লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৯ জুলাই ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১০টি

সমন্বিত স্কোর

৮.৫

বিচারক স্কোরঃ ৬.৪৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবর্ষা (আগস্ট ২০১১)

অন্যরকম সাক্ষী
বর্ষা

সংখ্যা

মোট ভোট ৮১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৮.৫

মনির মুকুল

comment ১৩২  favorite ৯  import_contacts ২,০৬৮
১.
আমজাদ আলীর বাড়ী থেকে যে পথটা দিয়ে হাটে যেতে হয় সে পথটার উপর এখনো মেম্বর-চেয়ারম্যানদের সুদৃষ্টি পড়েনি। তাই আজও এপথটার পিচ ঢালা আবরণ গায়ে জড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে হবু চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়েছেন তিনি জয়ী হলে এ পথটায় অন্তত ইটের সলিং এর ব্যবস্থা করবেন। তবে এ কথায় এলাকার মানুষ খুব বেশি আশ্বস্ত নয়, কারণ ইতিপূর্বে তারা কয়েকবার এ ধরণের প্রতিশ্রুতির শিকার হয়েছে। হঠাৎ মেঘের গর্জন শুনে আমজাদ আলী চলার গতি বাড়িয়ে দেয়। বৃষ্টি শুরু হলে মেঠো পথে আর হাঁটার উপায় থাকে না। বাজারের ব্যাগ হাতে জোরে হাঁটাও কষ্টকর তবুও যেভাবেই হোক বৃষ্টি নামার আগেই পেঁৗছানো দরকার।

বাড়ীর নিকটবর্তী আসতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমজাদ আলী বাম হাতে লুঙ্গি ধরে দৌড় দেয়। বাড়ীর মধ্যে ঢুকেই একেবারে বারান্দায় উঠে পড়ে। তার বউ জামিলা বেগম বারান্দায় বসা ছিল। স্বামী বারান্দায় উঠতেই তাকে একটা গামছা দিয়ে হাত থেকে বাজারের ব্যাগ নিয়ে ভিতরে যায়। আমজাদ আলী হাত-মুখ মুছতে মুছতে বারান্দার পশ্চিম পাশের চেয়ারটাতে বসে। বৃষ্টির গতি আরো বাড়তে থাকে। সে আয়েশ করে বসে থাকে। একটা উষ্ণ অনুভূতি তৈরি হয়।

জামিলা বেগম সওদা গুছাতে গুছাতে একটা কাগজের প্যাকেট দেখতে পায়। হাতে নিয়ে খোলে। বেশ কয়েকটা পিয়াজু আর সিঙ্গারা। এখনও গরমের উষ্ণতা বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘ ৮ বছরের বিবাহিত জীবনে তার স্বামীকে কোন দিন দেখেনি বাজার থেকে এসব কিনে আনতে। মানুষটা একটু কঠিন প্রকৃতির। ৬ বছরের একমাত্র ছেলে হিমেলের জন্যও কোন দিন এসব নিয়ে আসে না। ছেলেটা আজ তিন দিন যাবত বাড়ীতে নেই নানার বাড়ী আছে। সে বাড়ীতে থাকলে না হয় মনে হত ওর জন্য নিয়ে এসেছে। কিন্তু তাও না। ভাবে জিজ্ঞেস করে দেখি এটা কার? পরৰণে মনে হয়- না, দেখি সে নিজেই কিছু বলে কিনা। সে এক পাশে গুছিয়ে রেখে দেয় প্যাকেটটি।

স্বামীর কিছু কিছু কাজ-কাম জামিলার মধ্যে সন্দেহের দানা বাঁধে। এলাকার কেউ কেউ বলে তার স্বামী নাকি মোড়ল পাড়ার হালিম মিয়ার বাড়ীর কাছে মাঝে মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। জামিলা প্রথমে কথাটাতে পাত্তা দিতে চায়নি পরে ভেবে দেখে কথাটা একে বারেই ঝেড়ে ফেলা ঠিক না। কারণ হালিম মিয়া চার বছর আগে বনদস্যুর কবলে নিহত হবার পর দুটি বাচ্চা নিয়ে তার বিধবা বউটা একাই সংসার চালায়। এমন একজন অল্প বয়স্ক বিধবার বাড়ীর কাছে ঘোরাফেরা করার খবরটা একেবারেই গুরুত্ব দেবে না তা কি হয়? তাই জামিলাও এখন স্বামীর গতি বিধির উপর নজর রাখতে চেষ্টা করে।

পাশের বাড়ীর কুলসুম ভাবী একবার বলেছিল হালিম মিয়ার ছেলে-মেয়েকে নাকি প্রায়ই তার স্বামী দোকান থেকে এটা ওটা কিনে দেয়। পাড়ার আরো কয়েকজন মানুষও নাকি ব্যাপারটা খেয়াল করেছে। এসব কথা কানে আসলে কোন স্ত্রীরই মন ঠিক থাকে? তবু জামিলা ধৈর্য ধরে, ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু মাঝে মাঝে মনটা বুঝতে চায় না। সে একবার কথায় কথায় বলেই ফেলেছিল- 'তুমি নাকি হালিম মিয়ার ছাওয়াল-মাইয়েরে চকলেট, বিস্কুট কিনে দেও?" কথাটা শুনে সে একটু থমকে গিয়েছিল তবে অস্বীকার করেনি। বলেছিল- 'এতিম ছাওয়াল-মাইয়ে, তাগো কিছু খাতি দিলি আল্লাহও খুশি হয়। ক্যান কোন সমস্যা হয়েছে?" "সমস্যা হয়নি, হতি কতৰণ, তোমারে তাগো চিন্তা করার দরকার নাই, তাগো অন্য আত্মীয়-স্বজন আছে, তারাই করবে"। আমজাদ আর কোন কথা বলেনি।

সেদিনের সেই কথায় মনে হয় কাজ হয়নি, নইলে আজ আবারও এই ভাজার প্যাকেট কিনতো না। এটা নিশ্চয় ওদের জন্য কিনেছে। বৃষ্টির কারণে দ্রুত বাড়ী চলে এসেছে বলে দিতে ভুলে গেছে। কুলসুম ভাবীর কথাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয় কিনা কে জানে। সে বলেছিল হালিম মিয়ার বাচ্চাদের এটা ওটা দিয়ে বউটার মন নরম করার চেষ্টা করছে হয়তো?

জামিলার ভাবনা আরো গভীর হতে থাকে। ভিতরে ভিতরে একটু একটু রাগও জন্মে আমজাদের উপর। ঠিকমত খেতে-পরতে না দিলেও তার তেমন অনুযোগ নেই কিন্তু তাকে রাজরাণীর মত করে রেখেও যদি তার স্বামী অন্য কোন মহিলার পেছনে ঘোরে সেটা সে মেনে নিতে পারবে না। সংসারের আর্থিক দৈন্যতা থাকলেও ৮ বছরের বিবাহিত জীবনে তা নিয়ে কোন সময় ঝগড়া হয়নি তবে হালিম মিয়ার বউয়ের বিষয়টা নিয়ে গোটা দুইবার মনোমালিন্য হয়েছে। অবশ্য সেটা বড় কোন কিছুতে রূপ নিতে দেয়নি আমজাদ। নিজে নরম হয়ে বউয়ের রাগ ভাঙ্গানোর চেষ্টা করেছে।

বৃষ্টিটা বেশ ভালোই হচ্ছে। উঠানে অনেক পানি জমা হয়ে গেছে। পানি যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও বৃষ্টির গতি বেশি হওয়ার কারণে পানি জমে যাচ্ছে। জমে যাওয়া পানির উপর বৃষ্টির ফোটা পড়ে ডিমের মত তেরী হচ্ছে। হালকা বাতাসে তা এদিক সেদিক চলে যাচ্ছে। এর উপর আবার কোন ফোটা পড়লেই ফেটে যাচ্ছে। ভালোই দেখাচ্ছে। হঠাৎ আমজাদ আলীর মনটা যেন ভাবুক হয়ে ওঠে। সেই ভাবনা মুখ ফুটে বেরিয়েও আসে। আপন মনেই ঐ ডিমের দিকে তাকিয়ে বলে- "হায়রে পানির ডিম, তুই তো কিছুই করলি না। ওর ছাওয়াল- মাইয়েরে কিন্তু আমি আদর করি। আজও ওদের জন্যি খাবার কিনিছি...." হঠাৎ মনে হয় ব্যাগের মধ্যে তো ঐ খাবার গুলো রয়ে গেছে। বৃষ্টির জন্য দ্রুত চলে আসার কারণে ওদেরকে আর দেয়া হয়নি। ওগুলো জামিলা দেখলে ঝামেলা বাধতে পারে।

জামিলা এদিকেই তাকিয়ে ছিল। কথাটা সে শুনতে পেয়েছে। আমজাদ ঘাবড়ে যায়। জামিলা কাছে এগিয়ে আসে। তার চোখে-মুখে রাগ আর অভিমান। একটা চাপা কষ্ট বুকের মধ্যে চেপে রেখে বলে "তুমি কেন আমার সংসারে অশান্তি ডাইকে আনতিছো? তুমি কি আমারে নিয়ে সুখি নও?" আমজাদ তাকে শান্ত করার মনোভাব নিয়েই বলে "কিসের অশান্তি, আর কে কয়েছে তোমারে নিয়ে আমি সুখি না?"
- "এতৰণ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কার কথা কতিছিলে? ভাবিছো আমি শুনিনি"।
আমজাদ বুঝতে পারে তার আনমনা কথাগুলো সে শুনে ফেলেছে। তার এই ৰিপ্র মন-মানসিকতা শান্ত করা দরকার। তাই পরিবেশটা ঠিক করতেই সে বলে- "আচ্ছা বলতেছি, তার আগে কও আমার উপর রাগ করবা না?
জামিলা চুপ থাকে। একটু পরে বলে- "কও"। আমজাদ যেন কিছু একটা সাজানোর চেষ্টা করে মনে মনে। তারপর বলে "তোমারে বিয়ে করার আগে আমি একটা মাইয়েরে পছন্দ করতাম। এই রকম একদিন বর্ষার সময় সে আমারে কথা দিছিল আমারেই সে বিয়ে করবে। কিন্তু তার বাপে আমারে পছন্দ করিনি বলে আমার সাতে বিয়ে দেয়নি। ওর বাপে ওরে জোর করে বিয়ে দিতি চাইছিল। বিয়ের আগের দিন ও বিষ খাইছিল। আজ হঠাৎ তার কথাডা মনে হল তাই হয়তো কি বলে ফেলিছি।"
জামিলা চুপ থাকে। ঐ কথাটার সাথে এখন বলা ঘটনার মিল আছে কিনা মিলানোর চেষ্টা করে। একই রকম বলে মনে হচ্ছে না। সে তখন বাচ্ছাদের কথা বলেছিল। এই ঘটনায় তো কোন বাচ্ছাদের প্রসঙ্গ নেই। মনে হচ্ছে এগুলো তাৎৰণিক সাজানো। তাকে স্বাভাবিক করার জন্যই এগুলো বলেছে। সে বলে- "আমারে মিছা মিছি ভুলানোর চেষ্টা করতিছো তাই না? তুমি তখন বিড় বিড় কইরে বাচ্ছাগো কথা কতিছিলে। আর এখন কইছো অন্য কথা। তুমি হালিম মিয়ার বাচ্ছাগো জন্যি খাবার আনিছো, আমি দেখিনি ভাবিছো? সত্যি কইরে কওতো হালিম মিয়ার বউয়ের সাতে তোমার কোন সম্পর্ক নেই?" একটু থামে তারপর আবার বলে- "তোমার যা ইচ্ছা তাই করো, আমি আর এই বাড়ী থাকপো না।" কথাটা বলেই কাঁদতে থাকে। কান্না জড়িত কণ্ঠে আবার বলে "নিজির ছাওয়ালডার জন্যি কিছু আনতি দেহিনা আর ঐ বেডির ছাওয়াল-মাইয়ের জন্যি এটা-ওটা কেনো। আমি কিচ্ছু বুঝি না?"
আমজাদ বিচলিতবোধ করে। এই মুহুর্তে কি বলা দরকার ভেবে পাচ্ছে না। আপাতত একটা ঘটনা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল। হালিম মিয়ার পরিবারের সাথে আসলেই যে একটা ঘটনা আছে তা সে কারো কাছেই বলেনি। ভেবেছিল হালিমের বাচ্চা দুটির উপর তার সহানুভূতিকে কেন্দ্র করে যে যা-ই মনে করম্নক আসল ঘটনাটা কোন দিনই বলবে না। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমনভাবে গড়িয়েছে যে, তার সংসারেই ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। সে জামিলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে "আজ আসল কথাডা তোমারে কব, তবে কথা দেও কোন দিন কাউরে কইতে পারবা না।" জামিলা আগের বারের মত চুপ থাকে। আমজাদ বলে- "চুপ থাকলি হবে না, কথা দাও কাউরে কবা না"। সে কিছুটা শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে বলে- "কব না, কও"।

আমজাদ আনমনা হয়ে যায়। ভাবে বলবে কী বলবে না। ঐ কথাটা কাউকে বলা ঠিক না, কিন্তু তাকে যে ঘরের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। সে বলতে শুরু করে। জামিলা মনোযোগ দিয়ে শোনে। চার বছর আগের এক ঘটনা। তখন সে তেমন কোন কাজ কাম করতোনা। বাউন্ডেলের মত ঘুরে বেড়াত। একেবারেই যে কোন কাজ করতো না তা নয়। একটা কাজ ছিল যা আজও কেউ জানে না।

সুন্দরবন থেকে তাদের বাড়ীর দূরত্ব বেশি না হওয়ায় এই এলাকার অনেকেই সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে যায়। নদী ধরে যেতে হয় বনের অনেক গভীরে। প্রতিদিনের ধরা মাছ গুলো আড়তে বিক্রি করে আবার সেখানে যায়। এমনিভাবে ৬/৭ দিনের মাছ বিক্রির টাকা নিয়ে একসময় তারা বাড়ী ফেরে। আমজাদও যায় সেখানে। তবে মাছ ধরতে নয়; কষ্ট করে মাছ ধরতে যাওয়া মানুষগুলোর পরিশ্রমের টাকা ছিনিয়ে নিতে। সাথে একটা অস্ত্র থাকে আর মুখে কালো কাপড় বাধা। বনদস্যু সেজে এলাকার পরিচিত মানুষের কাছ থেকে ছিনতাই করলেও তাকে কেউ চিনতে পারে না। তবে বিপত্তি ঘটে একদিন। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। একপাশে একটা নৌকা। আশে পাশে আর কেউ নেই। সেটা ছিল হালিম মিয়ার নৌকা। নৌকায় উঠে হালিম মিয়াকে অস্ত্র দেখিয়ে টাকা নিয়ে ফিরে আসার সময় কিভাবে যেন সে চিনে ফেলে। পেছন থেকে বলে- "আমজাদ! বাড়ীতে যাই তারপর তোর দস্যুগীরি বুঝাবো"। খুব বেশি অবাক হলে বলা হয় "আকাশ থেকে পড়া" কিন্তু আমজাদের ৰেত্রে এটা বললে কম বলা হবে। হালিমের কথাটা শুনে সে যেন সপ্তম আসমান থেকে পড়েছে। হালিম বাড়ী গেলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে। তখন পড়বে মহা ফ্যাসাদে। জেল জরিমানা সহ বাড়তি পাওয়া যাবে এলাকার মানুষের ঘৃণা। এটা সহ্য করা যাবে না। মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য অস্ত্রটা সাথে রাখলেও কোন দিন এটা কারো উপর ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি কারো কারো কাছে টাকা না পেলেও তাকে তেমন কিছু বলেনি। কিন্তু আজ কি করবে সে? আজ অস্ত্রটা ব্যবহার না করলে তার সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। পেছন ফিরে হালিম মিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখা যায় তার চোখে মুখে যেন একটা আনন্দোল্লাসের ছায়া, যে ছায়া তার জীবনকে কালো করে দেবে। কোনভাবে তা হতে দেয়া যাবে না। হাতে থাকা কালো জিনিসটা হালিম মিয়ার দিকে বাগিয়ে পর পর দুইবার টিগারে চাপ দেয়। একটা আর্তনাদে লুটিয়ে পড়ে হালিম। কষ্ট চাপা কণ্ঠে বলে "তুই এ কী করলি আমজাদ! আমার বাচ্চা দুটার কি হবে? এর বিচার হবেই" হালিমের সেই বুকফাটা আর্তনাদ হার মানে বৃষ্টি ঝরার শব্দের কাছে। খুব বেশি দূরে পেঁৗছায় না। সে দেখতে পায় হালিমের লুটিয়ে পড়ার সাথে সাথেই তার উপর থেকে আশঙ্কার সেই কালো মেঘ আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। সে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলে- "বিচার"! কার কথাতে আমার বিচার হবে?" হালিম নদীর দিকে ফিরে বৃষ্টির ফোটায় তৈরি হওয়া ৰণজন্মা ডিমের দিকে তাকিয়ে বলে- "এই পানির ডিমই সাৰী দেবে আমাকে কে মেরেছে"। কথাটা নিত্যান্তই হাস্যকর মনে হয় আমজাদ আলীর কাছে। সে চলে আসে। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকে হালিম।


সেদিনের পর থেকে সে আর কোন দিন বনের দিকে যায়নি। ঐ পেশাটা একেবারেই ছেড়ে দিয়ে ভালো কাজে মনোযোগী হয়েছে। আজও কেউ জানে না সেদিন হালিমকে কে মেরেছিল। শুধু জানে বনদস্যু মেরেছে। হালিমের ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা দুটির দিকে তাকালে তার খুব খারাপ লাগে । নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়। তার কারণেই এরা আজ এতিম। তাইতো সাধ্য মত চেষ্টা করে বাচ্চা দুটিকে কিছু দিয়ে খুশি করতে।

এই কথাগুলো জামিলার কাছে বলতে বলতে তার চোখ দুটি ছল ছল করে উঠে। জামিলারও সকল রাগ যেন গলে গলে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে। নীরবে কেটে গেল কিছুৰণ। আমজাদ তাকিয়ে আছে উঠানের দিকে, এখনও বৃষ্টির ফোটায় পানির উপরে ডিম হতে দেখা যাচ্ছে। জামিলা উঠে গিয়ে ঘর থেকে সেই কাগজের প্যাকেটা এনে বলে- "বৃষ্টি থামলেই দিয়ে আসবা"। আমজাদ অপলক চেয়ে থাকে তার চোখের দিকে। এই চোখে এখন আর অভিমান নেই; আছে সমবেদনা।

২.
মুছা গাজীর পুকুরের পানি অনেকেই খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করে। প্রতিদিন এক কলস পানি হলেই জামিলাদের দিন পার হয়ে যায়। তবে বর্ষাকালে প্রতিদিন আসার দরকার হয় না। বাড়ীর মধ্যে বৃষ্টির পানি ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পানি জমা হয়। আজ সকাল থেকে আকাশটা একটু মেঘলা মেঘলা ছিল। বৃষ্টি হবে মনে করেই পানি আনার জন্য আসা হয়নি। শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হলো না দেখে জামিলা কলসটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় অন্য মৌসুমের চেয়ে অনেক কম আসা লাগে।

পুকুরের ঘাটে আসতেই দেখা মেলে কুলসুম ভাবীর। ভালোই হলো, দুই জন একসাথে কথা বলতে বলতে যাওয়া যাবে। কুলসুমের পানি নেওয়া হলেও সে জামিলাকে দেখে একটু দাঁড়ায়। পানির উপর ঢেউ দিয়ে জামিলা কলস ভরে কাখে তোলে। বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে। দুজন কলসী কাখে বাড়ীর দিকে রওনা দেয়।

বৃষ্টির গতি আরো বাড়তে থাকে। দুজনই ভিজে গেছে। সচরাচর দুপুরের গোসলের আগে পানি আনতে হয় বলে ভিজলেও সমস্যা নেই। তবে বৃষ্টিটা আগে শুরু হলেই আর কষ্ট করে পানি নিতে আসতে হতো না। বাড়ীতে বড় পলিথিন দিয়ে পানি ধরার যে ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানেও একটা কলস রাখা আছে। তাই বেশি না হলেও অন্তত এক কলস পানি ওখান থেকে পাওয়া যাবে। একবার স্বামীকে জানিয়েছিল একটা বড় পাত্র কিনতে পারলে এক সাথে অনেক পানি ধরে রাখা যাবে। বিষয়টির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে আমজাদ আলী দাবী পূরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারিনি।

হাঁটতে হাঁটতে পথের বাম দিকটাতে চোখ আটকে যায় জামিলার। তার চলার গতিও থেমে যায়। কয়দিনের টানা বৃষ্টিতে জমে যাওয়া পানির উপর এখনের এই বৃষ্টি ফোটা পড়ে ডিম ডিম তৈরি হচ্ছে। মনে পড়ে যায় সেদিনের শোনা সেই ঘটনাটার কথা। জামিলাকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে কুলসুম ইস্যু খোঁজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে জানতে চায় "অমন করে কি দেখিস রে জামিলা?" সে মিচকি হেসে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলে- "কিছু না, হাঁটো"। কুলসুমের কৌতূহল বাড়তে থাকে। বলে- "এমন কি কথা যে আামাকে বলা যাবে না?" জামিলা প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলে "দুপুরে কি রান্না করিছো?" একথায় কুলসুমের চিন্তার পরিবর্তন হতে দেখা গেল না। সে বলে- "রান্না করিনি, গিয়েই রান্না করবো। তুই কিন্তু কথাডা এড়িয়ে গেলি"। জামিলা চুপ থাকে। বুঝতে পারে ভাবীকে ভোলানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

কুলসুমের সাথে দেখা হলেই সাংসারিক কথা ছাড়াও হালিম মিয়ার বউ সম্পর্কে দু'চারটে কথা হয়। জামিলারও ইচ্ছে জাগে ঐ সংসারে তার স্বামীকে নিয়ে কোন আপডেট খবর আছে কিনা। তবে সেদিন ঐ ঘটনাটা স্বামীর মুখ থেকে শোনার পর এই খবরের প্রতি আর কৌতূহল জাগেনা। জামিলার এই কৌতূহল হারানোর বিষয়টিও কুলসুমকে ভাবায়। সে আবারও কিছুৰণ আগের বিষয়টিকে স্মরণ করানোর জন্য বলে-"বলতে না চাস বলিস না"। তার কথাটায় একটু চাপা অভিমান প্রকাশ পায় সেটা জামিলাও খেয়াল করে। বোঝা যাচ্ছে এই না বলা কথাটিকে সে বেশ সিরিয়াসভাবেই নিয়েছে। ঘটনাটা কুলসুম ভাবীকে বলা ঠিক হবে না তবে বললে হালিম মিয়ার বউ সম্পর্কে তার স্বামীকে নিয়ে যে ভুল ধারণা আছে তা দূর হবে। তবুও ঘটনাটা বলা উচিত হবে না।

কুলসুম খুব মন ভার করে কোন কথা না বলে হাঁটতে থাকে। যেন তাদের মধ্যে বিশাল আকারের মনোমালিন্য হয়েছে। তার এমন মন খারাপের বিষয়টা জামিলাকেও বেশ ভাবিয়ে তোলে। শেষমেশ বলে - "ভাবী ঐ কথাটা তোমাকে কব তবে কথা দেও কারো সাতে কতি পারবা না"। কুলসুম তাকে আশ্বস্ত করার সুরে বলে- "আমাকে কি তোর এমন মনে হয়?" এই কথাটা যেন তার আস্থাকে আরো মজবুত করে দিল। জামিলা বলতে শুরু করে তার স্বামীর বলা ঘটনাটা। শুনতে শুনতে এক পর্যায়ে কুলসুম চলা থামিয়ে জামিলার মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। জামিলার বলা শেষ হলে কিছুৰণ নীরব থেকে আবার চলা শুরু করে দু'জন। জামিলার মনে আবারও ভাবনা জাগে ভাবীকে বলা কি ঠিক হলো? হাঁটতে হাঁটতে তার বাড়ীর পথ এসে গেছে। সে কুলসুমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরো একবার অনুরোধ করে এই কথাটা যেন কাউকে না বলে। কুলসুম মুখে কিছু না বলে মাথাটা কাত করে সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দিয়ে ভাবতে ভাবতে চলে যায়।

৩.
পাতা পরিচর্যায় ব্যস্ত আমজাদ আলী। ধান গাছের চারাকে এলাকার সবাই পাতা বলে। পাতা সবল না হলে ধান গাছ শক্ত হয় না, ভালো ধানও পাওয়া যায় না। ঘরের পিছনেই পাতার ৰেত করা হয়েছে। ঘরের কাছাকাছি ৰেত তৈরি করার সুবিধা আছে। সব সময় নজরে রাখা যায়, গরু ছাগলের হাত থেকে রৰা করা যায়। সে বাইরে থাকলেও জামিলা ঘরের কাজ করার পাশাপাশি এদিকেও নজর দিতে পারে। এসব কথা বিবেচনা করেই প্রতি মৌসুমে পাতার ৰেত এখানটাতে করা হয়। হিমেল সব সময়ই বাবার সাথে থাকে। কাদা মাখতে শরীরের আর কোথাও বাকী নেই তার। কাজ করার সময় ৬ বছরের কোন বাচ্চা সাথে থাকলে কাজের চেয়ে অকাজ বেশি করে। তারপরও আমজাদ আলী তাকে সাথে এনেছে, যেন ছোট বেলা থেকেই কাজের প্রতি আগ্রহী হতে থাকে এই উদ্দেশ্যে।

কাজ শেষ করে আমজাদ আলী বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করে । গোসল করতে যাওয়ার জন্য গামছাটা দরকার। কাদামাখা শরীরে বারান্দায় ওঠা ঠিক হবেনা ভেবে এক নজর জামলাকে খুঁজে নেয়। তাকে রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখে নিজেই গামছাটা নামিয়ে নেয়। পিছনে কাদা মাখা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে হিমেল। তার গায়ের দিকে তাকালে মনে হবে বাবার চেয়ে চৌদ্দগুণ বেশি কাজ করেছে । জামিলা ধোয়ার কুণ্ডলী থেকে মাথা উঁচু করে হিমেলের এই অবস্থা দেখে কিছুটা বিরক্তিকর ভাবে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে "আজ তুমিই ওরে গোছল করাবা, ভূত বানিয়েছ ছাওয়ালডারে"। কথাটা হিমেলের জন্য খুশির। কেননা বাবার সাথে গোসল করতে গেলে কাঁধে চড়ে পুকুরের মাঝখানে যাওয়া যায়। কিন্তু মায়ের সাথে গেলে সেটা হয় না। সুতরাং আর দেরী করা ঠিক হবে না ভেবে সে বাবার আঙ্গুল ধরে টান দেয় পুকুরের দিকে যাওয়ার জন্য।

হঠাৎ গটমট করে কারো হেটে আসার শব্দ শুনে আমজাদ দরজার দিকে তাকায়। পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন মানুষ। সে অবাক হয়। তার বাড়ীতে পুলিশ! সাত-পাঁচ ভেবে উঠার আগেই ওদের মধ্যে একজন বলে উঠে "হ্যান্ডস আপ"। "হ্যান্ডস আপ" এর মানে কি আমজাদ জানে না। তবে পুলিশেরা এটা বললে কি করতে হয় তা জানা জানা আছে। বাংলা সিনেমায় অনেকবার কথাটা পুলিশকে বলতে শুনেছে। পুলিশ যাকে এই কথাটা বলে সে হাতে কিছু থাকলে সেটা ফেলে দিয়ে হাত উঁচু করে। কথাটার অর্থ হয়তো হবে 'খালি হাত খাড়া করা'। আমজাদ তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে হাতে একটা গামছা আছে। সে গামছাটা মাটিতে ফেলে দিয়ে হাত দুটি উঁচু করে। পুলিশের কথাটা জামিলার কানে পৌঁছে গেছে। সে ছুটে বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে। একজন পুলিশ আমজাদ আলীকে হাতকড়া পরিয়ে দিল। জামিলা কাঁদো কাঁদো ভাবে বলে- "কি করিছে আমার স্বামী?" পুলিশ বলে- "থানায় গেলেই জানতে পারবে"। জামিলা ডুকরে কেঁদে ওঠে। তাঁর মনে পড়ে যায় কুলসুম ভাবীর সাথে সে যে গল্প করেছিল তা মনে হয় লোকের কাছে বলে দিয়েছে। ঐ কথাটা কুলসুম ভাবীর কাছে বলা মস্তবড় ভুল হয়েছে। আমজাদ আলী জামিলার চোখের দিকে তাকায়। জামিলার কান্নার মাঝে যেন একটা অনুসুচনা ফুটে উঠতে দেখা যায়। সে বুঝতে পারে জামিলাকে বলা সেই গোপন কথাটি আর গোপন থাকেনি। হিমেলকে জড়িয়ে ধরে তার মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। তার শরীরে কাদা শাড়ীতে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

পুলিশ আমজাদকে নিয়ে যাচ্ছে। সে বার বার পিছনে দেখছে হিমেলকে। সেও তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। ওরা অনেক দূর চলে গেছে। হিমেল ঠিকমত বুঝতে পারছে ব্যাপারটা কী হচ্ছে। তবে এটা বুঝতে পারছে যে, আজ আর বাবার সাথে গোসল করা হবে না। তার কাঁধে চড়ে যাওয়া হবে না পুকুরের মাঝখানে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মনির  মুকুল
    মনির মুকুল ধন্যবাদ প্রজাপতি মন ও বিন আরফান।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • তানিম ইশতিয়াক
    তানিম ইশতিয়াক ভালো লাগছে লেখার মুল্যায়নের জন্য। গ্রুপ ভোটাররা এবার সুবিধা করতে পারেনি। অপনাকে শুভেচ্ছা।
    প্রত্যুত্তর . ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • মনির  মুকুল
    মনির মুকুল ধন্যবাদ তানিম।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • রওশন জাহান
    রওশন জাহান এই সংখ্যার ফলাফলে আমি অসম্ভব আনন্দিত. সত্যি বিচারকদের উপর আস্থা রাখতে পারছি. সাহিত্যমান সম্পন্ন জীবনমুখী এই লেখাটার বিজয় আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে !
    প্রত্যুত্তর . ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • মনির  মুকুল
    মনির মুকুল রওশন আপু, আপনার কথায় আমি যেন ভাষাহীন হয়ে গেছি। শুধু এতটুকু বলবো- দয়াময় যেন আপনাদের এই ভালোবাসার মূল্য দেয়ার শক্তি দান করেন। অনেক অনেক শুভকামনা রইল আপনার জন্য। আপনার সুখী দাম্পত্য জীবন কামনা করি।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • রওশন জাহান
    রওশন জাহান এখানে আবার সুখী দাম্পত্য জীবন কামনা করা কেন ! হা হা হা .মজা পেলাম.
    প্রত্যুত্তর . ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • নাজমুল হাসান নিরো
    নাজমুল হাসান নিরো দাদা আগেই ক্ষমা চাচ্ছি অনেক পরে অভিনন্দন জানাচ্ছি বলে। আমি সত্যিই অভিভূত গল্পকবিতার কার্যক্রমে এবং আংশিক বাদে যোগ্যজনের বিচারে।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • মনির  মুকুল
    মনির মুকুল ধন্যবাদ নাজমুল ভাই (আপনার শেষ বাক্যটি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে পুরোপুরি অনুধাবন করতে সক্ষম হইনি)।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • সোনিয়া  sultana
    সোনিয়া sultana excellent !!!
    প্রত্যুত্তর . ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১
  • মনির  মুকুল
    মনির মুকুল Thanks @ সোনিয়া sultana
    প্রত্যুত্তর . ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১

advertisement