ভালোবাসা আর ঘৃণা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একদিন যা ছিল ভালোবাসা, অন্যদিন তা রূপান্তরিত হতে পারে ঘৃণায়। এবছরের যা ছিল মধুময় ভ্যালেন্টাইন ডে, অন্য বছর অন্য কোন চৌদ্দই ফেব্রুয়ারী তা একই থাকবে তো? জানতে হলে পড়ুন ব্ল্যাক ভ্যালেন্টাইন।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪৭টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৬

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

ব্ল্যাক ভ্যালেন্টাইন
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

মোট ভোট ৩১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৬

এশরার লতিফ

comment ১৭  favorite ০  import_contacts ২৭৫
ছোট বেলা থেকেই আমি বিখ্যাত হতে চাইতাম। শক্তি, সুনীল কিম্বা শামসুর রাহমানের মত। ভাবতাম দারুন সব কবিতা লিখব। দেশের সেরা পত্রিকাগুলো আমার কবিতা লুফে নেবে আর ঘন যৌবনা রমনীরা অটোগ্রাফের জন্য ঘন ঘন আমার ওপর হামলে পড়বে। বিখ্যাতদের মত আমার জীবনেও মাঝেসাঝে একটু আধটু প্রেম ভালোবাসা আসবে। তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যম সরব হবে। চায়ের কাঁপে তর্কবিতর্কের ঝড় বয়ে যাবে।

আমার স্বপ্ন সফল হয়েছে। আমি বিখ্যাত হওয়া শুরু করেছি।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ঘন যৌবনা রমণী নয়, বৃদ্ধ এবং মধ্যবয়স্কদের মাঝে আমার সমাদর সবচেয়ে বেশী। জানি কী ভাবছেন। না, আমি কোন বৃদ্ধাশ্রমের মালিক নই। আমি লেখক হিসেবেই সুপ্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু সে লেখা কাব্য নয়। আমি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম শোক সংবাদ লেখক। মানুষের মৃত্যুর খবর প্রচারে আমি একটা নূতন ধারার প্রবর্তক। অনেক বৃদ্ধ বৃদ্ধারাই আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মুখিয়ে থাকেন। ওনারা ভাবেন আমার লেখা শোক সংবাদের ভেতর দিয়ে ওঁদের আটপৌরে একঘেয়ে জীবন একটা মাঝারি আকারের অমরত্ব এবং মহিমা অর্জন করবে। আমার সুবাদে এই সব বুড়ো-বুড়ি কিম্বা তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের পকেট থেকে মোটা অঙ্কের টাকা প্রায়ই পত্রিকার ভান্ডারে জমা পড়ে।

বিখ্যাত লোকদের মত আমারও ব্যক্তিগত জীবনে ধ্বস নেমে গেছে। তবে আমার বিয়ে ভাঙ্গার পেছনে খ্যাতিমানদের মত বিবাহবহির্ভূত রগরগে কোন কাহিনী নেই। বিষয়টা আসলে খুব বিব্রতকর। বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত আমাকে কে যেন পেছন থেকে টেনে ধরে। সত্যি বলছি, একদম শক্ত করে পেছন থেকে টেনে ধরে। আমার শরীরের সমস্ত উত্তাপ সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায়। এভাবে কি সংসার হয়?

শুধু বিয়ে না, ইদানীং আমার প্রেমও ভেঙ্গে যাচ্ছে। সেদিন আমার সাম্প্রতিকতম প্রেমিকা তামান্নাকে মোহাম্মদপুর বাবর রোড থেকে উঠিয়ে উত্তরার একটা রেস্টুরেন্টে যাচ্ছিলাম। গাড়িটা বিজয় সরণির মোড়ে আসতেই আমি আলতো করে তামান্নার ডান পা ছুঁয়েছি। হঠাৎ কী হলো জানি না, গাড়িটা চর্কির মত বিজয়সরনীর গোল চত্বর ঘুরতে লাগলো। একবার না, দুই বার না, সাত সাত বার। তামান্না ঝিম মেরে গাড়ির সিটে পড়ে গেছে, নাড়ীভুঁড়ি ওলটানোর অবস্থা। আমি পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বললাম, একেই বলে সাত পাঁকে বাঁধা। বলতে না বলতেই গাড়িটা আরেকবার চক্কর খেয়ে এক চাকা ফুটপাথে উঠিয়ে থুবড়ে পড়ল। লোকজনের ভিড় লেগে বিশ্রী অবস্থা। পুলিশ এসে লাইসেন্স দেখতে চাইলো। তামান্না ভীষণ ভয় পেয়ে উবার ডেকে চলে গেলো। আমার সাথে ও আর কোন যোগাযোগ রাখেনি।

তামান্নার আগে আমার প্রেমিকা ছিল মেরিনা। মেরিনা একদিন আমাকে ওর বাবার অফিসে নিয়ে গেলো। আমি চুইংগাম চিবোচ্ছিলাম। মেরিনার বাবা মুসুল্লী মানুষ। তিন বার হজ করেছেন, মুখে কাঁচাপাকা দাঁড়ি। আমি বাঁ হাতে চুইংগাম লুকিয়ে ডান হাতে ওনাকে সালাম দিতে গেলাম। কী হল জানি না, আমার ডান হাতটা হঠাৎ ঠাস করে ওনার গালে চড় বসিয়ে দিলো। আর বাঁ হাতটা নিজের অজান্তেই সম্ভাব্য শ্বশুরের দাঁড়িতে চুইংগাম লেপ্টে দিলো। উনি ত্রিশ বছরের পুরনো দাঁড়ি কেটে ফেলতে বাধ্য হলেন। সেই সাথে মেরিনার সাথে আমার তিন বছরের সম্পর্কটাও কেটে দিলেন।

একটা অদৃশ্য শক্তি যেন আমায় সুখী হতে দিচ্ছে না।

এসবে অতিষ্ঠ হয়ে আমি এখন পেশাদার জীবনেই বেশী মগ্ন থাকি। বিদ্যুৎবার্তা পত্রিকার সম্পাদক শাহেদ ভাইয়ের আমি বিশেষ স্নেহভাজন। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় শাহেদ ভাই আমাকে ঢাকা ক্লাবে নিয়ে যান। শাহেদ ভাইয়ের পছন্দ জিন অ্যান্ড টনিক। আমি ভদকা সহকারে ওনাকে সঙ্গ দিই। গতকাল সন্ধ্যায় যথারীতি ঢাকা ক্লাবে গেলাম। শাহেদ ভাই আমাকে টেনে ঘরের এক কোনায় নিয়ে গেলেন। তারপর দারুণ উৎসাহ নিয়ে বললেন,

‘তোমার জন্য একটা গুড নিউজ আছে। একটু আগে এলে আরও ভালো হতো’

আমি বসতে বসতে বললাম,

‘কী ব্যাপার বলুন তো, কে মারা গেছে?’

শোক সংবাদ লেখার এটাই একটা সমস্যা। মৃত্যু মানে আরেকটা মহান শোক সংবাদ লেখার সুযোগ। নামীদামী কেউ হলে তো কথাই নেই। শাহেদ ভাই অবাক হবার ভঙ্গী করে বললো,

‘মারা যাবে কেন? তবে ব্যাপারটা শোক সংক্রান্ত’

‘কোন ব্যাপারটা’

‘সাইফুলকে চেন না, ‘দ্বিতীয় মুদ্রণ’ প্রকাশনীর মালিক? ওর সঙ্গে একটু আগে দেখা হয়েছিল। ওরা তোমার বই ছাপাতে চায়। আমার কাছ থেকে তোমার কন্টাক্ট ডিটেইলস নিলো’

‘তাই?’ আমি অবাক এবং পুলকিত হলাম। আমার খ্যাতি সবে ছড়াচ্ছে, এই সময় ‘দ্বিতীয় মুদ্রণ’এর মত বিখ্যাত প্রকাশনী থেকে বই ছাপানোর আমন্ত্রণ ভাগ্যের ব্যাপার।

‘হ্যাঁ। সাইফুল ভাবছে এই ফেব্রুয়ারীত তোমার বই বাজারে আনবে। নামও সাজেস্ট করেছে’
‘কী নাম?’

‘নির্বাচিত শোক সংবাদ’ কিম্বা ‘শোক সমগ্র’। আমি বলেছি বইয়ের নাম ‘শোক সংকলন ১’ হলে ভালো হয়। সব শোক তো এদেশ থেকে ফুরিয়ে যায়নি। আরও অনেক শোক আসবে। এরপর আবার ‘শোক সংকলন ২’ ছাপানো যাবে। কী বলো?’

আমি শাহেদ ভাইয়ের কথায় সায় দিলাম। বইয়ের নাম নিয়ে আমার যায় আসে না। ‘দ্বিতীয় মুদ্রণ’ থেকে একবার বই বেরোলে পঞ্চম মুদ্রণও ফুরিয়ে যাবে। আমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না।

আমার লেখাগুলো আমি একটা স্ক্র্যাপ বুকে সেঁটে রাখি। সেদিন রাতে ঘরে ফিরে স্ক্র্যাপ বুক নিয়ে বসলাম। পাতা উল্টে লেখাগুলোয় চোখ বুলালাম…

শোক সংবাদঃ সুকুমার চৌধুরী
সুকুমার বাবু কেউ ছিলেন না, মানে সে রকম কেউ। সুকুমার বাবু রাজনীতি করেননি, টেলিভিশনে আসেননি, অনেক টাকাকড়ির মালিক হননি। ওনার অবদান নীরব এবং নিভৃত। ওই যে কবি বলেছেন না ‘আমি সদা অচল থাকি, গভীর চলা গোপন রাখি’, অনেকটা সেরকম। আবার এও বলা যায় যে সুকুমার বাবুর মত সচল মানুষ খুবই দুর্লভ। কারন তিনি ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চালাতেন। সুকুমার বাবুর ১৪ নভেম্বর ২০১৩’র বীরত্ব গাঁথা অনেকেরই অজানা। ওই দিন বিকেল বেলা ভুল সিগন্যালের কারনে দুটো ট্রেন মুখোমুখি চলে আসে। এর একটি সুকুমার বাবু চালাচ্ছিলেন। অনেক দূর থেকে তিনি ব্যাপারটা টের পান। সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক চেপে ট্রেন থামিয়ে লাইনে নেমে পড়েন। তারপর নিজের পরনের লাল জামা খুলে নাড়তে থাকেন। উল্টো দিক থেকে আসা ট্রেনটা একদম শেষ মুহূর্তে থামতে সক্ষম হয়। অন্য ট্রেনের ড্রাইভার পরে জানিয়েছিলেন যে সুকুমার বাবুর লাল কাপড় দেখতে না পেলে অন্তত এক হাজার যাত্রীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়তো। গতকাল সন্ধ্যায় সুকুমার বাবুর জীবনের ট্রেইনটি লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে হলুদিয়া শ্মশান ঘাটে।

শোক সংবাদঃ আরিফুল বারী সবুজ
আরিফুল বারী সবুজ তার নামের প্রতি সুবিচার করেছিলেন। তিনি ‘সবুজ বাড়ী’ বানাতেন, মানে গ্রিন আর্কিটেকচার করতেন। সুশীল সমাজ বেশ ক’ বছর ধরেই তাকে সবুজ স্থাপত্যের পুরোধা হিসবে অভিহিত করে আসছে। ধানমন্ডির অনেক এপার্টমেন্টের সবুজ ঘাসে ছাওয়া ছাদ আর গুল্মশোভিত বারান্দা তার সবুজ-সচেতন স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে রয়ে যাবে আরও অনেক যুগ। বাংলাদেশের সরল মনের লোকদের মাঝে নিন্দুক এবং পরচর্চাকারীর অভাব নেই। নিন্দুকেরা বলেন, তার কাজ সবুজ নয় বরং অবুঝ স্থাপত্য এবং গ্রিন ওয়াশের সেরা উদাহরণ। যে দেশে সিমেন্টের (অন্যতম কার্বন নিঃসরণকারী নির্মাণ উপকরণ) কোম্পানি টেঁকসই স্থাপত্যের পুরস্কার দেয় আর স্থাপত্য সংসদ সেটা সানন্দে উপভোগ করে, সেই দেশে এর বেশী প্রতিভা আশা করাই অন্যায়। অনেকেই বলেন টেঁকসই স্থাপত্যের সেরা উদাহরণ মাটির ঘর। বারী সবুজ গতকাল সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানের মাটির ঘরে শায়িত হয়েছেন।

শোক সংবাদঃ আকবর আলি
আমরা যারা সত্তরের দশকে জন্মেছি তাদের দর্জি দিয়ে কাপড় বানানোর অভিজ্ঞতা আছে। মেয়েরা এখনো গাওছিয়া মার্কেটে ব্লাউজ, সালোয়ার কামিজ মাপ দিয়ে বানায়। মেয়েদের দেহের মাপ দিয়ে কাপড় বানানো স্পর্শকাতর বিষয়। সব দর্জির সঙ্গে মেয়েরা সহজ হতে পারেনা কারন অনেকেই স্পর্শের সীমা ছাড়িয়ে ফেলে। আর এখানেই আকবর আলির মাহাত্ম্য। এ কাজটি আকবর আলী করতেন অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে। রুমানা আহমেদ আকবর আলির একজন ক্লায়েন্ট ছিলেন। বছরে অন্তত তিনবার তিনি আকবর আলিকে দিয়ে সালোয়ার কামিজ কিম্বা ব্লাউজ বানাতেন। হঠাৎ রুমানা বেগম আকবর আলির দোকানে আসা বন্ধ করে দেন। আবার রুমানা বেগমের সাক্ষাৎ মেলে দু’বছর পর। ব্লাউজের মাপ দিতে গিয়ে আকবর আলি টের পান রুমানা আহমেদের উন্নত বক্ষস্থল সমতল, মাথার চুল প্রায় নেই। রুমানা আহমেদ কিছু না বলায় আকবর আলিও কিছু জিগেস করেননি। কিন্তু তিনি ব্লাউজ এমনভাবে বানালেন যেন স্তনযুগলের যায়গাটি বর্তুলাকার থাকে। এর হয়তো কোন দরকার ছিল না, কিন্তু এই এক ঘটনার ভেতর দিয়ে রুমানা আহমেদ আকবর আলির সংবেদনশীলতা বুঝতে পেরেছিলেন। এই শোক সংবাদ রুমানা আহমেদের অনুরোধে লেখা। আকবর আলির শরীর আর আত্মার সুতোর সেলাইটা গতকাল সন্ধ্যায় আলগা হয়ে গেছে।


নিজের লেখা নিজেই পড়তে পড়তে একটা সুখকর ক্লান্তি নিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখাগুলোকে আরেকটু মার্জিত করে পাঁচ ফর্মার বইয়ের আকারে সাজালাম। এর মাঝে প্রকাশকের সঙ্গেও একবার কথা হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় ফুরফুরে মেজাজে ঢাকা ক্লাবে গেলাম। ভ্যালেন্টাইন্স ডে, এই মেয়ে সেই মেয়ের সাথে মাখামাখি আর শাহেদ ভাইয়ের সাথে মদ্যপানটা একটু বেশীই হয়ে গেলো। উবার নিয়ে বাসায় ফিরে টের পেলাম মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে, আশেপাশের দৃশ্যগুলো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। বিছানায় কোন রকমে শরীরটা এলিয়ে দিতেই শাহেদ ভাইয়ের ফোন এলো। মাত্রই ওনার সঙ্গে দু ঘন্টা কাটিয়ে এসেছি। তাই অবাক হয়ে বললাম,

‘কী ব্যাপার শাহেদ ভাই, কী হয়েছে’

‘তোমাকে এখুনি অফিসে যেতে হবে’

‘রাত সাড়ে বারোটায়? ভোরে গেলে হয় না’

‘না। একজন শিল্পপতি মারা গেছেন। এহতেশাম চৌধুরী। ক্লাবে দেখেছ না?’

‘জি, ঋণ খেলাপি, তিন হাজার কোটি টাকা হাওয়া করে দিয়েছেন’

‘ওনার পি এস অফিসে এসে বসে আছেন। তোমাকে শোক সংবাদ লিখতে হবে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি’

এক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎবার্তা পত্রিকার তেতালায় আমার অফিসে চলে এলাম। এহতেশাম চৌধুরীর পি এস এক গাদা কাগজ হাতে ধরিয়ে দিলেন, শিল্পপতি সাহেবের নানা জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি। বলে গেলেন এমনভাবে শোক সংবাদ লিখতে হবে যেন ঋণ খেলাপের ব্যাপারটা তার মাহাত্ম্যের তুলনায় তুচ্ছ ধূলিকণা মনে হয়।

রাত তিনটায় পত্রিকা মুদ্রণে যাবে, হাতে সময়ও বেশী নেই। এদিকে আমার রক্তে অ্যালকোহল তান্ডব লাগিয়ে দিয়েছে। ভাবনাগুলোকে ঠিকমত সংহত করতে পারছি না। তারপরও কম্পিউটার খুলে লেখা আরম্ভ করলাম…

‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই, দীন দুঃখিনী মা যে তোদের তার বেশী আর সাধ্য নাই- এই মন্ত্রে মুগ্ধ বাঙ্গালীর গা যখন মোটা কাপড়ের যন্ত্রণায় খস খস করছে ঠিক সেই সময় মখমলের প্রশান্তি নিয়ে এহতেশাম চৌধুরীর আবির্ভাব। তার টেক্সটাইলে বোনা হল সুতি, শিফন আর সাটিন কাপড়। তার গারমেন্টসে বানানো হল শার্ট, প্যান্ট, শাড়ি আর চাদর। তার শিফন শাড়ির খ্যাতি আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপ্ত...।

লিখতে লিখতে হঠাৎ মনে হল হাতের উপর থেকে আমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে, চিন্তায় কে যে জট পাকিয়ে দিচ্ছে। এক অক্ষরে চাপ দিচ্ছি, আঙুল জোর করে অন্য অক্ষরে চলে যাচ্ছে। তারপর কী ঘটল মনে নেই। শুধু খেয়াল আছে লেখা শেষ করে ইমেইলে সেন্ড বোতামে চেপেছিলাম। তারপর প্রচন্ড ক্লান্তিতে টেবিলেই ঢুলে পড়েছি।

পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে গেলো টেলিফনের ক্রিং ক্রিং শব্দে। ফোনের ও পাশ থেকে শাহেদ ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো,

‘তুমি কোথায়?’

‘অফিসে, রাতে বাড়ী ফিরিনি’

‘তুমি থাক, আমি আসছি’

আধঘন্টা পর শাহেদ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। আমার দিকে দৈনিক বিদ্যুৎবার্তার একটা কপি ছুড়ে দিয়ে বলল,

'এসব কী লিখেছ?'

‘কেন কী হয়েছে?’

‘পড়ে দেখ, এটা কী অবিচুরী? কার অবিচুরী’

আমি বিভান্ত দৃষ্টি নিয়ে পত্রিকার তিন নম্বর পৃষ্ঠা খুললাম। দু কলাম আট ইঞ্চি জুড়ে আমার লেখা শোক সংবাদ। আমি পড়ছে আর আমার হাত থর থর করে কাঁপছে…

শোক সংবাদঃ এহতেশাম চৌধুরী
‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই, দীন দুঃখিনী মা যে তোদের তার বেশী আর সাধ্য নাই- এই মন্ত্রে মুগ্ধ বাঙ্গালীর গা যখন মোটা কাপড়ের যন্ত্রণায় খস খস করছে ঠিক সেই সময় মখমলের প্রশান্তি নিয়ে এহতেশাম চৌধুরীর আবির্ভাব। তার টেক্সটাইলে বোনা হল সুতি, শিফন আর সাটিন কাপড়। তার গারমেন্টসে বানানো হল শার্ট, প্যান্ট, শাড়ি আর চাদর। তার শিফন শাড়ির খ্যাতি আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপ্ত।

নাজমাও শিফনের শাড়ি পছন্দ করত। আজ চৌদ্দই ফেব্রুয়ারী, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, নাজমার মৃত্যুদিন। নাজমা চারুকলায় পড়ত। দারুণ ছবি আঁকত। আমি তখন লিটল ম্যাগাজিনে উত্তর আধুনিক কবিতা লিখছি। পড়ালেখা না করলেও জগন্নাথ কলেজের খাতায় আমার নাম আছে। শাহবাগের কবিতার আড্ডায় নাজমার সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হতো। শুরুতে সবারই অনেক সম্ভাবনা থাকে। নাজমা আমার সম্ভাবনাকে ভালবেসে ফেললো। আমরা লুকিয়ে বিয়ে করলাম। মোহাম্মদপুর হুমায়ুন রোডের একটা চিলেকোঠায় আমাদের যৌথ জীবন আরম্ভ হলো। খুব সুন্দর ছিল সময়টা। পূর্ণিমার রাতে আমরা ছাদে বেরিয়ে আসতাম। আহা, কি আকরিক আলোয় ভরা আকাশ। শিফনের শাড়ির ভেতর দিয়ে জোছনা ঢুকে নাজমাকে দেবীর মত লাগত। বর্ষাকালে আমাদের টিনের চালে ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ত। নাজমা ছাদে দাঁড়িয়ে ভিজত। আমি মুগ্ধ হয়ে ওর শরীরের আঁকাবাঁকা রেখাগুলো দেখতাম। ছাদে অনেক ফুলের টব ছিল। জুঁই, বকুল হাস্নাহেনা।। সারারাত সুবাস ছড়াত।আমার মন উতলা হতো। হাস্নাহেনা নাকি নাজমা, কার সুবাস, আমি গুলিয়ে ফেলতাম।

কবিরা অনেক উল্টোপাল্টা করে। শক্তি করেছিলেন, সুনীল করেছিলে, আমিও। এখানে সেখানে যাওয়া, পানটান, এইসব। কিন্তু সেই অনুপাতে আমার কবিতা কোথাও তেমন কড়কে পাচ্ছিল না। জীবনানন্দের লেখাও ওনার সময় মূল্য পায়নি। আর আমি লিখছি উত্তরাধুনিক, ডিকন্সট্রাক্টিভিস্ট কবিতা। পাঠক সমাজ এর সমাদর পেতে তো সময় লাগবে, না কি? কিন্তু নাজমা সেটা বুঝল না। ওর যেন মোহভঙ্গ হলো। ও মোহনের দিকে ঝুঁকল। মোহন ততদিনে বেশ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ওর সবচেয়ে বাজে কবিতাও ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় স্থান পায়।

আমি জানতাম নাজমা আর মোহন ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে ওদেরকে অনুসরণ করতাম। ভয়ঙ্কর এক অন্ধ ক্রোধে আমার সমস্ত শরীর নিশপিশ করত। একদিন ওরা ঢাকা থেকে স্টিমারে বরিশাল যাচ্ছিল। নাজমা আমাকে বলেছিল ডিপার্টমেন্টের স্টাডি ট্রিপ। চাঁদের আলোয় বুড়িগঙ্গা নদী শিফন শাড়ির মত দুলছিল। নাজমা স্টিমারের ডেকে বসে কাগজে জল রং চড়াচ্ছিল। একটু দূর থেকে দেখলাম মোহন ওর কপালে চুমু খেয়ে কেবিনে ফিরে গেছে। আমি ধীরে ধীরে নাজমার দিকে এগুলাম। তারপর একটু থেমে পেছন থেকে মুগ্ধ হয়ে অর্ধস্ফুট জলরং দেখলাম। কালচে নীল আকাশে ধব ধবে সাদা চাঁদ আর নীল জলের মাঝে কম্পমান সাদা আলোর বিম্ব ওর তুলির ছোঁয়ায় কিরকম প্রাণ পেয়েছে। হঠাৎ নাজমা আমার দিকে ঘুরে তাকাতেই আমার আক্রোশটা ফিরে এলো। এক ধাক্কায় ওকে পানিতে ফেলে দিলাম। পড়ে যাওয়ার সময় নাজমা আমার হাত শক্ত করে ধরেছিল। হাত ছাড়িয়ে নিতেই ওর অনামিকা থেকে সোনার আংটিটা খুলে ফ্লোরে পড়ল।

আংটিটা আমি যত্ন করে রেখেছি। মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের তেইশ নম্বর লকারে। আংটির ভেতরের পরতে ওর আঙ্গুলের ছোঁয়া আর লোহিত কণিকার রেশ আজও লেগে আছে। মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে আংটিটা দেখি আর ভাবি আহা জীবনটা কত মধুময় হতে পারত।

নাজমা আঁকার হাত ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু নিজের ভুলে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনষ্ট হলো। ফুল মেনি আ ফ্লাওয়ার ইজ বর্ণ টু ব্লাশ আনসিন অ্যান্ড ওয়েইস্ট ইটস সুইটনেস অন দি ডেজারট এয়ার… যে ফুল না ফুটিতে ঝরিছে ধরনীতে, যে নদী মরুপথে হারাল ধারা…। জল রং করতে করতে জলের সঙ্গে মিশে গেলো আমার জল কন্যা’

শোক সংবাদ পড়া শেষে আমি স্তব্ধ হয়ে শাহেদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই সময় আবার একটা ফোন এলো,

‘স্যার, সোনালী ব্যাংক থেকে বলছি। পুলিশ এসে আপনার লকার খুলেছে। একটা সোনার আংটি নিয়ে গেছে। বলছে এটা এভিডেন্স…স্যার, শুনছেন?’

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement