মানুষের বেঁচে থাকার জন্য শারীরিক উষ্ণতার যেমন প্রয়োজন তার চেয়েও বেশী প্রয়োজন মানসিক উষ্ণতার। গল্পটি এই বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২২

বিচারক স্কোরঃ ২.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

উষ্ণতা
উষ্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট ১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২২

এশরার লতিফ

comment ৫  favorite ০  import_contacts ১৮২
একঃ রেশমি

রেশমি চেয়ার ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।

বাইরে একটা বড় উদ্যান। উদ্যানের পেছনে দালানকোঠার ছায়ারেখা আলোর প্রতিসরণে সামান্য কাঁপছে। শীতের হিমস্পর্শে উদ্যানের যে গাছগুলো রেখাসর্বস্ব ভাস্কর্যে পরিনত হয়েছিল তাদের খয়েরী শরীরে এখন সবুজ জল্ রঙের ছোঁয়া। পার্কের মাঝ দিয়ে কংক্রিটের টাইলস বিছানো ধূসর পথ। টাইলসের ফাঁকে ফাঁকে দুর্দান্ত জীবনী শক্তি নিয়ে অঙ্কুর মেলেছে আগ্রাসী গুল্মের দল। পার্কের একপাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে ছেঁড়া চামড়ার বল নিয়ে হুল্লোড় বাঁধিয়েছে রোগা লিকলিকে অর্ধ-উলঙ্গ ক্ষুধার্ত পথশিশুর দঙ্গল। একটা ইউক্যালিপটাস গাছের ডালে দুটো চঞ্চল শালিক ঠোঁট ঠোকাঠুকি করছে। বসন্তের এই পড়ন্ত ভোরে চারদিকে প্রাণের প্রবল প্রাচুর্য আর বেঁচে থাকার সুতীব্র এষণা।

রিমা একটু কিছু বলছে কিন্তু দ্রুত ধাবমান শব্দগুলো বাতাসে সামান্য তরঙ্গ তুলে রেশমির ভাবনার অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। রিমা কাছে এসে পিঠে হাত ছোঁয়াতেই রেশমি বললো,

‘এই যে কৃষ্ণচূড়া আর ইউক্যালিপটাস,কী অদ্ভুত সুন্দর গাছগুলো। অথচ এর একটাও আমাদের দেশী গাছ না’

‘তাই? জানতাম না’

‘হ্যাঁ। একটা মাদাগাস্কার থেকে এসেছে, অন্যটা অস্ট্রেলিয়া। মাটির নীচ শিকড় বিছিয়ে নিষ্ঠুরের মত এরা সব পানি আর খনিজ শুষে নেয়। দেশী গাছগুলো সুবিধে করতে না পেরে হারিয়ে যায়। দা উইনার টেইকস ইট অল, দা লুজারস স্ট্যান্ডিং স্মল’

‘রেশমি, এখন কী করবে ভাবছ?’

‘কী করার আছে?’

‘একটু সময় নিয়ে সব কিছু গুছিয়ে নিতে হবে তো’

রিমা বলেই বুঝল ‘সময়’ এবং ‘গোছানো’, দুটো শব্দই পরিহাসের মত শোনাচ্ছে। কর্কট রোগ, স্টেইজ ফোর, শরীরে ছড়ানো। ও সংশোধনের জন্য বললো,

‘ঝুমাকে কে দেখবে? আবেদ যে রকম...’

ঝুমার প্রসঙ্গ আসতেই রেশমির মনটা দ্রব হয়ে গেলো। মেয়েটা এখন ভেঙ্গে ভেঙ্গে কথা বলতে শিখেছে, কী যে মিষ্টি শোনায়। অভিমান করলে মাটিতে গড়াগড়ি খায়। রাতে মাকে না জড়িয়ে ঘুমুতে পারে না। এই বয়সের অন্য বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া আরম্ভ করেছে। কিন্তু রেশমি ঝুমাকে কাছ ছাড়া করতে চায়নি। এখন মনে হচ্ছে ওকে আগে আগে স্কুলে দিলেই ভালো হতো। সম্পর্কের জালটা আরেকটু ছড়িয়ে বিছিয়ে যেত। একটা মোটা সুতো ছিঁড়লে অন্য অনেক পাতলা সুতোর টান লেগে থাকতো। এখন ঝুমার মা’র জন্য অনেক কষ্ট হবে।

রেশমির ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে জানালার কাঁচ ঝাপসা করে দিলো।


দুইঃ নীলা

রেশমিকে এদিকে এগোতে দেখে নীলা অস্বস্তি বোধ করছে। না এলেই ভালো হতো। কিন্তু নীলা আগ্রহটাও চেপে রাখতে পারছিল না। উনি কী জানেন? কতটুকু জানেন?

রেশমি চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,

‘আপনাকে আসতে বলে আমিই দেরী করে ফেললাম, রাস্তায় এত জটলা’

‘না, ঠিক আছে। আমিও এখুনি এলাম। আমাকে তুমি করে বলুন’

‘কী বললেন?’

‘আমাকে তুমি করে বলুন, আমি আপনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট’

‘হু, সেটাই কাল হয়েছে’

‘জি?

‘কিছু না, ঠিক আছে তুমি করেই বলব’

রেশমি খাবারের মেনু হাতে নিয়ে বলল,

‘কী খাবে? আমার কিন্তু খিদেয় পেট চো চো করছে, ফ্রাইড রাইস আর চিকেন দিতে বলি?’

‘জি বলেন’

‘নাকি চাওমিন? এদের চাওমিন কিন্তু ভালো হয়’

‘জি, জি’

‘আর বেশী তাড়া থাকলে পিৎজা দিয়ে সেরে ফেলি, কী বলো? তোমার তো আবার অফিসে ফেরা লাগবে, তাই না?’

‘একটা হলেই হলো’

নীলা ‘আপা’ শব্দটা বলতে গিয়েও বললো না। রেশমি কীভাবে নেবে কে জানে। ও এখন দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব না।

ওয়েটার অর্ডার নিয়ে যাবার পর রেশমি নীলার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘দুল দুটো তোমার কানে দারুণ মানিয়েছে’

‘থ্যাঙ্ক ইউ’

‘আমারও এরকম এক জোড়া আছে’

‘তাই?’, নীলার মুখ শুকিয়ে গেছে। কী কুক্ষণে এই দুল পরে এলো? তাড়াহুড়োয় খেয়ালই করেনি।

‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার মুখের আদলের সঙ্গে একদমই যায়না। আমার কথা ভেবে হয়তো কেনা হয়নি। মনে হয় অফার ছিল এক জোড়া কিনলে আরেক জোড়া ফ্রি’

ওয়েটার পিৎজা দিয়ে গেছে। রেশমি নীলার দিকে পিৎজা এগিয়ে দিতে দিতে বললো,

‘তুমি কিন্তু সামনাসামনি আরও বেশী সুন্দর। তোমাকে দেখে মুগ্ধ না হওয়াটাই অস্বাভাবিক’

রেশমি ওর ছবি দেখেছে? কোথায় দেখেছে? আবেদের ফোনে? উৎকন্ঠা চেপে রেখে নীলা বললো,

‘আপনিও অনেক সুন্দর’

‘চিন্তা কর তাহলে, একজন মানুষের পক্ষে ঘরে বাইরে দুই সুন্দরীকে সামলানো কেমন ধকল?’

নীলার গাল লাল হয়ে যাচ্ছে, কেন যেন আবেদের উপর প্রচন্ড রাগ লাগছে। নীলা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,

‘আপনি আমাকে কেন ডেকেছেন বলবেন?’

‘তুমি আমার অর্ধেক বয়সী হবে, তাই না?’

‘জানি না’

‘হাঁটুর বয়সী মেয়েকে একটা মধ্যবয়সী লোক কেন ভালবাসে জান?’

নীলা কিছু বলার আগেই ওর করুণ ভাব দেখে রেশমি বললো,

‘থাক সে কথা, তোমার জন্য একটা গ্রন্থ এনেছি’

রেশমি ব্যাগ থেকে একটা নোট বই বের করে নীলার হাতে দিল।

‘এটা কীসের বই’

‘বলছি, পেছনের মলাটটা দ্যাখো, কী লেখা?’

‘একটা কবিতা’

‘হ্যাঁ, শঙ্খ ঘোষের, পড়তে পারবে?’

‘পারব…’ নীলা কোন আগ্রহ ছাড়াই যন্ত্রের মত পড়ে গেলো,

‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়
এ কথা খুব সহজ কিন্তু কে না জানে
সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’

‘বুঝলে কিছু?’

‘কিছুটা’

‘দূর থেকে প্রেম ভালোবাসা অনেক সহজ। কোন দায়িত্ব নেই। সংসারে ঢুক্লে দেখবে এর একটা বিরাট ভার আছে। যত সময় গড়ায় অভাব অভিযোগ আর গ্লানি জমে জমে সেই ভার তত বাড়তে থাকে। যত্ন না নিলে ওই ভয়াবহ ওজনের নীচে মিষ্টি আবেগগুলো চিড়েচ্যাপ্টে যায়’

‘আপনি যত্ন নেননি?’ নীলা বলেই বুঝলো কথাটা নিষ্ঠুর হয়ে গেছে।

রেশমি নীলার কথার জবাব না দিয়ে বললো,

‘এই বইটা তোমার কাছে রাখ’

‘আমি কেন রাখব?’

‘এটা একটা ম্যানুয়াল’

‘কীসের ম্যানুয়াল?’

‘আমার সাত বছরের সাতকাহন। সব সংসারেরই এরকম একটা ম্যানুয়াল থাকা প্রয়োজন। তাহলে কারো অভাবে সংসার মুখ থুবড়ে পড়বে না। নূতন যে আসবে সেও জানবে সংসারটা কীভাবে চালাতে হবে’

নীলা নোট বই হাতে নিয় বিব্রত হয়ে বসে আছে দেখে রেশমি বললো,

‘আচ্ছা তোমাকে একটা প্রিভিউ দেই। এই ম্যানুয়ালের নাম ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’’

‘আপনার সারা কেন?’

‘পরে বলছি। এই ম্যানুয়ালে তিন পর্ব। প্রথম পর্বের নাম ‘তৈজসপত্র ও আনাজপাতি’, নামটা কঠিন হয়ে গেলো, না?’

নীলার মনে হচ্ছে আবেদের স্ত্রী মনের ভেতর ভুমিকম্প সামলে কথা বলছেন। ও ক্ষীণ কন্ঠে জবাব দিলো,

‘কঠিন কিন্তু সুন্দর নাম’

‘এই পর্বে দুটো সেকশন। প্রথম সেকশনে হাড়ি পাতিল থালা বাসন চামচ গ্লাস সব কিছুর একটা লিস্ট আছে। কোনটা কোন সেলফের কোথায় আছে সেটাও লিখেছি। মানে সংসারের হাড়ির খবর। দ্বিতীয় সেকশন হলো, কখন কোন খাবার বানাতে হবে আর সেই খাবারের ফ্যামিলি রেসিপি’

‘এসব আমাকে কেন বলছেন?’

‘সে কথায় পরে আসছি। দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘স্বামী তোষণ’, এই পর্বটা নিয়ে খুব একটা আত্মবিশ্বাস এখন আর অবশিষ্ট নেই, বিশেষ করে আবেদ যখন বাহির পানে মুগ্ধ বিস্ময়ে চোখ মেলেছে’

নীলা বুঝল বাহির পানে বলতে কার কথা বলা হচ্ছে। ও দৃষ্টি নীচে নামিয়ে নিল।

‘যা হোক, আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি বলি। প্রথমত, আবেদ এমনিতে খুব ভালো মানুষ কিন্তু যখন ড্রিংক করে ওর মাথা বিগড়ে যায়। রাতবিরেতে বাপ মা তুলে গাল দেয়, চুল ধরে টানাটানি আরম্ভ করে। অবাক হয়ে গেছ মনে হচ্ছে?’

নীলা উত্তর দিল না কিন্তু আহত হলো।

‘পাড়ার লোকজন এই নিয়ে প্রথম প্রথম নালিশ করত। বিশেষ করে পাশের বাসায় একজন হার্টের রোগী আছে, তার হৃদপিণ্ডের উপর খুব চাপ পড়ে। ওদের বুঝিয়েছি আবেদ গ্রুপ থিয়েটারে মাতালের অভিনয় করে, রাত ছাড়া মহড়ার সময় কোথায়? এখন আর কেউ ঘাটায় না। তোমাকে তারপরও নিজের নিরাপত্তার জন্যই একটু সতর্ক থাকতে হবে। হেলমেট আর ইয়ার প্লাগ কিনে নিতে পারো, রাতে ন’টার পর থেকে ওগুলো পরে থাকবে’

‘হেলমেট?’

‘ঠাট্টা করলাম’

‘ও আচ্ছা’

একটু আগে নীলার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এখন একটু সাহস সঞ্চার করে বললো,

‘দুপুরে স্টাফ মিটিং আছে, আমাকে থাকতে হবে। বাকিটা আরেকদিন শুনি?’

‘এই তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। শুনেই যাও। আবেদের প্লেটে গরুর ভুনা প্রতি বেলা থাকা চাই। রান্নার সময় কালিজিরা খুব বেশী করে দিতে হবে। খাবার এক বেলা বাসি হলে ও কিন্তু আর ছুঁয়েও দেখবে না। ডাল ঘন হতে হবে, মুগ আর মসুর মেশানো। মুগ ডালটা আলাদা করে একটু ভেজে নিতে হয় সেটা নিশ্চয় জান? জামাকাপড় কতবার কীভাবে ধুতে হয় সেটা ম্যানুয়ালে বিস্তারিত দেয়া আছে। ও আরেকটা কথা, গতবছর আবেদের হার্নিয়া অপারশন হয়েছে, যাই কর সাবধানে করবে। আমার ধারণা এটা তুমি ইতিমধ্যে জান’


নীলার কান গরম হয়ে গেলো, ও রেশমির দিকে তাকাতে পারছে না। কোন রকমে মিউ মিউ করে বললো,

‘আপনি কি আবেদকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?’

‘তাই তো চেয়েছিলে, নাকি?’

নীলা কোন জবাব দিল না। রেশমি বললো,

‘হ্যাঁ, যাচ্ছি। তুমি জান আমাদের একটা মিষ্টি মেয়ে আছে?’

‘জি, ঝুমা’

‘আমার ম্যানুয়ালের শেষ পর্বের নাম ঝুমাপর্ব। আমার জন্য এই পর্বটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি পড়ে শোনাব না। আমার বেশী কষ্ট হবে। তুমি পড়ে নিও’

রেশমি উঠে দাঁড়ালো। নীলা বললো,

‘একটা কথা…’

‘কী’

‘আবেদ কি জানে যে আপনি জানেন?’

‘নাহ, ও যদি জানে আমি জানি, ও খুব বিব্রত হবে। খামোখা একটা মানুষকে বিব্রত করে কী লাভ? ম্যানুয়ালটা সাবধানে রাখো, তোমার লাগবে’

রেশমি আর কিছু না বলে বিল মিটিয়ে চলে গেলো। নীলা অথর্বের মত কিছুক্ষণ চেয়ারে পড়ে রইলো।



তিনঃ আনন্দ

পি এইচ ডি শেষ করার পর আনন্দ হেলসিঙ্কি সেন্টার ফর ইকনমিক রিসার্চে ঢুকেছিল। প্রায় সাত বছর ধরে সেখানেই আছে। অন্তত গত মাস পর্যন্ত ছিল। তারপর হুট করে দিন পাঁচেক আগে সব ছেড়ে ঢাকায় ফিরে এসেছে। নিজেও জানে না কেন এটা করল। এসেই আবার কোমর বেঁধে কাজের খোঁজে লেগেছে।

আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে এখন অগণিত বিশ্ববিদ্যালয়। এরা ভালো বেতনো দ্যায় তবে দিনরাত গাধার খাটনি খাটিয়ে টাকা উসুল করে নেয়। এই নিয়ে আনন্দের আপত্তি নেই। একা মানুষ, একটু ব্যস্ত থাকলে বরং সময়টা বেশ কেটে যাবে।

আজ ভোরে ধানমন্ডির একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে মিটিং ছিল। বিভাগীয় প্রধানের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল পারলে ওকে এখুনি কাজে নিয়ে নেয়। বড় পদ, মাসের শেষে মোটা অঙ্ক। বিদেশেও ট্যাক্স কাটার পর এত টাকা হাতে আসে না। আনন্দ কথা দিয়েছ সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে কাজে যোগ দেবে। সব মিলিয়ে ওর মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে গেছে। ভাবছে আড়ং-এ গিয়ে একটু এটা সেটা কিনবে।

ও সাতাশ নম্বর রোডের ফুটপাথ দিয়ে মন্থর বেগে হাঁটছে আর আশেপাশের অপরিচিত বাড়িঘরগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছে। এমন সময় একটা গাড়ি ফুটপাথের পাশে এসে এত জোরে ব্রেক কষল যে ও হাঁটা থামিয়ে চমকে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে যে মহিলাটি হাত নাড়াল তাকে ও প্রথমে চিনতেই পারেনি। পরে কাঁচ নামিয়ে যখন মহিলাটি চেঁচিয়ে উঠলো, ‘মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান?’ তখন বুঝল এটা ওর মেডিকেল কলেজের বন্ধু রিমা।

রিমা দরজা খুলে ওকে গাড়িতে ওঠার ইশারা করল। পেছনে যানবাহনের বিরাট বহর লেগেছে অনেকে বিরক্ত হয়ে লম্বা হর্ন দিচ্ছে। ও কালক্ষেপ না করে ভেতরে উঠে বসল।

রিমা অনেক মুটিয়ে গেছে। পোশাকআশাকে বিত্ত বৈভবের আভাস উদ্ভিন্ন। রিমা নিশ্চয় ওর ডাক্তারির পসার দারুণ জমিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে স্বামী প্রবরটি ধনাঢ্য। ইদানীং ধনী ব্যবসায়ীরা ডাক্তার কিম্বা অধ্যাপক মেয়ে বিয়ে করে। ট্রফি ওয়াইফ। জীবনে একটা ইন্টেলেকচুয়াল ছোঁয়া আরকি।

গাড়ি চলতে আরম্ভ করতেই রিমা মুখে সেই চিরপুরাতন হাসি ফুটিয়ে বললো,

‘মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান? কোথা হইতে আগমন? কীভাবে? কী কারনে?’

আনন্দের পোশাকি নাম মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে আর সবাই আনন্দকে আনন্দ নামেই ডাকত। কিন্তু রিমা ফাজলামো করে ওকে পোশাকি নামে সম্বোধন করত। বলত, ‘মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, প্যান্টালুন বুক পর্যন্ত উঠাইয়া রাখিয়াছ কেন, তব লজ্জা কি ঊর্ধ্বগামী হইতেছে?’,‘মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, লাশ কাটা ঘর অদ্য তব দর্শনে ধন্য হয় নাই, বাং মারিয়াছ বুঝি?’, ‘মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, এই রূপ রক্তিম সোয়েটার লালবাগের মেলা হইতে কিনিয়াছ কী?’।

সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে আনন্দের শিক্ষা-ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। মাস সাতেক গ্রেজ আনাটমি আর গাইটনস্‌ ফিজিওলজির ধকল সামলে, বার বার প্রফে ফেল করে আনন্দ বুঝেছিল ডাক্তারি বিদ্যা ওর জন্য কেবল দুঃখ বয়ে আনবে। পরের বছর আবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ও ঢুকেছিল ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের ইকনমিক্সে। স্যামুয়েলসনের অর্থনীতি আর কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মাঝে ও খুঁজে পেয়েছিল অনেক বেশী অর্থ এবং নিশ্চয়তা । তা না হলে একই সঙ্গে মস্কো ফেরত আকাশ স্যার আর বারকাত স্যার এবং হার্ভার্ড ফেরত আশিকুজ্জামান স্যারের প্রিয় ছাত্র হয় ক’জন?

সলিমুউলাহ মেডিকেল কলেজ আনন্দকে জ্ঞান না দিলেও জ্ঞানীগুণী বন্ধু দিয়েছে। এদের বন্ধুত্বের উষ্ণতায় অবগাহনের উদ্দেশ্যে আনন্দ প্রায়ই ওখানে চলে যেত।ক্যান্টিনে বসে গল্পে মেতে উঠত। ও রকম এক অবকাশময় মুহূর্তে ও রেশমিকে প্রথম দেখার মধুময় চঞ্চলতায় কেঁপে উঠেছিল।

‘কিরে স্টুপিড কথা বলিস না কেন?’

রিমার কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে আনন্দ বললো,

‘রিমা, তুই রিমাই আছিস।’

‘চেয়ারে বসে রোগী দেখতে দেখতে ধুমসি হয়ে গেছি আর তুই ইয়ার্কি মারিস মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান!’

‘আর সবাই কেমন আছে?’

‘রাশেদ ওই আগের মতই, টেম্পরামেন্টাল, এক চাকুরী ধরে তো আরেক চাকুরী ছাড়ে, এই নিয়ে ঘরেই এখন ছাড়াছাড়ি অবস্থা। মারহানা বারডেমের মেডিকেল কলেজে পড়াচ্ছে আর সোমা কাকে বিয়ে করেছে জানিস তো?’

‘কাকে?’

‘আমার দুই চোখের বিষ ফেল্লু ইশতিয়াককে। ইশতিয়াক এখন সোমার ঘাড়ে চড়ে ওর সাত পুরুষের সম্পত্তি খাচ্ছে আর ফাতরা রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি করছে’

‘আর তুই?’

‘আমি কীভাবে কীভাবে যেন বেশ জমিয়ে বসেছি’

‘তোর বর কী করে?’

‘টিপিক্যাল মেইল শোভিনিস্টিক কোশ্চেন! ওরে গাধা, বর থাকলে কি ক্যারিয়ার হতো? এই বর্বর দেশে বর হওয়া আর বড় হওয়া এক সঙ্গে চলে না’

‘হুম’, একটু ইতস্তত করে আনন্দ জানতে চাইলো,

‘আর রেশমি? রেশমি কেমন আছে?’



চারঃ রিমা

ওই দিন বিকেলেই আনন্দ রিমার অফিসে চলে এসেছে। রিমা বিশেষ করে বলে দিয়েছিল আনন্দ যেন সেদিনই আসে।

আনন্দ ঘুরে ঘুরে রিমার অফিস দেখছিল। বাংলাদেশে ওর ডাক্তার বন্ধুদের ভেতর রিমাই বোধ হয় সবচেয়ে ভালো করেছে। বিরাট বড় ঘর। মার্বেলের মেঝে, কাঠ দিয়ে মোড়া দেয়ালে নামী দামী শিল্পীদের আঁকা ছবি। ঘরের এক কোনায় ক্যাক্টাস আর পাথরকুচি গাছ। এগারো তলার কাঁচের জানালা দিয়ে একটু দূরে হেলিকপ্টার ওড়া দেখা যাচ্ছে। আর কী চাই।

‘তুই আল্লায় বিশ্বাস করিস’, চা এগিয়ে দিতে দিতে রিমা আনন্দকে জিগেস করল।

‘বিষয়টা নিয়ে সেভাবে কখনো ভাবিনি’

‘তুই এখন ঢাকায় কেন?

‘মানে?’

‘ওখানে কী কোন সমস্যা হয়েছে?’

‘নাহ। হঠাৎ দেশের জন্য খুব টান লাগছিল’

‘কেন?’

‘জানি না, ওই অন্ধকার বরফের দেশে হঠাৎ কেমন হাঁসফাঁস লাগছিল, মনে হচ্ছিল এখুনি দেশে না গেলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো’

‘তুই সকালে রেশমির কথা জিগেস করেছিলি’

‘হ্যাঁ’

রেশমির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল থার্ড ইয়ারে। ওদের মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে ভালো পাত্র হাতছাড়া করার উপায় ছিল না। সমাজ, সংসার, সংস্কার, সব কিছুর উপর তখন আনন্দের বৈরাগ্য ধরে গিয়েছিল। ঠিক করেছিল একটা বৃত্তি জুটিয়ে কোন রকম বাইরে যেতে পারলে আর কখনোই দেশে ফিরবে না।

‘রেশমি ভালো নেই’

‘ভালো নেই?’

‘নাহ, ও অসুস্থ, খুব বেশী অসুস্থ’

আনন্দের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। রিমা একটু থেমে বললো,

‘এই জন্যই তুই বাংলাদেশে। আনন্দ, তিনিই তোকে পাঠিয়েছেন’

আনন্দ বললো,

‘রেশমি কোথায় এখন?’

‘এখানে, এই হাসপাতালেই। এজন্যই তোকে আসতে বলেছি’



পাঁচঃ হাতের উপর হাত

রিমা একটু আগে আনন্দকে নিয়ে রেশমির কেবিনে ঢুকেছে। এসেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি হঠাৎ এমন অবনত হবে বুঝতে পারেনি। আবেদকে খবর দেয়া হয়েছে।

রেশমি এসব জানে না। ও শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। গভীর অগাধ ঘুম। যন্ত্র দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে।

মানুষের শরীরে ভেতরের তাপমাত্রা সাইত্রিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বেঁচে থাকার জন্য এই তাপমাত্রাটা ভীষণ জরুরী। কিন্তু রেশমির দেহের এই উত্তাপ ধীরে ধীরে নিভে আসছে।

রিমা সিরিঞ্জ দিয়ে রেশমির শরীরে বার বার অ্যাড্রিনালিন সঞ্চালন করছে। আশেপাশে নার্সরা নার্ভাস হয়ে ছুটোছুটি লাগিয়েছে।

আনন্দ চেয়ার টেনে খাটের পাশে বসল। তারপর হাত বাড়িয়ে রেশমির বরফের মত ঠাণ্ডা হাত স্পর্শ করল। রেশমির হাতটা একটু যেন কেঁপে উঠলো।

হিম জীবনে এই সামান্য উষ্ণতাটুকুই রেশমি চেয়েছিল।



advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোজাম্মেল  কবির
    মোজাম্মেল কবির অনেক দিন পর গল্প কবিতা আবার যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে আপনাকে পেয়ে। আমি নিজেও বছর খানেক ছিলাম না এখানে তবে আমার না থাকা আর আপনার না থাকায় পার্থক্য অনেক। আপনার সাথে লড়াই তো দূরের কথা আপনার মতো পেরে উঠাও কঠিন। গল্প যথারীতি ইউনিক।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১ জানুয়ারী
  • মোঃ মোখলেছুর  রহমান
    মোঃ মোখলেছুর রহমান কাল তিনটি গল্প সেইভ করে রাতে পড়েছি,এটি তার একটি। আপনার উপস্থিতি মানে নতুন কিছু,অনেক অনেক শুভকামনা আপনার জন্য।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ জানুয়ারী
  • ফাহমিদা   বারী
    ফাহমিদা বারী আপনার গল্পে অনেকগুলো স্ট্রং ব্যাপার থাকে, যে কারণে গল্পগুলো পড়ার পরেও রেশ থেকে যায়। ভাষার দক্ষতা, শব্দের নিখুঁত ব্যবহার এসবের মধ্যে পড়ে। কাহিনির ভিন্নতা ও গভীরতাও অন্যকিছু কারণ। তবে এই গল্পে কাহিনির জমাটবদ্ধতা মিসিং (আমার মতে)। গল্পটা পড়ার পরে রেশটুকু হার...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ জানুয়ারী
  • আবীর রায়হান
    আবীর রায়হান গল্পটা পড়তে পড়তেই কেন যেন মনে হয়েছে এই গল্প লেখার সময় লেখকের মন কোন কারনে বিক্ষিপ্ত ছিলো। হঠাৎ করে এমন কেন মনে হলো তারও কিন্তু কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিনা।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৪ জানুয়ারী
  • লুতফুল বারি পান্না
    লুতফুল বারি পান্না রোহন ভাই ঠিকই বলেছিলেন। গল্প বলার আর্ট আপনি জানেন। এত সিম্পল একটা কাহিনী স্রেফ পরিবেশনের গুণে অসাধারণ হয়ে উঠলো। পুরো ছবিটা অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো অথচ কোনো ডিটেইলসেই গেলেন না। গল্প বলার গ্ৰান্ডমাস্টার আপনি। হ্যাটস অফ!!!
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৭ জানুয়ারী
  • লুতফুল বারি পান্না
    লুতফুল বারি পান্না মন্তব্য করার পরে খেয়াল করলাম গক এর মেধাবী কিছু মুখের কাছে থেকে নেগেটিভ মন্তব্য। আমি বলবো তাঁরা আরেকবার গল্পটা পড়লে ধারণা বদলাবে। বিশেষ করে শেষ লাইনটা অল্প কথায় এত বিস্তার ঘটিয়েছে যে একজন প্রেমিকের আগের জীবনের ব্যাকুলতা তো ফোঁটালোই হাত রাখা যে শুধু হাত...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৭ জানুয়ারী

advertisement