এ বাড়িতে যখন আমি প্রথম আসি কোন ভয় কিংবা উদ্বেগ নয় বরং অদ্ভুত এক কষ্ট বুকে গুমরে মরছিল। আমি নৌকায় বসে বসে ভাবছিলাম- জীবনটা এমন কেনো? যৌবনের শুরুতেই এ প্রশ্নটা আমায় এতো জ্বালাবে কখনো ভাবি নি। অথচ বরের বয়স বেশি, মাথায় একগাদা চুল যেন পাখির বাসা কিংবা ভরা বর্ষায় কাঁধে অদ্ভুত রঙের চাদর এসব কিছুই আমায় তেমন স্পর্শ করে নি। আমার বিয়ে হচ্ছিলো না বলে আমি ধরেই নিয়েছিলাম কপালে এমন একজনই জুটবে। কে জানে হয়তো তাই সে সময় আমার সকল ভাবনা চিন্তা ছিলো জীবনটা এমন কেনো এই প্রশ্নে। কোন মানে হয়? আসলে মা-বাবা না থাকা যে একটা মেয়ের জন্য কতটা যন্ত্রণার ব্যাপার তা আমি আমার জীবন থেকে খুব টের পাই। একের পর এক বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। শেষমেশ যেদিন এ বিয়ের প্রস্তাবটা আসে সবাই যেন একটা দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচে। মামা-মামী দু’দিনেই সব আয়োজন করে ফেলে আর আমারও রাজী না হয়ে কোন উপায় ছিলো না। ছোট্ট শহরে বিশ বছরের কুমারী মেয়ে মানে অনেক বড় কিছু তার উপর মামা-মামীর কাছে আশ্রিত। তবুও যে কোন মেয়ের কাছে এমন একজনকে মেনে নিতে বুকের মাঝে কিছু তো ভাঙচুর হবেই। আর মনরে বলে কয়েই কে বা কখন ভাঙচুর ঠেকাতে পেরেছে?

এ বাড়ির ঘাটে যখন ছইওয়ালা নৌকাটা ভিড়লো আমার সে কষ্টের জায়গা এসে দখল করলো ভয়। ডুবে যাওয়া দুই হিজল গাছের কোল ঘেঁষে বাঁধা ঘাটে আমি পা রেখেই যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। ঘাটপাড়ে পুরো গ্রামের বউ-ঝিদের ফিসফাস, নাইওর আসা মুখগুলোর অকারণ হুল্লোড়, কুপি হারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় বাচ্চাদের কান্না, গাছপালার বিশালতা আমায় যেন জমিয়ে দিলো। এখানে নিজেকে কিভাবে মানাবো একথা ভেবেই আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিলো। যে ঘরে আমাদের শোবার ব্যবস্থা হলো সেখানে বড়সড় দুটি হারিকেন জ্বালানো। তবু সে আলো ঘরের সবটুকু কোণে পোঁছাচ্ছিল না। বিছানার চারপাশের রঙিন কাগজ আর ফুলে পরিবেশটা আরো অদ্ভুত লাগছিল। এর মাঝে আমায় ঘুমিয়ে পড়তে বলে মানুষটা সেই যে কই গেলো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বিয়ের প্রথম রাতে স্বামী বাইরে থাকবে এটা আমি আমার সবচেয়ে বাজে স্বপ্নেও কখনো দেখি নি। একা একা ভয়ে যখন মোটামুটি আমি অস্থির তখন মনতার মা নামের একজন এসে বলল, ‘আম্মা কিছু লাগলে ডাইকেন, আমি পাশের ঘরেই আছি।’ আর নিজে নিজেই গজগজ করতে লাগলো এতোদিনের পাগলামি কমলেই কি যায়- না হলে আইজ রাইতে কেউ কাছারিঘরে যেয়ে বসে? আমি কিছু না বলে শক্ত হয়ে বসে রইলাম। ছেলে পাগল ছিলো কই একথা তো মামা-মামী আমায় বলে নি। সে সময় বড় অভিমান হচ্ছিল জীবনের প্রতি। ও শেষ রাতে ঘরে ফিরে এসে আমায় সেইভাবেই জড়সড় হয়ে বসে থাকতে দেখে বিব্রত হয়ে বলেছিল ওদের বাড়ির এক বৃদ্ধ কামলা নাকি খুব অসুস্থ। আমার কি তখন রাগ করা উচিত নাকি কিছু জানতে চাওয়া উচিত ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। শেষ রাতের সেই অদ্ভুতক্ষণে আমি কিছুই না বলে মানুষটার দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে ছিলাম।

কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের তৃপ্তিবোধ দারুন আর আমিও তাদের দলে। নতুন জায়গায় হয়তো তাই খুব সহজেই মানিয়ে নিলাম। সকালে কান ঝালাপালা করা পাখির আওয়াজ, দিনভর ভিতর বাড়ির পুকুর পাড়ের ঝিঁঝিঁর ডাক কিংবা হারিকেনের আলোর জমাট অন্ধকার আমি আস্তে আস্তে উপভোগ করতে শুরু করলাম। মাঝরাতে যখন হঠাৎ হঠাৎ চালে ঢিলা পড়তে শুরু করতো- তখন পাওয়া ভয়গুলোও ধীরে ধীরে কমে যেয়ে রাতগুলো আরো মধুর হয়ে উঠলো। কখনো বাতাসহীন ক্ষণে উঠোনের কাপড় শুকানোর গুনার তারটি টিনের চালের সাথে লেগে ঝনঝন করে বাজতো। শুয়ে শুয়েও স্পষ্ট টের পেতাম কিছু একটা এসে তারে বসেছে। আমার সেই ঝনঝন শব্দও ভালো লাগা শুরু করলো। একসময় অবাক হয়েই আবিষ্কার করলাম-এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। শুধুই মনে হতে লাগলো জীবনতো এমনই হওয়া উচিত! এর মাঝে এক বিকেলে ও একটা বাঁধানো খাতা দিয়ে বলল, ‘আমার জীবনে ছোট্ট একটা ঘটনা আছে। আমি চাই সেটা তুমি জানো।’ আমি যদিও তখন খাতাটা খুলে দেখার মতো আগ্রহ পাই নি কিন্তু বড় যত্ন করেই তা তুলে রেখেছিলাম। কারণ জানতাম তা না হলে একদিন আফসোস করবো- একসময় ঠিকই টের পাবো কৌতূহলের কাছে অভিমান বড়ই তুচ্ছ।

সে সময় দিনগুলো বড় ঘোরলাগা ঘোরে কাটছিল। আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল মনতার মা। বেচারির ছিল গান গাওয়া রোগ। সুযোগ পেলেই শুধু গুনগুন করে গান গাইতো। মাঝে মাঝে গলাটা একটু জোরে উঠলে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম মনতার মা গাইছে-
“আগে যদি জানতাম আমি- প্রাণের বন্ধু
প্রেমের এতো জ্বালা
আমি ঘর করিতাম বৃক্ষতলা- প্রাণের বন্ধু
আমি রহিতাম একলা......”
দরদ গলার সেইসব গান শুনে কি আনচানই না করতো মন। বড় দীর্ঘ ছিল পরাণে আগলে রাখা সেই ক্ষণগুলো। কিন্তু তখনো আমি এ বাড়ির বিশালতাটুকু আত্নস্থ করতে পারি নি। উত্তরের আর পুবের বাড়িটি সারি সারি ঘর নিয়ে তালাবদ্ধ ছিল। তার ওপাশে ছিল বিল পর্যন্ত খালি জঙ্গল। আমরা থাকতাম দখিনমুখী নতুন তোলা বাড়িতে। আর ডান দিকের কাছারির ঘরগুলোয় থাকতো কামলা শ্রেণীর কিছু মানুষ। সকালে সেখানে বাইরের বারান্দায় লোকজন এসে বসতো। আপন বলতে শুধু ওর এক দাদী বেঁচে ছিল। ও ডাকতো দাদিজান। সে থাকতো দোতলার কোণার ঘরে। প্রায় সময়ই সে কিছু না কিছু খুঁজতো। কানে কম শুনতো বিধায় আমাদের সবারই তার সাথে জোরে জোরে কথা বলতে হতো। রোজ সকালে তার কোরআন পাঠ শেষ হলে আমাকে তার কাছে যেয়ে বসে থাকতে হতো। সে তখন থেমে থেমে গল্প করতো আর সামনে থাকতো কাসার বাটিতে ভরা চা। কত রকম যে ছিল তার গল্প-আর কি সে কথার ঘোর। মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করতো। হঠাৎ করেই গল্প করতে করতে বলত- কউ তো নাতবউ কবর কয় প্রকার? তারপর নিজ মনেই বলতে শুরু করতো- ‘কবর হল দুই প্রকার। বগলী কবর আর সিন্দুকী কবর। মাটি শক্ত হলে লোকে দেয় বগলী কবর আর নরম হলে দেয় সিন্দুকী কবর। আবার ধরো কবরে লাশ রাখবা সেইটারও কিন্তু একটা নিয়ম আছে। মাথা থাকতে হইবো উত্তর দিকে, লাশ চিৎভাবে শোয়াইয়া মুখ রাখতে হইবো কেবলার দিকে......।’ দাদিজান সে সময় খুব কবরের কথা বলতো। কে জানে শেষ জীবনে হয়তো সবারই মৃত্যুর জন্য নিজস্ব কোন প্রস্তুতি থাকে।

আলাভুলা সেইসব দিন রাতে আমি কী খুব নিঃসঙ্গ ছিলাম? কই না তো। ও আমায় বেশ সময় দিতো কিন্তু বেশিরভাগ সময় বড় চুপচাপ থাকতো। আমিই কথা বলতাম বেশি-আমার কথা। ওর কাজকর্ম বলতে মাসে দু’একবার কোর্টে যেতো জায়গা-জমি নিয়ে কিছু মামলা চলছে তার জন্য। আর হাটবারগুলোতে যেতো গঞ্জে। আমি যদিও জানি না তবে বেশ টের পাই বসে বসে খেলেও আরো কয়েক পুরুষ লাগবে এ বংশের জায়গা-জমি শেষ হতে। শুনেছি আমার শ্বশুর নাকি বস্তায় করে টাকা রাখতো ঘরে। সে সময় এ বাড়ি গমগম করতো মানুষে। আজকাল যে ওর কাছে তদবিরের জন্য মানুষ আসে না তা তো নয়। তবু বাড়িঘরগুলোর গভীর দীর্ঘশ্বাস নাকি সবাই টের পায়। আমি সে দীর্ঘশ্বাসের ভাষা পড়তে চেষ্টা করি। ভরদুপুরে কোন ঘুঘুর ডাকের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে বিশালতা নিয়ে ভাবি। মাঝে মাঝে মনতার মার সাথে কাছারিঘরে যাই বেঁধে রাখা বৃদ্ধ মানুষটিকে দেখতে। সে আমায় দেখলেই ভালো মানুষের মতো বলতো, ‘মা জি জানের ভিতর আগুন। জিহ্বাওলা আগুন।’ তার চোখগুলি তখন জ্বলজ্বল করে জ্বলতো। আমার বড় মায়া লাগতো। ভাবতাম পাগলদের চোখগুলি কি সবসময়ই এতো জ্বলে?

যে জীবনকে আমি প্রতিদিন দেখি-যে জীবন আমার রক্ত মাংস হাড়ের উপর দাঁড়ানো-কেন জানি সে জীবনকেই আমার বড্ড অচেনা লাগে। হয়তো সে অদ্ভুত তাই। আমরা কখনোই আজকের মতো ভেবে ভেবে কাল পার করতে পারি না। তো এই জীবনের ঘটনাগুলি রূপকথা নয়তো কি? যে মানুষটা কখনো অবাক হতে জানে না সেও জীবনের একসময় পিছনে ফিরে তাকিয়ে বড্ড অবাক হয়। উদাস হয়ে ভাবে-জীবনটা এমন কেনো? আর সেখানে রূপকথার এ গল্পে আমার নিজেকে নিয়ে ভেবে ভেবে যে অবাক লাগতো আশা রাখি তা কাউকে না জানালেও চলবে। পুরো কাহিনী আমি এ গল্পে বলে শেষ করতে পারবো না আর সে সুযোগও এখানে নেই। তারচেয়ে ভালোবাসাবাসির এক রাতের কথা বলে শেষ করি। ও সে রাতেও কাছারি ঘরে চলে গেলো। রাতভর সেখানেই বারান্দায় বসে কাটিয়ে দেবে। মনছুর হাই নামের সেই বৃদ্ধ কামলা হয়তো শেষ রাতে তার খিঁচুনি থেকে ক্লান্ত হয়ে মুক্তি পাবে। তার আগে যে ও কখনো ঘুমাতে আসবে না সে আমি জানি। আর তাই নিঃসঙ্গতা কাটাতেই ওর সেই বাঁধানো খাতা বের করে উল্টেপাল্টে দেখছি। হঠাৎ আনমনে জড়ানো সেই হাতের লেখা হেরিকেনের আলো বাড়িয়ে দিয়ে আমি পড়তে শুরু করলাম......

একসময় আমি খুব কষ্টে ছিলাম। ঢেউ এর মতো খিঁচুনি দিয়ে দিয়ে শরীর খুব কাঁপতো- বড় যন্ত্রণা হতো। লোকে বলতো খন্দকার বাড়িতে অভিশাপ লাগছে। আহারে একমাত্র ছেলেটা পাগল হয়ে গেলো। আমি জানতাম বিয়ের আগে এ ব্যাপারটা তোমায় জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম রাতে চোখের দৃষ্টি দেখে বুঝলাম তুমি এর কিছুই জানতে না। সে রাতের সেই হঠাৎ উপলব্ধিতে আমার কি বা আর এমন করবার ছিল? আমি তখন শুধু তোমার হতাশাটুকু না দেখবার ভান করেছি আর মনে মনে বলেছি আল্লাহপাক এ মেয়েটাকে তুমি একটু সুখ দিয়ো। জানি না মনের সব কথার মানে সহজ কথা কী না। শুধু জেনো যে অসহায়ত্ব সে ক্ষণে তুমি বোধ করছিলে তা আমি আমার রক্তে আজও ধারণ করে আছি। থাক সে সব মুহূর্ত পড়ে-আমি আমার কথায় ফিরে যাই।

আমার সুস্থ হয়ে উঠা মার দেখা হয়ে উঠে নি। তবু যে ভয়াবহতা তাকে দেখে যেতে হয়েছে তা দেখার মানসিক প্রস্তুতি হয়তো তার কখনো ছিল না। মা মারা গেলো আমার অসুখের দ্বিতীয় বছর। কিন্তু মরবার আগে দেখে গেলো- তার একমাত্র পুত্রকে খিঁচুনি শুরু হলেই বেঁধে ফেলা হতো। সে তখন ধনুকের মতো বেঁকে যেতে যেতে যন্ত্রণায় থরথর করে কাঁপতো। আর পশুর মতো গোঙানির সাথে সাথে মুখের এক পাশ দিয়ে বের হতে থাকতো লালা-থুথুর ধারা। মার মৃত্যুর পর দাদিজানই সব কিছুর হাল ধরলো। বাবার চোখে তখন ভরসা হারানোর দৃষ্টি। সে রাতভর আমি যেমন এখন মনছুর চাচার জন্য বসে থাকি তেমন বসে থাকতো আর এখানে ওখানে ছুটে বেড়াত আমার চিকিৎসার জন্য। দেশে তখন সামরিক শাসন চলছে আর ভীষণ কড়াকড়ি। বাবা এর মাঝেও আমায় নিয়ে ইন্ডিয়া চলে এলো। কিন্তু কোথাও কোন আশার আলো ছিল না। ছয়মাস পর রোগের ভয়াবহ তীব্রতা নিয়ে আমি গ্রামে ফিরলাম। সে সময় আমার এতো কষ্ট হতো যে দু-তিনদিন হয়তো কোন জ্ঞানই থাকতো না। এর মাঝে একদিন শুনি দাদিজান বাবাকে বলছে, ‘হারামজাদা পাগলের মতো কথা বলবি তো জুতিয়ে তোকে ঘর ছাড়া করবো।’ বাবা সেদিন কী কথা বলায় দাদীজান এতো রেগেছিল আজ তা আমার খুব জানতে মন চায়। আজকাল প্রায় ভাবি কী করে এতো শক্ত দাদিজান তখন ছিল।

আমার অসুখ হওয়ার ইতিহাসটা হয়তো এখন তোমায় বলতে পারি। আমরা যারা গ্রামে পড়াশোনা শুরু করেছি তারা বড় কষ্ট করেই স্কুলে যেতাম। তো স্বাভাবিক ভাবেই স্কুলের প্রতি মমতাও আমাদের একসময় অনেক বেশি হতো। সেবার শেষ ব্যাচ হওয়ায় আমাদের উপর দায়িত্ব পড়লো শহীদ মিনার সাজানোর। দায়িত্ব মানে এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে লুকিয়ে ফুল সংগ্রহ করা। আর ভোরের আগেই সুতোয় লাগানো রঙিন কাগজ ও তোলা ফুলগুলি দিয়ে শহীদ মিনারটা সাজানো। আমাদের গ্রাম থেকে সে বছর আমি আর রফিক মেট্রিক দেবো। কিন্তু রফিক সন্ধ্যাবেলা খবর পাঠালো জ্বরের জন্য সে আসতে পারবে না। মনে মনে ওর চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে আমি মাঝরাতে লুকিয়ে বের হয়ে পড়লাম। গ্রাম থেকে স্কুল তিন মাইলের পথ। কিন্তু সে বয়সটায় আমাদের কারোরই তেমন ভয়ডর ছিল না। আর গ্রামের ছেলে বলে রাতটাকেও তেমন অচেনা মনে হতো না। তিন ব্যাটারির একটা টর্চ নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই চলছি। মাঝখানে মিঞাবাড়ি থেকে কিছু গোলাপ তুলে নিলাম। তবে সোনাকান্দি এসে একটু ভয়ভয় করতে লাগলো। এ জায়গাটা খারাপ আর বেশ কিছুটা পথ চলে গেছে বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে। রাত হলে মাঝে মাঝেই নাকি এখানে বাঁশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ উপর দিয়ে পার হতে গেলেই নাকি তার খবর আছে। দোয়া-কালাম পড়তে পড়তে জায়গাটুকু পার হয়ে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সামনেই বাঁওড়ের পাড় ঘেঁসে কিছু ভাঙা হিন্দু বাড়ি। আর বাড়িগুলোকে ডাইনে রেখে কিছুদূর গেলেই স্কুলের মাঠটা শুরু। যেতে যেতেই একটা কুকুর সঙ্গী হল সাথে-বুকে বল পেলাম। এই গ্রামের কুকুর। ব্যাটা দিনের বেলায় স্কুল মাঠের ছাতিম গাছটার নিচে শুয়ে শুয়ে শুধু ঘুমায়। ফুল কম হয়ে গেলো ভাবতে ভাবতে চলছি হঠাৎ ভাঙা বাড়িগুলোর কাছে কিছু গাঁদা ফুলের দিকে চোখ আটকে গেলো। কিন্তু সমস্যা হল জায়গাটায় প্রচুর সাপের আস্তানা। গতবছরেও এইখানে দুইটা গরু মারা গেছে। তবু শীত আছে বলেই আওয়াজ করতে করতে সাহস করে এগিয়ে গেলাম। ফুল তুলছি হঠাৎ কুকুরটা কুই কুই করতে করতে কেন জানি পালিয়ে গেলো। আমি পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি ভাঙাচোরা বাড়িটার পাশ দিয়ে কুয়াতলাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর সেখানে কী সুন্দর একটা ফুল ফুটে আছে। কী ফুল ভাবতে ভাবতে আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। ততক্ষণে সাপের ভয়টা কেন জানি মাথা থেকে চলে গেছে। চারপাশের এতো আগাছার মাঝে জায়গাটিকে পরিষ্কার দেখে বেশ অবাক লাগলো। বাতাসে তখন সেই অজানা ফুলের মাদকতা। হঠাৎই মনে হল কেউ আমায় দেখছে। সে সময় বড় মন চাইছিলো উল্টো ফিরেই দৌড় মারি। তবুও আমি ফুলটিকে ছুঁতেই স্পষ্ট শুনতে পেলাম কুয়ার ভিতর থেকে এক নারী কণ্ঠ খনখনে গলায় বলে উঠলো, ‘তোর সাহস আছে।’

এরপর আর আমার কিছু মনে নেই। প্রচণ্ড জ্বর ও খিঁচুনি নিয়ে জ্ঞান ফিরলো একদিন পর ভরদুপুরে। তারপর থেকেই রাত হলে হাড়গুলোতে আগুন ধরে যেতো। আর আমি বাঁকতে শুরু করতাম। রাত বাড়তো আমার গোঙানি বাড়তো। কি কষ্ট কি কষ্ট! মনছুর চাচা তখন বুকে তেল ডলতে ডলতে বলতো, ‘বাজান ভোর আইলো বইলা-এইতো আর একটু আর একটু...।’ আমি বাঁকতে বাঁকতে অপেক্ষা করতাম ভোরের-একটুখানি আলোর। কিন্তু সেই ভোর আর কখনো হতো না। প্রায় সময়ই জ্ঞান হারাতাম শেষ রাতের দিকে। আজকাল মরবার আগের মুহূর্ত নিয়ে আমি বেশ ভাবি। ছোটবেলায় মনছুর চাচার ছেলেটা আমার সামনেই ওর বাপের কলে শুয়ে এদিক ওদিক অস্থিরভাবে চাইতে চাইতে মারা গেলো। আমার খুব জানতে মন চায় পর্দা নামার সেই মুহূর্তটিতে ও কি আলো খুঁজছিল? মৃত্যুর সময় আমরা সবাই কি ভোরের জন্য অপেক্ষা করি-যে ভোর কখনো হয় না?

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আমায় সে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলো অলকা নামের এক কিশোরী। মেয়েটি ছিল বড় সুন্দর আর ভারি মিষ্টি নাকি ছিল ওর কীর্তনের গলা। তবু কোন কুক্ষণ মেয়েটিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো অন্ধকারের সেই কুয়োতলায় আমি জানি না। শুধু জানি ওকে তেমন যন্ত্রণা সইতে হয় নি। এক সন্ধ্যায় বেচারি সবার সাথে বাঁওড়ে নাইতে নেমে ডুব দিয়ে আর উঠে আসে নি। পরদিন ও ভেসে উঠেছিলো পাশের গ্রামের এক ঘাটে যেয়ে। পানির ভিতর সেই অন্ধকারে ওর হাড়ে যখন আগুন ধরে গেলো তখন কী ও খুব কষ্ট পেয়েছিলো? আমার বড় জানতে মন চায়। কে জানে এক জীবনে হয়তো সবারই এমন অনেক কিছু জানতে মন চায়। আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম আর বাবা সে বছরই আমার নামে সবকিছু লিখে দিয়ে হজ করতে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু আমার ক্লান্ত বাবা সে হজ আর করে যেতে পারে নি। হয়তো মৃত্যু ভেবেছিলো বাবা সত্যি বড় ক্লান্ত ছিল। তার কিছুদিন পরেই আমি বাঁওড় পাড়ের সেই জায়গাটুকু কিনে ফেলি। আর চারপাশের গাছপালা কেটে কুয়া সহ সবকিছু পুঁতে ফেলি দশফুট মাটির নিচে। যদিও কুয়াটিকে আমি নিজেই পাথর ও মাটি দিয়ে চাপা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার শারীরিক দুর্বলতার জন্য মনছুর চাচা এসে আমার সাথে হাত লাগায়। সেই দুর্বল অবস্থায়ও সবকিছু ঠিকঠাক মতো করতে পেরে মনে আশ্চর্য এক প্রশান্তি লাগছিলো। কিন্তু এর ঠিক মাত্র দু’রাত পর থেকেই চাচার হাড় বাঁকতে শুরু করলো......

এরপর আর খাতাটিতে কিছু লেখা নেই। হেরিকেনের আলো দপদপ করতে করতে জানান দেয় এখন নিভে যাবে। বাইরে কুয়াশা ও জোছনার গাঢ় মেশামেশি। আমার অস্থির লাগা শুরু করলো। আমি ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। ওকে দেখি মূর্তির মতো একটু ঝুঁকে বসে আছে কাছারি ঘরের বারান্দায়-যেমনটা সবসময় থাকে। কি ভাবছে ও এতো? আমি পাশে যেয়ে বসতে বসতে খাতাটা বাড়িয়ে দিলাম। ও রাতজাগা চোখে পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। আজো কি আমার কাছের মানুষ এ চোখের ভাষা বুঝতে পারবে? আমি অপেক্ষায় আছি-প্রিয় এক অপেক্ষা। বাতাসে তখন অদ্ভুত মাদকতা-রাতের চিরন্তন ফিসফাস। শেষমেশ ও ক্লান্ত স্বরে বলল, ‘আচ্ছা জীবনটা এমন কেনো?’ আমি ওর কাঁধে মাথা রাখতে রাখতে গাঢ় সুরে বললাম, ‘কারণ এ জীবন রূপকথা।’ আর তখন হঠাৎই গুনার তারটি ঝনঝন করে বাজা শুরু করলো।