শহরের ব্যস্ততম ফ্লাইওভারের নিচে লাশটি প্রথম দেখা যায় ভোরের আলো ফোটার আগে। এক টুকরো পুরোনো চাদর গায়ে জড়ানো, মুখে অদ্ভুত শান্তি—যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কে সে? কোথা থেকে এসেছে? কেউ জানে না। পকেটে কোনো পরিচয়পত্র নেই, নেই মোবাইল ফোন, নেই এমন কিছু যা তাকে কোনো নাম দেবে। সে শুধু একটি লাশ—সনাক্তহীন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় জমতে লাগল। পুলিশ এলো, সাংবাদিক এলো, কৌতূহলী জনতা এলো। কেউ বলল, “দেখে তো মুসলমান মনে হয়, দাড়ি আছে।” আরেকজন প্রতিবাদ করল, “না, কপালে হালকা সিঁদুরের দাগের মতো কিছু আছে, হয়তো হিন্দু।” কেউ বলল, “গলায় ক্রস থাকলে বুঝতাম খ্রিষ্টান।” আরেকজন যুক্তি দিল, “মানুষ তো, ধর্ম দেখে বোঝা যায় নাকি!”
বিতর্ক দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। পাশের মসজিদের ইমাম সাহেব এসে বললেন, “যদি মুসলমান হয়, তবে জানাজা পড়ে কবর দিতে হবে।” মন্দিরের পুরোহিত বললেন, “যদি হিন্দু হয়, তবে দাহই তার শাস্ত্রসম্মত গতি।” গির্জার ফাদার নরম গলায় বললেন, “পরিচয় জানা জরুরি, তা না হলে নিয়ম ভঙ্গ হবে।” প্রত্যেকে নিজের ধর্মীয় বিধান তুলে ধরলেন, কিন্তু কেউ নিশ্চিত করতে পারলেন না—সে কোন ধর্মের মানুষ।
লাশটি ততক্ষণে রোদে পড়ে আছে। দুপুরের সূর্য তার নিথর শরীরকে আরও নির্জীব করে তুলছে। পুলিশ সিদ্ধান্তহীনতায় সময় কাটাচ্ছে; ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আসেনি। ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে আলোচনা সভা বসে গেল। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, শাস্ত্রের উদ্ধৃতি, ঐতিহ্যের উদাহরণ—সবই উঠে এল। কিন্তু লাশটি নিঃশব্দ।
দ্বিতীয় দিন গড়াল। শহরের মানুষজন বিরক্ত হতে শুরু করল। দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগল চারদিকে। দোকানিরা নাক চেপে ধরছে, পথচারীরা দ্রুত পা বাড়াচ্ছে। কেউ বলল, “এভাবে রাখা ঠিক না।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলে উঠল, “ধর্মের ব্যাপার, ভুল হলে পাপ হবে।” পাপের ভয়ে মানবতার কাজটি স্থগিত রইল।
তৃতীয় দিনের সকালে দুর্গন্ধ অসহ্য হয়ে উঠল। মাছি ভনভন করছে, কুকুরেরা ঘুরঘুর করছে। ধর্মীয় নেতারা আর আসেন না; জনতার ভিড়ও কমে গেছে। যে লাশটিকে নিয়ে এত তর্ক, এত উত্তেজনা—সে এখন শুধু একটি পচতে থাকা দেহ।
শেষ পর্যন্ত শহরের কয়েকজন সাধারণ মানুষ—রিকশাচালক, দোকানি, এক কলেজপড়ুয়া মেয়ে—মুখে কাপড় বেঁধে এগিয়ে এল। তারা বলল না সে মুসলমান না হিন্দু, খ্রিষ্টান না অন্য কিছু। তারা শুধু বলল, -“সে মানুষ ছিল।”
পুলিশের সহায়তায় তারা একটি গর্ত খুঁড়ল শহরের প্রান্তে। কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, কোনো বিশেষ প্রার্থনা ছাড়া, তারা নিঃশব্দে তাকে মাটির নিচে শুইয়ে দিল। কেউ মন্ত্র পড়ল না, কেউ আজান দিল না, কেউ স্তোত্র গাইল না। তবু সেই মুহূর্তে যেন বাতাসে এক গভীর প্রার্থনা ভেসে উঠল—মানুষের প্রার্থনা।
ফিরে আসার পথে কলেজপড়ুয়া মেয়েটি বলল, “আমরা তাকে নাম দিতে পারিনি, ধর্মও দিতে পারিনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে বিদায় দিতে পেরেছি।”
শহর আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল। ফ্লাইওভারের নিচে আর কোনো লাশ নেই, নেই কোনো তর্ক। কিন্তু বাতাসে থেকে গেল এক অদৃশ্য প্রশ্ন—আমরা কি আগে মানুষ, না আগে ধর্ম?
সনাক্তহীন সেই মানুষটির মৃত্যু শহরকে শিখিয়ে গেল—ধর্ম মানুষকে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু মানবতা না থাকলে সেই পথ অন্ধকারেই হারিয়ে যায়।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
শহরের ব্যস্ততম ফ্লাইওভারের নিচে লাশটি প্রথম দেখা যায় ভোরের আলো ফোটার আগে।
১২ মার্চ - ২০২৬
গল্প/কবিতা:
১ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি
“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।
প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী