“মা!!!! রাস্তায় দেখলাম ছেলেরা লাল সবুজের পতাকা নিয়ে কি যেন করছে। আর তারা সবাই লাল সবুজের জামা গায়ে দিয়ে ঘুরছে। ওরা কি করছে, আর লাল সবুজের জামা গায়ে দিয়েছে কেন?”
নিজের সদ্য বারো বছরে পা দেওয়া ছেলে পরাগের মুখে একসাথে এতগুলো প্রশ্ন শুনে শিউলি বেগম যেন হঠাৎ সময়ের ভেতর থেমে গেলেন। তার হাতে তখনও অর্ধেক সেলাই করা একটি শার্ট, সূঁইয়ের ফোঁড় যেন থেমে গেছে মাঝপথে। ছেলের চোখে কৌতূহলের ঝিলিক, আর তার নিজের চোখে হঠাৎ ভেসে উঠলো অদৃশ্য এক দীর্ঘশ্বাস।
“ওমা, বলো না কেন?” পরাগ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বললো।
শিউলি বেগম নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“বাবা, আজ তো মহান স্বাধিনতা দিবস। আজকের এই দিনে আমাদের দেশের মানুষ তাদেরকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিল। তাই সবাই লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ঘুরছে, লাল সবুজের জামা পরে আমাদের বাংলাদেশকে সম্মান জানাচ্ছে।”
পরাগের চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
“মা, আমিও দেশকে সম্মান করবো। আমাকেও একটা পতাকা আর নতুন লাল সবুজের জামা দাও না!”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে এমন এক সরল আবদার ছিল, যা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক আবদারগুলোর একটি। কিন্তু সেই স্বাভাবিক আবদারই যেন শিউলি বেগমের বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধলো।
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ঠোঁট কেঁপে উঠলো।
“বাবা… আমাদের তো এরকম জামা কেনার সামর্থ্য নাই। তোর বাবা যদি বেঁচে থাকতো… তাহলে হয়তো তোকে কিনে দিতে পারতো। তোর বাবা চলে যাওয়ার পর আমি এই সেলাইয়ের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাই। এখন কিভাবে দিবো তোকে বল?”
কথা শেষ করতে না করতেই তার গলা ভারী হয়ে এলো।
পরাগ কিছু বললো না। শুধু তার উজ্জ্বল চোখদুটো নিভে গেল ধীরে ধীরে। মুখটা কালো করে সে চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
দরজা পেরিয়ে যাওয়ার সময় সে একবারও ফিরে তাকালো না।
আর শিউলি বেগম…
তিনি ধীরে ধীরে সূঁইটা নামিয়ে রাখলেন। তারপর আঁচলের কোণা দিয়ে চুপচাপ চোখের পানি মুছে ফেললেন।
এই দৃশ্য তার জীবনে নতুন কিছু না।
প্রায় প্রতিদিনই পরাগ বাইরে থেকে নতুন কিছু দেখে আসে—কারো খেলনা, কারো জামা, কারো খাবার—আর এসে তাকে বলে।
আর তিনি…
তিনি শুধু চোখের পানি লুকিয়ে রাখেন।
পরাগ আজ একা একা হাঁটছে।
চারপাশে উৎসবের আমেজ।
রাস্তার দুপাশে লাল সবুজের পতাকা উড়ছে।
ছোট ছোট বাচ্চারা নতুন জামা পরে হাসছে, দৌড়াচ্ছে।
কেউ আইসক্রিম খাচ্ছে, কেউ বেলুন কিনছে।
পরাগ শুধু দেখছে।
তার চোখে আনন্দ নেই, আছে এক ধরনের নীরব শূন্যতা।
হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এলো মুক্তমঞ্চের সামনে। সেখানে মানুষের ভিড়। মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজছে। চারপাশে খাবারের দোকান।
তার নাকে ভেসে এলো চটপটির গন্ধ।
চটপটি তার সবচেয়ে প্রিয়।
সে ধীরে ধীরে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলো।
সে শুধু অন্যদের খাওয়া দেখছে।
তার গলায় শুকনো লালা জমছে।
কিন্তু তার পকেট ফাঁকা।
হঠাৎ—
“এই যে, তোমার নাম কি?”
পরাগ চমকে তাকালো।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভার্সিটিতে পড়া একটি মেয়ে। লাল সবুজের একটা সুন্দর জামা পরা।
পরাগ আস্তে বললো,
“পরাগ।”
মেয়েটা একটু হাসলো।
তারপর দোকানদারকে বললো,
“এক প্লেট চটপটি দিন।”
পরাগ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
চটপটি তার হাতে দেওয়া হলো।
সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
মেয়েটা বিল মিটিয়ে চলে যেতে লাগলো।
যাওয়ার সময় থেমে গিয়ে তার হাতে একটা ছোট লাল সবুজের পতাকা দিল।
বললো,
“শুভ বিজয় দিবস।”
তারপর চলে গেল ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে।
পরাগ পতাকাটা শক্ত করে ধরে রইলো।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো এক অদ্ভুত হাসি।
এমন হাসি—
যেন সে পুরো পৃথিবী জয় করে ফেলেছে।
তার কাছে সেই চটপটি শুধু খাবার না,
সেই পতাকা শুধু কাপড় না—
সেগুলো ছিল সম্মান, ভালোবাসা, আর এক অচেনা মমতার স্পর্শ।
সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরলো।
শিউলি বেগম ভাত আর ডাল রান্না করেছেন।
আজও তাদের খাবার—ভাত আর শুধু ডাল।
যেখানে সারা দেশ আজ উৎসব করছে,
সেখানে তাদের ঘরে নীরবতা।
পরাগ খেতে বসলো।
তার পাশে রাখা ছোট্ট লাল সবুজের পতাকাটা।
সে তৃপ্তি করে খাচ্ছে।
মুখে শান্তির হাসি।
শিউলি বেগম তাকিয়ে আছেন।
তার চোখ ভিজে উঠছে।
তিনি বুঝতে পারছেন না—
এটা দুঃখের পানি, না আনন্দের।
হয়তো দুটোই।
তিনি মনে মনে বললেন—
আমার ছেলে নতুন জামা পায়নি,
কিন্তু সে আজ দেশকে ভালোবাসতে শিখেছে।
আর হয়তো—
এই ভালোবাসাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।
বাইরে তখনও পতাকা উড়ছে।
আর ছোট্ট একটা ঘরের ভেতর—
একটা ছোট্ট পতাকা
একটা ছোট্ট ছেলের হৃদয়
আর এক মায়ের অশ্রু
মিলে তৈরি করছে
বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর স্বাধীনতা দিবস।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
“মা!!!! রাস্তায় দেখলাম ছেলেরা লাল সবুজের পতাকা নিয়ে কি যেন করছে।
২৪ জানুয়ারী - ২০২৬
গল্প/কবিতা:
২ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মার্চ,২০২৬