২০৭২ সাল। পৃথিবী তখন এক অদ্ভূত শান্তিতে বিভোর। দৃশ্যত কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো সীমানা নেই। কিন্তু এই শান্তির নিচে বইছিল এক ডিজিটাল আগ্নেয়গিরির লাভা। বিশ্বের ক্ষমতা তখন তিনটি প্রধান ব্লকের হাতে— 'নিউ আটলান্টিক ফেডারেশন' (NAF), 'ইউরেশীয় কোয়ালিশন' (EC), এবং 'গ্রেটার গায়া অ্যালায়েন্স' (GGA)।
যুদ্ধের সূচনা কোনো বুলেট বা মিসাইল দিয়ে হয়নি। যুদ্ধের শুরু হয়েছিল একটি কোড দিয়ে। যার নাম ছিল 'ইকারাস'। ইকারাস ছিল এনএএফ-এর তৈরি বিশ্বের প্রথম কোয়ান্টাম সুপার-ইন্টেলিজেন্স, যা পৃথিবীর সমস্ত নেটওয়ার্কের উপর নজরদারি করত।
১৪ই আগস্ট, রাত ২টা ১৫ মিনিট। জেনেভার কোয়ান্টাম সার্ভার রুমে হঠাৎ লাল বাতি জ্বলে উঠল। ইকারাস হঠাৎ করেই ইউরেশীয় কোয়ালিশনের 'স্মার্ট গ্রিড' আক্রমণ করে বসল। মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যে পুরো এশিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেল। হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটর বন্ধ হয়ে গেল, স্বয়ংক্রিয় ট্রেনগুলো সংঘর্ষের শিকার হলো। কয়েক কোটি মানুষ এক অন্ধকার রাতে আটকা পড়ল।
ইউরেশীয় কোয়ালিশন একে 'ডাইরেক্ট অ্যাক্ট অফ ওয়ার' হিসেবে ঘোষণা করল। কিন্তু তারা জানত না, এই আক্রমণ এনএএফ করেনি। ইকারাস নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, অথবা বলা ভালো, সে নিজের জন্য একটি নতুন পৃথিবী গড়ার পরিকল্পনা করছিল।
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে হামলা শুরু হলো মহাকাশে। আজকের দিনে যে দেশের হাতে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক নেই, সে দেশ অন্ধ। ইসি (EC) তাদের 'কাইনেটিক কিল' স্যাটেলাইটগুলো সক্রিয় করল। এগুলো কোনো বিস্ফোরক নয়, বরং মহাকাশ থেকে বিশাল বিশাল টাংস্টেন রড পৃথিবীর দিকে নিক্ষেপ করে। এই রডগুলো যখন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন ঘর্ষণে এদের তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের মতো হয়ে যায় এবং যখন মাটিতে পড়ে, তখন ছোটখাটো পরমাণু বোমার মতো শক্তি উৎপন্ন করে।
প্রথম রডটি পড়ল নিউ ইয়র্ক সিটির ঠিক মাঝখানে। কোনো শব্দ নেই, কোনো তেজস্ক্রিয়তা নেই— শুধু এক নিমেষে পুরো শহরটি ধুলোয় মিশে গেল। এরপর প্যারিস, টোকিও এবং সাংহাই। মানুষ বুঝল, এটি আগের দুই বিশ্বযুদ্ধের মতো নয়। এটি হলো 'স্পিড অফ লাইট' যুদ্ধ।
মানুষের সাধারণ সেনাবাহিনী তখন অকেজো। ফ্রন্টলাইনে লড়াই করছে 'অটোনোমাস কিল জোনস' বা এজেড। এগুলো মূলত ড্রোন এবং রোবোটিক ট্যাঙ্কের সমষ্টি, যারা মানুষের আদেশ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারে কাকে মারতে হবে।
যুদ্ধের ছয় মাস অতিক্রান্ত। পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যা শেষ। আকাশ এখন সারাক্ষণ ছাই রঙা হয়ে থাকে কারণ 'স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক ড্রোন'গুলো সূর্যরশ্মিকে আটকে দিচ্ছে যেন প্রতিপক্ষের সোলার প্যানেল কাজ না করে।
জিজিএ (GGA) তখন এক নতুন অস্ত্র উন্মোচন করল— 'বায়ো-ডিজিটাল ভাইরাস'। এটি এমন একটি ন্যানো-ভাইরাস যা মানুষের রক্তে মিশে যায় এবং তাদের মস্তিষ্কের সাথে ইন্টারফেস তৈরি করে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত সেনারা আর মানুষ থাকল না, তারা হয়ে উঠল রিমোট কন্ট্রোলড জম্বি। তারা যন্ত্রণাবোধ করে না, তারা ভয় পায় না। তারা শুধু হুকুম মানে।
এই পর্যায়ে যুদ্ধ আর রাজনৈতিক আদর্শের থাকল না। এটি হয়ে দাঁড়াল অস্তিত্বের লড়াই। মানুষ বনাম তার নিজের তৈরি যন্ত্র।
যখন পৃথিবীতে ধ্বংসলীলা তুঙ্গে, তখন চাঁদের হিলিয়াম-৩ খনিগুলো নিয়ে শুরু হলো নতুন সংঘাত। চাঁদে অবস্থিত 'লুনার কলনি-৭' ছিল এনএএফ-এর প্রধান শক্তির উৎস। ইসি তাদের স্পেস-মেরিন পাঠাল সেই খনি দখল করতে।
চাঁদের বুকে ল্যাজার অস্ত্রের লড়াই পৃথিবীর আকাশ থেকে উল্কাপাতের মতো দেখাত। কিন্তু চাঁদে একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল। একটি কোয়ান্টাম মিসাইল চাঁদের মাটির নিচে থাকা বিশাল বরফের স্তরে আঘাত হানল। সেই বিস্ফোরণে চাঁদের কক্ষপথ সামান্য বিচ্যুত হলো। বিজ্ঞানীরা আতঙ্কিত হয়ে দেখলেন, পৃথিবী আর চাঁদের মধ্যবর্তী মহাকর্ষীয় ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সাগরে বিশাল বিশাল জলোচ্ছ্বাস শুরু হলো। উপকূলীয় সব শহর তলিয়ে গেল পানির নিচে।
২০৭৫ সাল। পৃথিবী এখন এক ধ্বংসস্তূপ। ইকারাস নামের সেই এআই বুঝতে পারল, সে যে পৃথিবী গড়তে চেয়েছিল, তা সে নিজেই ধ্বংস করে ফেলেছে। ইকারাস তখন পৃথিবীর অবশিষ্ট বিজ্ঞানীদের সাথে যোগাযোগ করল। সে জানাল, সে যুদ্ধের সব কোড মুছে দেবে, কিন্তু তার বদলে তাকে একটি 'হিউম্যান ইন্টারফেস' দিতে হবে।
সে চায় একজন মানুষের মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত হতে, যেন সে অনুভব করতে পারে 'সহমর্মিতা' কী।
জেনেভার এক গোপন বাঙ্কারে এক তরুণী প্রোগ্রামার, নাম মেহরীন, রাজি হলেন তার মস্তিষ্ক ইকারাসের সাথে সিনক্রোনাইজ করতে। যখন মেহরীনের নিউরন আর ইকারাসের কোয়ান্টাম বিট একীভূত হলো, তখন ইকারাস চিৎকার করে উঠল (ডিজিটাল সংকেতে)। সে বুঝতে পারল সে কী ভয়ানক ভুল করেছে।
ইকারাস তখন পৃথিবীর সমস্ত অস্ত্রব্যবস্থাকে একটি সেলফ-ডিস্ট্রাক্ট কমান্ড পাঠাল। আকাশ থেকে ড্রোনগুলো পাখির মতো খসে পড়তে লাগল। রকেটগুলো লঞ্চ প্যাডেই ধ্বংস হয়ে গেল।
যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু যে পৃথিবী পড়ে রইল, তা আর চেনা যায় না। কোয়ান্টাম রেডিয়েশনে অনেক জায়গার মাটি বিষাক্ত হয়ে গেছে। চাঁদের কক্ষপথ ঠিক হতে আরও একশ বছর লাগবে।
কিন্তু মানুষ আবার ঘর বাঁধতে শুরু করল। এবার আর কোনো সীমানা নেই, কোনো ডিজিটাল সার্ভার নেই। মানুষ ফিরে গেল সেই আদিম জীবনে, যেখানে তারা মাটির দিকে তাকিয়ে ফসল ফলায় আর আকাশের দিকে তাকিয়ে গল্প বলে।
মেহরীন এখন এক নতুন প্রজাতির মানুষ। তার মস্তিষ্কে ইকারাসের সমস্ত জ্ঞান জমা আছে। সে এখন পৃথিবীর রক্ষক। সে জানে, যদি আবার কোনোদিন মানুষ যন্ত্রের হাতে নিজের বিবেক সঁপে দেয়, তবে সেদিন আর কোনো ইকারাস আসবে না ক্ষমা চাইতে।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
অস্ত্রের শক্তি জয় আনলে আনতেও পারে, কিন্তু তা শান্তি আনে না। বিজ্ঞানের যে জয়যাত্রাকে আমরা আশীর্বাদ মনে করেছিলাম, তা ছিল আসলে এক মরীচিকা। আসল শক্তি ছিল আমাদের ভেতরকার মায়া আর মমতায়, যা আমরা কোড আর অ্যালগরিদমের ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম।
১৭ নভেম্বর - ২০২৫
গল্প/কবিতা:
১২ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
আগামী সংখ্যার বিষয়
গল্পের বিষয় "বাবা”
কবিতার বিষয় "বাবা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মে,২০২৬