গা ছমছমে অন্ধকার। অমাবস্যার রাত না হলেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা থাকায় চাঁদের আলো মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। অর্ণব তার টর্চলাইটের ক্ষীণ আলোটা সামনে ফেলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক অট্টালিকা—লোকেরা যাকে 'নীলকুঠি' বলে ডাকে। একসময় এখানে নীলকর সাহেবরা থাকত, কিন্তু গত ১০০ বছরে এই বাড়ির চৌকাঠ কেউ মাড়ায়নি। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, এই বাড়িতে অভিশপ্ত কোনো আত্মা বাস করে।
অর্ণব একজন শৌখিন প্রত্নতাত্ত্বিক। পুরোনো স্থাপত্য আর ইতিহাসের ওপর তার প্রবল ঝোঁক। লোকমুখে শোনা এই রহস্যের সমাধান করতেই সে আজ রাতে এখানে এসেছে। তার সাথে আছে তার বাল্যবন্ধু সুমিত। সুমিত একটু ভীতু প্রকৃতির, কিন্তু অর্ণবের জোরাজুরিতে সে না এসে পারল না।
"অর্ণব, আমার মনে হচ্ছে আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত," সুমিত কাঁপা গলায় বলল। "গ্রামের লোকগুলো মিছেমিছি ভয় দেখায়নি। দেখছিস না, বাড়িটার চারপাশ কেমন থমথমে?"
অর্ণব হাসল। "ভয় পাবি না সুমিত। রহস্য যেখানে, রোমাঞ্চ সেখানে। চল ভেতরে যাই।"
বাড়ির সদর দরজাটা অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। কাঠের পাল্লাগুলো উইপোকায় খেয়ে কঙ্কালসার করে ফেলেছে। ভেতরে পা দিতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। ধুলো আর ঝুলের আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে এককালের দামী আসবাবপত্র। অর্ণব টর্চের আলো দেয়ালে ঘোরাতেই দেখতে পেল সারি সারি তৈলচিত্র। সবগুলোই সাহেবদের ছবি। কারোর হাতে চাবুক, কারোর হাতে পাইপ।
হঠাৎ একটা শব্দ হলো। মনে হলো ওপরতলার কোনো ঘর থেকে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সুমিত আঁতকে উঠে অর্ণবের হাত চেপে ধরল।
"শুনলি? ওপরে কেউ আছে!"
অর্ণব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শব্দটা থামল না। ঘষ ঘষ করে একটা আওয়াজ কিছুক্ষণ পর পর শোনা যাচ্ছে। তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিল। পুরোনো কাঠের সিঁড়িগুলো প্রতিটি পদক্ষেপে গোঙানির মতো শব্দ করছিল।
ওপরতলায় উঠে তারা একটি বড় হলের সামনে এসে থামল। হলের মাঝখানে একটি বড় ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে, যাতে এখন আর বাতি জ্বলে না। কিন্তু মেঝেতে টর্চ ফেলতেই অর্ণব অবাক হয়ে গেল। মেঝে পরিষ্কার! ধুলোর কোনো চিহ্ন নেই। বরং সেখানে চমৎকার একটি আলপনা আঁকা। কিন্তু আলপনার রঙটা স্বাভাবিক নয়—গাড় লাল। ঠিক যেন সদ্য জমাট বাঁধা রক্ত।
"এটা কী করে সম্ভব?" অর্ণব বিড়বিড় করল। "এই জনশূন্য বাড়িতে আলপনা কে আঁকবে?"
ঠিক সেই সময় হলের কোণ থেকে একটি অস্ফুট কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। কোনো এক নারীর কণ্ঠ। কান্নার সুরটা এতটাই করুণ যে সুমিতের চোখে জল এসে গেল। সে সম্মোহিতের মতো হলের ভেতরের দিকে এগোতে শুরু করল।
"সুমিত! থাম!" অর্ণব চিৎকার করে উঠল। কিন্তু সুমিতের কোনো হুঁশ নেই। সে যেন অন্য কোনো জগতের ঘোরে আচ্ছন্ন।
অর্ণব সুমিতকে টেনে ধরল এবং তাকে এক প্রকার জোর করেই ঘরের একপাশে নিয়ে এল। সেখানে একটি পুরোনো মেহগনি কাঠের টেবিল ছিল। ড্রয়ারটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটি জীর্ণ ডায়েরি। ডায়েরির পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, অনেক জায়গায় কালি লেপ্টে গেছে।
অর্ণব ডায়েরিটা পড়তে শুরু করল। এটি ছিল জন স্মিথ নামে একজন নীলকর সাহেবের। ১৮৫৭ সালের ডায়েরি। পাতায় পাতায় লেখা আছে নীল চাষীদের ওপর নির্যাতনের গল্প। কিন্তু শেষের দিকের পাতাগুলো ছিল অন্যরকম।
"আজ রাতে নীলিমার মৃত্যু হয়েছে। আমি তাকে চাবুক মেরেছিলাম কারণ সে নীল চাষ করতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু সে মরার আগে অভিশাপ দিয়ে গেছে—এই কুঠি কোনোদিন শান্তিতে থাকবে না। প্রতি অমাবস্যার রাতে তার রক্তের আলপনা এই হলের মেঝেতে দেখা যাবে। আমি ভয় পাচ্ছি... জানলার বাইরে আমি নীলিমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি..."
ডায়েরি পড়া শেষ হতেই ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেল। অর্ণব দেখল জানলার শার্সিতে একটি ছায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা চুল, সাদা শাড়ি, কিন্তু মুখটা দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ ঘরের সব কটি জানলা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দে চারিদিক তোলপাড়। সুমিত জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। অর্ণব দেখল, মেঝের সেই লাল আলপনা থেকে ধোঁয়া উঠছে। ধোঁয়া থেকে একটি অবয়ব তৈরি হচ্ছে।
অর্ণব পকেট থেকে একটি ছোট গঙ্গাজলের বোতল বের করল (সে পুরোপুরি নাস্তিক নয়)। সে জোরে মন্ত্র পাঠ করতে লাগল। ঘরটি হঠাৎ একটি তীব্র আলোয় ভরে উঠল। অর্ণব অনুভব করল তাকে কেউ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে।
পরদিন সকালে যখন অর্ণব আর সুমিতের জ্ঞান ফিরল, তারা দেখল তারা নীলকুঠির বাইরে ঘাসের ওপর শুয়ে আছে। রোদ ঝলমলে সকাল। নীলকুঠিটা আগের মতোই জরাজীর্ণ দেখাচ্ছে। কিন্তু অর্ণবের হাতে তখনো সেই লাল ডায়েরিটা ধরা ছিল।
সুমিত বলল, "অর্ণব, আমরা কাল রাতে কী দেখেছিলাম?"
অর্ণব কোনো উত্তর দিল না। সে ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল। সেখানে একটি নতুন বাক্য যোগ হয়েছে, যা কাল রাতে ছিল না:
"তোমাদের জীবন ভিক্ষা দিলাম, কারণ তোমরা সত্য জানতে চেয়েছিলে। কিন্তু আর কখনো ফিরে এসো না।"
গ্রামের মানুষ বলে, আজও নাকি অমাবস্যার রাতে নীলকুঠি থেকে কান্নার আওয়াজ আসে। অর্ণব তার ডায়েরিটা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নিজের সংগ্রহে রেখে দিল। রহস্য হয়তো পুরোপুরি সমাধান হলো না, কিন্তু নীলকুঠির সেই অভিশপ্ত রাত তার স্মৃতিতে চিরকাল অমলিন হয়ে রইল।
রহস্য মানুষকে টানে, আবার মানুষকে ধ্বংসও করে। অর্ণব সেই রহস্যের স্বাদ পেয়েছিল। সে বুঝেছিল, জগতের সবকিছুর ব্যাখ্যা বিজ্ঞানে নেই, কিছু জিনিস অনুভবের আর কিছু জিনিস ভয়ের।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
এটি একটি দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর কাহিনী যেখানে ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনার মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।
১৭ নভেম্বর - ২০২৫
গল্প/কবিতা:
১০ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি
“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।
প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী