একজন কণ্যা দায়গ্রস্থ বাবা শুকুর মুন্সি

বাবা (জুন ২০২৬)

খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি
  • 0
  • 0
বাদ্য বাজনা সহযোগে তরুণদের একটা সুসজ্জিত দল। কারো গলায় ঢোল, কারো হাতে বাঁশি, কারো হাতে কাশর ঘন্টা,কারো হাতে কাঁচকলা ধান দুবলোর সাজন কুলো, কারো হাতে আবার ত্রিপত্রক আম্র মঙ্গল ঘট।

আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে। এটা তাদের দলীয় সঙ্গীত। কাঠ ফাটা তপ্ত রোদের উঠোনে মাতম কোরে কোরে আল্লাহর কাছে পানি চেয়ে বেড়ায় ওরা।  

যখন যে বাড়িতে যায় সে বাড়ির গৃহিনীরা তাদের তপ্ত রোদের উঠোনে গড়াগড়ি খাওয়া ছেলে ছোকরাদের কষ্ট নিবারণের জন্য কলস কলস পানি এনে ওদের শরীরে ঢালতে থাকে।
এ ভাবে উঠোনে গড়াগড়ি খাওয়া ছেলেদের উপর উপর্যুপরি পানি ঢালার কারণে উঠোনটা এক সময় কাঁদায় কাঁদায় কাঁদাময় হয়ে যায়।
ওদিকে পানিতে উজ্জীবিত হয়ে ছেলেরা দ্বিগুণ উৎসাহে একে অপরের গায়ের উপর গড়াগড়ি খায় আর আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে, বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক চাপড়ায়।
এক সময় দলের কর্তা ব্যক্তিটি বাড়ির গৃহবধুর হাত থেকে মুষ্ঠির চাল ডাল আনাজপাতি বুঝে নিয়ে অন্য বাড়ির দিকে রওনা হয়।
এভাবে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওরা আল্লাহর কাছে পানি চেয়ে বেড়ায়।

এমনি এক আবেগপূর্ণ মুহুর্তে সেদিন লজ্জায় লাল হয়েছিল কাজলী। দলটি এক সময় ওদের বাড়ীর উঠোনে এসে পড়ে। তখন কাজলী আর ওর চাচাতো বোন শেফালী দুজন মিলে, উঠোনে গড়াগড়ি রত ছেলেদের গায়ে যথারিতি পানি ঢালতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে।
আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, যখন তুঙ্গে তখন তাড়াহুড়ো করে পানি ঢালতে গিয়ে উঠোনে গড়াগড়ি রত কালাচাঁন নামের ছেলেটার পায়ের সাথে দৈবাৎ শাড়ীর আঁচলটা জড়িয়ে পিচ্ছিল উঠোনে চিটপাট হয়ে পড়ে যায় বেচারি কাজলী। এমন দৃশ্য দেখে যথারিতি উপস্থিত দর্শক জনতা হাসিতে ফেটে পড়ে।
এদিকে কাজলী তড়িঘড়ি নিজের লজ্জা ঢাকতে গিয়ে কালাচাঁদের আয়ত চোখের গভীরে কখন যে হারিয়ে যায় বুঝে উঠতে পারে না। সেই থেকে চেনা জানা একে অপরকে ভালোলাগা শুরু হয়। 

প্রতি দিন বিলের ধারে মোশ চড়াতে আসে কালাচাঁন। মোশের পিঠে বসে সুরেলা কন্ঠে গান ধরে। গান শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে কাজলী। উদাস নয়নে চেয়ে থাকে উন্মুক্ত পাথারের দিকে। মোশের পিঠে কালাচাঁনকে তখন স্বপ্নের মদন কুমারের মতই মনে হয় ওর কাছে।
অবচেতন মনে কাজলী মুক্ত স্বাধীন বিহঙ্গের মত কখনো বা শেফালীকে সাথে নিয়ে কলমির জলে সাঁতার দেয়। শাপলার লাইল দিয়ে মালা বানায়। কলমির ফুল খোপায় গুজে কালাচাঁনের মনোযোগ আকর্ষণ সহ আরো কত কিযে করে তার ইয়াত্তা নাই। 

মোল্লাদের বাড়ি বছর চুক্তি কামলা খাটে কালাচাঁন। প্রতিদিন সে সুযোগ বুঝে মোশ চড়াতে চড়াতে মুখে হাসি আর হাতে বিড়ি নিয়ে আগুনের আব্দার করে কাজলীদের বাড়ির উঠোনে এসে বসে।
যতক্ষণ থাকে কাজলীর মার সাথে প্যাচাল পাড়ে আর কাজলীর সাথে টাংকি মারে।
কাজলীর মা সহজ সরল মেয়ে মানুষ ও সব প্রেম পিরিতির মারপ্যাচ কিছুই বোঝেনা। কাজলীর মাকে খালাম্মা বলে ডেকে ব্যবধাণটা যথাসাধ্য কমাবার চেষ্টা করে কালাচাঁন।

কেননা সে ভাল করেই জানে যে তার মতো একজন গরীব কামলার সাথে শুকুর মুন্সির মেয়ে কাজলীর কখনো মিলন হবার নয়। তবুও কাজলী কিসের মোহে যে বারবার কালাচাঁনকে কাছে আসার সুযোগ করে দেয় কালাচাঁন তা মোটেও বুঝে উঠতে পারেনা। এভাবে দিনে দিনে কালাচাঁন আর কাজলীর প্রেমের উপাখ্যান গোপনে পরিপক্ক হতে থাকে। 
দেশে তখন তীব্র খরা চলছিল। গ্রামের কারো চোখে ঘুম নেই। মনে শান্তি নেই, জমি জিরাত ক্ষেত খোলা পুড়ে সব অঙ্গার হয়ে যেতে বসেছে। শুকুর মুন্সির মনেও তখন তীব্র অশান্তী। কারণ শুকুর মুন্সি কেবল মাত্র সাধারণ কৃষকই নয়। একজন কণ্যা দায়গ্রস্থ বাবা ও বটে। এবারের ধানের খন্দক শেষে মেয়ের বিবাহ দেবার জন্য মনস্থির করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেশ কালের যে কি হলো, আর ভাবতে পারেনা শুকুর মুন্সি। মাঠের ফসল পুড়ে খাক হয়ে যাবার উপক্রম।

রাতের খাওয়া দাওয়া শেযে দুঃস্চিন্তা গ্রস্থ শুকুরমুন্সি স্ত্রীর হাত থেকে পানের খিলি নিতে নিতে কাজলীর কথা জানতে চায়। ইদানীং তার চলাফেরা মোটেও পছন্দ হচ্চে না। স্ত্রীকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে বলে আবার দুঃস্চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন অনাবৃষ্টর কারনে মনটা এমনিতেই ভালোনা মেয়েকে নিয়ে হয়েছে আরেক জ্বালা।

কাজলী আড়াল থেকে বাবা মার সব কথা শুনে ভীষণ চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়। মনে মনে স্থির করে কালাচাঁনকে হারালে তার চলবে না। যে কোরেই হোক কালাচাঁনকে তার পেতেই হবে। কিন্তু কি কোরে? কাজলী ভাবে, জীবনে এই পৃথিবীর মাঝে সব থেকে নির্ভরশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ কনো ব্যক্তি যদি থেকে থাকে তবে তো সে তার বাবা। তাই বাবার প্রতি আস্থা হারাতে চায়না কাজলী। আসলে পাহাড় সমান বিপদ থেকেও বাবা তাকে উদ্ধার করবে এটাই সত্যি। তাই ঠান্ডা মাথায় বাবাকে তার হাত করতে হবে।

কাজলীর মাথায় একটা আইডিয়া আসে তা হলো কালাচাঁন তো আল্লা মেঘদে পানিদে দলের লোক তাই অনেক কিছু গুন জ্ঞান বিদ্যা বুদ্ধি তার জানা রয়েছে বলেই তার বিশ্বাস। সেই সুবাদে কালাচাঁনকে একটি শর্ত বেধে দিয়েছিল কাজলী ।

ঃ তুমি যদি আমাক পাতি চাও তাহলে আগে আমার বাবার মন জয় করতি হবি। সেই জন্যি একটা কিছু দেখাতি হবি তোমাক। তুমিতো মেঘ দে পানি দে দলের লোক। আজ রাতের মধ্যে যদি আকাশ থেকে পানি নামাতি পারো তালে আমাক পাবা নচেত না। অতি ছেলে মানুষী পস্তাব বলে মনে হলেও আসলে কাজলীর বিশ্বাসে নিরিখে কালাচাঁনের প্রতি এ সরল সমিকরণ বলে ধরতে হবে।

কাজলীর কথায় কালাচাঁন হতভম্ব হয়ে যায়। আজ রাতের মধ্যে আকাশ থেকে পানি নামাতে হবে। এটা কি করে সম্ভব। অনেক ভেবে চিন্তে কোনো কুল কিনারা খুঁজে পায়না কালাচাঁন। তবে তার ওস্তাদের কাছে অনেক দিন আগে শোনা এক পদ্ধতির কথা তার মনে পড়ে। তাহলো খরা বা অনাবৃষ্টি হলে ব্যাঙা বেঙির বিয়ে দিলে সেই রাত্রেই নাকি বৃষ্টি নামে।
কালাচাঁনের কথা শুনে কাজলী হেসে কুটিকুটি। নিজেদের বিয়ের কথা মনে করে অন্য মনস্ক হলেও কথাটা ওর ভীষণ মনে ধরে।

যেই ভাবা সেই কাজ ব্যাঙা বেঙির বিয়ের আয়োজন শরু হয়ে যায়।
অতি প্রাচীন সেই বিন্দু কুটির ঝোপের পাশে ছোট্র একটি পুকুর খনন করা হয়। তার পর দুজন মিলে দুটি ব্যাঙা বেঙি ধরে আনে তার পর ওদের মাথায় তেল সিঁদুর মাখিয়ে ভালো করে সাঁজায়। এর পর কালাচাঁন বিজ্ঞ তান্ত্রিকের মতো গেরুয়া বসনে বিন্দু কুটির ঝোপের ডালে ডালে রঙিন তেনা বেঁধে তাতে মন্ত্র পাঠ করে
ঃ ব্যাঙা বেঙির বিয়ে দিলাম হে খোদা দয়াময় ৴ আজকে রাতের মধ্যে যেন বৃষ্টি বাদল হয়। 

মন্ত্র পাঠান্তে দুজন ব্যাঙা বেঙি দুটিকে নিজেদের তৈরী সেই পুকুরে ছেড়ে দেয়। তারপর যাবার সময় দুজন মুখোমুখী হয়ে দাড়ায় তারপর কাজলী বলে তোমার কথা যদি সত্যি না হয় অর্থাৎ আজ রাতে যদি বৃষ্টি না হয় তালি মনে রাখবা আমার এই যাওয়াই শেষ যাওয়া। কারণ আমি তোমার কথার সত্যতা নিয়ে আব্বার সাথে বাজি ধরতে চাই। তারে সাফ সাফ কয়া দিতি চাই আজ রাতেই পানি হবি।
কালাচাঁন তার ভালোবাসার জোরে কাজলীকে শতভাগ আশ্বাস দিয়ে বলেছিল তুমি দেখে নিও আজ রাতেই বৃষ্টি হবে। অতপর দুজন দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে যে যার বাড়ির দিকে চলে যায়।   

এশার নামাজ অন্তে শুকুর মুন্সি মেয়েকে কাছে ডেকে দোয়া দরুদ পড়ে মাথায় ফু দিচ্ছিল হঠাৎ করে কাজলীর ব্যাঙা বেঙির বিয়ের কথাটা মনে পড়ায় মুখ ফসকে হাসি বেড়িয়ে পড়ে। শুকুর মুন্সি অবাক হয়ে মেয়েকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করে। কাজলী কালাচাঁনের কথাটা বাবাকে বলবে কিনা ভাবতে থাকে। শুকুর মুন্সি মেয়ের রকম সকম দেখে বলে
ঃ তুই মনে কইতাছে কিছু কইবার চাসরে মা। 
বাবার কথায় কজলী মনে সাহস পেয়ে বলে
ঃ হ বাজান আইজ তোমারে আমি একহান কথা কইবার চাই।
ঃ তালি কি কবি ক স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বালিশে হেলান দেয় শুকুর মুন্সি।  
ঃ  হ বাজান কইতাছি আমাগো আর পানির চিন্তা করন লাগবোনা। আমাগো দুঃখ কষ্ট সব দুর হইয়া যাইবো। মাডের ফসল আবার তাজা হইবো মেয়ের কথার আগামাথা বুঝতে না পেড়ে প্রশ্ন করে
ঃ কি কবি খুইল্যা ক কিছুইতো বুজিনা। 
ঃ হ বাজান তাইলে হুনো আমি খুইল্যাই কইতাছি আইজ রাইত্তের মধ্যেই পানি অইবো এ্যার কুনু ভুল নাই তুমি দেইখ্যা নিও।
মেয়ের কথা শুনে শুকুর মুন্সি এবার নড়েচড়ে বসে। মুখের পান বাখর দিয়ে পুনরায় জানতে চায়
ঃ তরে কে কইছে আইজ রাইত্তেই পানি অইবো। বাবার মন তো মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়ের মনের কথা কিছুটা বুঝতে পারে। তাই কৌতুহলী হয়ে বলে তর মুহের বরকতে যদি বৃষ্টি আহে আর তর কথা যদি সত্যি হয় তাইলে আমার থন তুই যাই চাবি তাই তরে মিমু যাহ।

বাবার কথায় কাজলী ভীষন খুশি হয়। এবার ওর ভালোবাসার শক্তি সাহস আর অগাধ বিশ্বাস বুকে ধারণ করে এক নিঃশ্বাসে বাবাকে বলে
ঃ কালাচাঁন আর আমি আমরা দুইজন মিল্লা আইজ বিয়ানে বিন্দু কুটির ঝোপটারে স্বাক্ষী রাইখ্যা একজোড়া ব্যাঙা বেঙির বিয়া দিছি। কালাচাঁন কইছে আইজ রাইত্তেই পানি হইবো কুনু মিস হইবো না। 

মেয়ের কথা শুনে শুকুর মুন্সি ভীষণ অবাক হয়। হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায়না। ছোট বেলা এমনি ব্যাঙা বেঙির বিয়ের কথা শুনেছে বটে। তবে বৃষ্টি হয় কিনা তা জানা নেই। গাঁও গ্রামের কতইনা আচার বিচার তার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই।
কিন্তু তাই বলে কালাচাঁনের কথায় কাজলী এতোটা নিঃশ্চিত হলো কি করে সে কথাটাই ভেবে পায়না শুকুর মুন্সি। কালাচাঁনের প্রতি ওর আত্মবিশ্বাসের পরিসীমা দেখে শুকুর মুন্সি আর স্থির থাকতে পারে না। অশ্রু সজল নয়নে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। মনে মনে ভাবতে থাকে কালাচাঁনের কথা হোকনা গরীব তাতে কি তারও তো কোনো পুত্র সন্তান নেই তাই কালাচাঁনের প্রতি মেয়ের অন্ধ বিশ্বাসের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আবেগে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে তার। দীর্ঘ একটা হাই তুলে এক সময় প্রশান্তির ঘুমে তলিয়ে যায় একজন কণ্যা দায় গ্রস্থ বাবা শুকুর মুন্সি। 
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

বাদ্য বাজনা সহযোগে তরুণদের একটা সুসজ্জিত দল। কারো গলায় ঢোল, কারো হাতে বাঁশি, কারো হাতে কাশর ঘন্টা,কারো হাতে কাঁচকলা ধান দুবলোর সাজন কুলো, কারো হাতে আবার ত্রিপত্রক আম্র মঙ্গল ঘট।

১৯ আগষ্ট - ২০২৫ গল্প/কবিতা: ৯ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬