১.
হঠাৎ তীরবিদ্ধ একটা কবুতর বাসার ছাদে এসে পড়লো। ঠিক আমার পাশেই। কবুতরের পায়ে একটা চিঠি বাঁধা। আমি দৌড়ে গিয়ে ওর বুকে বিঁধে থাকা তীরটা বের করে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সেটা মারা গেলো। আমি ওর পা থেকে চিঠিটা খুলে নিলাম।
কবুতরটা কোত্থেকে এসেছে, কে পাঠিয়েছে, কাকে পাঠিয়েছে, এটাকে লক্ষ্য করে তীর কে ছুড়লো কিছুই জানি না আমি!!
চিঠিটাও বহু বছরের পুরোনো বলে মনে হচ্ছে। ময়লা ছেঁড়া ছেঁড়া ভাব কাগজটায়। ভাঁজ খুলে দেখলাম ভাঙা ভাঙা ভাবে লেখা,
"তুমি এই কবুতরের মৃত্যুর দায় কোনভাবেই এড়াতে পারবে না। তীরটার নিশানা ছিলে তুমি। অথচ এই নিষ্পাপ পাখিটা তোমার কারণে মৃত্যুর শিকার হলো। তুমি অভিশপ্ত!! যদি বাঁচতে চাও। দ্রুত ওখান থেকে পালিয়ে যাও।"
আমার মাথায় একটা ব্যাপার কোনভাবেই কাজ করছে না। যদি আমি নিশানা হই, আর কবুতরটা আমার বেঁচে যাওয়ার কারণ হয়। তবে তা এই পুরোনো চিঠিতে আগেই কিভাবে লেখা হলো?? এখন আমার কি করা উচিত? যদি সত্যিই এটা কোন পূর্বাভাস থাকে, তবে কি আমি পালিয়ে যাবো?"
এমন সময় আকাশ মুহুর্তেই কালো মেঘে ছেয়ে গেলো আর ফোটা ফোটা বৃষ্টি।
২.
আমি ছাদ থেকে নেমে বাড়ির বাইরে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি! তবে আমাকে বাঁচতে হবে। হাতের মুঠোয় চিঠিটা রয়ে গেছে।
আমি যেন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। মনে হচ্ছে, কেউ একজন আমাকে দিয়ে এসব করাচ্ছে। কারণ আমি অভিশপ্ত!
বৃষ্টির পানিতে জঙ্গলের রাস্তায় পিছলে একটা ডোবার পাশে গিয়ে পড়লাম। কেমন যেন একটা লাশ পঁচা গন্ধ। পাশে দেখলাম সত্যিই একটা লাশ। কেউ যেন মেরে ফেলে রেখে গেছে। লাশটা একটা মেয়ের।
আমি কৌতুহলে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম চেহারা এবং শরীরের সমস্ত মাংস পঁচে গেছে। লাশটার পাশেই একটা চিরকুট। তুলে নিয়ে দেখলাম সেখানে লেখা, "আমার মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী আশিক। আমি তোমার অনামিকা। চিনতে পারছো? চিনবে কিভাবে?
আমি তো এতদিনে পঁচে গলে গেছি।"
মেয়েটা সত্যিই অনামিকা! আমার সাথে চার বছরের সম্পর্ক ছিলো। ওর বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ের দেওয়ার পরের দিন আত্মহত্যা করে।
কিন্তু সেটাও তো আরও বছর দশেক আগের ঘটনা।
তাহলে সে এখানে কিভাবে এলো? আমি ভয়ে ওখান থেকে আবার দৌড়াতে শুরু করলাম।
৩.
জানি না কোথায় যাচ্ছি! এসব আমার সাথে কি হচ্ছে? আমি কি কোন ঘোরের মধ্যে আছি? নাকি স্বপ্নে? দৌডাতে দৌড়াতে জঙ্গলের মধ্যেই একটা ভাঙা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলাম।
আমি যাওয়া মাত্রই অনেকগুলো কবুতর উড়ে চলে গেলো। কয়েকটা উঠোনে বসে খাবার খাচ্ছে। আমি একটা ঘরের মধ্যে ঢুকলাম।
দেয়ালে বাচ্চাদের এলোমেলো হাতের লেখা, ড্রয়িং, অগোছালো ধুলো জমা বইপত্র।
মেঝেতে পড়ে থাকা খাবারের কৌটা। টেবিলের একপাশে ভাঁজ করা একটা কাগজ।
সেখানে বাচ্চাদের হাতে লেখা, "বাবা, আমি তোমার রোশনি। চিনতে পেরেছো আমাকে? তুমি কেন আমাকে মেরে ফেললে?
সেদিন আমাকে একটু খেয়াল করলে তো আমি ট্রাকের নিচে চাপা পড়তাম না। আমি এখনও তোমাকে অনেক মিস করি বাবা।"
চিরকুটটা পড়ে আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। দেয়ালের একপাশে দেখলাম রোশনির ছবি টাঙানো। ওটা বুকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। আমার একমাত্র মেয়ে। দুই বছর আগে স্কুলে নেওয়ার সময় আমার অসচেতনতার কারণে ও ট্রাকে চাপা পড়ে মারা যায়। আমি একটা কাগজে "আমাকে সাহায্য করো। আমি জঙ্গলে আটকা পড়েছি!"
লিখে ভাঁজ করি। এরপর বাইরে এসে একটা কবুতরের পায়ে বেঁধে ছেড়ে দিই। ভাঙা বাড়িটা থেকে বের হয়ে আসি। একটা পথ ধরে আবার এগোতে থাকি।
৪.
মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার পিছু নিয়েছে। আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পেলাম না। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পরে, একটা গাছের আড়াল থেকে দুইটা চোখ আমাকে দেখছে মনে হলো।
আমি ঘুরে দাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করতেই সে নিজেকে গাছের আড়াল করে নিলো। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম গাছটার দিকে।
সে বের হয়ে এসে আমার দিকে তীঁর তাক করে ধরলো। কিন্তু ওই মুহুর্তেই আমি তার হাত আর গলা চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দিলাম। অবাক করা ব্যাপার হলো, লোকটা আমি নিজেই। হুবহু আমার চেহারা, আমার পোশাক।
ঠিক তখনই কোত্থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এলো, "একে মেরে ফেললেই তুমি অভিশাপমুক্ত হবে।"
আমি ওর হাতে থাকা তীর নিয়ে ওর বুক বিদ্ধ করে দিলাম। লোকটা ছটফট করে মারা গেলো। আমি তীর আর ধনুকটা সাথে নিলাম নিজের আত্মরক্ষার জন্য।
লোকটার বুক পকেটে একটা চিরকুটের অর্ধেক বেরিয়ে আছে। ওটার ভাঁজ খুলে পড়লাম, "তুমি তো আমাকে হত্যা করলে তোমার অভিশাপ মুক্তির জন্য। কিন্তু তোমার আরেকটা অবয়ব অপেক্ষা করছে তোমাকে হত্যার জন্য। তাকে যদি তুমি মারতে না পারো।
তবে তুমি নিজেই তার হাতে মারা যাবে।" চিরকুটটা আমি আমার বুক পকেটে রেখে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম আরেকটা অবয়ব অর্থাৎ আরেকটা আমিকে খোঁজার জন্য।
৫.
ছুটতে ছুটতে চলে গেলাম জঙ্গলের আরেক প্রান্তে। ক্লান্ত হয়ে একটা জায়গায় বসে পড়লাম। চোখে সূর্যের আলো এসে পড়েছে। প্রচন্ড তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেছে।
বেশ অনেকটা দূরে জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে একটা পুরোনো দোতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। যেখানে ছাদে একজন দাড়িয়ে আছে। চোখ কচলে নিয়ে খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলাম। বাড়িটা অনেক চেনা এমনকি ছাদে যে দাড়িয়ে আছে, ওটাও আমিই!!
তাহলে যাকে একটু আগে হত্যা করে এলাম, যে হয়তো এর কথাই বলেছিলো। আমি আর দেরি না করে তীরটা তাক করে ধরলাম ওর দিকে। ঠিক মাথা বরাবর নিশানা করেই ছুড়ে দিলাম।
হঠাৎ কোত্থেকে একটা কবুতর এসে ওর সামনে দিয়ে উড়ে যেতে তীরটা কবুতরের বুকে বিঁধে গেলো এবং সেটা ছাদের ওপরে গিয়ে পড়লো। হায় হায়!!
এই ঘটনাও তো খুব চেনা মনে হচ্ছে। আমার সাথেই তো ঘটেছিলো এটা। আমি সাথে রাখা চিরকুটগুলো বের করলাম। "আমাকে সাহায্য করো, আমি জঙ্গলে আটকা পড়েছি!" লেখা চিরকুটটা আমার সাথেই আছে।
আমি ভুল করে অন্য একটা চিরকুট, যেটা সকালে ছাদে কবুতরের পায়ে বাঁধা পেয়েছিলাম, সেটাই বেঁধে দিয়েছি! তার মানে ওটাই সেই কবুতর। যে ছাদ থেকে আমাকেও বাঁচিয়েছিলো। ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো আমার কাছে। আমি একটা লুপের মধ্যে আটকা পড়েছি।
যেটা এভাবে চলতেই থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ছাদে থাকা ব্যক্তিটাকে হত্যা করা যাবে। কিন্তু এটা অসম্ভব! কারণ ঘুরেফিরে বারবার ওই কবুতরটা সামনে এসে যাবে, আর লোকটা বেঁচে যাবে।
হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল।
মানে…
ওই লোকটা এখনই বাড়ি থেকে বের হবে।
আর আমি…
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম—
নিজের হাতেই নিজের মৃত্যুর জন্য।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
রহস্যময়ী এই চিরকুটের ধাঁধায় যে পড়বে, সেই একটা লুপের মধ্যে আটকে যাবে। এবং বারবার তার সাথে একই ঘটনা ঘটবে। বারবার নিজেই নিজেকে মেরে ফেলবে। এটা একটা ব্যাপক রহস্যের মায়াজাল।
১১ মে - ২০২৫
গল্প/কবিতা:
১৪ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি
“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।
প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী