১.
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, শহরের শেষ প্রান্তে থাকা একটি পুরনো বাড়িতে থাকতে আসে মায়া নামের এক প্রাণোচ্ছল তরুণী। বাড়িটির চারপাশ উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, আর প্রাচীরের ওপর সারি সারি উল্টোভাবে গাঁথা তারকাঁটা এখনও রয়ে গেছে, যেন অচেনা কাউকে এই বাড়ি থেকে দূরে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সতর্কবার্তা দিচ্ছে! গেটের পাশের দেয়ালে থাকা নামফলকে বড় বড় করে লেখা— ‘মেঘলামায়া’।
বাড়িটি বহুদিন ধরে খালি পড়ে থাকায় মায়া এটি প্রায় অপ্রত্যাশিতভাবে সস্তায় কিনতে পেরেছে। অদ্ভুত হলেও সত্যি, বাড়ির বিক্রেতা তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে চায়নি। এমনকি তিনি যখন জানলেন যে এই বাড়িটা মায়ার পছন্দ হয়েছে, মনে হলো তিনি যেন একটু বেশিই খুশি হলেন। তার থেকেও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাড়ির বিক্রেতা যখন জানতে পারলেন যে এই বাড়ির বিক্রয়মূল্য মায়ার সাধ্যের বাইরে, তখন তিনি মায়াকে অবাক করে দিয়ে সানন্দে কমদামে বাড়িটি বিক্রি করতে রাজি হয়ে গেলেন। এতে মায়া কিছুটা অবাক হলেও বিষয়টিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি।
বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে এসব কথাই ভাবছিল মায়া। তার চোখে পড়ে বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গাছের শুকনো পাতা, ঘরের ভেতর সর্বত্র মাকড়সার জাল ঝুলছে, সেই সাথে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এক অদ্ভুত ভ্যাপসা গন্ধ, পুরো পরিবেশটাই যেন নিস্তব্ধ, ধুলোয়-মাখানো স্মৃতির ভুবন, যা মায়াকে কিছুটা অবাক করলেও এক অন্যরকম অজানা উত্তেজনায় ভরিয়ে দেয়।
একা হাতে পুরো বাড়ি পরিস্কার করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ক্লান্ত শরীরে মায়া কোনো রকমে গোসল করে, কিছু না খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
হঠাৎ কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে মায়ার ঘুম ভেঙে যায়। মায়া প্রথমে বুঝতে পারল না যে সে কোথায় আছে। কিন্তু আশপাশটা ভালো করে দেখতেই তার মনে পড়ে যায় যে, সে এখন তার নতুন বাসায় আছে। কিন্তু একটু আগে যে শব্দটি শোনা গেল, মায়া বুঝতে পারল না সেটি ঠিক কী ছিল। মায়া খানিকটা অবাক হলেও খেয়ে-দেয়ে আবারও শুয়ে পড়ে।
কিন্তু মায়া যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন হঠাৎ করেই তার ঘরের বন্ধ দরজা সশব্দে খুলে যায়। সেই শব্দে মায়ার ঘুম ভেঙে যায়, আর চোর এসেছে ভেবে সে ভয়ে আঁতকে ওঠে। কারণ এই পুরনো বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ নেই। আশেপাশে তেমন কোনো বাড়ি নেই। কোনো খারাপ লোকের খপ্পরে পড়লে তার সঙ্গে কী ঘটবে— এটা ভেবেই সে ভয়ে চুপসে যায়।
কিন্তু অনেকক্ষণ হওয়ার পরও তেমন কোনো শব্দ শুনতে না পেয়ে সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সে বাড়ির ভেতরটা ভালো করে খুঁজে দেখে, বাড়ির ভেতর কেউ লুকিয়ে আছে কি না। কিন্তু না, কোথাও কেউ নেই! শুধু মনে হচ্ছিল কোথা থেকে যেন কেমন অদ্ভুত ফিসফিসানির মতো ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে আসছে। মায়া অনেক খুঁজেও সেই শব্দের কোনো উৎস খুঁজে পায় না।
মায়া ভাবল: 'হয়তো এসবই তার মনের ভুল। নতুন জায়গা, অচেনা পরিবেশ, তাই হয়তো এতো অস্বস্তি হচ্ছে।'
তাছাড়া সারাদিন তার উপর যা ধকল গেল, এরপর এমন ভুলভাল শব্দ শোনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই আর সাত-পাঁচ না ভেবে মায়া আবারও ঘুমিয়ে পড়ে।
কিন্তু মায়া ঘুমিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবারও শোনা যায় সেই অদ্ভুত ক্ষীণ কণ্ঠ। কেউ যেন ফিসফিস করে ডাকছে: “মায়া... মা.. য়া.... মায়া...”
ক্ষীণ হিমশীতল কণ্ঠে ভেসে আসা এই ডাক যেন ঘরের প্রতিটি কোনায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু সেই শব্দ মায়ার কানে পৌঁছায় না। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মায়া জানতেও পারে না, সেই ক্ষীণ হিমশীতল কণ্ঠ কতটা ভীতিকর। এই কণ্ঠ শুনলে ভয়ে,আতঙ্কে যে কারো গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাবে, ভয়ে বুক কেঁপে উঠবে।
পরদিন সকালে মায়া ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে, তার সাথে ঘটে যাওয়া রাতের ঘটনা নিয়ে চিন্তা করতে করতে ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিল। এমন সময় কেউ যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করে ডেকে উঠল : “মায়া....”।
হঠাৎ তাকে ডাকায় মায়া ভয়ে চমকে উঠে, আর তাতেই গরম খুন্তির ছেঁকা তার হাতে লেগে যায়। মায়া যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মায়া তার হাতটি ঠান্ডা পানিতে হাত ডুবিয়ে দেয়। এতে সে কিছুটা আরাম অনুভব করে।
মায়া কিছুতেই বুঝতে পারছে না, হঠাৎ কি হলো? কে তার নাম ধরে ডাকল? আর শব্দটা শুনে তার কেন এমন মনে হলো, যেন খুব কাছ থেকেই কেউ তার নাম ধরে ডাকছে! শব্দটা শুনে মনে হলো, যেন কোনো মেয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে আকুল হয়ে তাকে ডাকছে। কিন্তু এই বাসায় তো সে ছাড়া আর কেউ নেই।
তবু তার কেন এমন মনে হলো, যেন সেই ব্যক্তি, সেই কন্ঠের মানুষটি তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল! মায়া কিছুই বুঝতে পারছে না। কি হচ্ছে এখানে! সবই কি তার কল্পনা নাকি যা ঘটছে তা বাস্তব?
কিন্তু তার হাতের সেই অংশে, যেখানে গরম খুন্তির ছেঁকা লেগে কালো দাগ ফুটে উঠেছে, সেটা তো মিথ্যা নয়। এখনও তার হাত জ্বলছে। এর মানে তো এটাই— এখানে সত্যিই কেউ ছিল, কেউ তার নাম ধরে ডেকেছিল। কিন্তু কে? আর সেই অজ্ঞাত মেয়েটি মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেল!
মায়া যখন গরম খুন্তির ছেঁকা খেয়ে পিছনে তাকায়, তখন তো সেখানে কেউ ছিল না! মায়া তো ঐ মূহুর্তে আশেপাশে কাউকে দেখতে পায়নি! মায়া বুঝতে পারল না, চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই সে কোথায় চলে গেল? মায়া পুরো বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে অনেক খুঁজেও এমন কাউকে পেল না, যে তাকে ঐভাবে ডাকতে পারে। ঐ ক্ষীণ, হিমশীতল, কিন্তু ব্যাকুলতায় ভরপুর কণ্ঠ শুনে মনে কেমন যেন আতঙ্ক তৈরি হয়। মায়া অনেক ভেবেও কিছুই বুঝতে পারলো না। অহেতুক ভেবে সময় নষ্ট না করে সে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
অফিসে পৌঁছেও মায়ার মনটা সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকে। সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। বাসে বসে থাকতে থাকতে তার বারবার মনে হচ্ছিল— সত্যিই কি কেউ তার নাম ধরে ডেকেছিল? নাকি সবই তার কল্পনা? অফিসে পৌঁছেও সে কাজে মন বসাতে পারছিল না। দিনটা কোনোভাবে শেষ করে, সন্ধ্যার দিকে আবার সেই পুরনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় মায়া।
সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা। বাড়ির গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ তার মনে হলো— আজ বাড়ির পরিবেশ যেন আরও অদ্ভুত, আরও নীরব, আরও নিস্তব্ধ; কোথাও কোনো শব্দ নেই, এমনকি ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকও নেই। মনে হচ্ছে, মায়া যেন তার নিজের বাড়িতে নয়, বরং কোনো কবরস্থানে প্রবেশ করছে। হঠাৎ মায়ার মনে হলো, কেউ যেন তাকে লক্ষ্য করছে— তাকে দেখছে, দূর থেকে কেউ যেন তার ওপর নজর রাখছে!
হঠাৎ করেই তার শরীরের ভেতর দিয়ে এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল। ঠিক তখনই আবার খুব ক্ষীণ একটা শব্দ তার কানে এলো— “মা...য়া... মায়া....”
মায়া চমকে উঠে চারদিকে তাকায়, কিন্তু কোথাও কেউ নেই। তবে কে তাকে ডাকল? এবার তো সে অন্যমনস্ক ছিল না। সে স্পষ্টই কারো ক্ষীণ কণ্ঠ শুনতে পেয়েছে। মনে হলো, খুব কাছ থেকেই কেউ তার নাম ধরে ডাকছে, আকুল হয়ে ক্ষীণ হিমশীতল কণ্ঠে! কিন্তু আশেপাশে তো কেউ নেই। তবে কে তাকে ডাকল?
এসব ভেবে মায়া শিউরে উঠল। তার গায়ের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় করে সে বাড়ির সদর দরজার সামনে এগিয়ে গেল। মায়া কয়েক মুহূর্ত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। ভয়ে, আতঙ্কে তার বুক ধকধক করছে। তবু একবুক সাহস নিয়ে ধীরে ধীরে দরজাটি ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেই পরিচিত ভ্যাপসা গন্ধ আবারও তার নাকে ভেসে এলো।
মায়া সাবধানে চারদিকে তাকাতে লাগল। সে তার রুমের দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। কারণ দরজাটি একটু ফাঁক হয়ে আছে। সকালে বের হওয়ার সময় সে দরজাটি বন্ধ করেই গিয়েছিল— এটা সে নিশ্চিত। মায়া ভীষণ ভয় পেল। দরজাটি তো সে বন্ধ করে গিয়েছিল। তাহলে কি বাসায় কোনো চোর এসেছে? কিন্তু তা কি করে সম্ভব? বাড়ির সদর দরজায় তো তালা লাগানো ছিল, আর সব দরজা, জানালাও বন্ধ। তাহলে চোর এলো কোন পথ দিয়ে? তবে কি এই বাড়িতে ঢুকার জন্য অন্য কোনো গুপ্তপথ আছে?
এসব ভাবতে ভাবতে কাঁপা কাঁপা হাতে মায়া তার রুমের দরজাটা আরও একটু ঠেলে খুলল। কিন্তু না, তেমন কোনো অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না। মায়া যেন কতকাল পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ফ্রেশ হয়ে, রাতের খাবার খেয়ে, বাড়ির সবগুলো রুম ভালো করে চেক করার পর ক্লান্ত মায়া ঘুমিয়ে পড়ল।
হঠাৎ করেই মাঝরাতে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দে মায়ার ঘুম ভেঙে যায়। কিসের শব্দ হলো, সেটা দেখার জন্য মায়া তার রুম থেকে বের হয়। সে পাশের রুমগুলো ভালো করে খুঁজে দেখে, কিন্তু কোথাও কেউ নেই।
ঘুমের ঘোরে ভুল শুনেছে এই ভেবে সে আবার তার রুমে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। ঠিক তখনই তার মনে হয়, ঘরের ভেতরের বাতাসটা যেন অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা হয়ে গেছে।
আর সেই মুহুর্তেই তার কানের কাছে ভেসে আসে সেই ফিসফিস কণ্ঠ— “মা…য়া… মায়া.... চলে যাও এখান থেকে… পালাও.... বাঁচতে চাইলে পালাও....”
এই কণ্ঠ যতটা হিমশীতল, তার চেয়েও অনেক বেশি করুণ। মায়া তৎক্ষণাৎ আতঙ্কে ঘুরে দাঁড়ায়। 'কিন্তু তার পেছনে তো কেউ নেই! তাহলে এইমাত্র সে কার ডাক শুনতে পেল?'
মায়া সাবধানে চারদিকে তাকাতে থাকে। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ভয়ে, আতঙ্কে মায়া দ্রুত নিজের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
রুমের দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল মায়া। ঐ হিমশীতল কণ্ঠ যেন এখনো তার কানে বাজছে। কাঁপা কাঁপা হাতে মায়া দরজাটি একটু একটু করে ঠেলে খুলল। তারপর যা দেখে, তাতে তার শরীর যেন জমে যায়।
তার রুমের আয়নায় দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ের প্রতিবিম্ব— লম্বা, কালো ঘন চুল, সাদা ফ্যাকাশে শরীর। আয়নায় তার মুখ দেখা যাচ্ছে না; শুধু মৃদু বাতাসে উড়তে থাকা লম্বা কালো ঘন চুলে ঢাকা পিঠ দেখা যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে মেয়েটা মাথা ঘুরিয়ে আয়নার ভেতর থেকে মায়ার দিকে তাকায়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা তখনই মায়ার চোখে পড়ে— আয়নায় দেখা সেই মেয়েটার মুখটা হুবহু মায়ার মতোই। তার কপালে গভীর এক ক্ষত, তাতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে।
হঠাৎ সেই মেয়েটা ঠান্ডা, হিমশীতল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠে— “মায়া… আমি জানতাম একদিন না একদিন আমাদের ঠিক দেখা হবে…নিয়তি আমাদের ঠিকই দেখা করাবে। মায়া চিনতে পেরেছ আমায়…”
একথা শুনে মায়া আঁতকে ওঠে। মায়া যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার মুখটা হুবহু তারই মতো। এমন মনে হচ্ছে, যেন মায়ার প্রতিবিম্ব মায়ার সাথেই কথা বলছে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তার চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের ফ্যাকাসে, কিন্তু সেই চোখে যেন গভীর এক দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে।
মেয়েটার শরীর যেন রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে; চুল উসকোখুসকো। তার কপালে, মুখে, হাতে, পায়ে, ড্রেসে, এমনকি শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত, যাতে জমাট বাঁধা রক্ত লেগে আছে— কি বিভৎস সেই দৃশ্য!
মায়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠে, “কে… কে তুমি?”
মেয়েটা ধীরে ধীরে আয়না থেকে বের হয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। তার পা মাটি স্পর্শ করছে না; সে যেন মাটির উপর ভেসে ভেসে আসছে।
মেয়েটা খুব আস্তে করে বলে— “আমি মেঘলা… এই বাড়ির আসল বাসিন্দা। এই বাড়িটা একসময় আমি কিনেছিলাম।”
একথা শুনে মায়ার বুক কেঁপে ওঠে।
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে উঠে— “পাঁচ বছর আগে তোমার মতো আমিও এই বাড়িতে থাকতে এসেছিলাম। কিন্তু এই বাড়িতে আসার কয়েকদিন পর এক অমাবস্যার রাতে সব শেষ হয়ে যায়....”
মায়া ভয়ে, আতঙ্কে পিছু হটতে থাকে। তবু মনে সাহস সঞ্চয় করে মায়া জিজ্ঞেস করে, “তাহলে তোমার কন্ঠই কি আমি বারবার শুনতে পাচ্ছি? তুমি কেন বারবার আমাকে ডাকছ? কি চাও আমার কাছে?”
মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা তুলে মায়ার চোখের দিকে তাকায়। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে বলে উঠে— “কারণ… তুমি বিপদে আছো। আর তাছাড়া আমি তোমার যমজ বোন। জন্মের পর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। আজ এতবছর পর আমি তোমায় ফিরে পেলাম। কিন্তু আমি এতটাই হতভাগ্য যে তোমায় ফিরে পেয়েও তোমাকে সুরক্ষিত রাখতে পারিনি। মায়া… তোমার জীবনে ভয়ংকর বিপদ ঘনিয়ে আসছে। যত দ্রুত সম্ভব পালাও এখান থেকে। নইলে তোমার পরিণতি আমার মতোই হবে!”
মায়া অবাক হয়ে বলে উঠে, “কি বলছ এসব! আমরা যমজ বোন! কিন্তু আমার তো কোন বোন নেই! তুমি কোন যুক্তিতে বলছ যে আমরা যমজ বোন! আর আমি বিপদে আছি এই কথাই বা তোমায় কে বললো? আর কোন বিপদের কথা বলছ তুমি?”
মেয়েটা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠে— “এই বাড়িতে শুধু আমি একা নই… আমার সঙ্গে এখানে খুব ভয়ংকর কিছু একটা আছে; কোনো খারাপ শক্তি, একটা কালো ছায়া, খুব অন্ধকার, খুব ভয়ংকর, হিংস্র। তাই বলছি, আমার কথা শোন, আজই অমাবস্যা! বাঁচতে চাইলে এখনি পালাও! মায়া.... পালাও এখান থেকে....”
মেঘলার কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ করেই ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়। ভয়ে, আতঙ্কে মায়ার বুক ধড়ফড় করতে থাকে। ঠিক তখনই ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে আসে এক ভয়ংকর কর্কশ হাসি। মায়া ধীরে ধীরে সেই দিকে তাকায়। তারপর যা দেখে, তাতে তার শরীর যেন জমে যায়।
কারণ অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে আরও একটি ছায়া— নিকষ কালো একটি অবয়ব। সেই ছায়ার শরীরের আকৃতি মানুষের মতো হলেও স্বাভাবিক নয়, কেমন যেন অদ্ভুত। ধীরে ধীরে ঘরে কেমন যেন এক অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সেই গন্ধ নাকে যেতেই মায়ার গা গুলাতে শুরু করে; বমি হওয়ার উপক্রম হয়। মেঘলা তখন আতঙ্কে মায়াকে আড়াল করে দাঁড়ায়, যেন সেই কালো ছায়ার নজর মায়ার উপর না পড়ে।
মেঘলা বলে উঠে, “দেখেছো? আমি বলেছিলাম তোমায়… ও এখানেই আছে…”
মায়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “কে… ও?”
মেঘলা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে, “এই সেই অপশক্তি… যে আমাকে মেরে ফেলেছিল… আমি জানি না সে কে, কেনই বা আমাকে এত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলো, কোন অপরাধে আমাকে অকালে প্রাণ হারাতে হলো; আমি জানি না, আমি সত্যিই জানি না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের সব আলো নিভে যায়। অন্ধকারে শুধু শোনা যায় এক ভয়ংকর কর্কশ কণ্ঠ— “আবারও…আবারও নতুন অতিথি এসেছে…”
সেই কালো ছায়ামূর্তি মায়াকে আক্রমণ করতে গেলে মেঘলা তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। সেই ঘন কালো অন্ধকারের মধ্যে তখন অদ্ভুত কিন্তু ভয়ংকর শব্দ শোনা যায়, যেন কোনো যুদ্ধ চলছে। মেঘলা বারবার মায়াকে পালাতে বলছে। ভয়ে, আতঙ্কে মায়া দৌড়ে তার রুম থেকে বের হয়ে যায়।
কিন্তু নিকষ কালো অন্ধকারে মায়া কিছুই দেখতে পায় না। তবুও অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে যতদ্রুত সম্ভব এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। কিন্তু এই ঘন কালো অন্ধকারে মায়া কিছুতেই বুঝতে পারছে না, সে কোন দিকে যাবে। সে এটাও বুঝতে পারছে না, ঘরের সদর দরজা কোনদিকে? অন্ধকারে বারবার মায়া হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, তবু প্রাণপণে চেষ্টা করছে এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার।
কিন্তু নিকষ কালো অন্ধকার যেন তার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় ঘন কালো অন্ধকারের মধ্যে মায়ার আর্তনাদ ভেসে আসে। তারপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাড়িটা আবারও নীরব ও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। চারপাশে শুধু ঘন কালো অন্ধকার আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই অদ্ভুত ভ্যাপসা, আঁশটে গন্ধ। এমন মনে হচ্ছিল, যেন একটু আগেও এই বাড়িতে কিছুই ঘটেনি!
২.
পরদিন সকালে আশেপাশের কয়েকজন লোক দূর থেকে দেখতে পায়, বাড়িটির প্রধান ফটকটি আধখোলা অবস্থায় রয়েছে। কয়েক বছর ধরেই এই বাড়ি নিয়ে আশেপাশের মানুষের মনে এক অদ্ভুত ভয় ও আতঙ্ক কাজ করে।
কারণ ১৫/২০ বছর আগে এই বাড়িতে এক ভাড়াটিয়া থাকতো, পেশায় কবিরাজ, এক মধ্যবয়স্ক লোক — নাম জয়েন উদ্দিন। সবাই জানতো, তিনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করেন, বিভিন্ন রকমের গাছগাছালির শেকড়, বাকল, ছাল, লতাপাতা নিয়ে তার সময় কাটতো। এছাড়াও মাঝেমধ্যে ঝাড়ফুঁক করতো, প্রয়োজনে কেউ সাহায্যের জন্য আসলে তাকে পানিপড়া বা তাবিজ দিতো। লোকটা কারো সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলতো না, মিশতো না।
ওই লোক এই মফস্বল শহরে আসার কিছুদিন পর থেকেই আশেপাশের লোকজন ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকে। হুট করেই সুস্থ সবল মানুষ চোখের সামনে রক্তবমি করে মারা যেতে থাকে। হাসপাতালে নিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছিল না। এমনকি ময়নাতদন্ত করেও ডাক্তাররা তাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে পারেনি।
পুরো এলাকায় ধীরে ধীরে মৃত্যুভয় ছড়িয়ে পড়ে। আশেপাশের লোকজন একসময় ওই কবিরাজের কাছ থেকে পানিপড়া, তাবিজ নিতে শুরু করে। এদের মধ্যে অনেকেই সুস্থ হতো, তবে তার উপর যাদের মনে সন্দেহ জন্মাতো, তারা পরদিনই রক্তবমি করে মারা যেত। এভাবেই কয়েকমাস কেটে যায়।
এরপর কোন এক নির্জন দুপুরে পাড়ার এক দুষ্টু ছেলে আধখোলা জানালা দিয়ে ওই কবিরাজকে তন্ত্রমন্ত্র করতে দেখে ফেলে। দুষ্টু হলেও ছেলেটি ছিল খুবই বুদ্ধিমান। কালো জাদু নিয়ে নির্মিত অনেক সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি সে দেখেছে। তাই এসব বিষয়ে তার কিছুটা ধারণা ছিল।
সে বুঝতে পারে, এই বাড়িতে কালোজাদুর চর্চা করা হয়; ছেলেটা ভাবে, ‘হয়তো এই লোকটা দুষ্টু জিনদের বশ করার চেষ্টা করছে।’ এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ছেলেটা চিন্তা করে, ‘দিনের পর দিন যেভাবে তাদের শহরে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তাতে এই লোক নিশ্চয়ই কোন না কোনভাবে দায়ী।’
তাই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সে চুপিচুপি, কোনরকম শব্দ না করে এলাকার সবচেয়ে জ্ঞানী, ইসলামিক জ্ঞানে অভিজ্ঞ হুজুরকে পুরো বিষয়টা জানায়। ঐ ছেলের মুখে সমস্ত ঘটনা শুনে হুজুর তৎক্ষণাৎ আশেপাশে থাকা লোকজনকে নিয়ে ঐ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বাড়ির সদর দরজার সামনে আসতেই হুজুর বুঝতে পারে, এই বাড়িতে নিশ্চয়ই কোন দুষ্টু জিনের প্রভাব রয়েছে। এলাকাবাসী যখন ওই কবিরাজের এমন কীর্তিকলাপের কথা জানতে পারে, তখন তারা এই বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়।
কিন্তু বাড়িতে প্রবেশ করেই তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে। পুরো বাড়িতে এক অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ, গা গুলিয়ে বমির উদ্রেক হয় এমনই সেই দূর্গন্ধ ; বাড়ির হলঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কালো জাদু করার অসংখ্য সরঞ্জাম। পিনগাঁথা অদ্ভুত চেহারার অসংখ্য নারী পুরুষের কাপড়ের পুতুল সেখানে পাওয়া যায়; তাদের মধ্যে বেশিরভাগ পুতুলই পুরনো, ছেঁড়া ও নোংরা। প্রতিটি পুতুলে বিভিন্ন বয়সী মানুষের কাপড় পরানো হয়েছে, যা বিভিন্ন ধরনের চুল ও সুতা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
হলঘরের মেঝেতে অদ্ভুত সব চিহ্ন আঁকা, ঘরের আনাচে কানাচে বিভিন্ন পশু-পাখির নাড়িভুড়ি, চামড়া, পালক, রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তার সাথে বিভিন্ন গাছের শেকড়, বাকল, ছাল তো আছেই। ধূপ জ্বালানো থাকলেও পুরো হলঘরে পচা দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
তারা যখন এই বাড়িতে প্রবেশ করে, তখন তারা দেখতে পায়, সেই কবিরাজ ঐ নোংরা, দুর্গন্ধময় পরিবেশের মাঝখানে বসে চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কালোজাদুর অদ্ভুত সব সরঞ্জাম, পিনগাঁথা পুতুল আর রক্তমাখা চিহ্নের মধ্যে তাকে যেন আরও ভয়ংকর লাগছে।
ঘরের ভেতর ধোঁয়াটে আলো, জ্বলতে থাকা ধূপের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া আর এক অদ্ভুত আঁশটে গন্ধে পুরো পরিবেশ যেন ভারী হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটা কোনো সাধারণ মানুষের বসবাসের উপযোগী নয়— বরং কোনো অশুভ শক্তির আস্তানা।
হঠাৎ করেই একসাথে এত লোকের উপস্থিতি টের পেয়ে সেই কবিরাজ ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা, এ যেন কোনো মানুষের চোখ নয়— বরং কোন শয়তানের চোখ!
হঠাৎ করেই এত লোককে একসাথে আসতে দেখে সেই কবিরাজ পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ক্রুদ্ধ জনতার হাতে ধরা পড়ে যায়। রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়া এলাকাবাসী গণপিটুনি দিয়ে তাকে মেরে ফেলে এবং তার বাড়িতে পাওয়া কালোজাদুর সমস্ত সরঞ্জাম ও তার সমস্ত জিনিসপত্র পুড়িয়ে ফেলে।
হুজুর বাড়িটিকে পরিস্কার করার ব্যবস্থা করেন। বাড়িটি পরিস্কার করার পর তিনি দুষ্টু জিনদের প্রভাব থেকে এই বাড়িটিকে মুক্ত রাখতে ইসলামিক রীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ সূরা ও দোয়া-দূরুদ পাঠ করে পবিত্র পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি পুরো বাড়ির ভেতর ও বাইরের প্রতিটি কোণায় ছিটিয়ে বাড়িটিকে বন্ধ করে দেন।
এরপর থেকে এই বাড়ির ধারেকাছেও কেউ যেত না, কখন কী হয় সেই ভয়ে! কিন্তু আজ কোনো এক অজানা কারণে, মনে একরাশ কৌতূহল আর আতঙ্ক নিয়ে কয়েকজন সাহস করে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই তারা অনুভব করল সেই অদ্ভুত ঠান্ডা বাতাস আর বাতাসে ভেসে আসা এক অদ্ভুত ভ্যাপসা, আঁশটে গন্ধ। ধীরে ধীরে তারা বাড়ির ভেতরে এগিয়ে গেল। বাড়ির হলঘরে যাওয়ামাত্রই হঠাৎ করে তাদের মধ্য থেকে একজন বিকট এক চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যায় — সবাই ছুটে এসে দেখতে পায়, মেঝের এক কোণে পড়ে আছে একটা মৃতদেহ! — মায়া!
মায়ার চোখ দুটো বিস্ফারিত, চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ; সাদা ফ্যাকাশে শরীর যেন রক্তশূণ্য, কপালে গভীর এক ক্ষত, তাতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। তার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন সে মৃত্যুর আগে ভয়ংকর কিছু দেখেছিল।
মায়ার চুলগুলো ছিল উসকোখুসকো, কপালে, মুখে, হাতে, পায়ে, ড্রেসে, এমনকি শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত, তাতে জমাট বাঁধা রক্ত লেগে আছে; কি বিভৎস সেই দৃশ্য!
এমন ভয়ংকর দৃশ্য দেখে মায়ার খোঁজ নিতে আসা সেই লোকগুলো ভয়ে আতঙ্কে দ্রুত সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
৩.
এরপর পুলিশ এলো। তারা পুরো বাড়িতে তল্লাশি করে অবশেষে বাড়ির স্টোররুম থেকে খুঁজে পায়— কয়েক বছর আগের একটি নারীর কঙ্কাল আর বাড়ির হলঘর থেকে পাওয়া যায় সদ্যমৃত মায়ার মৃতদেহ!
ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, নারীর কঙ্কালটি পাঁচ বছরের পুরনো। অর্থাৎ, তার মৃত্যু পাঁচ বছর আগে হয়েছিল। আর কঙ্কালটি ছিল এই বাড়ির পুরনো মালিকের, যার নাম ছিল মেঘলা। এই বাড়ির প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে মেঘলা এই বাড়িটি পাঁচ বছর আগে কিনেছিল। কিন্তু এবাড়িতে আসার একসপ্তাহ পরই সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তার কোন হদিস পাওয়া যায়নি।
আর বাড়ির হলঘরে পাওয়া মৃত মায়া ছিল এই বাড়ির নতুন ক্রেতা। বাড়ি কেনার দুদিন পরই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
মায়ার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত থাকলেও তার শরীর, পোশাক বা যৌনাঙ্গে দ্বিতীয় কোন ব্যাক্তির ডিএনএ পাওয়া যায়নি। তবে তার শরীরে থাকা ক্ষতগুলো পা পিছলে পড়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়নি— এ ব্যাপারে ফরেনসিক ডাক্তাররা শতভাগ নিশ্চিত।
তার ক্ষতগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ একরাশ রাগ ও ঘৃণা বুকে নিয়ে মায়ার শরীরে এলোপাতাড়ি আঁচড়ে দিয়েছে। অদ্ভুত হলেও সত্যি, মায়ার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত থাকলেও তার নখে দ্বিতীয় কোন ব্যাক্তির চামড়া বা রক্ত পাওয়া যায়নি।
তবে কি মায়া মৃত্যুর আগে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি! এটা কি আদৌও বিশ্বাসযোগ্য? মায়ার শরীরের ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে, মৃত্যুর আগে তার সাথে কারো হাতাহাতি হয়েছিল। কেউ হয়তো রাগের বশে তাকে অনবরত আঁচড় কেটে কেটে তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। এজন্যই হয়তো মায়ার শরীরে এমন গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
এরপর পুলিশ এই বাড়ির প্রকৃত মালিক জুনায়েদ হাসানকে জেরা করা শুরু করে। জুনায়েদকে জেরা করে পুলিশ জানতে পারে, পাঁচ বছর আগে সে এই বাড়িটা মেঘলার কাছে বিক্রি করেছিল। এই বাড়িতে আসার একসপ্তাহ পরই মেঘলা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
জুনায়েদ প্রথমে ভেবেছিল, মেঘলা হয়তো গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছে, কিছুদিন পর ফিরে আসবে। কিন্তু ২-৩ মাস পার হবার পরও যখন মেঘলা ফিরে আসেনি, তখন জুনায়েদ মেঘলার গ্রামের বাড়িতে যায়। সেখানে গিয়ে জুনায়েদ জানতে পারে, মেঘলা তার বাড়িতেই আসেনি — অর্থাৎ, মেঘলা নিরুদ্দেশ!
তখন জুনায়েদ ব্যাক্তিগতভাবে তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব মেঘলাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, কিন্তু তাকে কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। জুনায়েদ ভেবেছিল, ‘যদি সে মেঘলার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করে, তাহলে পুলিশ হয়তো তাকেই সন্দেহ করে গ্রেফতার করবে।’ এই ভয়ে সে এতদিন থানায় কোন ডায়েরি করেনি!
পাঁচ বছর ধরে মেঘলা নিরুদ্দেশ থাকায় একসময় জুনায়েদ চিন্তা করে যে ‘সে এই বাড়িটিকে আবারও বিক্রি করবে!’ কারণ মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য তার প্রচুর টাকার প্রয়োজন ছিল। তাই সে মেঘলাকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া ডেথ সার্টিফিকেট বানায় এবং নিজেকে মেঘলার অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করে বাড়ি বিক্রি করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে।
তাছাড়া, এই বাড়ির মূল দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র থেকে তথ্য নিয়ে এমনভাবে এই বাড়ির জাল দলিল তৈরি করা হয়, যেখানে এই বাড়ির প্রকৃত মালিক হিসেবে মেঘলাকে উল্লেখ করা হয়; যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে যে, এই বাড়িটিকে এর আগেও একবার বিক্রি করা হয়েছিল। যেহেতু এই বাড়িটিকে সবাই এড়িয়ে চলে তাই বাড়িটি বিক্রি করা জুনায়েদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়। পরিকল্পনামতো একসময় সে ক্রেতাও পেয়ে যায়।
জুনায়েদ আরও জানায়, মায়াকে প্রথমবার দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য আঁতকে উঠেছিল। ভেবেছিল হয়তো এতবছর পর মেঘলা ফিরে এসেছে! কিন্তু জুনায়েদ যখন মায়ার কাগজপত্র দেখে, তখন সে বুঝতে পারে মায়ার নাম, পরিচয়, ঠিকানা সবই ভিন্ন— মেঘলা ও মায়া দুজন ভিন্ন মানুষ।
জুনায়েদ কিছুতেই বুঝতে পারছিল না যে, এদের চেহারা হুবহু একইরকম কীভাবে হতে পারে? সে মায়াকে দেখে এতটাই হতভম্ব হয়ে যায় যে সেই মুহূর্তে তার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হয়নি। মায়ার সম্পর্কে জানার ইচ্ছে থাকলেও কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি।
জুনায়েদ ভাবে, যেহেতু দুজনের চেহারা হুবহু একইরকম, তাই কেউ যদি মায়াকে এই বাড়িতে কখনো দেখে ফেলে, তখন তাকে মেঘলা বলেই ভুল করবে! ভাববে, হয়তো মেঘলা এতবছর পর ফিরে এসেছে। আর যেহেতু সবাই এই বাড়িকে এড়িয়ে চলে, তাই কেউ মায়ার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে আসবে না!
তাই সবদিক বিবেচনা করে জুনায়েদ কিছুটা কমদামেই মায়ার কাছে এই বাড়িটা বিক্রি করে। তবে জুনায়েদ আরও জানায় যে, মায়া বা মেঘলার মৃত্যুর পেছনে তার কোন হাত নেই। তারা কীভাবে, কখন মারা গেছে, সে এই ব্যাপারে কিছুই জানে না।
জুনায়েদ ১৫-২০ বছর আগে এই বাড়িতে থাকা সেই কবিরাজের কথাও জানায় এবং সে কীভাবে কালোজাদু করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল, কীভাবে এলাকাবাসীর হাতে তার মৃত্যু হয়েছিল — সেই সমস্ত কথাও সে পুলিশকে জানায়।
পুলিশ জুনায়েদের কথা শুনে একটু চিন্তায় পড়ে যায়। তারা সেই ব্যাক্তির পরিবারকে খোঁজার চেষ্টা করে কিন্তু যেহেতু ঘটনাটি অনেক বছর আগে ঘটেছিল, তাই পুলিশ সেই কবিরাজের পরিবার সম্পর্কে কোনো বিশেষ তথ্যই পায়নি।
পুলিশ তখন জুনায়েদের কাছ থেকে মেঘলা ও মায়ার ডকুমেন্টস গুলো নিয়ে যায় এবং তাদের বাড়ি গিয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে তারা যা জানতে পারে তাতে এই জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটন হওয়া তো দূরের কথা পুলিশ যেন নিজেই এক ভয়ংকর গোলকধাঁধায় বন্দী হয়ে যায়!
পুলিশ মেঘলা ও মায়ার বাড়ি গিয়ে জানতে পারে, তাদের দুজনের বাবাই মারা গেছে। মেঘলা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর মেঘলাকে হারানোর শোক সহ্য করতে না পেরে দু'বছর আগে মেঘলার বাবা মারা যান। আর মায়ার বাবা মারা যান ছয় বছর আগে।
পুলিশ একটা বিষয় লক্ষ্য করে অবাক হয়ে যায়, মেঘলার মা যেমন মায়ার সম্পর্কে কিছুই জানে না তেমনি মায়ার মাও মেঘলার সম্পর্কে কিছুই জানে না। তাদের দাবি, তাদের একটিমাত্র সন্তান ছিল — তাদের কন্যা! মায়ার মা দু'বার মৃত সন্তান জন্ম দিলেও আল্লাহর দয়ায় সে মায়াকে জন্ম দিয়েছিল; সেই ছিল তার একমাত্র সন্তান। অন্যদিকে, সেইসময় মেঘলার বাবার আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। তাদের পক্ষে তখন দু'টি সন্তান লালন-পালন করা সম্ভব ছিল না। মেঘলাই ছিল তাদের একমাত্র সন্তান।
তাছাড়া পুলিশ এটাও জানতে পারে যে, মেঘলা ও মায়া উভয়ের জন্মই হয়েছিল একই দিনে, একই হাসপাতালে — ২৫ বছর আগে মনোহরপুর সরকারি হাসপাতালে।
পুলিশ সেখানে তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে, দশ বছর আগে তাদের হাসপাতালের পুরনো ফাইল রাখার গোডাউনে হঠাৎ করে শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লেগে যায় আর তাতে সমস্ত পুরনো ফাইল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একটি কাগজের আধপোড়া অংশও তারা উদ্ধার করতে পারেনি।
আর তাছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এত পুরনো ফাইলে থাকা তথ্য কখনো তাদের হাসপাতালের কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেনি। তবুও পুলিশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করে, মেঘলা ও মায়ার জন্মের সময় কোন কোন ডাক্তার - নার্স ডিউটিতে ছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
কখনো এই হাসপাতালে বাচ্চা চুরির ঘটনা ঘটেছে কি না এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানায়, এমন ঘটনা এই হাসপাতালে কখনো ঘটেনি। তাদের কাছে এমন অভিযোগ কখনো কোনোদিনও আসেনি। তাই পুলিশ এত গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়েও খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হয়।
তাছাড়া পুলিশ যখন জানতে পারে, ডিএনএ টেস্টে এটাই প্রমাণ হয়েছে — মেঘলা ও মায়া যমজ বোন, মায়ার বায়োলজিক্যাল মাদার মেঘলার মা ফাতেমা খাতুন। মায়ার বর্তমান মা জোবেদা খানমের সঙ্গে মায়ার রক্তের সম্পর্ক নেই! — তখন পুলিশ কর্তৃপক্ষের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে!
মেঘলার লাশ সনাক্তকরণের জন্য মেঘলা ও মেঘলার মায়ের ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছিল। ডিএনএ টেস্ট করতে গিয়ে কৌতূহলী এক ফরেনসিক ডাক্তার মেঘলা ও মায়ার চেহারা হুবহু একই রকম হওয়ার রহস্য জানতে এতটাই আগ্রহী হয়ে ওঠে যে, কাউকে কিছু না জানিয়ে সে তাদের ডিএনএ টেস্ট করায়। আর তাতেই বেরিয়ে আসে এত বড় একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট মেঘলা ও মায়ার ডিএনএ রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু পুলিশের কাছে এমন কোন তথ্য বা প্রমাণ ছিল না, যা দিয়ে এই জোড়া খুনের আসামিকে খুঁজে বের করা সম্ভব, আর তাছাড়া, মায়ার বর্তমান মা এতবছর ধরে মায়াকে নিজের সন্তান বলে জানতেন এবং তাকে আদর-যত্নে লালন-পালন করে বড় করেছেন। এখন যদি তিনি জানতে পারেন যে, মায়ার বায়োলজিক্যাল মাদার তিনি নন, বরং অন্য কেউ; তবে হয়তো তিনি এই সত্যিটা মেনে নিতে পারবেন না। তাই পুলিশ কর্তৃপক্ষ মানবিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় — যতদিন পর্যন্ত তারা মেঘলা ও মায়ার জন্মরহস্য উদঘাটন করতে না পারছে, ততদিন পর্যন্ত তারা এই ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করবে না!
পুলিশ আবারও নতুন উদ্যমে তদন্ত করা শুরু করে, কিন্তু মেঘলা ও মায়ার মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করা তো দূরের কথা — তাদের জন্মরহস্য রহস্যই থেকে যায়। জন্মের পরপরই মায়া কীভাবে মেঘলার মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, সেটা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে রয়ে গেছে!
তাছাড়া যদি যুক্তির খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে, মেঘলার মা- বাবা জানতো না তাদের যমজ কন্যাসন্তান হয়েছিল বা জন্মের পরপরই মায়াকে হাসপাতাল থেকে চুরি করা হয়েছিল, তবুও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন সেই ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানতে পারলো না?
আর মেঘলাই বা কীভাবে কোন মন্ত্রবলে, কোন অদ্ভুত টানে বা কোন অজানা যুক্তিতে সদ্য কেনা বাড়ির নাম “মেঘলামায়া” রেখেছিল? মেঘলার পক্ষে তো জানা সম্ভব ছিল না যে, মায়া নামে তার এক যমজ বোন আছে, যাকে কোন এক অজানা কারণে জন্মের পরপরই তাদের থেকে আলাদা করা হয়েছে! তাহলে কোন কিছু না জেনে কীভাবে সে বাড়ির এমন নামকরণ করতে পারল? এ কি শুধুই রক্তের টান নাকি এর পেছনে রয়েছে কোন অমীমাংসিত রহস্য? পুলিশ আজও সেই রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি!
মায়াকে কি সত্যিই তার বর্তমান বাবা মেঘলার মায়ের কাছ থেকে চুরি করেছিল? আর যদি চুরি করেই থাকে তাহলে কখন, কীভাবে চুরি করল? মেঘলার মা কয়টি সন্তান জন্ম দিয়েছে, এই ব্যাপারে কি মেঘলার পরিবার সত্যিই কিছু জানতো না? এটা কি আদৌও সম্ভব? কিন্তু সেটাই বা কীভাবে সম্ভব, আর কেউ জানুক বা না জানুক সেদিন হাসপাতালে দায়িত্বরত ডাক্তার - নার্সদের তো সত্যিটা জানার কথা। তবে কি তারা এই বাচ্চা চুরির ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল? কিন্তু এই মুহূর্তে তারা কোথায়? পুলিশ শত চেষ্টা করেও তাদের হদিস পায়নি। মেঘলা - মায়ার জন্মরহস্য, তাদের মৃত্যুরহস্যের মতো আজও অমীমাংসিত!
পুলিশ একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং বাড়ির প্রতিটি স্থানে তল্লাশি চালায়। কিন্তু তারা কীভাবে মারা গিয়েছে, কে তাদের এতটা অসহনীয় যন্ত্রণা দিয়ে খুন করেছে সেই সম্পর্কে কিছু জানতে পারবে এমন কোন তথ্য বা প্রমাণ তারা উদ্ধার করতে পারেনি! প্রত্যেকবারই তারা খালি হাতে ফিরে এসেছে!
পুলিশরা বাড়ির প্রতিটি স্থানে তল্লাশি করলেও এক জায়গায় তল্লাশি করতে গিয়ে তারা একটি মস্ত বড় ভুল করে ফেলে! ঘটনাস্থলে অর্থাৎ সেই পুরনো বাড়ির স্টোররুমে থাকা এক পুরনো, জীর্ণশীর্ণ আয়না ঢাকা ছিল ধুলাবালিতে ভরপুর এক ময়লা চাদরে। তাই কোন পুলিশ সেই আয়নার চাদর সরিয়ে দেখার প্রয়োজনবোধ করেনি!
যদি তাদের মধ্যে কেউ আয়নার চাদরটা সরাতো, তবে দেখতে পেত স্টোররুমে থাকা সেই পুরনো জীর্ণশীর্ণ আয়নায়, তাজা রক্ত দিয়ে এখনও লেখা আছে: “আমি এখনও অপেক্ষা করছি নতুন অতিথির জন্য…”!
কিন্তু রক্ত দিয়ে ঐ আয়নায় কে লিখলো এই লেখাটা? কার রক্ত দিয়ে লিখলো? — মেঘলার নাকি মায়ার নাকি অন্য কারোর? তবে কি বাড়ি বন্ধ করার পরও কবিরাজের বশ করা সেই দুষ্টু জিন এতবছর ধরে এই বাড়িতেই ছিল, নাকি কোনভাবে এই বাড়িতে আবার সে ফিরে এসেছে?
মেঘলা ও মায়ার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? কে তাদের এত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল? ঐ কবিরাজের বশ করে রাখা দুষ্টু জিন, নাকি এসবের পেছনে রয়েছে অন্য কেউ? সে কি আদৌও কোনো মানুষ নাকি কোনো অশুভ শক্তি? আর কেনই বা তাদের এত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো? তাদের হত্যা করার পেছনের উদ্দেশ্য কী ছিল?
আর তাছাড়া, কে এখনও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নতুন অতিথির জন্য? কে…?তাদের হত্যা করার পেছনের উদ্দেশ্য কী ছিল?
আর তাছাড়া, কে এখনও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নতুন অতিথির জন্য? কে…?