অনেক রাত্রে গফুর মেয়েকে তুলিয়া কহিল, আমিনা, চল আমরা যাই-
সে দাওয়ায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, চোখ মুছিয়া উঠিয়া বসিয়া কহিল, কোথায় বাবা?
গফুর কহিল, ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে।
মেয়ে আশ্চর্য হইয়া চাহিয়া রহিল। ইতিপূর্বে অনেক দুঃখেও পিতা তাহার কলে কাজ করিতে রাজি হয় নাই- সেখানে ধর্ম থাকে না, মেয়েদের ইজ্জত-আব্রু থাকে না, এ কথা সে বহুবার শুনিয়াছে।
গফুর কহিল, দেরি করিস নে মা, অনেক পথ হাঁটতে হবে।
…………………………………………………………………………………………………………
খড়-মাটির জীর্ণ কুটির, সমাজপতি বামুনকুলের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, সন্তানতুল্য মহেশের মরদেহ আর একবুক দীর্ঘশ্বাস পেছনে ফেলে বাপ-বেটি গ্রাম ছাড়ল। ওরা যখন চটকলের কাছাকাছি তখন ওদের সাক্ষাৎ হলো শরৎ বাবুর সাথে। বাবু শহর থেকে বিরাট খবর এনেছে। এক সমাজহিতৈষী মহাশয় গফুরের অভাব-অনটন আর তার ওপর সমাজপতিদের জুলুম-নিপীড়নের কথা শুনে বিগলিত হয়েছেন। তার বন্ধকীঋণ শোধ করে দিতে চায়। সাথে ব্যবসা করার জন্যে কিছু নগদ অর্থযোগও আছে।
কিন্তু বিনিময়ে তাকে কী দিতে হবে?
তেমন কিছু না! আমিনাকে ওদের হাতে তুলে দিতে হবে। সৈয়দ আলতাফ হোসেন তার একমাত্র ছেলে সৈয়দ এমদাদ হোসেনের সাথে মেয়েটার বিয়ে দিতে চান।
এহেন প্রস্তাবে গফুর যেন বিস্মিত হতেও ভুলে গেল। এতদিন গাঁয়ের বাবুরা তার সাথে যে প্রবঞ্চনা করেছে তা ছিল সরাসরি। এই শহুরে বাবু কী চায়? এমন প্রস্তাবের আড়ালে মতলব কী তার?
মতলব-টতলব কিছু না। সোজাসাপ্টা ব্যাপার হলো, সৈয়দ সাহেবের একমাত্র ছেলের কেন জানি ঘর টেকে না। উচ্চবংশীয় উচ্চশিক্ষিত দুই বধু সামান্য কারণে সংসার ত্যাগ করেছে। মনঃক্ষুণ্ণ সৈয়দ সাহেব এখন চাইছেন নিম্নবংশীয় নিম্নশিক্ষিত মেয়ে ঘরে আনতে। তাও ছেলের ঘর টিকুক।
অতঃপর এক শুভদিনে গফুরের ভগ্ন কুটিরের সামনে বড় একখানা গাড়ি এসে থামে। বধুসাজে সজ্জিত আমিনাকে নিয়ে সৈয়দ সাহেব আর তার স্ত্রী-পুত্র শহরে পৌঁছায়। ‘সৈয়দ ম্যানসনের’ বাহিরের গেট ধরে গাড়ি ভেতরে ঢুকতেই আমিনার চক্ষু চড়কগাছ। এত বড় বাড়ি! এ তো বাড়ি না, রাজমহল! সামনে বিশাল বাগান, বাপ যে জমিতে বর্গা চষে সেটাও এত বড় না। কেরোসিন কুপির মিটিমিটি আলো থেকে এক ঝটকায় ঝাড়বাতির ধাঁধানো আলোয় এসে ওর চোখ ঝলসে যায়। বাড়ির সর্বত্র উপচে পড়া আভিজাত্য দেখে ফেলে আসা দারিদ্রের স্মরণে ওর বুকটা হু হু করে ওঠে।
আমিনার খাওয়া-পড়ার চিন্তা নেই। বাসায় করার মতো কাজ নেই। চাকর-বাকর, পাচক, মালি, শোফার, দারোয়ান- অধঃস্তন কর্মীতে ঘর ঠাঁসা। সবরকম কাজের জন্যে লোক রাখা আছে। টিভিতে শত শত চ্যানেল, ব্যাক্তিগত লাইব্রেরিতে হাজার হাজার বই। বিনোদনের অজস্র মাধ্যম। তবু আমিনার মনে শূন্যতা। ছোট্ট ফাটল বড় হতে হতে কালক্রমে তা গিরিখাত।
বাসর রাতে আমিনা সারারাত বউ সেজে বসে ছিল, স্বামী একটিবারের জন্যেও এদিকটায় আসে নি। অদ্যাবধি তাকে ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখে নি। কারো সাথে তাকে ‘এ-বাড়ির বউ’ বলে সসম্ভ্রম পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় নি। বেডরুমে স্বামী একাই থাকে। তার নাকি বেড শেয়ারিংয়ে প্রবলেম! আমিনার জায়গা হয়েছে গেস্টরুমে।
এবাড়িতে অনেক মানুষের যাতায়াত। সেখানে স্ব-মহিমায় আমিনা অনুপস্থিত।
একজন অবশ্য তার পরিচয় জানে। আদিল চৌধুরী। এমদাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাম বিজনেস পার্টনার।
এমদাদ-আদিল সেদিন হাত ধরাধরি করে বাড়িতে ঢুকছিল। সামনে পড়ে আমিনা জবুথবু হয়ে একপাশে সরে দাঁড়ায়। তাকে দেখে আদিল এমদাদকে শ্লেষের স্বরে বলে
“সো, দিস ইজ ইওর লাকি থার্ড!”
“ইয়াপ”
“আই ডোন্ট থিংক শি উইল সাসটেইন লং। দিস মরন...”
“ছাড় তো! ভেতরে চল”
আদিলের কথাগুলো শুনে আমিনার বুকটা ছলাৎ করে উঠেছিল। ও ভালো করেই জানে আমিনা এমদাদের তৃতীয় স্ত্রী। কিন্তু কথাটা এভাবে বলল কেন? এই বিদ্রুপের রহস্য কী?
আদিল প্রায়ই আসে-যায়। সৈয়দ পরিবারের সাথে এক টেবিলে ডিনার সারে। সেই টেবিলে আমিনার জায়গা হয় না।
যে বেডরুমে আমিনার স্থান হয় না বেড শেয়ারিং প্রবলেমের কারণে, সেখানে দুই বন্ধু রাতে দরজা লাগিয়ে দিব্যি ঘুমায়। আমিনার ভালো ঠেকে না ব্যাপারটা। একবার শাশুড়িকে হালকা করে বলেছিল। শাশুড়ি মুখ শক্ত করে জবাব দিয়েছিল, “তোমার এত কিছু দেখার দরকার কী বাপু? খেয়েপড়ে ভালো আছো না?”
আসলেই তো! খেয়েপড়ে দিব্যি ভালো আছে সে। আগে ভাতের মাড়ের সাথে লবণটুকুও কখনোসখনো ধার করে আনতে হতো, এখন মাছ-মাংস ছাড়া আহার হয় না। রঙচঙে নতুন পোশাকে ঠাঁসা ওয়ারড্রব ভুলিয়ে দেয় দুই শাড়িতে বছর পার করার স্মৃতি। মহেশের খোরাক জোগাতে গফুর ঘরের চালার খড় টেনে বার করেছিল বলে আমিনা কী অসন্তোষই না দেখিয়েছিল! বৃষ্টি এলে ঘরের ভেতরে থেকেও ভিজে যেতে হতো যে! এখন বৃষ্টিতে হাত ভেজাতেও কত কসরৎ করা লাগে।
না, বাপের জন্যে চিন্তা করতে হয় না। বাপ খেয়েপড়ে ভালোই আছে, আগের কষ্ট নেই। শুধু বাপ-বেটির দেখাসাক্ষাৎ হয় না, এই যা! “আপনার মেয়ে কিন্তু আর আপনার নেই; ওকে আমাদের মেয়ে বলে জানবেন”- আমিনাকে গাড়িতে তুলতে তুলতে মিসেস সৈয়দের বলা কথাগুলো যে আক্ষরিক ছিল তা ওরা তখন বোঝে নি। অনাথ মেয়েকে পুত্রবধু করায় সৈয়দ পরিবারের বদান্যতার মুকুটে আরেকটি পালক সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমিনা চিরদিনের জন্যে হারিয়েছে বাবার স্পর্শ।
এত বড় বাড়িতেও আমিনার দম বন্ধ হয়ে আসে। আরামের বিছানায় শুয়েও ঘুম নেই। সেই রাতটা স্বপ্নে ঘুরেফিরে আসে। বাপ যেদিন বলেছিল সব ছেড়েছুড়ে চটকলে চাকরি নেয়ার কথা, আমিনা ভয় পেয়েছিল খুব। ও জানত ওটা হবে ওদের দাসের জীবন। চটকলের কর্মচারী হতে হয় নি তাকে, কিন্তু এখন যে জীবনটা সে যাপন করছে সেটা দাসের চেয়ে কম কী!
এই বিশাল অট্টালিকা তার কাছে কারাগার বৈ কিছু না। আভিজাত্যের প্রদীপের নিচে হতাশার অন্ধকার বুকে নিয়ে বেঁচে আছে সে। বাপের কাছে যাওয়ার স্বাধীনতা নেই। বাইরে বেরোনোর অনুমতি নেই, কারো সাথে কথা বলার উপায় নেই। ‘বউমা’র কদর বাড়ে শুধু ঘরোয়া পার্টিতে। পোশাকআশাক, চলনবলনে তাকে গ্রুম করা হয়েছে ওই এক উপলক্ষে। পার্টি খতম, কদরও শেষ!
আমিনা বুঝতে পারে এই বিয়েটা ছিল স্রেফ লোকদেখানো। ইংরেজিতে এর একটা মুখরোচক নাম আছে- ল্যাভেন্ডার ম্যারেজ! সমাজের মুখর মানুষের মুখে তালা মারতেই এই উদ্যোগ। এ-বাড়ির আগের দুই পুত্রবধু ইতিহাসে বেঁচে আছে বন্ধ্যা অপবাদ নিয়ে। বিয়ে বিচ্ছেদগুলো একপাক্ষিকই ছিল, প্রভাব বলয়ে পড়ে সেটা এই পক্ষে এসে ঠেকেছে। আমিনা যদি সব ছেড়েছুড়ে চলে যায় তখন এই বিচ্ছেদটাও হয়ে যাবে এক বন্ধ্যা নারীকে তালাক দেয়ার নাম। কেউ ঘাঁটাতে আসবে না কেন মেয়েটা বন্ধ্যা, কেন তার বাচ্চা হয় না।
দাসত্বের জিঞ্জিরে আমিনাকে বাধা পড়তে হলো কেন? সহজ ব্যাপার- এমন একজনকে সৈয়দ পরিবার বেছে নিয়েছে, যার যাওয়ার জায়গা নেই। যতই বঞ্চিত হোক, মুখ ফুটে রা করবার জো নেই। সোনার খাঁচায় পোরা তোতাপাখির মতো পেটভর্তি আহার পেলেই যে ওড়ার নীল আকাশটাকে বেমালুম ভুলে যাবে।
না, আমিনা সব ভুলতে পারে না। তার মনে হতাশার কালো মেঘ জমে জমে ভারী বর্ষণে পরিণত হয়। রমজানের প্রতিটা রাত সে নিভৃতে জাগে। গভীর রাতে নিকষ অন্ধকারের মধ্যে আলোর পানে দুহাত তুলে কেঁদে কেঁদে জানায় ফরিয়াদ, “হে আল্লাহ! আমি তোমার দাস, তুমি আমাকে মুক্ত করো এই পার্থিব দাসত্ব থেকে”
দিনের পর দিন আমিনা কেঁদে চলে। হঠাৎ একদিন অন্ধকারে আলো জ্বলে ওঠে যেন। মনের ভেতরে সে সাড়া পায়- কোনো এক স্পষ্ট ইশারা। তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে মুক্ত জীবনের আলো।
সবাই সেহরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিনা ঘুমায় না। একসময় বাইরের অন্ধকার কেটে যায়, ফোটে দিনের আলো। আমিনার মনের আঁধারও ততক্ষণে কেটে গেছে, মুছে গেছে অস্থিরতা হতাশা নিরাপত্তাহীনতার বোধ। এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে। গেটে দারোয়ান চাচা তাকে আটকায়। চাচা সব জানে-বোঝে, অন্দর-বাহিরের সবকিছু। মেয়েটা দিনের পর দিন এই বিরাট অট্টালিকায় দাসের জীবনযাপন করছে আগের দুই বউয়ের মতো। তবু আমিনাকে শুধায়,
“এত বড় দুনিয়ায় কই যাইবা মা জননী? বাপটাও তো মরল, একা তুমি টিকবা ক্যামনে? তোমার নিজের বইলা তো কিছু নাই!”
আমিনা হাসে।
“আমার কিছু নাই চাচা, কিন্তু আমি যার গোলামী করি সেই পরম প্রভুর তো সব আছে! এত বড় বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ড যে দেখে, এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমাকে সে দেখবে না?”
দারোয়ান চাচা আলতো হেসে গেট খুলে দেয়। আমিনা পা বাড়ায় অনিশ্চিতের পথে।
কোথায় যাবে সে? কোথা থেকে শুরু করবে নতুন জীবন?
আপাতত একটা জায়গার নামই মনে পড়ছে- ফুলবেড়ের চটকল!
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
অনেক রাত্রে গফুর মেয়েকে তুলিয়া কহিল, আমিনা, চল আমরা যাই-
সে দাওয়ায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, চোখ মুছিয়া উঠিয়া বসিয়া কহিল, কোথায় বাবা?
৩০ সেপ্টেম্বর - ২০২৩
গল্প/কবিতা:
৩১ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
প্রতি মাসেই পুরস্কার
বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।
লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন
-
প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল,২০২৫