সহকারী শিক্ষকের অবহেলিত অধ্যায়

দাসত্ব (এপ্রিল ২০২৫)

মোহাম্মদ শাহজামান
  • 0
  • 0
শহরের এক কোণায় অবস্থিত ‘নবজাগরণ বিদ্যালয়’। বিদ্যালয়টির অবকাঠামো যেমন পুরনো, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোও যেন একই রকম স্থবির। বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন আহসান স্যার। প্রায় বিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি অগণিত ছাত্রছাত্রীকে মানুষ করেছেন, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর হয়েছেন। কিন্তু, তার পদবী এখনো সেই ‘সহকারী শিক্ষক’ রয়ে গেছে।
যখন আহসান স্যার এই বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন, তখন তিনি ছিলেন তরুণ, স্বপ্নবাজ এক শিক্ষক। ভেবেছিলেন, জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে সমাজ বদলে দেবেন, একদিন প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসবেন, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। কিন্তু বছর যেতে থাকল, সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল।
বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক বদলালেও, তার পদবী বদলালো না। সহকারী শিক্ষক হিসেবেই জীবন কেটে যাচ্ছে। তার চেয়ে কম অভিজ্ঞতার শিক্ষকরা অন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন, অথচ তিনি রয়েই গেলেন সেই একই অবস্থানে।
বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তারা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নিতে পারেন না। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঠিক করা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে তাদের মতামত কখনোই নেওয়া হয় না। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিংবা পরিচালনা পর্ষদ কখনো তাদের গুরুত্ব দেয় না। আহসান স্যার বহুবার চেয়েছেন বিদ্যালয়ের জন্য নতুন কোনো পরিকল্পনা প্রস্তাব করতে, কিন্তু তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে একটাই বাক্যে – “আপনি তো শুধু সহকারী শিক্ষক!”
শিক্ষার্থীদের সব ক্লাস তিনিই নেন। কিন্তু বিদ্যালয়ের যেকোনো পুরস্কার প্রদান কিংবা কৃতিত্ব ঘোষণায় মূল কৃতিত্ব চলে যায় প্রধান শিক্ষক কিংবা সিনিয়র শিক্ষকদের নামে। এমন বৈষম্য দেখে কখনো কখনো মনে হতো, এ কি তবে তার ভাগ্য?
একদিন বিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী এসে আহসান স্যারকে বললো, “স্যার, আপনি আমাদের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক। কিন্তু আপনাকে কেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বানানো হয় না?”
আহসান স্যার একটু হেসে উত্তর দিলেন, “পদবীর জন্য নয়, ভালোবাসার জন্যই একজন শিক্ষক মূল্যবান।” কিন্তু মনে মনে তিনি জানেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই।
একদিন তিনি বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির কাছে গিয়ে বললেন, “আমি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এখানে শিক্ষকতা করছি। আমার কি প্রধান শিক্ষক হবার কোনো সুযোগ নেই?”
সভাপতি হেসে উত্তর দিলেন, “দুঃখিত আহসান সাহেব, নিয়ম অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই।”
এমন অবিচার দেখে আহসান স্যার হতবাক হয়ে গেলেন। একজন শিক্ষকের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং শ্রমের মূল্য যদি পদবীর সীমাবদ্ধতার কারণে স্বীকৃতি না পায়, তবে শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে উন্নত হবে?
এরপর থেকে আহসান স্যার ঠিক করলেন, তিনি আর অপেক্ষা করবেন না। সহকারী শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আন্দোলনে নামবেন। তিনি বিদ্যালয়ের অন্যান্য সহকারী শিক্ষকদের একত্রিত করলেন এবং তাদের বললেন, “আমাদের এই অবহেলার অবসান ঘটাতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করতে হবে।”
ধীরে ধীরে তার এই কথায় সাড়া দিলো অন্য শিক্ষকরাও। তারা চিঠি লিখলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, সংবাদপত্রে কলাম লিখলেন, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালালেন। শিক্ষার্থীরাও তাদের সমর্থন জানাল। কারণ তারা জানতো, তাদের আসল শিক্ষকেরা তারাই, যারা তাদের প্রতিদিন পড়ান, গড়ে তোলেন।
শেষ পর্যন্ত, শিক্ষামন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নিলো। সিদ্ধান্ত হলো, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য স্বচ্ছ নীতি তৈরি করা হবে। তাদেরকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
যে বিদ্যালয়ে আহসান স্যার বছরের পর বছর সহকারী শিক্ষক হিসেবে অবহেলিত হয়েছেন, সেই বিদ্যালয়ে এবার নতুন নীতির আলোয় পরিবর্তনের সূচনা হলো।
একদিন প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর নতুন প্রধান শিক্ষক বেছে নেওয়ার সময় এল। এবার আর বাইরের কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলো না। বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও পরিশ্রমী শিক্ষক আহসান স্যারকেই প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত করা হলো।
একদিন যাকে বলা হতো, “আপনি তো শুধু সহকারী শিক্ষক!”, সেই আহসান স্যার আজ বিদ্যালয়ের প্রধান। তিনি এখনো সেই আগের মতোই শিক্ষার্থীদের পড়ান, তবে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে একটি নতুন দায়িত্ব—সব শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

শহরের এক কোণায় অবস্থিত ‘নবজাগরণ বিদ্যালয়’।

১১ আগষ্ট - ২০২৩ গল্প/কবিতা: ১৮ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "সংসার”
কবিতার বিষয় "সংসার”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল,২০২৫