বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বত্রিশ বছর শিক্ষকতা পর অবসর নিলেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক আব্দুল হক স্যার। আব্দুল হক স্যার এইচএসসি পাশ ছিলেন। তিনি আমাদের গণিত শিক্ষক ছিলেন। তাহাঁর গণিত ক্লাস ছিল চমৎকার। তিনি বিজ্ঞান ক্লাসও করাতেন। বিজ্ঞান ক্লাসে তিনি ছবি এঁকে এঁকে বুঝাতেন তাই সহজে উনার ক্লাসের পড়া বুঝতে পারতাম। এসএসসি পাশ করার পাশ করার পর স্যারের আর কোন খোঁজ খবর নেই নাই। নিজের জীবন সংগ্রামে মশগুল হয়ে পড়েছি তাই স্যারের কোন খোঁজ খবর নেয়া হয়নি। বন্ধু বান্ধবদের নিকট কালে ভদ্রে খোঁজ নিয়েছি তবে সেটা সৌজন্যবোধ করে। স্যারেরা আমাদের জীবন গড়িয়েছে কিন্তু নিজেদের জীবন গড়ে তোলতে পারেনি। প্রদীপের মত নিজে জ্বলে অন্যকে আলো দিয়েছে। বত্রিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কত-শত শিক্ষার্থীদের আলোর পথ দেখিয়েছেন। কত শিক্ষার্থী তাঁর দেওয়া শিক্ষা নিয়ে আজ জীবনে অনেক বড় পর্যায়ে গিয়ে দেশসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। এ রকম হাজার-হাজার শিক্ষক উন্নত জাতি গড়ার জন্য অমূল্য ভূমিকা রাখছেন।
যতটুকু শোনেছি স্যারের অবসরে কোন বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হয়নি। দেয়া হয়নি কোন সম্মাননা। যারা সারা জীবন নিজের সাধ্যমত শিক্ষার্থীদের সেবা ও ভালবাসা দিয়েছেন তাঁরা বিদায়ের বেলা শুণ্য হাতে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি যেতে হয়। অতচ একসময় এই স্কুলটি ছিল তাঁর বাড়ি, সংসার, ইবাদত খানা। সেই স্কুলটি স্যারকে শূন্য হাতে বিদায় দেয়। প্রায় তিন যুগ এই স্কুলে তিনি শ্রম ও মেধা দিয়েছেন। বিদায়ের বেলায় তাঁর ভাগ্যে একটি নামাজের মুসলা, পায়জমা, পাঞ্চাবী আর এক জোড়া চামরা জুতা, একটা ছাতি তাহাঁর ভাগ্যে জুটেনি। বিদায়ের পর স্যার খুব অসহায় হয়ে পড়ে। কয়েকটি স্কুলে খন্ডকালীন শিক্ষকতার জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
হক স্যার অবসরের একমাস পরেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নিকট এসে অবসর ভাতা এবং গ্র্যাচুয়েটির আবেদনের জন্য কাগজপত্র চাইলেন। প্রধান শিক্ষক দেম দিচ্ছি বলে কয়েকমাস বিলম্ব করলেন। অবসরের চার মাস মাস পর হক স্যার অবসর ভাতার জন্য আবেদন করলেন। আবেদন করার পর ঢাকায় এক বছরে কয়েক দফায় যোগাযোগ করলেন কিন্তু অবসর ভাতা তিনি পায় না। সহকর্মীরা হক স্যারকে বুঝালেন ঘুষ দিয়ে অবসর ভাতা দ্রুত আনার জন্য কিন্তু হক স্যার চিন্তা করলেন সারা জীবন ছাত্রদের নৈতিকতা শিখালেন আর আজ নিজেই নৈতিকতা হারাবেন! চিন্তা ভাবনা আর অভাবে কাটল জীবনের আরেকটি জীবন সংগ্রাম অধ্যায়।
হক স্যারের মেধাবী ছাত্ররা যখন স্যারের বিদায়ের বেলায় কেউ এগিয়ে আসেনি তখন গ্রামের কিছু ছাত্র উদ্যোগ নিলেন হক স্যারকে বিদায় সংবর্ধণা দিবেন। এই ছাত্রগুলো ছিলো ক্লাসে পিছনের ব্যাঞ্চের ছাত্র। আমরা যারা সামনের ব্যাঞ্চের ছাত্র ছিলাম তাঁদেরকে স্যারের বিদায়ের বেলায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাকেও তাঁরা পায়নি। দু একজন প্রবাসী ছাত্র কিছু টাকা দিয়েছেন। হক স্যারের প্রাক্তন ছাত্ররা আয়োজন করলেন হক স্যারের বিদায় সংবর্ধনা। বিদায় সংবর্ধনার দিনে স্যার বক্তব্য দিতে গিয়ে শিশুর মত হাউ মাউ করে করে কান্না করে দিলেন। স্যারের কান্নায় সকল শিক্ষার্থীরাও কান্না করলেন। স্যারের বিদায়ী মর্সিয়া আকাশে বাতাসে স্তব্দ হয়ে উঠল। কি যে কষ্ট, কি যে যন্ত্রনা প্রকাশ পেয়েছা তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিদায় সংবর্ধণা অনুষ্ঠানে স্যারের জন্য স্যারের দুষ্ট ছেলেরা জামা কাপড়, কিছু আসবাবপত্র, কিছু বই এবং কিছু নগদ টাকা উপহার দিয়েছেন।
তিনবছর পর হক স্যার অবসর ভাতা পেলেন। অবসর ভাতা দিয়ে স্যার ছেলেকে ইউরোপে পাঠালেন। আশা ছিল ছেলে ইউরোপে গেলে সংসারে আয় রোজগার বাড়বে। অভাব অনটন থাকবে না। ছেলে ইউরোপে যাবার পর স্যারের অসহায়ত্বতা আরো বেড়েছে। ছেলে টাকা পয়সা পাঠায় না। স্যারের শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তাচাপ রোগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দিয়ে বললেন, শীঘ্রই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিতে হবে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বাড়ি আসার দুদিন পরেই স্যার ইন্তেকাল করলেন। স্কুলের দফতরী ফেসবুকে স্টাটাস দিয়ে জানায় আব্দুল হক স্যার ইন্তেকাল করেছে। আমি দ্রুত জানাযায় অংশগ্রহণ করি এবং স্যারকে কিছু না করার বেদনায় কেঁদে ফেলি। এই যেন আমাদের অবহেলায়ই মারা গেছেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বত্রিশ বছর শিক্ষকতা পর অবসর নিলেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক আব্দুল হক স্যার।
১১ আগষ্ট - ২০২৩
গল্প/কবিতা:
৩২ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।