ধুলোয় মাখা প্রাণ

ভূমিকম্প (জানুয়ারী ২০২৬)

Muhammadullah Bin Mostofa
  • 0
  • ৪৪
শহরটা যখন প্রথম দুলে উঠেছিল, নীলিমা তখন রান্নাঘরে রাতের শেষ থালাবাসনগুলো গুছিয়ে রাখছিল। জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আলোটা কেমন যেন অস্বাভাবিকভাবে দুলতে দেখে তার বুকটা ধক করে উঠেছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল মনের ভুল, কিন্তু যখন পায়ের নিচের টাইলসগুলো জীবন্ত সাপের মতো মোচড় দিতে শুরু করল আর মাথার উপরের ক্যাবিনেট থেকে কাঁচের গ্লাসগুলো ঝনঝন করে পড়তে লাগল, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না কী ঘটছে। সে চিৎকার করে ড্রয়িং রুমের দিকে দৌড় দিল, যেখানে তার স্বামী আরিফ আর সাত বছরের ছেলে অয়ন সোফায় বসে কার্টুন দেখছিল। পুরো বাড়িটা তখন দানবীয় এক শব্দে গর্জে উঠছে, যেন মাটির নিচ থেকে কোনো প্রাগৈতিহাসিক জন্তু পিঠ ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠতে চাইছে। চারদিকের দেয়াল থেকে চুনকাম খসে পড়ছে, সিলিং ফ্যানটা বনবন করে ঘুরে ছিঁড়ে পড়ার উপক্রম। নীলিমা অয়নকে জাপটে ধরল, কিন্তু আরিফ তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল দরজার দিকে। কিন্তু লিফটের পাশের ওই সরু করিডোর দিয়ে পালানোর পথটুকু পাওয়ার আগেই একটা বিকট কড়কড় শব্দে পুরো পৃথিবীটা যেন উল্টে গেল।
যখন জ্ঞান ফিরল, চারদিকে জমাট বাধা নিরেট অন্ধকার। নাকে ইটের গুঁড়ো আর পোড়া গন্ধ। নীলিমা অনুভব করল তার বুকের ওপর ভারী কিছু চেপে বসে আছে। একটু নড়াচড়া করতেই অসহ্য যন্ত্রণায় সে আর্তনাদ করে উঠল। হাত বাড়িয়ে অন্ধকারের মধ্যে সে পাগলের মতো অয়নকে খুঁজতে লাগল। "অয়ন! অয়ন সোনা!" তার গলা দিয়ে ঠিকমতো আওয়াজ বেরোচ্ছিল না, ধুলোয় বুকটা ভরাট হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পাশেই একটা নিস্তেজ গোঙানি শুনতে পেল সে। অয়ন ফিসফিস করে কাঁদছে, "মা, অন্ধকার... আমার ভয় করছে মা।" নীলিমার চোখে জল বাঁধ মানল না, সে প্রাণপণ শক্তিতে একটা স্ল্যাব সরানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। তার হাত দুটো থেঁতলে গেছে। তারা আটকে পড়েছে কংক্রিটের এক গোলকধাঁধায়। কিছু দূরেই আরিফের গলা শোনা গেল, সে পাথরের ওপর পাথর ঠুকে একটা সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করছে। আরিফ বারবার অভয় দিচ্ছিল, "নীলিমা, ভয় পেও না, আমরা বেরোবই। কেউ না কেউ আসবে আমাদের বাঁচাতে।"
সময়ের কোনো হিসাব ছিল না সেই গহ্বরে। কত ঘণ্টা না কত দিন কেটে গেছে তারা জানত না। তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছিল। অন্ধকারের এই স্তব্ধতায় মানুষ তার জীবনের সমস্ত হিসাব মেলাতে শুরু করে। নীলিমা ভাবছিল ছোট ছোট সব ঝগড়ার কথা, অপ্রাপ্তির কথা, যা এই মুহূর্তে কত অর্থহীন মনে হচ্ছে। পাশের ধ্বংসস্তূপের আড়াল থেকে আরেকজনের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। এক অপরিচিত বৃদ্ধ, সম্ভবত তাদেরই উপরের তলার কোনো বাসিন্দা। তিনি কাতরাচ্ছিলেন আর বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছিলেন। একসময় সেই প্রার্থনা থেমে গেল। সেই নিস্তব্ধতা ছিল আরও বেশি ভয়ংকর। মৃত্যুর এতো কাছাকাছি তারা আগে কখনো আসেনি। অয়ন খিদের জ্বালায় আর পানির পিপাসায় একসময় নিস্তেজ হয়ে নীলিমার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ল। নীলিমা ভাবছিল, মানুষের গড়া এই শহর, এই আভিজাত্য, এই উঁচু তলার অহংকার—সবই প্রকৃতির এক মুহূর্তের কাঁপুনিতে মাটির সাথে মিশে গেল।
হঠাৎ অনেক দূর থেকে একটা ক্ষীণ যান্ত্রিক শব্দ শোনা গেল। ড্রিল করার শব্দ। নীলিমা আর আরিফ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু বাইরে সেই আওয়াজ পৌঁছাচ্ছে কি না বোঝার উপায় নেই। একসময় মনে হলো শব্দটা মিলিয়ে যাচ্ছে। নিরাশায় নীলিমা যখন চোখ বুজল, তখনই ঠিক মাথার ওপর থেকে একটা টর্চের আলো সরু ফাটল দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ওই এক চিলতে আলো যেন হাজার সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল। উদ্ধারকারীদের গলার আওয়াজ শোনা গেল, "ভেতরে কেউ আছেন? সাড়া দিন!" আরিফ চিৎকার করে বলল, "আমরা এখানে! তিনজন আছি! আমার ছেলে আছে সাথে!" শুরু হলো নতুন করে বাঁচার লড়াই। পাথরের ওপর পাথর সরানো হচ্ছে, স্ল্যাব কাটা হচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা যুগ। উদ্ধারকারীরা যখন শেষমেশ নীলিমাকে বের করে আনল, তখন ভোরের আলো ফুটেছে। নীলিমা দেখল তার সাজানো গোছানো তেরো তলার বিল্ডিংটা এখন ধুলো আর ইটের পাহাড়।
স্ট্রেচারে শুয়ে নীলিমা দেখল ধ্বংসস্তূপের চারপাশ জুড়ে মানুষের ভিড়। কেউ তার স্বজনকে হারিয়ে বুক ফাটানো আর্তনাদ করছে, কেউবা ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়ার আশায় হাহাকার করছে। স্বেচ্ছাসেবীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে একটা প্রাণও যদি বাঁচানো যায়। এক স্বেচ্ছাসেবক তরুণী এক গ্লাস পানি নীলিমার ঠোঁটে ধরল। সেই এক চুমুক পানি যেন অমৃতের মতো লাগল তার কাছে। সে দেখল আরিফকেও অক্ষত বের করা হয়েছে। তাদের দুজনের চোখ যখন মিলল, তখন কোনো কথা হলো না, শুধু চোখের জলে এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেল। এই ভূমিকম্প শুধু দালানগুলোকেই গুঁড়িয়ে দেয়নি, মানুষের ভেতরে থাকা নিষ্ঠুর আত্মকেন্দ্রিকতাকেও যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। নীলিমা দেখল, যে প্রতিবেশী কোনোদিন কারো সাথে কথা বলত না, সে আজ নিজের রক্ত দিচ্ছে অজানা কাউকে বাঁচাতে। শহরটা ধ্বংস হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষগুলো যেন নতুন করে একে অপরের হাত ধরতে শিখেছে। নীলিমা অয়নকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে আকাশের দিকে তাকাল। সেই বিশাল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আজ নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে, আবার বেঁচে থাকার এই অবিশ্বাস্য আনন্দ তাকে এক নতুন সার্থকতা এনে দিল। এই শহর আবার গড়ে উঠবে, কিন্তু এই দীর্ঘশ্বাসের দাগ মুছে যেতে হয়তো বহু সময় লাগবে।

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী অনিন্দ্য সুন্দর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ লিখনিতে প্রিয়, মন ছুঁয়ে গেল পাঠে ভালো থাকুন সবসময়
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
মাহাবুব হাসান গল্পটা ভালো লাগল। এক চিলতে আশার আলো আছে গল্পে।
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

শহরটা যখন প্রথম দুলে উঠেছিল, নীলিমা তখন রান্নাঘরে রাতের শেষ থালাবাসনগুলো গুছিয়ে রাখছিল।

২৬ জানুয়ারী - ২০২২ গল্প/কবিতা: ৪১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

বিজ্ঞপ্তি

“ফেব্রুয়ারী ২০২৬” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।

প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী