রাজলক্ষী দেবী তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। কিন্তু এত চেষ্টা করেও তারা একটি সন্তানের মুখ দেখেনি। হয়তো এই কষ্ট নিয়েই তারা দুনিয়া ছাড়া হবেন। তিনি বিধি তাদের ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন অন্য একটি খেলা। রোজকার হতাশা, গ্লানি আর কষ্ট নিয়েই সেদিন রাতে ঘুমেয়ে ছিলেন স্বামী স্ত্রী। ভোরে উঠে আত্মীয় বাড়ি যাবেন, বাড়িতে থেকে বেড়ুতেই একটু দূরে ঝোপের মধ্যে থেকে একটি বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনতে পয়ে কাছে গিয়ে দেখেন, সাপ্তাহ তিন কি চারদিনের একটি মেয়ে শিশু পড়ে আছে। একজন আরেকজনের দিকে তাকেয়ে থাকেন। আবারও বাচ্চাটা কান্না করে উঠেন। রাজলক্ষী দেবীর মাতৃহৃদয় জেগে উঠে। তিনি কোলে তুলে নেন। নিজের মেয়ের মতই পালন পালন করতে থাকেন বিজয়াকে। শিশুটি বিজয়া নামেই পরিচিত হয়ে উঠে।
স্বামী মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। কুরিয়ে পাওয়া মেয়েকে নিয়েই দিন কেটে যাচ্ছে। সেদিনের সেই ঘটনাটা আজও তার মনে পড়ে গেলো। মাঝে মাঝে একলা হলেই স্মৃতির ভীরে বিজয়াকে পাওয়ার ঘটনাটা হরহামেসাই হানা দেয়। একটা ছোট্ট মেয়ে বাচ্চা। গায়ে ছেঁড়া কাথা, হাতে মাটির দাগ, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। একটানা কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত।
রাজলক্ষীর বুক কেঁপে উঠলো। একি দেখছেন তিনি। চাঁদের ফুল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
“কোথা থেকে এলে মা, কে তোমায় রেখে গেলো এখানে ?” রাজলক্ষী যেন বাচ্চাটিকে নয় নিজেকেই জিজ্ঞেস করলেন।
মেয়ে কেবল – ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর কাঁদে। কান্না থামলে চারদিক শুনসান নিরবতা, তারপর যেন এই তিন জন ছাড়া আর কিছু নেই। কিসের যেন একটা প্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখা দিল সন্তানহীনা নারীর মনে। সময় যেন থমকে গেল।
লোকজন জড় হলো। কেউ বলল, “এইডা কারা জানি ফালাইয়া গেছে।” কেউ বলল, “পাগলীর মাইয়া।” কেউ আবার বলল, “চুরি করে এনে এখানে ফেলে গেছে কেউ।”
কিন্তু রাজলক্ষী কাউকে কিছু বলতে দিল না। কারো কথা শুনতেও চাইলনা। বুকের ভেতর কষ্টক্লান্ত ভালোবাসা মাথা তুলে উঠল। সে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলো, আর বলল, “এ আমার মেয়ে। এখন থেইকা আমার।”
এভাবেই ‘বিজয়’ নাম পেল মেয়ে। রাজলক্ষী জানত না মেয়ে কার, কোথা থেকে এসেছে, কী ইতিহাস। শুধু জানত—এই ছোট্ট প্রাণটাকে আর একটুও কাঁদতে দেবে না।
সময়ের গায়ে সময় জমে পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়। তেরোটা বছর পেরিয়ে যায়। রাজলক্ষীর চুলে পাক ধরেছে, বিজয়ার গালে লাল টুকটুক ছোঁয়া। প্রথম দিকে স্কুলে পড়ত না, কারণ বই কেনার টাকা ছিল না। নিজেই পড়াত মেয়েকে । পরে স্কুলে দিয়েছে। তবে রাজলক্ষী নিজে তাকে হাটে-ঘাটে নানান কিছু শেখাত। রান্না-রান্না, গাছ চেনা, মাছ ধরা। বিজয়াও কথা বলত মধুর করে, সবাই বলত, “রাজলক্ষীর আপন মেয়ে না হলে কী হবে! আ পন মেয়ের চেয়ে কোন অংশে কম করেনা রাজলক্ষী।
কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে পাল্টে যেতে থাকে বিজয়া । বিজয়ার চোখে স্বপ্ন জাগে—নতুন শহর, নতুন জীবন, নতুন প্রেম। মন্দিরের পূজারীর সাথে সম্পর্কে জড়ায় প্রথম বিজয়া তারপর সেই পূজারীর বন্ধু যে বাজারে কাজ করে তার সাথেও দহরম মহরম সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই দুই তরুণের সাথে বিজয়ার দৃষ্টির আদান-প্রদান, ঘুরতে যাওয়া, গোপনে দেখা করা। এই সব রাজলক্ষী টের পায় ধীরে ধীরে।
সে বোঝাতে চায় মেয়েকে, “মা, মানুষ চিনতে শিখ। দুনিয়াডা এত সহজ না। আজ যাকে আপন ভাবছ, কাল তারাই পর হবে। স্বার্থ ফুরালে সবাই কেটে পড়ে।’’
কিন্তু বিজয়া ততদিনে অন্য পথে পা বাড়িয়েছে। তার মনে হয়, “এই গাঁয়ের কুঁড়ে ঘর, এই ধুলোবালি—এসব আমার জন্য না। আমার তো আলাদা কিছু হওয়ার কথা ছিল।”
একদিন সকালে রাজলক্ষী ঘুম ভাঙতেই দেখে, খালি বিছানা। চিঠি রাখা—
"মা, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ, কিন্তু আমি আর এই জীবন চাই না। আমি ওদের সাথে যাচ্ছি। ভাল থেকো।"
চিঠির নিচে দুইটা নাম—রাকিব আর শম্ভু।
রাজলক্ষী অনেকক্ষণ বোবা হয়ে বসে থাকে। গলা শুকিয়ে আসে। তারপর চিঠি হাতে বাইরে বেরোয়। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদে—“মা হইয়া কি আমি আগাছা বড় করছি? আমি কাকে এতদিন হাওয়া-পানিতে মানুষ করছি?” একটাবার আমার দিতে ফিরা চাইলনা।
পাড়া-প্রতিবেশীরা আসে, কেউ কাঁধে হাত রাখে, কেউ চোখ মুছে দেয়। কিন্তু রাজলক্ষী জানে, তার বুকের ভেতর যে গহ্বর তৈরি হয়েছে, তাতে কিছুতেই আলো ঢুকবে না।
কয়েক মাস কেটে যায়। খবর আসে—বিজয়া শহরে গেছে, দুজনের সাথে পালিয়েছিল, কিন্তু এখন একাই ঘুরছে। কেউ বিশ্বাস ভাঙ্গেছে, কেউ ঠকাচ্ছে। রাজলক্ষী শুনেও চুপ করে থাকে। কিছু বলে না।
একদিন, সন্ধ্যার মুখে কুয়াশার ভিতর একটা ছায়া দেখা যায় মাটির রাস্তায়। মাথা নিচু করে বিজয়া দাঁড়িয়ে। রাজলক্ষী চুপচাপ ভেতর থেকে এক গ্লাস জল এনে দেয়। মেয়ের মুখে কালি, চোখে লজ্জা।
বিজয়া কাঁদে না, কিছু বলে না। রাজলক্ষী শুধু বলে—
“জল খা, মা। পরড়াছা কখনো গাছ হয়না। বীজ থাকলে আবার গাছ হবে।”
কোনো মা কখনো তার সন্তানের জন্য আগাছা বোনে না। সে বোনে ভালোবাসার বীজ। কে জানে কখন সেটা একটুখানি বৃষ্টিতে অঙ্কুর গজায়।
রাজলক্ষী দেবী যখন বিজয়াকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, তখন এই পাষাণ পৃথিবীতে একটিমাত্র আত্মার জন্য তিনি বেঁচে উঠেছিলেন। চোখের সামনে বেড়ে ওঠা মেয়েটি তার নিঃসঙ্গ জীবনের আলো হয়ে উঠেছিল। চাষের কাজ, জঙ্গল থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে এনে সংসার টেনেছেন, শুধু যেন মেয়েটার মুখে হাসি থাকে।
বিজয়ার বান্ধবী মৃণালিনী বলে, তুমি মাকে ফেলে কোথায় গিয়েছ? এই পৃথিবীতে তোমার আপন বলতে মা ছাড়া আর কেউ নেই। ওই শয়তান দুটোর মিষ্টি কথায় তুমি কি করে গলে গেলে। সাবধান হো। নয়তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
কিন্তু সময় কেবল শরীরেই বয়স আনে না, মনে এনে দেয় বিচ্ছিন্নতার দূরত্ব। বিজয়া যখন দুই প্রেমিক রাকিব আর শম্ভুর পাল্লায় পড়ে ঘর ছেড়ে চলে যায়, তখন রাজলক্ষীর হৃদয়ে আগুন জ্বলে ওঠে না—বরং এক দীর্ঘশ্বাসে সবকিছু ছেড়ে দেয়। বিচ্ছেদ দূরত্ব বাড়ায়।
কিন্তু বিজয়া ফিরে আসে কয়েক মাস পর, নিঃস্ব, ক্লান্ত। সে যেন আর আগের মত নেই। রাজলক্ষী তাকে নিঃশব্দে মেনে নেয় যদিও কিন্তু মনে মনে ভাবে, এ মেয়ে তার কোনদিনই আপন হবেনা। মনকে শান্তনা দেয় এই বলে, হয়তো মায়ের ভালোবাসা বুঝতে শিখেছে অবশেষে, তাই ফিরে এসেছে।
কিন্তু বিজয়া ফিরে এসেছিল একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে।
প্রেমিক রাকিব আর তার বন্ধু শম্ভু তাকে বুঝিয়েছিল,
“তোদের ঐ কুঁড়ে বাড়িটাই তো সম্পত্তি। গাঁয়ের ভেতর জমি, পুকুর—এইটাই আমাদের ভবিষ্যৎ। বুড়ি মরলেই সব তোর নামে হবে। আমরা তিনজন মিলে একটা নতুন জীবন গড়তে পারব।”
প্রেমের মোহে অন্ধ বিজয়ার রাজি হয়ে যায়।
সে দিনরাত রাজলক্ষীর দুর্বলতা খুঁজে বেড়ায়—কখন ঘুমায়, কখন জল খায়, কীভাবে বাড়ির দরজায় তালা দেয়।
এক রাতে, হালকা বৃষ্টির শব্দে চারপাশ স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। রাজলক্ষী বারান্দায় বসে মশার ধূপ জ্বালাচ্ছিলেন। বিজয়া এসে বলল,
“মা, তোমার পায়ে তেল মালিশ করি?”
রাজলক্ষী মৃদু হাসলেন, “এতদিন পর মনে হয় টের পাইতেছে, কে আপন।”
আহা! মেয়ের এমন সুমতি দেখে তিনি আনন্দিত। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লেন বলতেই পারবেন না। আর রাতের খাবাড়ে কড়া ডোটের ঘুমের ঔষধ মিশিয়েছে বিজয়া তা ঘুণাক্ষরেও টের পান নি রাজলক্ষী।
রাতে সংকেত পাঠায় বিজয়া কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়ল রাকিব আর শম্ভু—চুপিচুপি।
চোখে মুখে কাপড় বাঁধা, হাতে লাঠি।
বিজয়া দাঁড়িয়ে দেখছিল সব কিছু। কিছু একটা তার বুকের ভিতর কাঁপছিল। কিন্তু এখন আর থামার উপায় ছিল না।
একটা থাবা রাজলক্ষীর মাথায় পড়তেই তিনি আর মাথা তুলতে পারেন না। সামন্য একটু ধস্তাধস্তি হল, রাজলক্ষী নিস্তেজ হয়ে গেলেন। পরগাছা মেয়ে তাকে পৃথিবী ছাড়া করল।
তিনজনে মিলে খুঁজতে লাগল ট্রাঙ্ক, জমির দলিল, স্বর্ণালঙ্কার।
কিন্তু সেই মুহূর্তে পাশের বাড়ির বৃদ্ধা চরণী বুড়ি জানালার ফাঁক দিয়ে সব দেখছিলেন।
তিনি চুপিচুপি থানায় খবর পাঠিয়ে দিলেন—“রাজলক্ষীর বাড়িতে ডাকাতি হইতেছে, খুনও হইছে হয়তো।”
পুলিশ এসে হাতেনাতে ধরে ফেলে বিজয়া, রাকিব আর শম্ভুকে।
ঘরের ভেতর রক্তাক্ত রাজলক্ষী পড়ে আছেন। নিঃশ্বাসের সাথে বিশ্বসও হারিয়েছিলেন কিছুক্ষণ আগে।
বিজয়ার চোখ তখন ভয়, হতাশা আর দুঃখে ছেয়ে গেছে। সে চিৎকার করে উঠে—
“মা... মা... আমি তোকে মারতে চাইনি... শুধু একটু ভালো থাকতে চেয়েছিলাম!”
বিজয়া ভেবেছিল রাজলক্ষী শেষবার চোখ মেলে তাকাবে। চোখে জল, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি নিয়ে।
আর বলবে—
“মা হয়ে... আমি পরগাছা বড় করি নাই। কিন্তু তুই... নিজেই পরগাছা হইয়া গেলি।”
এগুলো বিজয়ার মনের কথা, তার বিবেক হয়তো রাজলক্ষীর মুখ থেকে এগুলো শুনতে চেয়েছিল।
পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। মামলা চলে, সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়—
"মেয়ের হাতে মা খুন, সম্পত্তির লোভে বিভ্রান্ত প্রেম"
গ্রামে মন্দিরে একটি ছোট ফলক বসানো হয়—
“রাজলক্ষী দেবী—একজন মা, যিনি ভালোবাসা দিয়েও সন্তানের মন জিততে পারেননি।”
এই পৃথিবীতে সব সন্তান মায়ের কোলে ফিরে আসে না। কেউ কেউ ফিরেও বুকে ছুরি চালায়।
আর রাজলক্ষীর মত মায়েরা চুপচাপ সেই ছুরির আঘাতেও কেবল বলেন—
“তোর গায়ে যেন কষ্ট না হয়, মা…”
পরশীরা আতকে উঠে বলে, তেরো বছরের একটা মেয়ে কি ভাবে পাড়ল মাকে খুন করতে ? অনেকে আবর বলল, নিজের আপন মেয়ে হলে হয়তো খুন করতে পারত না।
কে যে কখন কি পেরে উঠে তা কেবল সময়ই বলে দেয়।
সত্যঘটনা অবলম্বনে লিখিত একটি গল্প।