পাগলী পাগলী ভাব নিয়ে অদ্ভুত অপরুপ রকমের মন মাতানো একটা হাসি হাসতে হাসতে রাণীমাতা নিজেকে বেসামাল করে দিয়েছিল । ক্ষনিকের তরে ছিটকে পরেছিল তার উচ্চ বংশীয় মর্যাদা ও আর্কষনীয় ব্যাক্তিত্বের বলয় হতে ।
একেতো জেদী । তার উপর জেদের মাত্রাটা এমন এক জায়গায় পৌছেছিল----, যেখানে জিততে হলে---, ঐ ভাবে হাসা ছাড়া তার আর অন্য কোনো উপায়ও ছিল না ।
বণ্যেরা বনে সুন্দর , শিশুরা মাতৃক্রোড়ে ।
দাও ফিরে সেই অরন্য , লও এই নগর ।
----- প্রবাদ বাক্যের মত এ কথা গুলোর চলমান ধারনাকে আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য রাণীমাতা একটা বিপ্লবের ডাক দিল ।
শীলা দেবী অনেকটা জোর করেই তার সাথে রাতটা কাটাবার জন্য বাধ্য করেছিল । শুক্ল পক্ষের উজ্জ্বল সেই রাতের ঘটনা-প্রবাহ অনেক নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছিল । ঘন যৌবনের পূর্ণিমার সেই চাঁদ প্রকৃতির পরতে পরতে জোঁয়াড় আর জাগড়নের যে শিহরণ বইয়ে দিয়েছিল----, শীলা দেবীর সাথে থাকার কারনে সেটা বুঝতে পারা অনেকটাই সহজ হয়েছিল ।
শীলা দেবীর ছোট বোন লীলাবতী । উঠতি বয়সের অপরুপ সুন্দরী তরুনী । ওজোন স্তরের ফাটল , গ্রীন হাউস এ্যাফেক্ট , বিশ্ব উঞ্চতা ও মরু-প্রক্রিয়া ----, এগুলো নিয়ে তার চিন্তার অন্ত নাই । এজন্য নাকি বেশী বেশী গাছ লাগানো দরকার । ওর বকবকানি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা ।
আমি বললাম----, বকবকানী থামা । যদি পারিস--- একটা পাগলী হাসি দিতে দিতে রাণী মাতার দলে যোগ দে । তারপর রাণী মাতার চেয়েও একধাপ এগিয়ে সবুজ বিপ্লবের ডাক দে । তখন সবাই তোকে সবুজ কণ্যা বলে ডাকবে । ঐ যে একটা গান আছে না ----, " দূর্বা সবুজ , পত্র সবুজ আর চির সবুজ বন---- । তার চেয়েও সবুজ কণ্যা , তোমার অবুঝ মন ।"
তোর মনের স্তরের ফাটল কোন সবুজ দিয়ে বন্ধ করবি---- আগে সেই চিন্তা কর । এ কথায় সে রেগে গিয়ে বলল ---, আপনাকে দিয়ে বন্ধ করব । তারপর আহত নাগিনীর মত ফোঁস ফোঁস করে চলে গেল ।
শীলা দেবী কিছুটা বিব্রত হলো । সে বললো---, এটা কি হলো ? আমি বললাম---, " আধ্যাত্মিকতার সবক দিতে হলে মন নিয়ে মশকরার এই প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করা খুবই বিপজ্জনক । এতে প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা থাকে । আপনার অনুরোধেই আমি তাকে হালকা সবক দিতে চেয়েছিলাম ----,অনেকটা রাণীমাতার ঐ Love you---এর মত ।
মিথ্যা মহলে সবাই বসে আছে । গুরুরাজ আজরাহা সহ সবাই বেশ চিন্তিত । দেশটার কি হবে----এই চিন্তায় সবাই বিষন্ন ।
সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা এই সোনার বাংলার খাদ্য-শস্য লুঠ হয়ে যাচ্ছে--- বিভিন্ন কৌশলে । আর তা অশুভ শক্তির হাতে যেয়ে জমছে । এর পাশাপাশি মাদকে ভাসছে গোটা দেশ । দূর্ভিক্ষের হালকা ধাক্কা আর মাদকের বিলাসীতায় দেশটা সম্পূর্নভাবে একটা মেথর রাষ্ট্রে পরিনত হয়ে যেতে পারে । ক্ষুধা , মাদকতা আর তীব্র বাজনার তালে তালে আর্যরা যেভাবে মানবতার ভিত্তিমূলে আঘাত করে একটি জাতীর নিম্ন বর্ণের মানুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মেথর বানিয়ে রেখেছে----, সেই সমীকরনের সমীরণ কিন্তু বড়ই মারাত্মক ।
কেউ বলছে---, রাস্তা-ঘাট , ব্রীজ-কালভার্ট উড়িয়ে দিতে হবে । লুঠের লট-বহরের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে হবে । কেউ বলছে----, না । বুদ্ধিভিত্তিক এই লুঠের বিরুদ্ধে বুদ্ধিভিত্তিক অবস্থান নিতে হবে । কেউ বলছে---, আমরা বেশী বেশী আবাদ করে আর গাছ লাগিয়ে সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে দিব । কিন্তু বিপ্লবকে কিভাবে এগিয়ে নেয়া হবে এবং এর সুফল কিভাবে পাওয়া যাবে ---- এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলছে না ।
গুরুমাতা এসে গেছে । সবাই সবার কথা বলে যাচ্ছে । শীলা দেবী সবুজ বিপ্লবের পক্ষে । আমি গুরুমাতাকে সম্মান জানিয়ে বললাম ----, সাধু-সণ্যাসী-সাধকদের জ্ঞানহীন বিপ্লবে জড়িয়ে না পরাই ভাল । এদেশে মালিকের বা জনগনের চেয়ে আমলা বা চাকরের অবস্থা অনেক ভাল । চুরি করে করে হূষ্ট-পুষ্ট হয়ে চাকরেরা এখন মালিককে ধমক দিচ্ছে । আত্মশক্তি ও ঐক্যের অভাবে মালিক বা জনগন এখন চাকরদের হাতে জিম্মী হয়ে পরেছে । এই মুহুর্তে যে কোনো বিপ্লবের সুফল চাকরদের দ্বারা ছিনতাই হতে বাধ্য । জনগনের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে --- জনতার রুহের জগতে রুহানী বিপ্লবের তরঙ্গ সৃষ্টি করা প্রয়োজন ।
গুরুমাতা বললেন----, এ বড় কঠিন কাজ । আমরা ইনসান । আমাদের শত্রু ইবলীশ শয়তান । তার বিরুদ্ধে জিততে হলে আধ্যাত্মিকতার পথ ধরে রুহানী বিপ্লবের বিকল্প নাই । কিন্তু আমরা এই বিপ্লব চালিয়ে যাব সবুজ বিপ্লবের আড়ালে । প্রকৃতির সবুজ আর মনের সবুজ ------ এই দুই সবুজের সৌন্দর্য্য ও শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে । এর জন্য সাধনার যে পথ সেই পথে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ।
রাণীমাতার কাছে এই বিপ্লবের বাণী পৌছে দিতে হবে । গুরুমাতা বারবার আমাকে কেন রাণীমাতার কাছে পাঠাতে চায়-----, তা ঠিকমত বুঝে উঠতে পারি না । শীলাদেবী বলে----, আমি নাকি সাধনায় অনেক দুর এগিয়ে গেছি । তাই আমার উপর গুরুমাতার বিশ্বাস আর ভরসাটা একটু বেশী । এজন্য জ্ঞান-বুদ্ধির সীমার বাইরের ব্যাপার গুলোতে তিনি আমাকে জড়িত করতে চান ।
রাণীমাতা এক আজব মহিলা । তার রয়েছে কয়েক রকমের জ্ঞান । সাপ ,জ্বীন ও মানুষের আদলে অদ্ভুত-অপরুপ আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী----এই রানীমাতা । জ্বীন-যাদুর শক্তিসহ তার রয়েছে অসম্ভব রকমের সম্মোহনী ক্ষমতা ।
আমি অনেক তোয়াজ করে রাণীমাতাকে বললাম----, আপনি যদি আপনার জ্বীন গুলির দ্বারা জেনে নিতেন ---, আগামী ৫০ বছর পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের পরিমান কেমন হবে----, তাহলে খুব ভাল হতো ।
রাণীমাতা বিরক্তিভরা ভাব দেখিয়ে অনেকটা এড়িয়ে গেল । ভাগ্যিস----, এবার তাকে Love you বলি নাই ।
রংমহলে জন্মদিনের জলসায় Love you বলাতে রাণীমাতা অন্তরে যে ধাক্কা খেয়েছিল ----, সেটা এখনো সামলে উঠতে পারে নাই । মনের কথা মনে রেখে এখন মেজাজ দেখাবার সুযোগটা ভালই কাজে লাগাচ্ছে ।
গল্প-গান আর গনিতের জটিলতা রাণীমাতার খুবই পছন্দ । তাকে বললাম---, একদা মিশর অধিপতি স্বপ্নে দেখেছিল----, সাতটি মোটা-তাজা গাভীকে সাতটি জীর্ণ-শীর্ণ দূর্বল গাভি খেয়ে ফেলছে । আর সাতটি সতেজ-সবুজ শীষ এবং অপর সাতটি শুষ্ক শীষ । ----এই স্বপ্ন তার কাছে দুঃস্বপ্নের মত মনে হতে লাগল । তিনি এর ব্যাখ্যা জানার জন্য ছটপট করতে লাগলেন ।
ইউসুফ নবী এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বললেন----, প্রথম সাত বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে । ফল-ফসলে ভরে যাবে । পরের সাত বছর খরা হবে । দূর্ভিক্ষ দেখা দিবে । এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রথম সাত বছরের খাদ্য-শস্য শীষ সমেত সংরক্ষন করতে হবে ।
--- এই গল্প শুনে রাণীমাতা যখন একটু উদারতা দেখালো----, তখন তাকে বললাম----, আগামী ৫০ বৎসর বৃষ্টিপাতের পরিমানটা জানতে পারলে পৃথিবীতে খাদ্য-শস্যের ভারসাম্যা আন্দাজ করা সহজ হতো । কোনো অশুভ শক্তি কৃত্রিম দূর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিতে চাইলে তার মোকাবেলায় বুদ্ধিভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেত । গুরুমাতা এরকম একটি চেতনাকে বিকশিত করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ।
রাণীমাতা বলল---, আমরাও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছি । সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছি । সবার আগে মাদক মুক্ত সমাজ গড়ব । মাদককে প্রতিহত করব ।
আমি বললাম----, রাণীমাতা । মাদকের সুফল যারা ভোগ করছে---, সেই মাফিয়া চক্রে দেশটা ভরে গেছে । ঠুনকো আওয়াজ দিয়ে এটা প্রতিহত করা অত সহজ নয় । তারচেয়ে বরং তরুন প্রজন্মের মানসিকতার গতিমুখ বদলে দেয়া দরকার । তাদেরকে বুঝানো উচিত----, এক শ্রেনীর মানুষ নেশা করে বিশ্ব শাসন করছে । আর এক শ্রনীর মানুষ নেশা করে মেথরের চেয়েও নিচে নেমে যাচ্ছে । হে জাতীর তরুনেরা-----, তোমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ----, তোমরা কোন পথে চলতে চাও ?
রাণীমাতা তার মুচকী হাসিকে চেপে ধরে বললো---, তাহলে তুমি কি আমাকে প্রথম Love you--টা নেশা অবস্থায় দিয়েছিলে ! এরপর রাণীমাতা আওযাজ করে পাগলীর মত হাসতে লাগলো । রাণীমাতার এই হাসিকে যদি কখনো কোনো সাধক পুরুষ উসকিয়ে দিতে পারে -----, তাহলে যে অট্রহাসির সৃষ্টি হবে তার প্রভাবে অনেক বিপ্লব এক মোহনায় মিলিত হয়ে এক মহা বিপ্লবের আলপনা আঁকতে থাকবে ।।
[ এই লেখায় আগের লেখার ধারাবাহিকতা রয়েছে । ]