১.
শেষবিকেলের আলো একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে। কত সহজেই না দিন চলে যায়! ভাবতে অবাক লাগে রাকিবের। এইতো সেদিন সে ঢাকা এলো স্বপ্ন পূরণের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে এখন কর্পোরেট অফিসে চাকরি করে। মাঝে মাঝে ফেরার পথে পার্কটাতে বসে। দিনের সমাপ্তি দেখে তারপর বাসায় ফিরে।এমন সময় তার আনমনা ভাবনার ব্যাঘাত ঘটলো। একটা তরুণী এসে বসেছে বেঞ্চটাতে।রাকিব একবার তাকিয়ে দেখলো তাকে। ২৬-২৭ বছর হবে। নীল রঙের শাড়িতে ভালোই মানিয়েছে। অপরিচিতা মেয়েটি বললো
-বিরক্ত হলে বুঝি অনুমতি না নিয়ে বসলাম বলে?
-না, একটু অন্যমনস্ক ছিলাম।
-প্রায়ই এখানে আসেন, তাই না?
-বলতে পারেন। আপনি কি ঘুরতে বেরিয়েছেন?
-অনেকটা তেমনই। তবে আপনার সাথে দেখা করাও একটা উদ্দেশ্য। রাকিব, আমি আপনাকে আমার সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।
রাকিব অবাক হয়ে বললো
-আপনি আমার নাম জানলেন কি করে? কে আপনি? আমি কি কোনোভাবে চিনি আপনাকে?
-এতো প্রশ্ন একেবারে করলে উত্তর দিবো কি করে?
মেয়েটা হাসতে লাগলো। যেন হাসি দিয়েই সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। তারপর বললো
-রাকিব তুমি মনে হয় ভয় পাচ্ছো? আমি নীলা। তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। জীবনসঙ্গীর ক্ষতি কেউ করে?
রাকিব ঘামছে একটু একটু করে। মেয়েটা কি চায়? তার উপর আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছে। কি উল্টা পাল্টা কথা বলছে কে জানে? এখান থেকে চলে যাওয়াই মনে হয় ঠিক হবে। সে উঠে পড়লো।
তখন মেয়েটা একটা কাগজ বের করে বললো
-শোনো রাকিব! এটাতে আমার নাম্বার লিখা। ইচ্ছে হলে ফোন করো। তোমার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা। তাই ভাবলাম দেখা করে আসি।
রাকিব কথা না বাড়িয়ে কাগজ নিয়ে চলে গেলো।
২.
এক সপ্তাহ চলে গেলো। মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছে। রাকিবের মাঝে মাঝেই মেয়েটার কথা মনে হয়। গুরুত্বপুর্ণ একটা ফাইল দেখছে এমন সময় প্রায়ই মেয়েটা কল্পনাজুড়ে চলে আসে। কাজে মন দিতে পারে না। ঘুমাতে যাবে তখনো একই সমস্যা। তাই ঠিক করে ফেলল- কথা বলবে মেয়েটার সাথে। ফোন করতে তো আর সমস্যা নেই! মেয়েটা অদ্ভুত! তারপরও…
-হ্যালো, এটা কি নীলা?
-কে বলছেন?
-আমি রাকিব। নীলার সাথে কি একটু কথা বলতে পারি?
-নীলার বন্ধু বুঝি? অনেকদিন ধরে নীলার সাথে যোগাযোগ নেই, তাই না?
-বন্ধু না ঠিক। কয়েকদিন আগে কথা হয়েছে।
-কি বললে তুমি? কবে কথা হয়েছে?
-গত সপ্তাহে কথা হয়েছে ওর সাথে।
-এটা তো অসম্ভব! নীলা তিন বছর আগেই মারা গেছে।
-আপনি কি নিশ্চিত?
-আমি ওর মা। তুমি ওকে কোথায় দেখেছো?
-নীহারিকা পার্কে। কিন্তু এটা কি করে হতে পারে?
ভদ্রমহিলা বোধ হয় কাঁদছেন। রাকিব কি বলবে বুঝতে পারছে না। একটু সময় নিয়ে তিনি নিজেই সাম্লে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন
-নীলাকে কিভাবে দেখেছো?
-আমি বসে ছিলাম। হঠাৎ করে এসে বসলো আমার পাশে। শাড়িতে খুব সুন্দর লাগছিলো ওকে।
-শাড়ি?
-হ্যাঁ, কেন? ওকি শাড়ি পছন্দ করতো না?
-ওর নীল রঙের শাড়ি খুব পছন্দের ছিলো। যেদিন মারা গেলো সেদিনও নীল শাড়ি পরে ছিলো।
-ও কিভাবে মারা গেলো?
-ডেঙ্গু হয়েছিল। সুস্থও দেখাচ্ছিলো শেষের কয়েকটা দিন।তারপর…
-নীলা কি একটু অদ্ভুত ছিলো?
-না। আমার মেয়ে খুব লক্ষী ছিল। সবসময় তাকে নিয়ে গর্ব করতাম। ডেঙ্গু যখন হল- তখন বলতো ও নাকি জানে কার সাথে ওর বিয়ে হবে! ডাক্তার বলেছিলো- জ্বরের ঘোরে এমন কথা বলে।
রাকিবের আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। এক ধরণের বিষণ্ণতা, কষ্ট ওকে চেপে ধরেছে যেন।
-আচ্ছা আন্টি, আজ রাখি। পরে আবার কথা বলবো।
৩.
কথা শেষ করে রাকিব কাগজের দিকে তাকালো। এ কি! একটা একটা করে ফোন নাম্বারের অঙ্কগুলো মুছে যাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি ফোনের ডায়াল লিস্ট চেক করে। একটু আগে কথা বলা নাম্বারটা নেই। সে নাম্বারটি মুখস্তও করেনি। তার মানে কি আর কখনই কথা বলতে পারবে না এই নাম্বারে? নীলা কি এটাই চেয়েছিল? উত্তর পাওয়ার পরই সব মুছে যাবে?
রাকিবের সামনে পৃথিবীটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে। সে বুঝতে পারে তিনটা বছরের গোলমাল হয়ে গেছে। এমন সুময়ের ভুল হয় কি করে? নীলার সাথেই তার বিয়ে হওয়ার কথা। এই ভুল শোধরানোর উপায় কি?
এমন সময় নীলা হাত রাখলো রাকিবের কাঁধে আর বললো
-কি হলো? ভয় পেলে বুঝি? তুমিও না খুব ভীতু। জানো না আমার একা থাকতে কত কষ্ট হয়? চলো আমার সাথে চলো।
রাকিব যেন হঠাৎ করেই নীলার তীব্র কষ্টটা বুঝতে পারে। তার মনে হয় নীলার সাথে চলে যাওয়াই বোখ হয় ঠিক হবে। এমন মায়াবতী একটা মেয়ে একা একা কেন কষ্ট পাবে?