বয়স বাড়ার সাথে সাথে কি আমরা আমাদের ভিতরের শিশুতোষ আচরণগুলো অতিক্রম করে আসতে পারি? আমাদের সমাজে পরিণত বড় মানুষগুলোর কাজ কর্মগুলো কি কম শিশুতোষ? শিশু যেমন ভালো মন্দ না বুঝেই শুধু মাত্র নিজের আনন্দের জন্য গোয়ারতুমি করে, ঘোর কেটে যেতেই সব ভুলে যায় আমরা কি এই স্তরটা থেকে আমাদের সমগ্র জীবনে আর বের হতে পারি?
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ আগস্ট ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শিশু (সেপ্টেম্বর ২০১৯)

শিশুতোষ
শিশু

সংখ্যা

মেহেদী রবিন

comment ১  favorite ০  import_contacts ৫৩

তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে চায়ের কাপটা ঠিকভাবে টেবিলে রাখতে পারলো না আনিস। পলকে নিচে পড়ে গিয়ে তিন টুকরো হয়ে গেল। কাপের চা ছলকে সারা বাড়ি। অন্য হাতে ধরা দৈনিক পত্রিকা কোন রকমে ভাঁজ করে চেয়ারের উপরে রেখে উঠে দাঁড়ালো সে। চেহাড়ায় স্পষ্ট বিরক্তি। রনিটা সকাল থেকে কিছু খাচ্ছে না। গো ধরে আছে। কাছে গিয়ে কিছু বোঝাতে চাইলে চিৎকার করছে গলা ফাটিয়ে। বিরক্তিতে আনিসের ঠোঁট কুঁচকে আছে। রনি আনিসের একমাত্র ছেলে। সাড়ে ছয় হলো বয়স। এই বয়সের অন্যান্য বাচ্চা কাচ্চারাও এরকম অবুঝ, আবাধ্য হয় কি না আনিস সেটা জানে না। রনির জন্মের আগে আর কোন বাচ্চা কাচ্চাকে নিয়ে ভাবার তার প্রয়োজন হয় নি।
রনির জন্মের পরও ওর যত্ন, খাওনো-পড়ানোর কাজটা রেশমিই সামলেছে বেশীর ভাগ। আনিস শুধু রেশমীকে সাপোর্ট করে গেছে। আনিসের সাথে রনির সবচেয়ে বেশী সময় কেটেছে যখন ওরা দু’জন বাইরে ঘুরতে যেতো তখন। সময় না থাকলেও ছেলের আবদারের কাছে হার মেনে কিছু সময় বের করে প্রায়ই বাপ ছেলে ঘুরতে বের হয়। এ পর্যন্ত সব কিছু খুব একটা খারাপ ছিল না। কিন্তু গোল বাঁধে অন্যখানে। বাইরে বের হলেই কোন না কোন কিছু দেখে রনির গো ধরতে হবে যে তার সেটা চাই। এরপর না দেয়া হলে শুরু হয় তার গোঁয়ার্তুমি। খাওয়া বন্ধ করে দিবে, চিৎকার করে কাঁদবে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিড়ে কুঁচি কুঁচি করবে। গায়ে হাত তুলেও খুব একটা লাভ হবে না। এক পর্যায়ে রেশমি এসে বলবে, “এই বাচ্চা ছেলের উপর হাত তুললেই ভেবেছো সব ঠিক হয়ে যাবে? আর এনে দিতেই বা সমস্যা কোথায়? টাকা পয়সা কম থাকতো তাহলেও একটা ব্যাপার ছিলো”।
আসল সমস্যা যে টাকা পয়াসায় না সেটা আনিস ঠিক বুঝাতে পারে না রেশমিকে। চাওয়া মাত্রই সব কিছু তুলে দিতে হয় না বাচ্চাদের হাতে। প্রয়োজন আর বিলাসীতার পার্থক্য এদেরকে ছোট থেকেই শেখানো উচিৎ। যেমনটা শিখিয়েছিলেন আনিসকে আনিসের বাবা। আনিসের মাঝে মাঝে মনে হয় রনি আর তার মাঝের সম্পর্কটা ঠিক ভাবে আগাচ্ছে না। সম্পর্কটা কেমন দেয়া নেয়ার সম্পর্কে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। রনি আবদার করবে আর তার কাজ সেই আবদার পূরণ করা। বিনিময়ে সে শুধু চাইবে রনি শান্ত থাকুক, রেশমি শান্ত থাকুক। এর বাইরে তার যেন আর কিছু চাওয়ার নেই। আর কোন সম্পর্ক নেই, ভূমিকা নেই। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আনিস।
আজ সকালে বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলো রনি ওর মায়ের সাথে। শপিং এ যাওয়ার সময় মাঝে মাঝেই রেশমি নিয়ে যায় রনিকে। শপিং সেরে আসার পথে একটা ছেলেকে আয়রনম্যানের একটা খেলনা রেপ্লিকা দিয়ে খেলতে দেখার পর থেকে তার মাথায় জেদ চেপেছে আবার। ওরকম একটা রেপ্লিকা তারও লাগবে। এরপর থেকে যথারীতি কার্যকলাপ চলছে। খাওয়া বন্ধ , থেকে থেকে চিৎকার করে কাঁদছে। এই মুহূর্তে ওয়ার্ডরোবের একটা ড্রয়ার খুলে ভিতরের সব কিছু বাহির করছে। ওকে থামানোর জন্য তাড়াহুড়ো করতে গিয়েই চায়ের কাপটা পড়ে ভাংলো।
রনিকে একহাতে ধরে রেখে অন্যহাত দিয়ে বাহির করা কাপড় , কাগজ আবার ড্রয়ারে তুলে রাখলো আনিস। কাজের মেয়েটা এসে কাজ সেরে চলে গেছে অনেক আগে। শপিং করে এসে নিজের রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়েছে রেশমি। মাথা ধরেছে হয়ত। শপিং থেকে ফিরলেই রেশমির মাথা ধরে। এটা পুরানো রোগ। তবুও শপিং এ তারই যেতে হয়। নিজের পছন্দ মত না কিনলে কোন কিছু পড়তে পারে না সে। অন্য একটা মানুষের রুচিকে প্রাধান্য দেয়া তার কাছে তার নিজস্ব স্বাধীনতায় আঘাত করার মত। এসবে আনিস এখন আর কিছু মনে করে না। সে ভাঙা কাপের টুকরো ওঠাতে লাগলো একটা করে। অন্য হাত রনি কামড়ে ধরে আছে। শিশু বুঝি একেই বলে !


রেশমির ঘর অন্ধকার। ঘর অন্ধকার করে ঘুমানোর অভ্যাস তার ছোটবেলা থেকে। বিন্দু মাত্র আলোতেও ওর ঘুম হয় না। সে দিনেই হোক অথবা রাতে। ইদানিং যদিও সে দিনে ঘুমাচ্ছে না। হঠাৎ করেই জীবনে খুব দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যে প্রচুর ভাবনা চিন্তা করা প্রয়োজন। সেটাই আপাততঃ করা হচ্ছে এই সময়টাতে। অন্ধকার ঘর শুধু ঘুম না, গভীর চিন্তা ভাবনা করার জন্যেও বেশ ভালো। গত ক’দিনে এটা সে উপলব্ধি করেছে।
আনিসকে বিয়ে করে আসলে কি সে সুখে আছে?

এই প্রশ্নটার অস্তিত্ব সে অনেক দিন ধরেই তার নিজের ভিতরে টের পাচ্ছে। প্রথম প্রথম এ ধরনের প্রশ্ন নিজের অজান্তেই মনে জাগ্রত হওয়াতে সে নিজের উপরেই রেগে যেত। বিব্রত বোধ করত। কিন্তু যত দিন গেছে, চৈত্রের মাঠের মত শুধু ফাটলই ধরিয়েছে মনে এই একটাই প্রশ্নে। অবশেষে তাকে বাধ্য করেছে প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করার যথেষ্ট প্রয়াস চালাতে। আসলেই কি আনিসের সাথে সে সুখী? আসলেই যদি সে সুখী হত তাহলে এই প্রশ্ন কখনই তার মাথায় আসত কি? পৃথিবীর সব স্ত্রীরই কি এরকম প্রশ্ন মাথায় আসে? আসলেই কি সে ভালো আছে?
অন্য আর দশটা ভালো চাকরি, সচ্ছল জীবন যাপন করা মানুষের চাইতে আনিস আলাদা। ওর ভিতর থেকে ওর ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার সময়কার মিডিওক্রিটিটা যায় নি। যায় তো নি বড়ং শিকড় বাকড় ছাড়িয়ে আরো শক্ত হয়ে গেঁড়ে বসেছে। নিজের গন্ডি ছাড়িয়ে চিন্তাই করে না কিছুই। পুরানো দিনের লোকজনের মত ভাবে, মান্ধাতা নীতিবোধ আর মন ভরা থার্ড ক্লাস যত রোমান্টিসিজম। রনির সাথে পর্যন্ত এখন থেকেই কঠোর আচরণ করছে। ও চায় রনি ওর মত হোক। রেশমি কখনোই সেটা হতে দিবে না। বাবা, পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়, নিজের স্বাধীনতা অনেক স্যাক্রিফাইস করেছে রেশমি। যতই দিন যাচ্ছে আনিসের সংসারকে তার কবর বলে মনে হচ্ছে। এ থেকে মুক্তির প্রয়োজন।
অথচ এই লোকটার জন্যই অন্ধ ছিলো রেশমি একসময়। বাবার বারবার নিষেধ সত্ত্বেও পরিবারের সবার অমতে নিজে থেকে আনিসকে বিয়ে করেছিলো সে। ভেবেছিলো ভারসিটির এত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ভালো কাজ কর্ম শুরু করলেই নিজের ভিতরের এসব সস্তা সেন্টিমেন্ট ওভারকাম করতে পারবে। আর তখন এসবকে বড় কোন সমস্যা বলে মনে হয় নি। কিন্তু এখন তো আর নেয়া যাচ্ছে না। এ থেকে মুক্তি পেতেই হবে।
এই মুহূর্তে তার সাথে চৈতির ফেসবুক চ্যাটিং চলছে। চৈতি রেশমির সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। রেশমির জীবনের সব রকম সময়ে চৈতি রেশমির পাশে ছিলো। আনিসের এই সমস্যা নিয়ে অনেক দিন ধরেই রেশমি কথা বলছে চৈতির সাথে। চৈতি বেশ স্বাধীনচেতা স্বভাবের মেয়ে। সব ক্ষেত্রেই ও বেশ কাজে আসে। প্রথম থেকেই রেশমিকেই দোষারোপ করেছে আনিস এর অতীত জেনেও ওকে বিয়ে করার জন্যে। এখনো করে
“আমি আগেই বলেছিলাম একদিন পস্তাবি। আমাকে তো পাত্তাই দিস নি উলটা কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলি আমার সাথে।”
“দ্যাখ, পুরানো কথা তুলবি না। আমি বাবাকেও সেদিন মানিনি। কি করব বুঝে উঠতে পারছি না বলেই তোকে বলেছি সব।”
“কি করতে চাস?”
“এইটা আমি আর কন্টিনিউ করতে পারছি না। সব কিছু মেনে চলা যায়। ছোটলোকি মেনে নেয়া যায় না”
“তাহলে বল আনিস ভাইকে সব খুলে। ঠান্ডা মাথায় তাকে বল”
“বাবাকে কি বলবো বলতে পারিস?”
“আংকেল যথেষ্ট আধুনিক মানুষ। সব শুনলে উনি বরং খুশিই হবে। উনি সাহায্য করবে তোকে সব সামলে নিতে”
“হু”
“হু কি?”
“জানাবো। গেলাম”
শোয়া থেকে উঠে বসলো রেশমি। যা হবার সব আজই হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। ঘরের জানালা দরজা খুলে দিলো ও। জামা কাপড় বদলে একটা দীর্ঘ শাওয়ার নেবার জন্য প্রস্তুত হলো। দীর্ঘ শাওয়ারের ভিতর মেডিটেশানের মত ব্যাপার আছে। মনের স্ট্রেস দূর করে মনকে শান্ত করে। আজ মন শান্ত রাখা প্রয়োজন।


আনিস আর রনি গাড়িতে বসে আছে। আনিস গাড়ি চালাচ্ছে। রনি পাশের সিটে বসা। রনির হাতে আয়রন ম্যানের বেশ বড় সড় খেলনা রেপ্লিকা রোবট। কেনার পর থেকেই সে সেটাকে উড়ানোর চেষ্টা করছে। রবোটটির গায়ে বেশ কয়েকটি সুইচ। সে একটার পর একটা সুইচ চাপছে। কোনটা চাপলে রোবটটি বলছে “I am Ironman”, কোনটা চাপলে চোখ থেকে কৃত্রিম লেজার লাইট জ্বলছে। কিন্তু কোনভাবেই সেটাকে ওড়ানো যাচ্ছে না। চোখে প্রশ্ন নিয়ে সে তার বাবাকে জিজ্ঞাস করে,
“বাবা এটা ওড়ে না?”
“না বাবা।”
“তাহলে তো এটা আমার রোবোকপটার মত।”
“হ্যা বাবা, এগুলো তো খেলনা। সব খেলনাই এক।
“ওহ”
এ পর্যায়ে রনির আগ্রহ কমে আসে। আরো কিছুক্ষণ রোবটটাকে ওড়ানোর চেষ্টা করে শেষে বিরক্ত হয়ে রেখে দেয় সে। আনিস এর দিকে তাকিয়ে বলে,
“বাবা ক্ষুধা লেগেছে। পাস্তা খাবো।“

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement