প্রেমিকার বিয়ের খবর শুনে মাথায় আসে চরম প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা। সেই প্রতিশোধের আমন্ত্রণ কি মেটাতে পারবে ভাঙা মনের পিপাসা?ভালবাসার মানুষ যখন আশাহত করে তখন ভেঙ্গে যায় হৃদয়। সেই ভাঙা হৃদয়ের টানাপোড়েন নিয়েই এ গল্প।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৮
গল্প/কবিতা: ৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভাঙ্গা মন (নভেম্বর ২০১৯)

আমন্ত্রণ
ভাঙ্গা মন

সংখ্যা

কাজী প্রিয়াংকা সিলমী

comment ১  favorite ০  import_contacts ২৭
সামনের গাড়িটা থেমে যাওয়ার সাথে সাথে আমি প্রচন্ড জোরে হার্ডব্রেক করলাম। ক্যাচ করে শব্দ হয়ে গাড়িটা থেমে গেল। পাশের সারিতে রিকশায় বসা মেয়েটা পিছনে একবার তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে তার সঙ্গীকে কিছু বলল। হয়তো আমার সম্বন্ধেই বলছেঃ ‘ বড়লোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে—গাড়িতে উঠলেই হাই স্পিড উঠায় ফেলে! এসের জন্যই তো এক্সিডেন্টগুলো হয়!’ শালা! এই চেহারাটাও যা! এখনও মানুষজন আমাকে পোলাপাইন ভাবে,জিজ্ঞাসা করে, ‘কিসে যেন পড়?’ ছাত্রজীবন কোন আমলে শেষ করার পরও ছাত্র টাইটেল থেকে মুক্তি নাই!

মেয়েটা আবার পেছনে তাকায়- আমার চোখে চোখ পড়তেই ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়। মেয়েটার সাথে যে আছে সে কে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। প্রথমে ভেবে নিয়েছিলাম বয়ফ্রেন্ড হয়তো বা। কিন্তু মেয়েটা যে হারে আমার দিকে তাকাচ্ছে মনে হয় না পাশে বসে থাকা মানুষটি ওর বয়ফ্রেন্ড। বয়ফ্রেন্ড পাশে বসে থাকলে অন্য ছেলের দিকে এর ঘন ঘন তাকানোর কথা না। হয়তো ভাই-টাই হবে বা শুধুই বন্ধু হয়তো বা। আমাদের অভ্যাসই আসলে খারাপ হয়ে গিয়েছে- পাশাপাশি সমবয়সী একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে দেখলে প্রথমেই মনে করি এরা বোধহয় কপোত-কপোতী। আজব! দুনিয়ায় কি শালার প্রেম ছাড়া অন্য কোন কারণে ছেলে-মেয়ে একসাথে কিছু করতে পারে না?

মিতুর মধ্যে এই সন্দেহটা প্রবল ছিল। আমাকে কোন মেয়ের সাথে একটু হেসে কথা বলতে দেখলেই ওর গা জ্বলে যেত। কি সব ঝামেলা যে করত! ভার্সিটিতে থাকতে পার্ট-টাইম চাকরি করতাম, সেখানকার এক সহকর্মী নীলাআপা আমার বাসার পাশের গলিতে থাকত। ওনার সাথে এক রিকশায় আসলে নিয়মিত টাকা বাঁচত। কিন্তু মিতুর সে এক কথা—ও ছাড়া আর কোন মেয়ের সাথে এক রিকশায় চড়া যাবে না।
‘আরে কি মুশকিল! তুমি অন্য ছেলেদের সাথে রিকশায় উঠ না! আমি কি মানা করসি নাকি?’ আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম।

মিতু কিছু বলত না, গাছের মতন চুপ করে থাকত।মেয়েদের এই সমস্যা—যখন কথা বলা দরকার তখন মুখ বন্ধ করে থাকে, আর যখন কথা বলার দরকার নেই, তখন বিরামহীন কথা বলেই যায়।
এই যেমন সামনের রিকশার মেয়েটা বকবক করেই যাচ্ছে। মেয়েটার চেহারা একপাশ থেকে দেখতে ভালই লাগছে- যখন হাসছে, তখন আবার গালে টোল পড়ছে। মিতুর খুব দুঃখ ছিল যে ওর গালে টোল পড়ে না। আমার গালের টোলটা মিতুর খুব পছন্দ ছিল। অথচ মিতুর সাথে পরিচয় হবার আগে আমি কোন্দিন খেয়ালই করিনি যে আমার গালে টোল পড়ে। মিতু প্রায়ই উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠত, ‘তোমার টোলটা এত্ত সুইট! প্রীতি জিন্তার মতন! এক গালে টোল পড়ে!’

আমি একটু সন্দিহান হয়ে চোখ সরু করতাম। মিতু কি আমার প্রশংসা করছে নাকি অপমান? একটা হিন্দি সিনেমার নায়িকার সাথে একটা চব্বিশ বছরের তরুণের চেহারায় মিল থাকা কি অদৌ সম্মানজনক? নায়ক হলে তাও না হয় একটা কথা ছিল। তবে মিতু আমার দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে বলেই চলত, ‘আল্লাহ, আমাদের বাচ্চাগুলোর যেন টোল পড়ে। ছেলেটার না পড়লে না পড়ুক, মেয়েটার যেন অবশ্যই পড়ে!’
কে জানে মিতুর যে ভদ্রলোকের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তার গালে টোল পড়ে কীনা! যদি না পড়ে, তাহলে কি ওর মেয়ের গালেও টোল পড়বে না? আচ্ছা, টোল ব্যাপারটা কি জেনেটিক নাকি?

মিতুর বিয়ের খবরটা জানতে পেরে যে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম, তা না। বন্ধুরা এতদিন লিক্যে রেখেছিল, কাল মনে হয় অনেক শলাপরামর্শ করে আমাকে ব্যাপারটা বলেছে। হয়তো বা ভেবেছে যে আমি যখন ব্যাপারটা জানবই, তখন ওদের কাছে থেকে জানতে পারলেই ভাল। অবশ্য নাও হতে পারে। এমন না যে ওদের সাথে রোজ কথা বা দেখা হয় যে খবরটা কসরত করে লুকাতে হবে। সবাই ব্যাস্ত- নিজের চাকরী, ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে, আর যাদের বউ-বাচ্চা আছে তারা তো যেন ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা!

তবে এত ব্যাস্ততার মধ্যেও ওরা সবাই এক হয়ে এত সুন্দর করে মিতুর বিয়ের সংবাদটা দেয়াতে নিজেকে খুব বিশিষ্ট মনে হল। যা সুন্দর করে জীবনে এগিয়ে যাবার পরমর্শ দিয়ে আলোচনাটা শেষ করল যে আমি মূগ্ধ হয়ে গেলাম। পুরা জিনিসটা বোধহয় আবিরের সাজানো- ব্যাটা কোন চ্যানেলে জানি স্ক্রিপ্ট না কিসব লেখে। অন্যদের চাইতে ওর দায়টাও যেন বেশি- আমার আর মিতুর প্রেমের ঘটকগিরি ওই করেছিল কীনা! শালার বেহেশ্ত যাওয়া হল না। বিয়ের ঘটকগিরি করলে নাকি জান্নাত নাজিল এর কি সব নিয়ম আছে একটা। প্রেমের ঘটকগিরি করলে কোন লাভ নাই।

বেহেশত না যেতে পারার চিন্তার চাইতে আমাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত মনে হচ্ছিল আবিরকে। আমার কোন সাড়া না পেয়ে ও আবার বলল, ‘ তুই কি শুনেছিস কি বললাম?’

আমি খুব নাটকীয় ভঙ্গীতে আনমনা ভাবে তাকিয়ে বললাম, ‘কি?’

সবাই চুপ হয়ে গেল। রেস্টুরেন্টে আর কোন মানুষ না থাকলে আবহাওয়াটাকে বলা যেত ‘পিনপতন নীরবতা’।

কিছুক্ষণ পর অনীক উশখুশ করে বলল, ‘এগুলো নিয়ে মন খারাপ করিস না, দোস্ত! জীবনটা অনেক বড়, এইসব ব্যাপার অনেক ছোট।‘

আমি তৎক্ষনাত উত্তর দিলাম, ‘আচ্ছা!’ তারপর তুড়ি বাজিয়ে ওয়েটারকে ডেকে নির্বিকারভাবে বিল দিতে বললাম।

পুরো ঘটনাটা যতবারই চিন্তা করি, ততবারই হাসি পায়। বন্ধুরা নিশ্চিত ভেবেছে যে আমি অধিক শোকে পাথর হয়ে গিয়েছি। অথচ মজার ব্যাপার হল আমার কোন দুঃখ-টুঃখ লাগছে না। প্রথমে শুনে কোন অনুভূতি হয়নি। রাতে বাসায় এসে বিছানায় শুয়ে একা একা যখন চিন্তা করলাম, তখন কেন যেন মিতুর উপর প্রচন্ড রাগ উঠতে লাগল। আশ্চর্য! মাত্র তিন মাসের মাথায়ই মেয়েটা আমাকে ভুলে গেল? সুন্দর নাচতে নাচতে বিয়ে করতে যাচ্ছে? অথচ আগে কি নিষ্পাপ চেহারা বানিয়ে বলত, ‘তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না!’


মিতুর অবশ্য সব-সময়ই এরকম সিনেমার করার স্বভাব ছিল।সেদিন যখন আমি ওকে বলমান, ‘তোমার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ,’ তখনো কিরকম কেঁদেছিল। তারপর প্রতিদিন ফোন করত, ক্ষণে ক্ষণে মুঠোবার্তা—আমি সাড়া দিতাম না। তবে মেয়েটার ধৈর্য দেখে অবাক হতাম। তারপর ধীরে ধিটে ফোনের সংখ্যা কমতে লাগল। যেদিন দেখলাম মিসডকলের লিস্টে মিতুর একটা কলও নেই, সেদিন বোধহয় একটু দুঃখও লেগেছিল। আবার একটু সুখও পেয়েছিলাম হয়তো- ভেবে নিয়েছিলাম যে মিতু অভিমানে আর ফোন করছে না। ভেবে নিয়েছিলাম মিতু কষ্ট পাচ্ছে- যেমন ভয়ংকর কষ্ট আমি ওকে দিতে চেয়েছিলাম ঠিক তেমন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মিতু মনে হয় না অত কষ্ট পেয়েছে। নয়তো তিন মাসের মাথায় কেউ সোজা গিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসে?

‘স্যার! শুনেন!’ ডাকটা শুনে আমি চমকে উঠলাম।

কতক্ষণ হল জ্যামে আটকে আছি?
সিগ্নাল তো এতক্ষণ হওইয়ার কথা না। কোন দেশের কোন প্রধনমন্ত্রি না রাষ্টপতি কে জানি এসেছে- সে জন্যই গাড়িগুলো সব আটকে রেখেছে মনে হয়। আমার অবশ্য কোন তাড়া নেই। যতটুকু বেশি সময় জ্যামে আটকে থাকব, ততটুকু সময় আমার জীবনের আয়ুর সাথে যোগ হবে। সিগ্নালটা পেরুলেই তো সোজা রাস্তা, তারপর হাইওয়েতে উঠলে ফুলস্পিড। ব্রিজের কোন জায়গা দিয়ে গাড়ি নিয়ে নদীতে পড়ব তাও ঠিক করা আছে। তারপর মৃত্যু-‘দি এন্ড’, ভরা বর্ষায় নদীতে অমন গতিবাহী গাড়ি নিয়ে পড়লে সাঁতার না জানা আমার বেঁচে যাওয়ার ক্কোন সম্ভাবনা নেই।

মিতুর বিবাহবার্ষিকীগুলো হয়ে যাবে আমার মৃত্যুবার্ষিকী। যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন অন্তত ওর বিবাহবার্ষিকীর দিনগুলোতে আমার কথা মনে পড়বে ওর, দুঃখ পাবে, জাগবে অপরাধবোধ। একজন মানুষকে এর চেয়ে ভয়ংকর, সুন্দর ভাবে সারা জীবনভর কষ্ট দেয়া সম্ভব না।

আমার বাবা-মা নাই- আমি মারা গেলে কারো কিছু যায় আসবে না। বরং যখন অল্পকিছু সম্পত্তির উইল করছিলাম, তখন মনে হল আমার মৃত্যুতে কিছু মানুষের লাভই হবে। শেষবার বড়ভাই আর বন্ধুদের সাথে কথা বলে নেয়ার আগে ভেবেছিলাম হয়তোবা দূর্বল হয়ে যাব, কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি। বড় হয়ে গেলে বোধ হয় আর শৈশব-তারণ্যের গভীর সম্পর্কগুলোর কোন অর্থ থাকে না। সবাই ব্যাস্ত হয়ে যায় নিজের ব্যাক্তিগত লক্ষ্য, স্বপ্নগুলো পূরণ করতে। আর যাদের সেসব থাকে না, তারা জীবন নিয়ে খেলা করে, প্রতিশোধ নেয়।

গাড়ির জানালাতে আবার ঠকঠক শব্দ। ‘স্যার, আমারে চিনেন নাই? আমি শোভন। আপনারে দাওয়াত দিয়ে আইছি!’

ছেলেটা দেখি এখনো যায়নি। আমি চমকে উঠলাম- দাওয়াত? কিসের দাওয়াত?

ছেলেটা যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরে দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘কালকে থাইকা অই সিগ্নালের মোড়ে একটা দোকান দিতাছি, স্যার! আপ্নাকে কিন্তু আইতেই হইব!’

ছেলেটার কন্ঠে অধিকারের ছাপ। আমি পুলকিত বোধ করলাম। ভাল করে তাকালাম ছেলেটার দিকে- কত বয়স হবে এর? ষোল-সতের, হয়তো বা! ভাল করে আবার তাকালাম। আরে! একে তো আমি চিনি! গত চার-পাঁচ বছর ধরে এর নিয়মিত ক্রেতা আমি । প্রথমে লজেন্স-ফুল, তারপর পত্রিকা- কতকিছুই না কিনেছি। একদম শুরুতে ছেলেটা ভিক্ষা করত, তখন আবার আমি ওকে টাকা দিতাম না। রাস্তাঘাটে কোন ভিক্ষুককেই আমি কখনও ভিক্ষা দেই না। ভিক্ষা না নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি দূর করার উদ্যোগ ছিল এক সময়।

তখন এই ছেলেটাকে ভিক্ষা না করে কাজ করার কথা বলে কি এক ছোটখাট ভাষণও দিয়েছিলাম। তারপর কিছুদিন পর থেকে দেখি পিচ্চি ভিক্ষা না করে লজেন্স,ফুল এগুলো বিক্রি করে। ঘটনাটা আমি খুব খুশি হয়ে বন্ধুমহলে গর্ব করে বলেছিলাম। কি সে আনন্দ- অন্তত একজন ভিক্ষুককে হলেও তো আমি অন্য পথে উৎসাহিত করতে পেরেছি! তখন কত স্বপ্নই না ছিল! চাকরি করে টাকা হলে এসব ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করার প্রকল্প নিব- দেশের চেহারা পালটে দেব। হায়! খুব কি আগের কথা? কিন্তু সব যেন স্মৃতির পাতা থেকে বেমালুম হারিয়ে গিয়েছে।

পেছনে হর্ণের কর্কশ হর্ণের শব্দে খেয়াল করলাম যে সিগ্নাল ছেড়ে দিয়েছে।

‘স্যার! আইসেন কিন্তু! কালকে না পারলে পরশু আইসেন! কবেথেকে আপনারে খুঁজতাছি দাওয়াত দেওনের জন্য!’ ছেলেটা হাসিমুখে গলা চড়িয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাস্তা থেকে সরে গেল।

সিগনাল পেরিয়ে সোজা হাইওয়ের পথে না গিয়ে আমি গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম। হঠাৎ করে মনে পড়ে গিয়েছে যে আমারও কিছু পুরাতন স্বপ্ন ছিল, প্রতিশোধের আনন্দের চাইতে সেগুলো নিয়ে কাজ করাটা বেশি তৃপ্তির হওয়ার কথা। তাছাড়া আগামীকালের যে আমন্ত্রণ পেলাম একটা- সেখানেও তো যেতে হবে, তাই না!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement