শিশুদের যৌন নির্যাতনের ব্যাপারটি উঠে এসেছে এ গল্পে
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৮
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯৬

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শিশু (সেপ্টেম্বর ২০১৯)

সকল শিশুর জন্য
শিশু

সংখ্যা

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯৬

কাজী প্রিয়াংকা সিলমী

comment ১৮  favorite ১  import_contacts ৪৬৩
দিনের এই সময়টা কেজো মানুষেরা ক্লান্ত হয়ে যায়। আমার সে সমস্যা নেই- এ সময়টা আমার সবচেয়ে পছন্দ। চারিদিকে বেশ শান্তি শান্তি ভাব। দুপুরের খাবার পর আম্মা বিছানায় শুয়ে ভাতঘুম দিচ্ছেন, আপার অফিস থেকে ফেরত আসতে এখনও অনেক দেরী। টিউটর আসার আগে ফারাহ তার হোমওয়ার্ক দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে -- প্রতিদিন বকা খাওয়ার পরও মেয়েটা সময়ের পড়া সময়ে করে রাখে না। মাত্র দশ বছর বয়সেই সে মহা ফাঁকিবাজ হয়ে গেছে, পড়াশুনায় মন নেই। জমিলাবুয়াও নিজ মনে নিঃশব্দে রাতের খাবারের কাটাকুটো সেরে রাখছে।
শব্দের মধ্যে আছে এসির জন্য বন্ধ জানালা ছাপিয়ে আসা ফেরিওয়ালার আবছা ডাক। আর আছে বসার ঘরে কার্পেটে বসা ছোট্ট ফারহানের গেম খেলার চিরিক চিরিক শব্দ। এ সময়টা ফারহানের ঘুমানোর কথা। কিন্তু আপা না থাকলে সে নিয়ম নিয়ে কেউ জবরদস্তি করে না। তাই সোম থেকে শুক্র ফারহান দুপুরবেলা গেম খেলে আর খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে গেলে টিভিতে কার্টুন দেখে। কার্টুন দেখতে দেখতে এক সময় সে সোফায় ঘুমিয়ে পড়ে, জমিলা বুয়া তখন তাকে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দেয়। আপা অফিস থেকে এসে দেখে চাঁদের কণা ছেলেটা গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছে।
প্রথমদিন যখন দেখেছিলাম আপার নিয়ম সত্ত্বেও ফারহান ঘুমাচ্ছে না, ভেবেছিলাম সেটা নিয়ে কিছু করব, আপাকে বলব। তারপর ভেবে দেখলাম, আমি এমনিতেই অতিথি মানুষ, এ বাড়ির রীতি রেওয়াজে যে ভারসাম্য আছে, সেটা টালমাটাল করা আমার ঠিক হবে না। তাই আর কিছু বলিনি।
এক সপ্তাহ হল এখানে আছি। এ বাড়িতে চলে আসা নিয়ে এখনও কেউ আমাকে সরাসরি কিছু বলেনি। মেয়ে মায়ের বাড়িতে আসতেই পারে। কিন্তু কিছু আভাস পাচ্ছি যে কিছুদিন পরেই কথা শুরু হবে। সেদিন কথায় কথায় রাঙ্গাদাদা বলছিলেন, ‘মেয়েরা বেশিদিন স্বামী থেকে আলাদা থাকলে অমঙ্গল হয়। বিয়ের পর মেয়েদের আসল বাড়ি তাদের স্বামীর বাড়ি।’ রাঙ্গাদাদাকে এমনিতেই অপছন্দ করি বলে হয়তো কথাটা কানে লেগেছিল। মনে হয়েছিল, ‘আরে! আমি আমার মায়ের বাড়িতে থাকি না মামার বাড়িতে থাকি না আশ্রমে থাকি, তাতে কার কি?’
কিন্তু এ নিয়ে তো আর মুখরা হওয়া যাবে না। এ বাড়ির কেউ রাঙ্গা দাদার সাথে কখনও তর্ক করে না। প্রচন্ড জ্বরে হোমোপ্যাথি অষুধ খাওয়ার আদেশ থেকে শুরু করে বাচ্চাদের ভাল স্কুল ছেড়ে ওনার পরিচিত লোকের মাদ্রাসায় ভর্তির সিদ্ধান্ত - ওনার কথাই শেষ কথা। ওনার সিদ্ধান্তেই অনার্স ফাইনালের আগের দিন আমার বিয়ের কাবিন করা হল। এখনও ফার্স্টক্লাস না পাওয়ার দুঃখ ভুলতে পারিনি।
নিজের দাদাকে কখনও চোখে দেখিনি, বাবাও মারা গেছেন শৈশবে। তাই মাঝে মাঝে দাদার এই ভাইকে শ্রদ্ধা করার চেষ্টা করি। কিন্তু আসে না। একবার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন তিনি এই লোকের এসব অযাচিত শাসন সহ্য করেন। মা একটা কথাই বলেছিলেন, ‘মা রে, এই সমাজে পুরুষ একজন অভিভাবক না থাকলে চলা মুশকিল। বিপদে-আপদে আর কোন ভাবে না হোক উনি আমাদের না চাইতেই অনেক আর্থিক সহায়তা করেছেন।’
মায়ের কথায় গা ঘিনঘিন করে ওঠে। টাকার বিনিময়েই উনি আমাদের কিনে নিয়েছেন তাহলে। আত্মীয়-স্বজন প্রায়ই কানাঘুষা করে, শেষ কালে সব সম্পত্তি আমাদেরকেই হয়তো লিখে দেবেন- ওনার কোন নিজের শরীক নেই বলে। দুষ্টুলোকে বলে যে সেই সম্পত্তির লোভেই আমাদের বাড়িতে ওনার এত আদর-আপ্যায়ন করা হয়। কে জানে সে কানাঘুষা হয়তো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয়।
এবার এ বাড়িতে এসে ভেবেছিলাম যে এখন আপা চাকরী করে, দুলাভাই আবুধাবি থেকে মাসে মাসে টাকা পাঠায়, এখন হয়তো আর রাঙ্গাদাদার অত আধিপত্য নেই। কিন্তু ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। অবস্থা ফিরলেও এ বাড়ির সবাই ধান ভানছে। প্রায় প্রতিদিনই দাদার এ বাসায় আসা-যাওয়া। উনি আসার সময় হয়তো দামী আঙুর বা বাহারী মিষ্টি নিয়ে আসেন। তাতেই বাড়ির ছোট-বড় সকলে তাকে নিয়ে লাফালাফি করে। তার জন্য নিয়ম করে বিকেলে ঝাল নাশতা বানানো হয়। বাচ্চারা সেমাই খেতে চাইলে কি হবে, রাঙ্গাদাদা তো ডায়বেটিসের জন্য তা খেতে পারবেন না!
নাহ, কেউ কিছু না বললেও এ বাড়ি থেকে জলদি বিদায় নিতে হবে। ঢাকায় কিছু চাকরীতে এপ্লাই করেছি। কোন একটাতে যদি টিকেট লেগে যায় তাহলেই বিদায়। রাঙ্গাদাদা যতদিন আছেন, ততদিন আর এ বাড়িমুখো হব না। তবে ভাগ্না-ভাগ্নি দুটোকে না দেখে থাকতে কষ্ট হবে। ফারাহটা মাত্র দশ বছর বয়সেই কেমন বড় হয়ে গেছে। দুবছর পর এবার এসে ওর সাথে তেমন জমে নি কেন জানি। কাছে আসতে চায় না, একা একা মুখ গম্ভীর করে থাকে, যেন দুনিয়ার শত বোঝা ওর ঘাড়ে। আজকাল বাচ্চাদের পড়াশুনার এত চাপ, ওদেরকে আসলে খুব একটা দোষও দেয়া যায় না। প্রতিদিনের টিউটর, হুজুরের পড়া, স্কুল- সব মিলিয়ে ওদের শৈশব যেন ছিনতাই হয়ে গেছে।
ফারহানটা ভারী মিষ্টি হয়েছে। ওর ভুবন-ভুলানো হাসিটা দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়। তাই, ও যখন দুপুরে গেম খেলে বা কার্টুন দেখে, তখন আমি বসার ঘরে বসে থাকি। তবে একটা ব্যাপারে একটু অস্বস্তি হচ্ছে। ফারহান দেখি প্রায়ই আনমনে তার পুরুষাঙ্গ নিয়ে খেলা করে, যদিও চার বছরের শিশুর গোপন অঙ্গকে ‘পুরুষ’ শব্দটার সাথে জুড়ে দেয়াটা ঠিক কিনা জানি না। একবার ভেবেছিলাম আপাকে বলব, কিন্তু আপা যা বদমেজাজী এতে ফারহান খামোখাই বকা খাবে। গুগল করে দেখেছি যে ১৮ মাস বয়স থেকেই নাকি কিছু শিশু নিজেকে ছোঁয়, এটা নাকি স্বাভাবিক। কিন্তু মন সায় দেয় নি। ক’দিন পরই ফারহানকে স্কুলে দেবে, সেখানে ও এই কাজ করলে খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।

তাই, একটু ইতস্তত করে আজ বলেই ফেললাম, ‘ফারহান... ওভাবে প্যান্টের ভেতর হাত দেয় না, আব্বু।’
ফারহান প্রথমে এ কথা শুনে হাত বের করল, তারপর আবার কিছুক্ষণ পর সেই একই জায়গায় হাত। ‘আব্বু, হাত বের করো! এভাবে সবার সামনে প্যান্টে হাত দিতে হয় না।’ আমি আবার বলি।
‘কিন্তু, আপু যে আমার প্যান্টে হাত দেয়…’ ফারহান বলে ওঠে।
আমি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারি না। ‘আপু...মানে ফারাহ, মানে তোমার বোন তোমার প্যান্টে হাত দেয়?’
‘হ্যা, আপু বলেছে এটা একটা খেলা। রাঙ্গাআব্বাও খেলে আপুর সাথে। এটা বড়দের খেলা, রাঙ্গাব্বা বলেছে কাউকে না বলতে…’
আমার কানে যেন কেউ গরম এসিড ঢেলে দিয়েছে, প্রচন্ড জ্বালা করছে। মনে হচ্ছে এখনই রান্নাঘরের বটিটা নিয়ে পাশের বাড়িতে যাই, রাঙ্গাদাদাকে টুকরো টুকরো করে ফেলি। নিজেকে ঠান্ডা করতে মেডিটেশনের ক্লাসে শেখা বড় বড় দুটো শ্বাস নিলাম। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানি দিলাম।
তারপর মায়ের ঘরে গিয়ে মাকে ডেকে তুললাম ঝাঁকি দিয়ে। ‘তুমি জানো রাঙ্গা দাদা যে ফারাহ আর ফারহানকে...ওদের প্যান্টে হাত দেয়?’

মাকে খুব একটা বিচলিত মনে হল না। ‘ও, ওদেরকেও করে? ওনাকে আর ওদের সাথে একা রাখা যাবে না।’
‘ওদেরকেও করে মানে?? আর কাকে করেছে? কি বলছ তুমি, মা!’ আমি চিৎকার করে বলি। মার এই নির্বিকার প্রতিক্রিয়া আমার সহ্য হয় না।
‘আরে এগুলো ওনার বুড়ো বয়সের ভিমরতি। সোমত্ত্ব মেয়েদের গায়ে উনি হাত দেন না। কিন্তু বাচ্চাদেরকে ধরেন। একটু সাবধান থাকলেই হয়।’ মা ধীরে ধীরে বলেন।
‘মা, তুমি জানো পিডোফাইল কাকে বলে? এরা শিশুদের যা করে এটা এক ধরণের রেপ, যৌন নির্যাতন- বাচ্চারা তো বড় মানুষের মতন এসব কাজে সম্মতি দিতে পারে না।’ আমি চিৎকার করে বলি।
‘আরে! বাচ্চারা এগুলা ভুলে যায়। একটু সাবধান থাকলেই হয়। আমি ফারাহ-ফারহানকে বারণ করে দেব যেন একা একা ওনার বাসায় না যায়। ওরাও যা বিচ্ছু, ঠিক বড় টিভি দেখার লোভে ঐ বাসায় চলে যায়।’
হঠাৎ আমার কানে জোরে হিন্দি গান বাজতে থাকে, ‘ওলে ওলে ওলে, ওলে ওলে ওলে’। টিভি দেখতে তো আমিও ভালবাসতাম। আমি দুকান চেপে বলি, ‘থামাও! বন্ধ করো গান!’ হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই দুঃসহ স্মৃতি- রক্ত! রক্ত! আর টিভিতে বাজছে সেই হিন্দি গান।
‘মা, উনি কি...উনি কি আমাকেও? তুমি জানতে?’
মা মাথা নীচু করে থাকেন।
আমি এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে পড়ি। ‘আমি ঐ শয়তানকে পুলিশে দেব।’
মা, পেছন থেকে আমাকে জাপটে ধরেন। ‘শান্ত হও, মা। শান্ত হও।’
আমি ধাক্কা দিয়ে মা’কে সরিয়ে দেই। ‘মা, তোমার লজ্জা করে না?’
মা আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে বলেন, ‘উনি বুড়ো মানুষ। এই বুড়ো বয়সে জেলে দিবি? আর ক’দিন পর তো এমনিই মরে যাবে। তারপর আল্লাহতায়ালাই ওনার সাজা দিবেন। এখন আর মামলা-পুলিশ করে ফ্যামিলির মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করিস না।’
‘বাহ! উনি সাজা না পেয়েই মরে যাবেন! আর আমি যে ওনার অকাজের জন্য সারাজীবন সাজা পেয়ে যাচ্ছি। তুমি জানো আমি তোমার জামাইয়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে পারি না? সে আমার কাছে আসলেই আমি আতংকে চিৎকার করে উঠি? ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করি? তুমি জানো রাতে আমার এখনও ঘুম হয় না! তুমি জানো ছোটবেলায় আমার প্রচন্ড মন খারাপ থাকত সব সময়, মনে হত মরে যাই? এই সাজা আমি কেন পাচ্ছি, মা? কেন?’
‘তোর তো এ ঘটনা মনেই ছিল না। ফারাহ-ফারহানও ভুলে যাবে…’ মা কিছুতেই আমার দুঃখটা বুঝতে পারেন না।
‘আমার মন হয়তো ঐ ট্রমাটাকে ব্লক করে রেখেছিল, কিন্তু সারাজীবন আমি এর ফলাফল ভোগ করেছি। আমার অবচেতন মন, শরীর তো এক মূহুর্তের জন্যও ভোলেনি!’

‘এত বছর পর এগুলো করে কি লাভ?’
‘এই লোকের শয়তানি বন্ধ করার এটাই উপায়। উনি যতদিন সাজা না পেয়ে বেঁচে থাকবেন, ততদিন আরও কত শিশুকে যৌন নির্যাতন করবেন ভাবতে পারো? নির্যাতন বন্ধ করার একটাই উপায়, তা হল অপরাধীর বিচার করা। যাতে অন্য মানুষও এ কাজ করার সাহস না পায়’।
‘আয়েশা, দেখ, এমন প্রতিশোধ নিয়ে কখনও লাভ হয় না। জানাজানি হলে তোর শ্বশুরবাড়ির লোক কি বলবে? বা ধর ফারহান-ফারাহরও তো ভবিষ্যতে মুখ দেখাতে হবে...’
‘এটা প্রতিশোধ না, ন্যায়বিচার…তুমি শিশু আয়েশার জন্য যা করো নি, আমি তা করবো। ফারহান-ফারাহর জানা দরকার যে যারা এমন করে তাদের সাজা হয়। নয়তো ওদের মনে যে কোন আশা থাকবে না, মা। এ পৃথিবীটাকেই ওরা আর বিশ্বাস করতে পারবে না’।
ছোটবেলা থেকে আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে কখনও কিছু করতে পারিনি। কিন্তু, আজ আমি মায়ের কথা অমান্য করে স্থিরচিত্তে এগিয়ে যাই।
শিশু আমার জন্য
শিশু ফারহানের জন্য
শিশু ফারাহর জন্য
শিশু ফারিয়ার জন্য
শিশু সায়মার জন্য
সকল শিশুর জন্য…
শিশুর নিরাপত্তা কখনই সামাজিক মান-সম্মানের উপরে নয়।

বিঃদ্রঃ
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে হেল্পলাইন(বাংলাদেশ)-১০৯

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement