এই মাসের গল্পের বিষয় ছিল "মা"। আমার গল্পটিও একজন মাকে নিয়ে। এমন একজন মাকে নিয়ে যিনি প্রথাগত চিন্তাধারার বাইরে এসে সন্তানকে বড় অফিসার বানানোর চেয়ে তাকে একজন খাঁটি মানুষ বানানোতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। একজন দরিদ্র মা হয়েও তার একমাত্র সন্তানের নিরাপত্তার চেয়ে সন্তানের মাথা যেন সবসময় উঁচু থাকে সেটাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। তাই আমি মনে করি আমার গল্পটি এই মাসের যে বিষয় "মা" তার সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৮৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মা (মে ২০১৯)

মেরুদণ্ড
মা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬৫

রিফাত হাসান

comment ৬  favorite ০  import_contacts ২৩৭
ফরিদা খালার সাথে যেদিন আমার প্রথম দেখা হয় সেদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তখন কেবল ভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি। হলে উঠেছি অল্প দিন হল। সারাদিন টো টো করে সারা শহরে ঘুরে বেড়ানো, আর সারারাত নতুন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়েই দিন কেটে যায়। মাঝে মাঝে সারারাত ধরে হৈ চৈ করে তাশ খেলা হয়। তখন নতুন নতুন তাশ খেলা শিখেছি। অদম্য উৎসাহে সবসময়ই খেলার মধ্যমণি হিসেবে পাওয়া যায় আমাকে। পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে বলা চলে। অবশ্য তখনও ক্লাসগুলোতে সেভাবে পড়াশোনা শুরু হয় নি। আর হলেই বা কী, সারাজীবন শুনে এসেছি ভার্সিটিতে কোনো পড়াশোনা নেই, শুধু পরীক্ষার আগে একরাত পড়লেই হয়। এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে অফুরন্ত উৎসাহে নতুন জীবন কেটে যাচ্ছিল আমাদের।
যে দিনের কথা বলছি সেদিন সন্ধ্যা থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। মাঝরাতের পর বৃষ্টি আরও বাড়ল। হলে আমাদের নতুনদের মাঝে বিপুল উৎসাহে আড্ডাবাজি আর তাশ খেলা চলছিল। বারবার সেদিকে মন চলে গেলেও অনেক কষ্টে আমি নিজেকে সামলে পড়ার টেবিলে বসে ছিলাম। কারণ পরেরদিন আমার ভার্সিটি জীবনের প্রথম ক্লাস টেস্ট হওয়ার কথা ছিল। খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল না, কিন্তু এতদিন কিছুই না পড়ার ফলে ছোট একটা পরীক্ষাও বিশাল বোঝা হয়ে চেপে বসেছিল আমার মাথায়। রাত দুটার দিকে পাশের রুমের শাহেদ এসে হঠাৎ বলল, “চা খেতে যাবি?”
“এত রাতে চা পাব কোথায়?” শাহেদের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। একে তো রাত বাজে দুটা, তার উপর আবার বাইরে রীতিমত মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টিতে শহরের অর্ধেকটা ভেসে যাওয়ার কথা। আমার কথা শুনে শাহেদ মৃদু হাসল। হেসে বলল,
“ক্যাম্পাসের খোঁজখবর তো কিছুই রাখিস না দেখি। পাওয়া যাবে চা। চল আমার সাথে।”
আমি আর আপত্তি করলাম না। দুজন দুটো ছাতা নিয়ে হেঁটে হেঁটে হলের বাইরে চলে এলাম। শাহেদ আমাকে নিয়ে এল হলের মেইন গেটের বাইরে রাস্তার পাশের ফুটপাতে। আমার ধারণাই ঠিক ছিল। অর্ধেকটা না, বলতে গেলে সমস্ত রাস্তা জুড়েই পানি জমে আছে। কিন্তু অবাক ব্যাপার, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও ফুটপাতে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান খুলে বসে আছেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। নীল রঙের একটা প্লাস্টিকের আবরণ দিয়ে কোনোমতে এই ভয়াবহ বৃষ্টির হাত থেকে দোকানের সব জিনিসপত্রগুলো সামলে রেখেছেন তিনি। সম্ভবত অনেকক্ষণ হল কোনো কাস্টুমার আসে নি। আমাদের দেখে তার মুখে হাসি ফুটল। শাহেদ দু কাপ চায়ের অর্ডার দিল। যত্ন করে চা বানিয়ে আমাদের খাওয়ালেন তিনি। যত্ন করে বলছি, কারণ এই কংক্রিটের শহরের ফুটপাতের চা ততদিনে অনেকবার খেয়েছি। আজকে এই ভয়াবহ দুর্যোগের রাতে যেটা খেলাম সেটা আহামরি কিছু ছিল না, কিন্তু কিছু একটা অবশ্যই ছিল যেটা অন্যগুলোর চেয়ে তাকে আলাদা করে মনে রাখতে বাধ্য করেছিল আমাকে।
ফরিদা খালার সাথে সেই আমার প্রথম পরিচয়।
তখন শুধু চা খেতাম, সিগারেট খাওয়ার হাতে খড়ি তখনো হয় নি। কিন্তু কয়েকদিন পর বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে সেটাও হয়ে গেল। আস্তে আস্তে ফরিদা খালার দোকানে যাতায়াত বাড়তে লাগল। বেশিরভাগ সময়েই যাওয়া হত গভীর রাতে। তবে দিনরাত সারাদিনই ফরিদা খালাকে দেখা যেত সেই চায়ের দোকানে। গভীর রাতে কাস্টুমার কম থাকলে তার সাথে মাঝে মাঝে কথা হত আমার। আস্তে আস্তে তার সাথে খাতির বাড়তে লাগল। ফরিদা খালা আস্তে আস্তে তার জীবনের না বলা সব গল্প বলতে শুরু করলেন। সিগারেটের ধোঁয়ার রিঙ বানাতে বানাতে আমি তার গল্প শুনতাম। বলার মত তেমন কোনো গল্পও ছিল না অবশ্য সেগুলো। সবই শুধু দুঃখের বিষাদগাঁথা। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তার দরিদ্র বাবা খুব অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন তার। সেই বিয়েও বেশিদিন টেকেনি। তিন বছর যেতে না যেতেই তার রিকশাওয়ালা স্বামী কী মনে করে আর একটা বিয়ে করে। একটা ছোট ছেলে সহ ফরিদা খালাকে বের করে দেয় বাড়ি থেকে। ততদিনে তার বাবা মারা গেছেন। মা থাকেন ভাইদের সাথে। সেই ভাইরাও অত্যন্ত দরিদ্র। কিছুদিন ভাইদের সংসারে ভাবীদের লাথি ঝাঁটা খেয়েই পড়ে থাকেন তিনি। তারপর একসময় বাধ্য হয়ে বের হয়ে আসেন সেখান থেকেও। অনেক ঘাঁটের জল খাওয়ার পর নিজের সামান্য কিছু সঞ্চয় দিয়ে অনেক কষ্ট করে একদিন এই দোকান দেন তিনি। এখন তার আয় রোজগার বলতে গেলে ভালোই হয়। কিন্তু রাস্তার পাশে দোকান চালানোর ঝামেলাও অনেক। মাসে মাসে অনেক রকম টাকা খাওয়াতে হয় অনেক জনকে। পুলিশকে দিতে হয় একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক। ইউনিভার্সিটির ছাত্রনেতাদের দিতে হয় কিছু। আরও বেশ কিছু জায়গায় টাকা দিতে হয় মাসে মাসে। তারপরেও সব মিলিয়ে টানাটানি করে হলেও চলে যায় তার। একমাত্র ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করেছেন। কতদূর পড়াতে পারবেন জানেন না। তারপরও অনেক স্বপ্ন দেখেন তাদেরকে নিয়ে।
দিনগুলো ভালোই চলছিল। কিন্তু এরই মধ্যে একদিন ক্যাম্পাসে একটা কাণ্ড হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র পরিষদের নির্বাচন ছিল সেদিন। সকাল দশটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছিল। প্রথম কিছুক্ষণ ভালোই চলছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা যেতে না যেতেই সরকার সমর্থিত ছাত্র রাজনৈতিক দলের কারচুপির খবর কানে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু। জোর করে সাধারণ ছাত্রদের ভোট দিতে না দিয়ে ইচ্ছামত ব্যালটে সিল মারছে একদল মানুষ। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররাও ছাড়বে কেন? শুরু হয়ে গেল হাতাহাতি মারামারি। কয়েক মুহূর্তেই রণক্ষেত্রের আকার ধারণ করল সমস্ত ক্যাম্পাস। গোল্লায় যাক ভোট, কিন্তু এই অন্যায় মানা যায় না। অনেকক্ষণ পর পুলিশের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হল বটে, কিন্তু আসল খেলাটা দেখা গেল বিকেলবেলা। নির্বাচনের ফল প্রকাশ করার পর দেখা গেল মোটামুটি সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে সরকার সমর্থিত ছাত্র রাজনৈতিক দল।
পরের কয়েকদিন বেশ উত্তপ্ত রইল পরিস্থিতি। বেশ কয়েকবার হাতাহাতি মারামারির ঘটনা দেখা গেল ক্যাম্পাসে। সাধারণ ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ল এই প্রহসনের নির্বাচন বয়কটের দাবিতে। মিছিল মিটিং থেকে শুরু করে অনশনের ঘটনাও ঘটল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার কথায় অনড়। নির্বাচন নাকি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হয়েছে। তবে সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। আস্তে আস্তে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে এল। ছাত্ররাও ধীরে ধীরে তাদের সাধারণ জীবনযাত্রায় ফিরে গেল। সবকিছু শান্ত হয়ে এলে আমার চোখে পড়ল ফুটপাতের উপর ফরিদা খালার চায়ের দোকানটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। শুধু ফরিদা খালার না, আরো কয়েকটি দোকান আর নেই। জানতে পারলাম গোলমালের আশঙ্কায় আশেপাশের সমস্ত ছোট ছোট দোকানগুলো বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ফরিদা খালাকে আবার দেখা গেল প্রায় একমাস পর। একদিন গভীর রাতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয়েছি, আশেপাশে কোনো খাবারের দোকান পাওয়া যায় কিনা তার সন্ধানে। হল থেকে বের হয়ে একটু হাঁটার পর চোখে পড়ল দোকানটা। আগের জায়গা থেকে সামান্য দূরে। দোকানের বিক্রি হওয়া জিনিসেও পরিবর্তন এসেছে। আগে ছিল চায়ের দোকান, এবার দেখলাম রুটি পরোটার দোকান। একমনে পরোটা বেলে যাচ্ছেন ফরিদা খালা। তারপর গরম গরম ভেজে সবজি কিংবা ডিমভাজি দিয়ে পরিবেশন করছেন সামনের বেঞ্চে বসে থাকা কাস্টুমারদেরকে। আমাকে দেখে ফরিদা খালা মলিনভাবে হাসলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন,
“এই যে এত মিছিল মিটিং করলেন কয়টা দিন, তাতে লাভটা কী হইল?”
তার কথায় চাপা ক্ষোভ টের পেলাম আমি। কারণটাও বুঝতে পারলাম। সবকিছু ঠিকটাক হয়ে গেলেও এতকিছুর মধ্যে বলতে গেলে ক্ষতি হয়েছে শুধু তাদের কয়জনেরই। আমি তার ক্ষোভটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না। বড় কিছু পেতে হলে ছোট ছোট কিছু ক্ষতি হয়ই। আমি কণ্ঠে উত্তেজনা এনে ব্যাখা করলাম আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা। তখন রক্ত গরম ছিল। সবকিছু পরিষ্কার করে রাখতাম নিজের মনের কাছে। ফরিদা খালা অবশ্য আমার কথাবার্তা শুনে কী ভাবলেন তা বুঝতে পারলাম না। এরপর আবারও তার সাথে ঘন ঘন দেখা হতে লাগল গভীর রাতে। কাস্টুমার না থাকলে আবারও নানা বিষয়ে কথাবার্তা বলতাম আমরা। হালকা বিষয়ে কথাবার্তা শুরু হলেও এক পর্যায়ে অবধারিতভাবে আমি টেনে আনতাম পরিবর্তনের কথা। সমাজ পরিবর্তনের কথা। দেশ পরিবর্তনের কথা। আমার কথা শুনে ফরিদা খালা মুচকি হাসত শুধু। কিছু বলত না। সে হাসি প্রশ্রয়ের না বিদ্রুপের তা বুঝতে পারতাম না আমি।
সময় বড় দ্রুত যায়। দেখতে দেখতে আমার ভার্সিটির জীবন শেষ হয়ে গেল। একটা অ্যাড ফার্মে মোটামুটি ধরণের একটা চাকরি পাওয়ার পর হল ছেড়ে দিলাম। দুই রুমের একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া করলাম মালিবাগে । ফরিদা খালার সাথে সম্পর্কও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বলা চলে। সারাদিন চাকরি আর সন্ধ্যার পর বিসিএস এর প্রিপারেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। ভার্সিটির দিকে আর আসার সময়ই পেতাম না। গাধার মত খাটুনীর বদৌলতেই হোক আর নিজের সৌভাগ্যের বদৌলতেই হোক, প্রথমবারেই আমার বিসিএস হয়ে এল। সরকারের ম্যাজিস্ট্রেট পোস্টে জয়েন করলাম। ধীরে ধীরে চাকরি নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ফরিদা খালার কথা একসময় আমি ভুলেই গেলাম।
দেখতে দেখতে পনেরো বছর পার হয়ে গেল। প্রমোশন পেয়ে একসময় আমি সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট হলাম।দেশের অনেকবড় বড় কাজ হয় আমার হাতের একটা সইতে। এর মধ্যে একদিন দেশে আরও একটা বড় ঘটনা ঘটে গেল। ড্রাইভার বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে গিয়ে ঢাকার একটা ব্যস্ত রাস্তায় ফুটপাতের উপর বাস তুলে দিল। ফলে যা হবার তাই হল, কলেজে পড়া একটা ষোল বছরের মেয়ে বাসের নিচে চাপা পড়ে মারা গেল।
দেশের ছাত্রসমাজের উপর এই ঘটনার প্রভাব পড়ল ভয়াবহ। প্রথমে সব স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমে এল। তারা দোষী বাস চালকের শাস্তি চায়। শুধু শাস্তি পেয়েই তারা খুশি না, যে কোম্পানীর বাস এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা সেই বাসের নিবন্ধনও বাতিল চায়। দু একদিন রাস্তা আটকিয়ে আন্দোলন করার পর তারা আরো বড় কর্মসূচী শুরু করল। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশের অযোগ্যতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তারা নিজেরাই রাস্তায় ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে শুরু করল। তারা রাস্তায় প্রত্যেকটা গাড়ির কাগজপত্র চেক করল, সবগুলো গাড়িকে নির্দিষ্ট লেনে থাকতে বাধ্য করল, ছোটবড় প্রত্যেকটা নিয়ম মেনে চলতে সব মানুষকে বাধ্য করল। প্রথম কয়েকদিন বড় বড় পরিবহন কোম্পানীগুলো তাদের বাস রাস্তায় নামালো না। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? বসে থেকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতি হচ্ছিল তাদের। কিন্তু স্কুল কলেজের বাচ্চাদের এই তোপের মুখে গাড়ি রাস্তাতে নামানোও যায় না। বলাই বাহুল্য, বেশির ভাগ গাড়িরই কাগজপত্র থেকে শুরু করে অনেককিছুই ঠিক নেই। এখন একটাই উপায়। যেভাবেই হোক এই আন্দোলন বন্ধ করতে হবে। ভিতরে ভিতরে জল অনেকদূর গড়িয়ে গেল। আন্দোলন বানচাল করতে একশ্রেণীর মুখোশধারী গুণ্ডা মাস্তান রাস্তায় নেমে গেল। তারা কারা তা সবাই জানে কিন্তু প্রকাশ্যে তা বললেই বিপদ। বেশ কয়েক জায়গায় তাদের সংঘর্ষ হল স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সাথে। রাস্তার গুণ্ডামাস্তানদের সাথে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পারার কথা না, তারা পারলও না। একসময় তারা পিছিয়ে আসতে শুরু করল। এইসময় রাস্তায় নেমে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। স্কুল কলেজের ছাত্রদেরকে লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে ঘরে ফেরত পাঠানো গেলেও এদেরকে ঘরে ফেরত পাঠানো এত সহজ না। সমস্ত শহরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ল। জায়গায় জায়গায় মুখোশধারী মাস্তানদের সাথে সংঘর্ষ হল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের। আগেরবারের মত মুখোশধারীরা এবার কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারল না। অবস্থা বেগতিক দেখে এবার অন্য পথের আশ্রয় নেওয়া হল। গুজব ছড়ানো, মারামারি করা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা এরকম বিভিন্ন অযুহাতে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। আর বলাই বাহুল্য, গ্রেফতারকৃতরা সবাই ছিল সাধারণ ছাত্রছাত্রী। মুখোশধারীদের কেউ গ্রেফতার হল না।

এবার কিছুটা লাভ হল। এদেশের যুবসমাজ রাস্তায় মারামারি করে হাসপাতালে যেতে রাজি কিন্তু জেলের ভাত খেতে রাজি না। আস্তে আস্তে তারা পিছিয়ে আসতে শুরু করল। কয়েকদিন পর পরিস্থিতি মোটামুটি ঠাণ্ডা হয়ে গেল বলা চলে। গ্রেফতারকৃতদের আদালতে সমর্পণ করা হল। শুরু হল প্রহসনের বিচার। তবে উপর মহল জানত এদেরকে কোনো রকম শাস্তি দিলে পরিস্থিতি আবার খারাপ হয়ে যেতে পারে। তখন হয়তো এই পথেও আর লাভ হবে না। তাছাড়া তাদের উদ্দেশ্য ততদিনে সফল হয়ে গেছে। শুধু শুধু ঝুঁকি নেওয়ার মত বোকা তারা না। সুতরাং আদালত থেকে বলা হল যেহেতু তারা সবাই মেধাবী শিক্ষার্থী, প্রথমবারের মত একটা ভুল করে ফেলছে, তাই এবারের মত তাদের সবাইকে ক্ষমা করা হবে। তবে সবাইকে তাদের অভিভাবকের উপস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে একটা লিখিত মুচলেকা দিতে হবে। যেখানে লেখা থাকবে এবারের মত তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যতে আর কখনো এই কাজ করলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না, আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে।
মুচলেকা নেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। নির্দিষ্ট দিনে প্রায় ত্রিশ জন ছেলে তাদের বাবা – মা কে নিয়ে উপস্থিত হল আমার অফিসে। আমার রুমের দরজার বাইরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের উপরই একটা ঘৃণা এসে ভর করল আমার মধ্যে। একসময় আমিও এদের মত রাস্তায় নেমেছি, আন্দোলন করেছি। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা তা আমরা সবাই জানি কিন্তু শুধুমাত্র নিজের গাঁ বাঁচানোর জন্য একটা অদ্ভুত নির্লিপ্ততার অভিনয় করে যাচ্ছি আমরা সবাই। আমার একবার ইচ্ছা হল এই কাজ না করি, ছেড়ে দেই এই তোষামোদির চাকরি। অন্তত নিজের জায়গাটুকু থেকে প্রতিবাদটা তো করি। পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে উঠল স্ত্রী সামিয়া আর একমাত্র ছেলে সাহাদের মুখ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবেগকে দূরে সরিয়ে কলম হাতে তুলে নিলাম আমি।
একে একে সবাই এসে মুচলেকা দিয়ে গেল। সবার শেষ হলে আর্দালি হাতে ধরা একটা কাগজ এগিয়ে দিল আমার দিকে। কাগজটা হল এই ছেলেগুলোর নামের একটা লিস্ট। এতক্ষণ যারা যারা মুচলেকা দিচ্ছিল আর্দালি তাদের নামের পাশে একটা টিক দিচ্ছিল। আমি তাকিয়ে দেখলাম বত্রিশটা নামের মধ্যে একত্রিশটা নামের পাশেই টিক দেওয়া হয়েছে শুধু একটা ছাড়া। সামনে ছেলেগুলো তখনো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বাবা-মা সহ। আমি আর্দালিকে বললাম,
“এখনো তো একজন বাকি আছে দেখা যাচ্ছে। মমিনুল ইসলাম কে? ডেকে আনো তো।”
আর্দালি রুমের বাইরে গিয়ে কিছু একটা বলল। আমি দেখলাম বাইরে থেকে হালকা পাতলা চশমা পড়া শ্যামলা একটি ছেলে আস্তে আস্তে এসে রুমে ঢুকল। আমার টেবিলের সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো আমার সামনে। আমি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে দেখলাম ছেলেটাকে। একদমই সাধারণ একটা ছেলে। এই ছেলে পড়াশোনা ছাড়া আর অন্য কিছু করতে পারে তা মনেই হয় না। কয়েক মুহূর্ত পর আমি বললাম,
“কী হল? তোমাকে ডেকে আনতে হল কেন? একটা কাগজ নাও, যা যা লেখার কথা লিখে তোমার আর তোমার অভিভাবকের সাইন নিয়ে এস। যাও।”
আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটা মৃদু অথচ স্পষ্ট স্বরে আস্তে আস্তে বলল,
“আমি মুচলেকা দেব না স্যার। এই অন্যায়ের সাথে আমি আপোষ করতে পারব না।”
আমি কয়েক মুহূর্ত কী বলব বুঝতে পারলাম না। ছেলেটা কি যা বলছে তা ভেবেচিন্তে বলছে? এই বয়সে রক্ত একটু গরম থাকে এটাই স্বাভাবিক। আমারও ছিল। কিন্তু সে তার সামনের বিপদটা ঠিকমত বুঝতে পারছে তো? হ্যাঁ সে তার নিজের জায়গায় ঠিক আছে। কিন্তু সে তার জায়গা থেকে এই সামান্য প্রতিবাদ করে আর কীই বা করতে পারবে? মাঝখান থেকে আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে তার জীবনটাই নষ্ট হবে। আমার এখন কী করা উচিত? আমি তাকিয়ে দেখলাম দরজার বাইরে থেকে অনেকগুলো মুখ তাকিয়ে আছে এদিকে। একটু থেমে আমি বললাম,
“দেখ মমিনুল ইসলাম, এই বয়সে রক্ত গরম থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর। এই সামান্য প্রতিবাদ করে তুমি কিছুই করতে পারবে না। মাঝখান থেকে তোমার ক্যারিয়ারটাই নষ্ট হবে। সময় নষ্ট করো না, যা করতে বলছি কর। একটা কাগজে যা বলি লেখ।”
কিন্তু ছেলেটা তার সিদ্ধান্তে অনড়। মুচলেকা সে কিছুতেই দেবে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম, “তোমার বাবা-মা কেউ আছে এখানে?”
“আমার বাবা নেই স্যার। মা আছেন। তবে এখানে আসেন নি। মা আমাকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন।উনিই আমাকে বলেছেন মুচলেকা না দিতে।”
আমি আর কী বলব বুঝতে পারলাম না। সেদিনের মত ঘটনা সেখানেই শেষ হল। সবাই তাদের অভিভাবকের সাথে চলে গেলেও মুচলেকা না দেওয়ায় ছেলেটাকে আমি ছাড়তে পারলাম না। পুলিশ তাকে তাদের সাথে নিয়ে গেল। কয়েক দিন ব্যাপারটা আমি ভুলে থাকতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। ছেলেটা আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে অনেক কিছু দেখিয়ে দিয়েছে। ঠিক চারদিন পর আমি নিজেই থানা হাজতে উপস্থিত হলাম ছেলেটার সাথে দেখা করতে। ছেলেটা কিন্তু আমাকে দেখে অবাক হল না, বরং হাসল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম আশ্চর্য একটা সারল্য রয়েছে তার হাসিতে। হাসতে হাসতেই ছেলেটা বলল,
“আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আপনি আসবেন।”
আমি এর উত্তরে কী বলব ভেবে পেলাম না। ইতস্তত করে একটু পর বললাম,
“তোমার মায়ের ঠিকানাটা দেওয়া যাবে? আমি একটু তার সাথে দেখা করতে চাই।”
“অবশ্যই স্যার দেওয়া যাবে। কিন্তু স্যার আমরা খুব গরীব। আমাদের বাসায় আপনি যেতে পারবেন না। তার চেয়ে আমিই বরং মাকে বলব আপনার অফিসে দেখা করতে। মা প্রতিদিন আমার সাথে এখানে দেখা করতে আসেন।”
আমি একটু আপত্তি জানানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ছেলেটা আগের মতই তার সিদ্ধান্তে অনড়। অগত্যা বাধ্য হয়ে তার কথাই মেনে নিতে হল আপনাকে।
পরের দিন সকালে আমি আমার অফিসে বসে ছিলাম। সকাল এগারোটার দিকে আমার পিওন শামসুদ্দীন এসে বলল একজন মহিলা নাকি আমার সাথে দেখা করতে চায়।
অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত ছিলাম আমি সেদিন। পিওনকে বলতে গেলাম মহিলাকে বলতে অন্যদিন আসতে। তখনই হঠাৎ গতকালের কথা আমি মনে পড়ল আমার। কাগজপত্র সব একপাশে সরিয়ে রেখে আমি পিওনকে বললাম মহিলাকে নিয়ে আসতে।
পিওন শামসুদ্দীন যাকে নিয়ে এল তাকে দেখে আমার খুব চেনা চেনা মনে হল। কয়েক মুহূর্ত আমি অনেক চেষ্টা করেও মহিলা কে তা মনে করতে পারলাম না। হাল ছেড়ে দিয়ে আমি যখন তাকে তার ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম তখন উনি হাসলেন। আশ্চর্য এক বিদ্রুপের হাসি। হাসতে হাসতেই বললেন,
“স্যার আমি খুব গরীব মানুষ। ইউনিভার্সিটি এলাকায় একটা ছোট্ট দোকান চালাই। পোলাপানগো দেখি মিছিল মিটিং আন্দোলন করতে। রক্ত গরম কইরা তারা আমার দোকানে নাশতা খায়। বড় বড় কথা কয়। কিন্তু স্যার বড় হইয়া অফিসার হইলেই সবাই সেই কথা ভুইলা যায়। মেরুদণ্ড বাঁকা কইরা ফালায়। আমি আমার ছেলেরে শিখাইছি কীভাবে সারাজীবন নিজের মেরুদণ্ডটা সোজা কইরা রাখতে হয়।”
হঠাৎ করে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে। এই সেই ফরিদা খালা, পনেরো বছর আগে যার সাথে আমার নিয়মিত কথা হত চায়ের দোকানে। তিনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমাকে ঈঙ্গিত করেই কি বলছেন কথাগুলো? আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম তাকে। পনেরো বছর আগের সেই ফরিদা খালা আর আজকের এই ফরিদা খালার মধ্যে অনেক পার্থক্য। বার্ধ্যকের বোঝা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে তাকে। তবু পনেরো বছর আগের সাথে তার কোথায় যেন একটা মিল আছে। তখনো মেরুদণ্ড সোজা করে বেঁচে ছিলেন তিনি। এখনো আছেন। একটা মাত্র ছেলে ছাড়া আর কিছুই নেই তার জীবনে। তবুও সেই ছেলের মুক্তির জন্য তিনি কিছুতেই তাকে হেরে যেতে দেবেন না। আমার হঠাৎ মনে হল তার তুলনায় আমিই বরং অনেক দুর্বল। সামান্য স্ত্রী সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মেরুদণ্ডটাকে ভেঙে ফেলেছি কাপুরুষের মত।হঠাৎ করে আমার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেল আমার। নিকোটিনের তৃষ্ণা। পকেট থেকে বেনসন অ্যান্ড হেজেসের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালাম আমি।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে ফরিদা খালা তখনো বলে চলছেন,
“আপনের মত বড় অফিসার মনে হয়বানাইতে পারবনা ছেলেটাকে। তবে স্যার তাতে সমস্যা নাই। মানুষ তো বানাইছি। একটা খাঁটি মানুষ।”
ম্যাজিস্ট্রেটের আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মায়ের সামনে।
যিনি তার ছেলেকে কখনো হেরে যেতে শেখান নি।
বরং শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে মেরুদণ্ড সোজা করে বেঁচে থাকতে হয়।




advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement