প্রিয়তমাসু,
আজ আমার বয়স আটাত্তর বছর পূর্ণ হল। এখন মধ্যরাত। ফেরারি বসন্তের এই ক্ষণে আকাশ নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা। তবে এর মাঝেও ধ্রুব তারার অস্তিত্ব বিদ্যমান। নিসচিন্দপুর বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা এবং নার্সরা গভীর নিদ্রায় মগ্ন। বৃদ্ধাশ্রমের তৃতীয় তলার করিডোরের শেষ কক্ষে আমার বাস। সত্তরোদ্ধ বয়সে আমি এখানে আসি। দেখতে দেখতে ছয় বছর পার হয়ে গেল। বিগত দিনের সৃতির ধুসর আবরণ ভেদ করে অনেক কথা মনে পড়ে। পৃথিবী তার আপন গতিতে কক্ষপথে ঘুরছে। দিন বদলের পালায় কত রাজবংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতা দখল করলো। দুই দুটো বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের সমস্ত শুভবোধ এবং মানবিকতার ধারণা অসারে পরিনত করলো। ব্রিটিশরাজের দখলকৃত উপনিবেশগুলো স্বাধীন হয়ে গেল। শুধু আমার গৃহকোণে বসে সোয়েটার বোনার কাজটা শেষ হল না।
১৯৭১ সালে তুমি যেদিন যুদ্ধে গিয়েছিলে সেদিন মুখ ফুটে অব্যক্ত কথাটা বলতে পারিনি। আমাদের অলকপুর গ্রামে চারিদিকে তখন ঘোর আতঙ্ক। পঁচিশে মার্চের পর পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা বাঙালি নিধনযজ্ঞে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। বৈঠক ঘরে বড় ভাইজান আর তুমি তর্ক করতে। ভাইজান বলতেন, পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি আমাদের শোষণ করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ খেঁটে খাওয়া মানুষ এই জুলুমের অংশীদার নয়। সমগ্র পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য দরকার শ্রেণি সংগ্রাম। কিন্তু তুমি বলতে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের আক্রমণ করেছে। এই মুহূর্তে প্রতিরোধ যুদ্ধ ছাড়া উপায় নাই। বৈঠক ঘরের পাশে পর্দার আড়াল থেকে টেবিল ক্লথে সুই সুতা দিয়ে ফুল তুলতে তুলতে তোমাদের কথা শুনতাম। আমি কোন পক্ষে যাব? কোন বিষয়ে স্বাধীন মতামত দেয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আমার জন্ম। বাবা উকিল ছিলেন। কলকাতা থেকে ফিরে পূর্ব বাংলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন। কিন্তু আইন ব্যবসায় তেমন পসার জমাতে পারেন নাই। আমরা ছয় ভাইবোন। বড় দুই ভাই ছিল আলীগড় কলেজের ছাত্র। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন থেকে পর্দানশীন হতে হয়। এই প্রথা ভাল না মন্দ তা বলছি না। আমার অন্য দুই বোন ততোদিনে কোরআন শরীফ খতম দিয়ে গৃহকর্মে পারদর্শী হয়ে গেছে। তখন তারা বিয়ের জন্য অপেক্ষমান। বড় আপার বিয়ে হয় দশ বছর বয়সে। আমার বাবা ফরায়জি মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। নিবিষ্ট চিত্তে ধর্ম পালন করতেন। তার কোন মেয়ে স্কুল বা কলেজে পড়বে এই বিষয়টা দুঃস্বপ্নেও ভাবতেন না।
আমার মা, দাদি, চাচীরা কর্মস্থলে অংশগ্রহণ দূরের কথা মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে সেই বিষয়টাও সমর্থন করতেন না। বিনা বাক্য ব্যয়ে পুরুষপ্রধান সমাজ কর্তৃক আরোপিত প্রথা মেনে নিয়েছিলেন। অবশ্য রান্নাঘর আর আঁতুড়ঘর ছাড়া তাদের আরেকটা গন্তব্যস্থল ছিল। আমাদের একতলা বাড়ির ছাদে মেঘমুক্ত আকাশের নিচে দাদি আম্মা তার ছেলের বউদের নিয়ে বসতেন। তারা বিভিন্ন রকম মুখরোচক খাবার প্রস্তুত করতেন। সকালে বাবা কাকারা অফিসের উদ্দেশ্যে বের হত। তখন বাড়ির মহিলারা ছাদে বসে মোরব্বা বা আঁচারের জন্য কাঁচা আম টুকরো করত। কুমড়োর সাথে ডাল বাটা মিশিয়ে বড়ি তৈরি করত। আর পরস্পরের সাথে সুখ দুঃখের গল্প করত। কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমি বাড়ির ছাদে মহিলা মজলিসে থাকার অনুমতি পেয়েছিলাম।
প্রাচীর ঘেরা ছাদে নেকাবে মুখ ঢেকে ঐ প্রথম আমার বহির্জগৎ দেখা। মহিলারা গল্পে মশগুল থাকলে আমি দেখতাম , বাড়ির সামনে সদর রাস্তা দিয়ে গোয়ালা দুধ বিক্রি করতে যাচ্ছে। ফেরিওয়ালা তার পসরা বোঝায় ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বিকিকিনির জন্য হাক দিচ্ছে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে কৌ্তুহলের বিষয় ছিল সন্ধ্যা বাউলিনির গান। আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে অলকনন্দা নদী প্রবাহমান। নদীর তীর বরাবর রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যা মাসি গলায় রুদ্রাক্ষরের মালা আর একতারা বাজিয়ে গান করতে করতে যেত, ও সখি আমার ভাল হইলো কই?
গান শুনে মনটা উদাস হয়ে যেত। আকাশে পাখির ঝাঁক উড়ে বেড়ায়। কই তাদের তো অন্দরমহলে বন্দী থাকতে হয় না। ভাবতে ভাবতে মনে হত, মা, দাদি, চাচীদের মতো আমিও একদিন একুশ রকমের আঁচার বানাবার প্রণালী শিখে জীবন সার্থক করব।
কিন্তু ভাগ্যবিধাতার ইচ্ছা বুঝি ভিন্ন ছিল। একদিন অপরাহ্নে দুই ঘোড়ায় টানা গাড়ি আমাদের বাড়ির প্রধান ফটকে এসে দাঁড়ায়। আমার মেজ কাকা ছিলেন বি এ পাস। তিনি সদ্য পরিণীতা স্ত্রী কে সঙ্গে করে বাড়ি এসেছেন। মেজ কাকিমা ইডেন কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী। নকশা করা ফুল হাতা ব্লাউজ। সাদা পাড়ের নীল রঙয়ের তাঁতের শাড়ি কাকিমা কুচি দিয়ে পড়েছেন। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যপার হল তিনি বোরখা পরিহিতা নন। মাথায় অবশ্য শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘোমটা দেয়া। নতুন বউকে দেখার জন্য সবাই ভিড় জমাল। পুরুষরা সবাই গোমড়া মুখ করে নীরব হয়ে রইল। কিন্তু অন্দরমহলে নারীরা ঠেস দিয়ে কথা শুরু করলেন,
নেকাপড়া জানা মেয়ে বিয়ে করে এনেছে। এ তো আদব লেহাজ কিচ্ছু জানে না। পর পুরুষের সাথে কথা বলে।
তাদের এই আক্রমণ সপ্তমে চড়লো। দিন দশেক পর জানা গেল, মেজ কাকিমা মাস্টার্স পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। মা আমাকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে কড়া আদেশ দিলেন, খবরদার, মেজ কাকিমার ঘরে যাবি না। তার ছায়াও মারাবি না। অবনত মুখে সেদিন মায়ের কথা মেনে নিয়াছিলাম। দিন দুয়েক কৌতুহল আর নিষেধের মধ্যে আমার মনে দন্ধ চলল। তারপর একদিন গুটি গুটি পায়ে মায়ের অজান্তে মেজ কাকিমার ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়ালাম। কাকিমা ফুলদানিতে ফুল সাজাতে সাজাতে গান করছিলেন,
মেঘ বলেছে যাব যাব
রাত বলেছে যাই ।
সাগর বলে কূল মিলেছে
আমি তো আর নাই।
তার কণ্ঠ টা সুরেলা। আমায় দেখতে পেয়ে ভিতরে ডাক দিলেন, কিরে পুঁটি, বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ঘরে আয়। আমি কাকিমা কে প্রশ্ন করি, আপনি গান করেন? কাকিমা বলেন, ছোট বেলায় শিখেছিলাম। রেওয়াজ করা ছেড়ে দিয়েছি। এটা কার গান বলতে পারিস? আমি মাথা নেড়ে বলি , না। কাকিমা বলেন , গানটির রচিয়তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কবিতা পড়েছিস। বললাম, আমি বাংলা পড়তে জানি না। কাকিমা গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, লেখাপড়া শিখবি? আমি বলি, মেয়েমানুষ, লেখাপড়া শিখে কি হবে? কাকিমা বলেন, তুই এই পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিস। মানবজন্ম আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এই দুর্লভ জীবন নিয়ে কি করবি? জগতের পরিস্থিতি, জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা সম্মন্ধে কিছু জানার চেষ্টা করবি না? অত শক্ত কথা সেদিন বুঝতে পারি নাই। তবে তখন থেকে মেজ কাকিমার ঘরে আমার গোপন অভিসার শুরু হল। সহজ পাঠ, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল ছড়া থেকে শুরু করে দেবী চৌধুরানী পর্যন্ত পড়া হয়ে গিয়েছিল।
বলা বাহুল্য আমাদের যাত্রাপথ নির্বিঘ্ন ছিল না। জানাজানি হলে মা গলা চড়িয়ে মেজ কাকিমা কে বলেছিলেন, তুমি মেলচ্ছদের সাথে মিশে মান সন্মান, সমাজ বিসর্জন দিয়েছ। আমার কেন সর্বনাশ করছ? মেজ কাকিমা সেদিন এই কথার জবাব দেন নাই। কিন্তু সূর্য যদি আকাশে উদিত হয় তবে কার সাধ্য তার কিরণ রোখে? মেজ কাকিমার জন্যই আমি আমিনপুর গার্লস স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছিলাম। মেজ কাকিমা মারা যান সন্তান ভুমিস্টের সময়। তিনি একটি মৃত শিশু প্রসব করেন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা কেউ বলে নাই।
তখন আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। বাড়ি থেকে পর্দা ঘেরা রিক্সায় চড়ে কলেজে যাই। মনের কোণে কুসুম কোমল অনুভূতিগুলো বাস্তবের রুঢ় আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি যে কোন মুল্যে আমাকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের মতো বাঁচার জন্য আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া দরকার। আমার এই গোপন বাসনায় তুমি অনুপ্রেরণা দান করেছ। এক বৃষ্টিস্নাত বিকালে বড় ভাইজান আমাকে ডেকে পাঠান। ঘরে গিয়ে দেখি ভাইজানের পাশে মেহগনি কাঠের চেয়ারে একজন বসে আছে। বয়স বাইশ তেইশ হবে। লম্বা, সুঠাম গড়নের সৌম্যকান্তি তরুণ। এইভাবে তোমাদের সামনে আসা আকস্মিক হলেও খুব বেশি অনভিপ্রেত ছিল না। যুগ পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ষাটের দশকের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা মিছিলে যাচ্ছে। কর্মস্থলে নারীরা অংশ নিচ্ছে।
ভাইজান বললেন, জহির, তোমাকে আমার ছোটবোনের কথা বলেছিলাম। ও কলেজে পড়ে। তুমি নির্মিলিত চোখ দুটো তুলে বললে, ভাল তো। বই পত্র পড়া হয়? আমি মাথা নেড়ে সায় দিই। ভাইজান বলেন, কলেজ থেকে ফিরে রান্নাঘরে যায়। বিকালের নাস্তা বানানো, ছোট কাকিমার বাচ্চা দুটো দেখা সব কাজ পুটী করে। তবে ওর রেজাল্ট বেশ ভাল।
গম্ভীরভাবে তুমি বললে, পাঠ্য বইয়ের বাইরেও তো পড়াশোনা করতে হয়। শরতের পথের দাবী উপন্যাসটা পড়েছ? আমি উত্তর দেয়ার আগে ভাইজান বলেন, সর্বনাশ। ওকে গল্প উপন্যাস পড়ার কথা বল না। কলেজে পড়ছে। এই যথেষ্ট। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে পাত্রস্থ করতে হবে।
আমাকে যদি কেউ কখনো প্রশ্ন করে, বিধাতার কাছে তুমি কি চাও? আমি উত্তরে বলবো, আমার ষোল বছর বয়েসের সেই কয়েকটা মাস ফেরত চাই। অপেক্ষা এত মধুর হতে পারে? সারা সপ্তাহ আমি রবি বারের জন্য অপেক্ষা করতাম। ঐদিন বিকালে তুমি আসতে। বৈঠক ঘরে তোমার আর ভাইজানের মধ্যে কথা হত। ভাইজান দিজাতিত্ত্বের সমর্থক ছিলেন। তিনি বলতেন, হিন্দু মুসলিম দুটো ভিন্ন জাতি। তুমি আপত্তি করে বলতে, শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গড়ে উঠতে পারে না। জাতি গঠনের বিভিন্ন উপাদান আছে। জাতীয়তাবাদের ধারণা সমাজ বিবর্তনের ধারায় দীর্ঘ ক্রমবিকাশের ফল। বৈঠক ঘরের পর্দার আড়াল থেকে আমি তোমাদের কথা শুনতাম।
এমনি এক রবিবারে তুমি আস নাই। সেদিন পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে আসে। বড় কাকিমা নেকাবে মুখ ঢেকে আমার তৈরি কিছু হাতের কাজের নকসা করা বিছানার চাদর, কাঁথা আর উলের সোয়েটার প্রদর্শন করেন। পাত্রপক্ষ সূচীকর্মগুলো পছন্দ করেছিল। রাতে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুই জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় উতরে গেলি। একটা অব্যক্ত বেদনা নীল দংশন হয়ে আমার মর্মে গিয়ে আঘাত করে। তবে চোখ দুটো ছিল অশ্রুহীন। নিয়ত চর্চার মাধ্যমে বোবা কান্নার কৌশল নারীদের রপ্ত করতে হয়।
মহা ধুমধামে আমার বিয়ে হয়। বরযাত্রী মোটর গাড়ি করে এসেছিল। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় তোমাকে এক ঝলক দেখেছিলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আতশবাজির আলোকচ্ছটা দেখছ। তোমার তখন কত কাজ। উনসত্তরের গনভ্যুথানের পর সারাদেশ ক্ষোভে ফুঁসছে। সত্তর সালে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় হয়ে গেল। এই ঝড়ে ব্যপক প্রাণহানি হয়। অথচ উদ্ধার কাজ বা ত্রান তৎপরতার ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা ছিল উদাসীন । ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পরে।
যুদ্ধের নয় মাস আমি আমার স্বামীর সাথে তার ফুফুর বাসায় অবস্থান করি। বার দুয়েক আমাদের স্থান পরিবর্তন করতে হয়। এর মাঝে একবার পিত্রালয়ে এসেছিলাম। বড় ভাইজান ক্রমশ বিষণ্ণ হয়ে পড়েছেন। চোখের সামনে দেখা হত্যাযজ্ঞ তার বিশ্বাসের ভিত নড়বরে করে তুলেছিল। তার কাছে শুনেছিলাম, যুদ্ধের প্রারাম্ভিক কালে তুমি ভারতে চলে গিয়েছ। কথাটা শুনে আমার মুখ দিয়ে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে আসে, জহির ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি? যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ধ্বংসলীলার মাঝেও আমরা ভাবীকালের জন্য অপেক্ষা করতাম। পূর্ব দিগন্তে উদীয়মান লাল সূর্যের মতো মুক্তি আসবে। আমরা স্বাধীন হবো। আমার স্বামীর নাম রফিকুল বারী।তিনি সরকারি চাকরি করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল অফিসের বস হওয়া। আমার হাতে রবি ঠাকুরের সোনার তরী বইখানা দেখলে বিদ্রুপ করে প্রশ্ন করতেন, কবিতা পড়ে মুক্তি পাওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না।
১৬ই ডিসেম্বর দেশ বিজয় অর্জন করে। ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সর্বত্র ধ্বংসস্তূপ আর বিশৃঙ্খলার মাঝে দেশ গঠনের কাজ শুরু হয়। আমাদের প্রত্যাশা ছিল পর্বতসম। আর অচিরে মোহভঙ্গ ঘটে। বিতর্কিত সমাজতান্ত্রিক পথে দেশের অর্থনীতি পরিচালনা থেকে শুরু করে বাকশাল গঠন পর্যন্ত এক ভয়াবহ সঙ্কটে দেশ নিমজ্জিত হয়। ৭৪ সালে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। আমার স্বামী বারী সাহেব সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের মধ্যে অন্যতম যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ওস্তাদ। দুর্ভিক্ষের সময় বারী সাহেব চোরাকারবারি শুরু করে। এক গভীর রাতে সে বাড়ি ফিরে গোপনে আমার হাতে বেশ কয়েক বান্ডিল টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলে, এগুলো তাড়াতাড়ি লুকিয়ে রাখ। আমি তাকে শান্তভাবে প্রশ্ন করি, টাকা কোথায় পেয়েছ? সে বলে, তা দিয়ে তোমার দরকার কি? আমি বলি, তুমি একটা পিশাচ। দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য মজুদ করে ব্যবসা করছ? বারী সাহেব আমার চুলের মুঠি ধরে বিছানায় আছড়ে ফেলে বলে, কৃষ্ণ করলে লীলাখেলা আমি করলে ঢং। তোর জহির ভাই যে ঠিকাদারির নামে অবৈধ ব্যবসা করছে সেই কথা মুখে আনতে লজ্জা করে?
দেখতে দেখতে কয়েক দশক পার হল। বারী সাহেবের ছয়তলা বিল্ডিং উঠল। আমার দুই ছেলের মধ্যে বড়জন একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করে। ছোট ছেলে লেখাপড়ায় ভাল। ও ঠিক ওর বাবার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে স্কলারশিপের জন্য মরীয়া চেষ্টার পরেও সে পায়নি। বারী সাহেব তার ছোট ছেলেকে নিজ খরচে কানাডায় পড়তে পাঠিয়েছেন। আমি ব্যথিত বিস্ময়ে লক্ষ্য করি ছোট খোকা কোনোদিন তার পিতাকে প্রশ্ন করেনি, বাবা তোমার আয়ের উৎস কি? আমার জীবন কেটে গেল তিন সাহেবের সকালের নাস্তা, বিকালের জলখাবার আর রাতের রাতের রান্না করে। সকালে ওরা তিনজন বাইরে চলে যাবার পর আমার ক্ষণিক অবসর মিলত। জানালার ধারে বসে কল্পনা করতাম, আমার যদি একটা ঝুল বারান্দা থাকত। আমি সেখানে কিছু কামিনি আর বেলি ফুল গাছের চারা লাগাতাম। গ্রিল বেয়ে উঠে যেত অপরাজিতা ফুলের গাছ। আমি সেখানে দুদণ্ড নিঃশ্বাস নিতে পারতাম।
বারি সাহেবের মৃত্যুর দুই বছর পর টগরের জন্ম। আমার বড় ছেলের একমাত্র সন্তান। আমার পুত্রবধু একটা গার্লস হাই স্কুলের গণিতের টিচার। ওর নাম মিলি। শ্যামাঙ্গী এই তরুণীটি স্বল্পভাষী। সে নিবিষ্ট মনে তার সংসার করে। কখনো কারও কাছে তার নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে না। টগরের দেখভালের দায়িত্ব আমার উপর। আমি বোধহয় এতদিনে একটা মনের মতো কাজ পেয়েছি। জানালার ধারে বসে টগর কে খাওয়াই। ভর দুপুরে সামনের দোতলা বাড়ির ছাদে তিনটা বিড়াল ছানা খেলা করে। ওদের দেখে আমার নাতিটা খুশি হয়। ভাবছি টগরের জন্য একটা লাল সোয়েটার বুনে দেবো। টগরের গাঁয়ের রঙ, মুখের গড়ন ঠিক ওর মায়ের মতো।
এমনি এক বিকালে আমি আর টগর বারান্দায় বসে খেলা করছি। ওকে বলি, তোর বারবি ডল দুটোর জন্য একটা প্যাকিং বক্স যোগার করেছি। পুরো বক্সটা লেস আর টুকরো কাপড় দিয়ে সাজিয়ে দেবো। পুতুলরা সংসার করবে। আমার অলক্ষ্যে মিলি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি ভঙ্গিটা বিষণ্ণ।আমি প্রশ্ন করি , কিছু বলবে , মা? মিলি নঞর্থক মাথা নাড়ে। টগর বলে, মা, দেখেছ? আমার পুতুলের ঘর। মিলি বলে, মানুষের জীবনটাই তো নিয়তির পুতুল খেলার ঘর। জীবনের নাট্যমঞ্চে আমরা সবাই অভিনেতা। কথাটা আমার মর্ম স্পর্শ করে। কিন্তু অর্থ বুঝতে পারিনা।
আমার বড় ছেলে আর পুত্রবধূর মধ্যে বেশ উচ্চস্বরে মতান্তর হতো। অনিক প্রায় মধ্যরাতে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরত। ওদের স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে আমি থাকতে চায়নি। কিন্তু কোন এক শীতের রাতে টগরের কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। বিছানায় উঠে বসে ধাতস্ত হতে সময় লাগে। তখন শুনতে পাই, কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ। দ্রুত ঘরের বাইরে বের হয়ে আসি। ডাইনিং স্পেসে টেবিলে রাখা প্লেট বাটি অনিক মেঝেতে আছড়ে ফেলে ভাঙ্গছে। আর সেই ভগ্নস্তুপের একপাশে নিঃসাড়ভাবে পড়ে আছে মিলি। ওর কপাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। অনিক হিংস্রভাবে মুখ খিস্তি করে বলে, বাপের বাড়ি থেকে দশ কাঠা জমি লিখে নিয়ে আসবি। নয়তো ঘেটি ধরে পিষে মারবো। অনিক তার স্ত্রীর বেতনের টাকা প্রায় কেড়ে নেয়। কিন্তু ও যে এমন দানবে পরিনত হয়েছে সেই বিষয়টি আমার ধারণার বাইরে ছিল। স্তম্ভিতভাব কাটার আগেই দেখি অনিক ফুলদানি তুলেছে স্ত্রীকে আঘাত করার জন্য। আমি দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে বলি, অনিক থাম। বড় ছেলে ঘুরে আমার দিকে তাকায়। আমি বলি, জমির দরকার হয় নিজে আয় করে কিনে নাও। স্ত্রীর উপর অত্যাচার করবে না। এই ঘটনার দুই দিন পর আমার বড় ছেলে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায়।
দেখতে দেখতে ছয় বছর পার হয়ে গেল। মিলি মাঝে মাঝে টগর কে নিয়ে আমাকে দেখতে আসে। আমি সর্বদা প্রার্থনা করি ওর মুখের উপর থেকে যেন বিষণ্ণভাবটা মুছে যায়। আমার বয়স প্রায় আশি হতে চলল। শরীরে বার্ধক্যজনিত রোগব্যধি বাসা বেঁধেছে। কিছুদিনের মধ্যে হয়ত অন্তিম শয্যায়শায়িত হব। পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার আগে আমার এই না পাঠানো চিঠিতে তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। তুমি আমাকে মুক্তির কথা বলেছিলে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়। একটা দেশ কয়বার স্বাধীন হয়? সেই স্বাধীনতা বেশীরভাগ মানুষের জীবনে কতটুকু প্রভাব রাখে? আমরা জীবনটা তো কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু কি হলো?