লীলাবালি

ভালবাসায় গল্পের শুরু (ফেব্রুয়ারী ২০২৩)

Lubna Negar
মোট ভোট ১৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৮৯
  • ২১৯
আবহমান বাংলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত হলেও রাজধানী ঢাকার বেশীর ভাগ স্থানে সেই সৌন্দর্যের চিহ্নমাত্র নেই । ট্রাফিক জ্যাম , বায়ু দূষণ , শব্দ দূষণ , প্রভৃতি কবলিত শহরে হাতে গোনা যে কয়টা পার্ক আছে সেগুলো যেন মানুষের বেচে থাকার অক্সিজেন । তেমনি আটপৌরে মধ্যবিত্ত জীবনে সীমিত আয় , প্রতিষ্ঠা লাভের লড়াই ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যে তাদের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হল বিয়ে । আজ বিন্তির বিয়ে । সারারাত তার একপ্রকার নির্ঘুম কেটেছে বলা চলে । সপ্তাহ দুয়েক আগে কলেজ থেকে বাসায় ফিরে অনুর মুখে সে খবরটা প্রথম শুনতে পায়। ড্রইং রুমে সোফায় বসে বিন্তি একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। অনু বিন্তির ছোট বোন। সে এসে কোনো ভূমিকা না করে বলেছিল, বড় আপু, তুমি রূপ আর বিদ্যা প্রদর্শনের পরীক্ষায় পাস করেছো। পাত্রপক্ষ তোমাকে পছন্দ করেছে। ঘটকের ভাষায়, ওঠ ছুড়ি তোর বিয়ে।
মা এসে বললেন, কথার ধরন দেখো। এই বাজারে পাত্র পাওয়া কত কঠিন সেটা বুঝিস? অনু বললো, এই ধরণের প্রথা নারীদের জন্য অবমাননাকর। মেয়েদের সবার আগে দরকার আর্থিক মুক্তি। অনুর স্পষ্ট কথায় একটু মনক্ষুন্ন হলেও বিন্তি নিজের উচ্ছাসটা চেপে রাখতে পারলো না। তিন বছর ধরে বিন্তি কে বিভিন্ন পাত্রপক্ষ দেখে গেছে। ষোল আনা আপ্যায়ন ভোগ করে দুই দিন পর তারা জানিয়ে দিয়েছে মেয়ে পছন্দ হয়নি। বিন্তির গায়ের রং কালো আর সে বেশ স্থুলকায়। মা দের দূরদর্শি চিন্তা করতে হয়। বিশেষ করে যার ঘরে তিনটি অবিবাহিতা মেয়ে আছে। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় থেকে মা বিন্তির জন্য পাত্র খোজাঁ শুরু করেন। বাবা কিছুটা আপত্তি করে বলেছিলেন, যুগ বদলেছে। এখন মেয়েরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকরি করছে। কিন্তু মা ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি বলেছিলেন, এই দেশে বেকার সংখ্যা কতো, তা জানো? যে দেশে একটা ছেলেরই চাকরি হয় না সেখানে একটা মেয়ে কিভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে? তাছাড়া বিয়ের বাজারে গুণ, বিদ্যা কিচ্ছু দেখে না। শুধু দেখে গায়ের রং ফর্সা কিনা।
বিন্তিরা উকিল সাহেবের বাড়ি ভাড়া থাকে। দুই তলায় তিন রুমের একটা বাসা। নিচ তলা থেকে চার তলা পর্যন্ত বাগান বিলাস আর মাধবী লতা ফুল গাছের ঝাড় দেয়াল বেয়ে উঠেছে। বিন্তি জানালা খুলে দেখতে পায় গাছ দুটো ফুলে সুশোভিত। বিন্তির বিয়েতে আলোকসজ্জা করা যায়নি। পাত্রপক্ষের ফার্নিচার, টেলিভিশন, ফ্রিজ ইত্যাদি উপহারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাবার জেরবার অবস্থা। বাড়িওয়ালা কে তিনি অনুরোধ করেছেন , চলতি মাসের ভাড়াটা তিনি পরের মাসে দেবেন। বাড়ির মালিক উদার প্রকৃতির মানুষ। তিনি মেনে নিয়ে বলেছেন, ভালোয় ভালোয় মেয়ের বিয়েটা হোক। বিন্তির মনে অবশ্য এইসব কথা এখন আসছে না। জানালার ধারে দাড়িঁয়ে সে গুন গুন করে গান গাইছে,
আজ যেমন করে গাইছে আকাশ,
তেমনি করে গাও।
এই আনন্দের দিনটার জন্য সে কতো না প্রতীক্ষা করেছে। কৈশোরে যখন তিন গোয়েন্দার বই ছেড়ে হুমায়ুন আহমেদের বই পড়া শুরু করে তখন থেকে মনে অস্পষ্ট স্বপ্ন দানা বাধতে শুরু করে। কলেজে বান্ধবীদের সাথে তার খুনসুটি হতো। টেলিভিশনে টাইটানিক সিনেমা দেখে কতো রাত লুকিয়ে কেদেঁছে। তার হবু স্বামীর নাম সাজ্জাদ হোসেন। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস। একটা ডেভলপার কোম্পানিতে চাকরি করে। বিন্তির ছোটমামার পরিচিত। সম্বন্ধটা করেছে ছোটমামা। বিন্তির ছবি দেখে নাকি সাজ্জাদ বলেছে, একটা স্বাভাবিক ছবি দিলেই তো হতো। ছবি দেখে মনে হয় কম্পিউটারে কারসাজি করা হয়েছে। বস্তুত, বুদ্ধিটা মায়ের। বিন্তির গায়ের রং কালো আর মুখের গড়ন কিছুটা বাকা হওয়ায় ছবিতে তাকে ভালো দেখায় না। মা পাড়ার দোকানের কম্পিউটার থেকে বিন্তির ছবি কিছুটা পরিবর্তন করে দিয়েছেন।
এইসব সত্ত্বেও পাত্রপক্ষ রাজী হয়েছে, যা তার পরিবারের জন্য বিরাট স্বস্তির। ঢাকা শহরে তো বটে, মফস্বল শহরেও এখন বিয়ের আগে ছেলে মেয়েরা মেলামেশা করে। পরস্পর কে জানার সুযোগ পায়। কিন্তু বিন্তির সাথে সাজ্জাদের কোনো কথা হয়নি। এমন কি ফেসবুক বা মোবাইল ফোনেও তারা যোগাযোগ করে নি। তবে সেটা নিয়ে বিন্তি মন খারাপ করেনি। কথা বলার জন্য তো সারা জীবন পড়ে আছে। আচ্ছা, বিয়ের পর তারা প্রথম কি বিষয় নিয়ে কথা বলা শুরু করবে? সে কি সাজ্জাদ কে বলবে,
এতো দিন যে বসে ছিলেম , পথ চেয়ে আর কাল গুনে
দেখা পেলেম ফাল্গুনে।
না, এইসব আচরণ সে করবে না। নাটকীয় হয়ে যাবে। সে বরং ধীরে ধীরে সাজ্জাদ কে জানার চেষ্টা করবে। তার শৈশব, ভালো লাগার বিষয়, শিক্ষা জীবনের অভিজ্ঞতা সব কিছু। একটা সময় পর সাজ্জাদ তার জীবনের অংশ হয়ে যাবে।
দরজায় করাঘাতের শব্দে বিন্তির ঘোর ভাঙ্গলো। মা বাইরে থেকে ডাকছে। দরজা খুলতেই মা বললো, কিরে , এতোক্ষণে তোর ঘুম ভাঙ্গলো? কখন থেকে ডাকছি। মায়ের এক হাতে হলুদ বাটা অন্য হাতে এক গ্লাস দুধ। যখন থেকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসা শুরু করেছে তখন থেকে বিন্তির রূপচর্চা শুরু হয়েছে। এখন যেন বিষয় টা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌছেঁ গেছে। তবে বিন্তি আজ আর আপত্তি করলো না। মা তাড়া দিলো, শীঘ্রই গোসল সেরে ফেল। পার্লারে যেতে হবে। সাজ সজ্জা সব বাকি। এতো খুশির মধ্যে ও মায়ের মুখে যে একটা উদ্বেগের ছাপ আছে, সেটা বিন্তির দৃষ্টি এড়ায় না।
সাজ সজ্জ্বা পর্ব নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হলো। কনে সাজাবার সময় ছোট খালা বিন্তির পাশে বসে ছিল। চুলের সাজটা তার পছন্দ হয়নি। পার্লারের মেয়েটি কে বললেন, সামনের চুলগুলো সরিয়ে দাও। টিকলি টা দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটি বললো, তাহলে পুরো চুলের সাজ নতুন করে করতে হবে। বিন্তির মনে পড়লো কাল রাতে মা বাবা কে বলছিলেন, টিকলিটা ছোট হয়ে গেছে। বাবা অসহায় ভাবে বলেছিলেন, সোনার ভরির দাম নব্বই হাজার টাকা। প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে আর ঋণ নেয়া যাবে না। মা তবু বলেছিলেন, হাতের বালা দেয়া গেল না। শ্বশুড় বাড়িতে কথা উঠবে। বাবা বলেছিলেন, আমাকে কি চুরি করতে বলো? তাছাড়া আমার আরও দুটো মেয়ে আছে।
মা এসে তাড়া দিলেন, তোমাদের সাজগোজ শেষ হয়েছে? কমিউনিটি সেন্টারে যেতে হবে। পাত্রপক্ষ ফোন দিয়েছে। ওরা আধ ঘন্টার মধ্যে রওনা দেবে। নিমেষে বিন্তির মন থেকে দুর্ভাবনাগুলো মিলিয়ে গেল। অজানা অনুভূতি মন কে দোলা দিয়ে যায়। অনুভূতিটি আনন্দের। শেষ বারের মতো সে নিজে কে আয়নায় দেখলো। বিন্তির মনে হলো, সত্যি সে সুন্দরী। অন্তত আজকের দিনের জন্য সে অপরূপা। বরযাত্রী যখন এসে পৌছাঁলো তখন পুরো কমিউনিটি সেন্টারে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। অতিথিদের কোলাহল, ঝলমলে পোশাক, হিন্দি গান কি নেই?
পাত্রপক্ষের অনুরোধে আপ্যায়ন পর্ব তাড়াতাড়ি চুকে গেল। নির্বিঘ্নে বিয়ে হয়ে যাবার পর বরযাত্রীর সাথে কনের শ্বশুড় বাড়ি যাবার পালা। গাড়িতে বিন্তি সাজ্জাদের পাশে বসলো। বিয়ের আসরে হট্টগোলের মধ্যে বিন্তি চোরা চোখে দুই একবার সাজ্জাদ কে দেখার চেষ্টা করেছে। সাজ্জাদের চোখ মুখ ভাবলেশ হীন। আরেকবার দেখেছে সে, সাজ্জাদ তার ইয়ার দোস্তদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। গাড়িতে দুই জনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। পুরো পথ সাজ্জাদ স্মার্ট ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রইলো।
শ্বশুড়বাড়িতে আয়োজনের তেমন ঘটা ছিল না। ঘনিষ্ট আত্নীয়রা এসে কনের মুখ দেখে গেলেন। বিন্তির মনে হলো তাদের যেন আশা ভঙ্গ হয়েছে। এর মধ্যে টুকরো টুকরো মন্তব্য তার কানে এসেছে। মেয়ে বাপের বাড়ি থেকে এই এনেছে? ড্রেসিং টেবিলটা সেগুন কাঠের নয়। হাতের চুড়িগুলো সিটি গোল্ডের। বৌভাতের সময় মেয়ের বাড়িতে বলে দিতে হবে, তারা যেন বিশ জনের বেশি না আসে।
এই শীতের রাতেও বিন্তি ঘামছিল। তার ক্লান্ত লাগছিল। অতঃপর ফুলশয্যা। ড্রইং রুমের পাশের ঘরটি তে ফুলশয্যার আয়োজন করা হয়েছে। পুরো বাড়ি ভরা অতিথি। বিন্তি বিছানায় একা বসে থাকলেও বাইরের শোরগোল তার ঠিকই কানে আসছিল। কিছুক্ষণ পর সাজ্জাদ এসে রুমে ঢুকলো। সে পোশাক পরিবর্তন করে এসেছে। তার গায়ে একটা সিল্কের পাঞ্জাবী। সে এসে জগ থেকে ঢেলে এক গ্লাস পানি পান করলো। তারপর বিন্তির পাশে এসে বসলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিন্তি কে নিরীক্ষণ করতে লাগলো। তার ঐ দৃষ্টির সামনে বিন্তি কেমন জড়োসড়ো হয়ে গেলো। সাজ্জাদ বললো, সারাদিন ধকল গেছে। রাত অনেক হয়েছে। চলো শুরু করা যাক। বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বিন্তি স্বামীর দিকে তাকালো। সাজ্জাদ সম্মতি অসম্মতির তোয়াক্কা না করে শাড়ির আচঁলের নিচে বুক চেপে ধরে বিন্তি কে চুমু খেতে শুরু করলো। বিয়ের লাইসেন্স হাতে পেয়ে সাজ্জাদ স্ত্রীর শরীর দেখা শুরু করেছে।
এখন মধ্যরাত। কোলাহল মুখর বাড়িটি নীরব হয়ে গেছে। প্রণয়লীলা সাঙ্গ হবার পর সাজ্জাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। বিন্তি একা জেগে আছে। নিজের বিশ্রস্ত বেশবাসের দিকে তাকিয়ে ভাবছে কিছুক্ষণ আগে তার সাথে যা ঘটলো সেই ঘটনা কে কি বলা যায়? প্রেম? সহবাস? নাকি বিবাহকালীন ধর্ষন? এইসব প্রশ্ন সে কখনো প্রকাশ্যে উত্থাপন করতে পারবে? বিন্তি জানে না। শুধু বুঝলো তার জীবনে আরেকটা অধ্যায় শুরু হলো।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
বিষণ্ন সুমন অভিনন্দন ও ভালোবাসা রইলো
সাইফুল সজীব আমার কাছে গল্পের গতি, গল্পের প্লট, গল্প বলার ধরন অসাধারণ লেগেছে। ভালো থাকবেন।
শিশির সিক্ত পল্লব সময় পাল্টে গিয়েছে। বিন্তিদের সাবলম্বি হয়ে নিজের পায়ে দাড়ানো উচিত।
ভালো লাগেনি ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
ফয়জুল মহী অপূর্ব আবেশ জড়ানো লেখা,
ভালো লাগেনি ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
Lutful Bari Panna ডিফারেন্ট থিংকিং। চমৎকার।
ভালো লাগেনি ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
শাহ আজিজ প্রথম প্রথম ওরকমই লাগবে , দ্বিতীয়ার্ধে শেষ রাতে বিন্তি নিজেই উদ্যোগী হয়ে শব্দহীন ভাষায় বলবে চল শুরু করা যাক , হে হে হে ।
ভালো লাগেনি ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

প্রতীক্ষিত ভালবাসা কি তাহলে এমন হয়???

০৩ মার্চ - ২০১৯ গল্প/কবিতা: ২৯ টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৮৯

বিচারক স্কোরঃ ২.৬১ / ৭.০ পাঠক স্কোরঃ ২.২৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "অর্জন”
কবিতার বিষয় "অর্জন”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মার্চ,২০২৩