মায়ের স্নেহের বৈচিত্র্যতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২০ নভেম্বর ১৯৮৮
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৯৪

বিচারক স্কোরঃ ৩.২৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৭ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মা (মে ২০১৯)

পলাশীর ছেলে
মা

সংখ্যা

মোট ভোট ১৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৯৪

সৌবর্ণ বাঁধন

comment ৬  favorite ০  import_contacts ৩৮২
(১)
সহদেবের দুষ্টামি দিন দিন মাত্রা ছেড়ে যাচ্ছে। পনেরো বছর বয়সেই স্কুল কলেজের পাশ ফেলের দেনা পাওনা মিটিয়ে, স্বঘোষিত স্বাধীনতাকে বরণ করেছে সে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি যে তাকে নিয়ে সমালোচনায় আসর মাতায় তা তার ভাল মতোই জানা! তাই সম্ভবত জ্ঞাতসারেই তাদের ছোট খাটো ক্ষতি না করতে পারলে দিনটা ভালো যায় না তার। কারো আলুটা কারো মুলোটা মাঝে মাঝেই হাওয়া হয়ে যায়! অথবা যত্ন করে দেখে রাখা পাকা আম গুলো আর পাওয়া যায় না! রবিঠাকুরের কবিতার ‘যা কিছু হারায়; কেষ্টা ব্যাটাই চোর’ এর মতো এ গ্রামে সহদেবেরও এমন সুনাম!
সমবয়সীরা যখন বাবু সেজে মাথার চুলে কদম ছাঁট দিয়ে স্কুলে দৌড়ায়, সহদেব তা দেখে খুক খুক করে হাসে। তাদের দেখে তার মনে হয় সবগুলো যেন গড়ের হাটের মেলায় খেলানো একদল পুতুল! তবে তার এতোসব কীর্তিকলাপের প্রাত্যাহিক ব্রেকিং নিউজেও যিনি নিস্পৃহ থাকেন তিনি তার মা পলাশী। সাধারণের চেয়েও অনেক বেশি সহজ সরল এই মহিলা কোন কিছুতেই তেমন প্রতিক্রিয়া দেখান না কখনো। বিশেষত সহদেবের ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কখনোই তাকে কেউ রাগতে দেখে নাই। জ্ঞানীজনেরা বলেন বড় ছেলের প্রতি নাকি মায়েদের অতিমাত্রার প্রশ্রয় আর পক্ষপাতসুলভ স্নেহ কাজ করে! এ গ্রামেও বউঝিদের ধারণা বিষয়টা সে রকমই! অনেকে আবার বলে- মহিলা ভান ধরে এইসব ভাব দেখায়! আসলে সেই ছেলেকে শিখিয়ে পড়িয়ে এসব করাচ্ছে। তা যাই হোক, পলাশীর মুখ দেখে কেউই বুঝতে পারেনা তেমন কিছুই। কিছু মুখ হয় মুখোশের মতো, আসল চেহারা লুকানোই থাকে চিরকাল!
সহদেবের ছোটভাই বঙ্কু, বছর দশেক বয়স। চেহারাতে যেমন তার ভাইয়ের সাথে খুব বেশি মিল নাই, আচার আচরণেও আকাশ পাতাল তফাৎ। সবাই বলে বড়টা হয়েছে বাপের মতো আর ছোটটা অবিকল মায়ের মতোন। মায়ের মতোই অতিমাত্রায় চুপচাপ সে আর মায়ের পাশেই ঘোরাঘুরি করে কাটে তার সারাদিন। টানাটানা চোখের বিশেষ মায়া আছে বলতেই হবে, কারণ তার ভাই সহদেব ও তাকে খুব বেশি স্নেহ করে। তাই ভাইভাই বিবাদ বিসংবাদ নিয়ে পলাশীকে কখনোই ব্যতিব্যস্ত হতে হয় নাই। বঙ্কু পেটে আসার আগে পলাশীর আচরণ এমন ছিলোনা। কথায় কথায় রেগে যাওয়া আর স্বামী সুজনের সাথে হাতাহাতির বাতিক ছিলো তার। কিন্তু ছোট ছেলেটার জন্মের পর থেকেই অনেক বেশি শান্ত হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। সম্ভবত সংসারের প্রতি চিরবিতৃষ্ণ সুজনও খেয়াল করেছিলো তা। হাতাহাতি ছাড়াই দুইবেলা বাড়ি এসে ভাত খেতে পাওয়ার সৌভাগ্যেই বোধ হয় সুজনের কাছেও তার ছোট ছেলের জন্ম আশীর্বাদই মনে হয়! সুজন একটু অদ্ভুত গোছের মানুষ। আগে সে এই গাও গেরামে গোলাপ ফুল বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছিলো। কিন্তু এই অভাবের দেশে যেখানে খাবার জোটানোই দায় সেখানে ফুল কেনা একটা উচ্চমার্গীয় বিলাসিতাই। স্বভাবিক ভাবেই ব্যবসাটা একেবারেই জমে নাই। হিসাবের খাতা শূন্যই থেকে গিয়েছিলো। এরপর কিছুদিন এক বুড়ো সহিসের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে সাগরেদের কাজ করেছিলো সে। বিয়েবাড়ীতে মাঝে সাঝে ডাক পরলেও আয়ের অবস্থা এতো খারাপ হয়ে পরেছিল যে ঘোড়ার খাবার কেনার টাকাও জোটাতে পারতোনা সেই সহিস। তারপরও তাকে ছেড়ে আসে নাই সুজন। বুড়ো সহিস, ঘোড়া আর গাড়িটার উপর তার মায়া জন্মে গিয়েছিলো। চিরন্তন নিয়মে কোন কিছুই স্থায়ী হয়না। আর সুজনের জীবনে আসলেই স্তায়ী বন্দোবস্ত বলে কিছু যে নেই তা প্রমাণ করতেই একদিন বুড়োটা হুট করে মরেই গেলো। তার কোন আত্মীয় কোথায় আছে, কার সাথেই বা কেমন সম্পর্ক, এর হদিশ বের করতে না পেরে, শেষকালে দুইটি রুগ্ন ঘোড়া আর একটা ভাংগা কঙ্কালের মতো হাড় জিরজিরে গাড়ি তার অনভিপ্রেত মালিকানায় চলে এসেছিল। জীবনে প্রথমবারের মতো স্বামীকে দৃশ্যমান কোন অর্জন বাসায় আনতে দেখে পলাশী প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলো সেইদিন। কয়েকদিন পর অবশ্য টের পেয়েছিলো যে সুজন শখ করে গরীবের ঘোড়ারোগ ঘরে টেনে এনেছে। কিন্তু তার দুই ছেলে ততদিনে ঘোড়াগুলোকে আদর সোহাগ করে মোটামুটি বাড়ির মানুষ বানিয়ে ফেলেছিল। সহদেবটা পড়ালেখায় কাঁচা হলে কি হবে; সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি চালানো আয়ত্ত্ব করেছিলো। এমনকি রাজা বাদশাহদের মতো রাজকীয় কায়দায় ঘোড়ার পিঠে চাপাও শিখে ফেলেছিলো দুই ভাই। প্রতিদিন বিকালে সহদেব যখন গাড়ি চালিয়ে ছোটভাইকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেত; দৃশ্যটা খুব বেশি স্পর্শ করতো পলাশীর মনকে। ছোট্ট বঙ্কুর যে মা ছাড়াও আরেকটা নির্ভরতার জায়গা আছে এটা ভেবে তার মন একটা অদ্ভুত প্রশান্তি পেতো। তাই অভাবের সংসারে, ভালোভাবে দুই বেলা ভাত না জুটলেও, আপাতত উপদ্রবটা মেনে নিয়েছিলো সে।

(৩)
সেবার গরমকালটা ভালো যাচ্ছিলোনা। শুরু থেকেই ঝড় বৃষ্টির তোড়ে গ্রীষ্মকে বর্ষা থেকে আলাদা করাই মুশকিল হয়ে পরেছিলো। সহদেবের মন সকাল থেকেই খুব খারাপ! একেতো ঘোড়ার গাড়িটা নিয়ে বাহিরে বের হওয়া যাচ্ছেনা। খানিক যেতেই চাকা মাটিতে ডেবে যাচ্ছে। আর এদিকে ঘোড়াগুলোর চরে বেড়ানোর ঘাসের জমিটাও পানির নীচে চলে গিয়েছে। নিজেদেরি খাবার জোটেনা যাদের, তারা ঘোড়ার খাবার আনবে কোথায় থেকে! এ নিয়েই তার চির শান্ত মা হঠাত রূদ্রমূর্তি ধারণ করেছেন। ঘুম থেকে ঊঠার সময় থেকেই মা বাবার চীৎকার চেঁচামেচি তার ঘুমের বারোটা বাজিয়েছিলো সেইদিন। এমনিতেই ছোটবেলা থেকেই সহদেবের দিকে তার মা পলাশীর স্নেহের সামান্য ঘাটতি আছে বলে মনে হয়। অন্তত সহদেবের কাছে তো মাঝে মাঝেই মনে হয়! অবশ্য সহদেবের দিদা মালতী বলতো পলাশী নাকি সহদেবের জন্মের পর মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। সারাদিন ড্যাব ড্যাব করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো; নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে। ছোটবেলা থেকে তাই মার বকাবকির অত্যাচার সহ্য না করতে হলেও স্নেহের সৌভাগ্যও বেশি জোটেনি তার কপালে। আজ সকালে যখন পলাশীর মেজাজ সপ্তমে চড়েছিল, সে সুজনকে সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছিলো, এবার যেন ঘোড়া গুলো বিদায় করে! নাহলে আর এ বাড়ির কারোরই ভাত জুটবেনা। আজ থেকে এ বাড়িতে রান্না বন্ধ। যাদের নিজেদের দুইবেলা ভাত জোটেনা, তাদের আবার বাদশাহি শখ!
ঘুম থেকে উঠেই এরকম বাদানুবাদ শুনে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি সহদেব। মানুষের মনে কখন কার বা কিসের জন্য ভালোবাসা জন্মে তার কোন গাণিতিক নিয়ম থাকেনা; অথবা থাকলেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য তা বের করা দুষ্কর। তেমনি এক অজানা মায়ায় পড়ে গিয়েছিলো সহদেব। বিশেষ করে ওদের পিঠে চাপলে নিজেকে যে রাজা না হলেও সিনেমার হিরো মনে হয় তার এ ব্যপারে সন্দেহ নাই! তাই সে ঘুমের ঘোরে বোধ বুদ্ধির মাথা খেয়ে তার মাকে থামাতে গিয়েছিলো। এর আগে কখনো এমন সে করে নাই, আর পলাশীও তার বড় সন্তানকে এমন করতে আগে দেখে নাই। হতে পারে এজন্যই মুখ ফস্কে বলেই ফেলেছিলো- “তুই কথা বলার কেরে? পড়াশুনার মাথা নাই, আয়-রোজগারের ক্ষমতা নাই, তোর খাবারই তো সবার আগে বন্ধ করার কথা!” সবসময় মায়ের বকুনি শোনে যে ছেলেরা তারা অভ্যস্ত হয়ে যায়, কিন্তু সহদেব অভ্যস্ত ছিলোনা। তাছাড়া সেখানে তার ছোটভাই বঙ্কুটাও দাঁড়িয়ে ছিলো; মান-সন্মান আর থাকে নাই! এক্কেবারে ভাইয়ের সামনে মঞ্চের রাজা থেকে জোকার বনে যাওয়া আর কি! এক ঝটকা দিয়ে সে পলাশীর শোবার ঘরের নড়বড়ে খুঁটীটা নাড়া দিতেই ছনের চাল সহ মাটিতে পড়েছিলো সেটা।
এতোদিন সহদেবের প্রতি কখনোই কোন খারাপ আচরণ করেনাই যে পলাশী, এ দৃশ্য দেখে হিতাহিত শূন্য হয়ে বটি নিয়ে তাড়া করেছিলো তাকে। বিপদ বুঝে দৃড় পায়ে সেই স্থান থেকে পালিয়েছিলো সে! কিন্তু ততোক্ষণে পাড়াময় হয়ে গিয়েছে সংবাদটা! দূরে কানছগাড়ির পুকুরের ধারে বসে সহদেব ভাবছিলো সবকিছু। না আসলেই সে আজ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে! শাসন না করলেও তো কখনোই স্নেহ পায়নি সে মায়ের! এই যে বঙ্কুটাকে এত জড়িয়ে রাখে মা, তাকে তো কখনো রাখে নাই! খুব কষ্ট হয় তার, নিজেকে মেঘগুলোর মতো একা লাগে, ওদের মতো গলে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল আজ। না সে সত্যিই চলে যাবে; জানা নেই কই যাবে, কিভাবে যাবে! তবুও যাবে। আপনার বলতে ওই পিচ্চি ভাই বঙ্কুটার কথাই তার মনে হয়। ওকেই সে ভালোবাসে, রক্তের টানের ভাই বলে কথা। আর কার জন্য সহদেবের কোন স্নেহ নেই। সে যখন বাড়ি ফিরতো দেরী করে, পিচ্চি বঙ্কুই তার জন্য খাবার রেখে দিতো। ছোট্ট মানুষটার এতো বুদ্ধি! এতো ভালোবাসা ভাইয়ের জন্য!

সহদেব ভাবে ওর সাথে দেখা না করে যাওয়াটা ঠিক হবেনা! তাছাড়া বঙ্কু ওর কাছে আবদার করেছিলো একদিন ঘোড়ার গড়িতে চেপে স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার। আজ বিকালেই ওকে ঘুড়িয়ে আনবে! তারপর রাতের বাসে ঢাকা চলে যাবে; কি হবে সেটা পরে দেখা যাবে!

(৪)
আজ বঙ্কুর স্কুলে যাওয়া হয় নাই। সারাদিন মায়ের সাথে মিলে সে ঘরের চালাটা ঠিক করেছে। বঙ্কুর মা ঘেঁষা ভাব দেখে পড়শিরা ঠাট্টা করে বলে- আসলে ছোটটার মেয়ে হওয়ার কথা ছিলো, ভুলে ছেলে হয়ে গিয়েছে! তা যে যাই বলুক বঙ্কুর তাতে কিছু যায় আসেনা। মায়ের সাথে কাজ করতে করতে গল্প শুনতেই তার ভালো লাগে। হতে পারে মানসিক অস্থিরতার কারণে পলাশী যে স্নেহ সহদেবকে দিতে পারে নাই, তার পুরোটাই ছোট ছেলেটাকে উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে।
আজকে রান্না করার চাল ছিলোনা। সুজন বা সহদেব কেউই ঝগড়ার পর থেকে বাসায় আসে নাই। পলাশী পাশের বাড়ি থেকে কোনভাবে এক বাটি ভাঙ্গা চাল জোগাড় করে এনেছিল বহু অনুনয় করে। প্রায়শই তার অজুহাত শুনে বিরক্ত পড়শিরা আজকাল সাহায্য করতে চায়না! নিজের দুঃখে ভিতরে ভিতরে নীল হয়ে সে আজকাল মান-অপমানও ভুলে গিয়েছে। কিছু অপমান সহ্য করে হলেও যদি খাবার জোটে! তার মা বলতো মেয়েদের স্বামীভাগ্য নাকি জন্মের আগেই ঠিক করা থাকে; সাতজন্মে একই মানুষের সাথে! এইজন্মে পলাশি মাঝে মাঝেই মনে মনে প্রার্থনা করে, এবার যা হয়েছে হোক! পরজন্মে যেন ভগবান তাকে এই ভাগ্য না দেন!
খুব বেশি কষ্ট হলে বঙ্কুর মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁচার শেষ আগ্রহ বাঁচিয়ে রাখতে চায় পলাশী। হয়তো এজন্যই সে এখনো বেঁচে আছে। মানুষের বাঁচার জন্য কোন না কোন একটা আশা লাগেই।
বঙ্কু প্রতিদিনের মতো আজো চাল ধোয়ার জন্য কলপাড়ে বসেছিলো। তার মনটাও আসলে ভালো নাই। সাওকাল থেকেই বড়ভাই এর খবর নেই। তারমধ্যে আজ বিকালে তার ভাইয়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে ঘুরতে যাবার কথা। স্টেশনে নাকি বড় মেলা বসেছে! যাওয়া হলে সে মাটির একটা টমটম গাড়ি কেনা যেত! এসব হাবিজাবি ভাবতেই বোধ হয় বঙ্কু একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিলো। সেটুকু অন্যমনস্কতার ফাঁকেই হাতের ফাঁক গলে সবটুকু চাল গিয়ে পড়লো পাশের ড্রেনটার মধ্যে! একটু দূরেই চুলা জ্বালাচ্ছিল পলাশি। এতো কষ্ট করে আনা চাল ড্রেনে পড়তে দেখে হঠাত তার মাথাটা কেমন জানি করে উঠলো। অপমানের বিষে নীল হয়ে যোগাড় করা চাল এভাবে পুরোটা নষ্ট হতে দেখে চুলার আগুন জ্বলার আগেই মাথায় রাগের আগুন জ্বললো তার। পাশে রাখা শক্ত কঞ্চিটা তুলে নিয়ে বঙ্কুর চুলের মুঠি ধরে আচ্ছামতো বঙ্কুকে পেটানো শুরু করলে, পাশের বাড়ির মানুষ জন চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে আসলো এইদিকটায়। কোনভাবে তার উন্মাদনা থেকে বঙ্কুকে ছাড়ালো তারা। কোনদিক না তাকিয়ে মাঠের দিকে হাটা দিলো পলাশী।
বেলা পড়ে এলে, মাথাটা ঠান্ডা বোধ হলো তার। আগের সব ঘটনা মনে পড়তেই বুকটা ধক করে উঠলো। তার প্রিয় ছেলেটা এখন কি অবস্থায় আছে, কি করছে, ভাবতেই খুব কান্না পেলো তার। দ্রুত পায়ে বাড়ির পথে রওনা দিল পলাশী। বাড়িতে এসে বেশ কয়েকবার খুব জোরে চেঁচাল বঙ্কুর নাম ধরে। কিন্তু তার দেখা পাওয়া গেলো না। পাশের বাড়ির বঊটাকে জিজ্ঞাসা করলে বলল সেও দেখে নাই। তবে পলাশিকে বলল-“মা হয়ে ছেলেকে কেউ এভাবে পেটায়! মায়া দরদ কি কিছুই নাই!”
এসব শোনার মতো অবস্থা পলাশীর ছিলোনা! হঠাত তার মনে হলো নিজের ঘরটাই তো দেখা হয় নাই। তাড়াতাড়ি দরোজা খুলতে গিয়েই চোখ বড় করে মেঝেতে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো পলাশী। ঘরের ছাদ থেকে রশিতে লটকে ঝুলে আছে তার প্রিয় ছেলে, তার যাদুধন। জিহবা বের হয়ে আছে, ঘাড়টা একদিকে বাঁকানো। জীবনের কোনই লক্ষণ নেই সেই ঝুলন্ত শরীরে!

(৫)
আশেপাশের এলাকার সব মানুষ সেইদিন বিকাল বেলা চলে এসেছিলো পলাশীর বাড়ি। যারা কখনো তার নাম শোনেনি তারাও এসেছিলো। আত্মহত্যার ঘটনার রটনা স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি ছড়ায়। কেউ কেউ বলছে “আত্মহত্যা নাকি হত্যা!” কেঊ বলছে- “মা টা কি ডাইনীরে বাবা! ছেলেকে এভাবে মারে কেউ!” আরো নানান কথা ভাসছে এই বৈকালিক বাতাসে। পলাশীর মা মালতীও চলে এসেছে পাশের গ্রাম থেকে। তার ঘাড়ে মাথা দিয়ে বোবার মতো নির্বিকার বসে আছে পলাশী। পৃথিবীর কোন কথাতেই যেন তার যায় আসেনা। হঠাত পলাশী পাগলের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে মাকে বলে ঊঠলো- “ সব ওই কুড়ায় পাওয়া কুলাঙ্গার ছেলেটার দোষ। সুজন যদি রাস্তা থেকে ওকে তুলে এনে সন্তান বলে কোলে তুলে না দিত! এমন হতোনা, কিছুতেই হতোনা! আজ সকালে ওই কুলাঙ্গারটাকে মারতে গিয়েছিলাম আর মরে গেলো আমার বুকের মাণিক!”
মালতী তার মেয়ের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরলেন সাথসাথেই। সবই জানেন মালতী। প্রথম যেদিন সহদেবকে তুলে এনে পলাশীকে দিয়ে বলেছিলো অসহায় বাচ্চাটার যাওয়ার জায়গা নাই; তারা না দেখলে মরেই যাবে হয়তো! সেদিন মালতী সেখানে উপস্থিত ছিল! অভাবের সংসারে তার মেয়ে জামাইয়ের যেখানে নিজেরই চলেনা, সেখানে আরেক আপদ সারাজীবনের জন্য টেনে আনাটা তারো ভালো লেগে নাই। পলাশীটার মাথাও খারাপ হয়ে গিয়েছিলো এই চাপে! তবুও মালতীই তখন সব বিপদ সামালে নিয়েছিলো। ভগবানের সৃষ্টি তা রাস্তায় পাওয়া যাক আর গর্ভে আসুক, তাকে ফেলে দেওয়া যাবেনা, এই বোধ কাজ করছিলো তখন তার মনে। তাছাড়া বাচ্চাটাকে আশ্রয় না দিলে যদি তার মেয়ের অমঙ্গল হয়! সেই চিন্তাও ছিল!
মালতী ভাবতে পারছিল না কি করে সামলাবে আজ। সম্ভবত প্রকৃতি জীবনে একের পর এক নাটক মঞ্চায়ন করে। আনন্দে শোকে উল্লাসে কখনোই নাটকীয়তার অভাব থাকেনা! এরকম এক অদ্ভুত দৃশ্য তার চোখে পড়লো এই মুহূর্তে! আঙ্গুল দিয়ে পলাশীকে নাড়া দিয়ে একটু দূরে দেখাল সে কিছু একটা।
সহদেব কোথায় থেকে যেন পাগড়ি আর আলখাল্লা জোগাড় করেছে। ভাঙ্গা ঘোড়ার গাড়িটার পুরোটা কাঠামো ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। ঘোড়া গুলোর শরীরো ফুলের মালা দিয়ে জড়ানো। সহদেবের চোখ ফুলে লাল, মাতালের মতো ত্রস্ত পায়ে এসে পলাশীর কোলের উপর মাথা রেখে বলল-“ মারে ভাইটা আমার আইজ বিকালে ঘোড়ার গাড়ি চইরা স্টেশন যাইতে চাইছিল। অনুমতি দাও মা শ্মশানে পোড়ার আগে স্টেশনের পাশ দিয়া নাই যাই অরে!”
মালতী বুঝে উঠতে পারছিল না কিভাবে সামলাবে এই পরিস্থিতি। কেউ না জানুক সেতো জানে সহদেব আসলে পলাশীরর ছেলে নয়। আর আজ এখন যদি পলাশী পাগলামি করে এই কথা প্রকাশ করে ফেলে, তখন তো মেয়েটার আসলেই কেউই থাকবে না! তাড়াতাড়ি মেয়েকে সেখান থেকে সড়িয়ে নেয়ার জন্য জড়িয়ে ধরে অন্য দিকে নেয়ার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু শক্ত হাতে বাঁধা দিলো পলাশী।
কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে বাকরুদ্ধ পলাশী হঠাত হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। সহদেবের মাথায় হাত রেখে ডুকরে উঠে বলল-“ যা বাবা ভাইয়ের শেষ শখ পূরণ করে আয়!”

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement