প্লানচেট ও বাস্তব।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ জানুয়ারী ২০১৯
গল্প/কবিতা: ১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

বাদল মেঘের রিমঝিম “বৃষ্টি”
উষ্ণতা

সংখ্যা

Kaptan Noor

comment ০  favorite ০  import_contacts ৫০
৬/৭ বছর আগের কথা। প্লানচেট লেখক হিসেবে পাড়ায় অল্পকিছু পরিচিতি হয়েছে আমার ।
সকালের দিকে আমার নাতি ছুটে এসে বলল- নানু, বাদল ভাই ভোর রাতে মারা গেছে, শুনেছো? মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে। তুমি যাবে না?
নিশ্চয়ই যাবো, চলো হাত ধরো আমার।
ঘটনাস্থলে সত্যিই অনেক লোক । আমি একজন মুরুব্বি। সবাই সরে দাঁড়ালো। এক ইয়ংম্যান বলল- প্লানচেট কাকু, এখানে বসেন।
শুনলাম, দুপুরে মসজিদে জানাজা হবে এবং বনানীতে সমাহিত করা হবে বাদলকে। ও একলাই ছাদের চিলে কোঠার ঘরে থাকতো ওর বোনকে নিয়ে। দেখলাম, ওর নিকট আত্মীয় স্বজন সব এসে পড়েছে।
জোড়া ছ'তলার মালিক রিমঝিমের বাবাকে দেখলাম ছোটাছুটি করে সবকিছু তদারকি করছেন।
গতকালত রিমঝিমের গায়ে হলুদ হয়ে গেলো। জোড়া ছয় তলা বাড়ি ফুল আর আলোকসজ্জায় এখনো সাজানো রয়েছে দেখলাম। আজ হয়তো বর পক্ষ ওকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। এমন সময় ভাড়াটিয়া বদলের এই করুণ মৃত্যু, ভাবাই যায় না। তাছাড়া পাড়ার সকলেই জানে রিমঝিম আর বাদলের একটা সম্পর্ক ছিল। এই দুনিয়াই হচ্ছে আলো আর আঁধারের খেলা। কখন কি হবে বিধাতাই জানে? অকস্মাৎ উপর থেকে বাবা বলে চিৎকার শুনলাম। তাকিয়ে দেখি অলিন্দে এসে দাঁড়িয়েছে রিমঝিম, সাদা ম্যাক্সিতে, মুখে হাতে হলুদের ছাপ এখনো জ্বলজ্বল করছে।
রিমঝিম উচ্চ স্বরে বলে উঠলো- বাবা, আলোকসজ্জা- ফুলের বাহার সব সরিয়ে ফেলো। আমি আজ কিছুতেই এ বাড়ি ছেড়ে যাব না। ওদের আসতে নিষেধ করে দাও ।
মসজিদের ইমাম সাহেব কাছেই ছিলেন। বাড়িওয়ালা খান সাহেবের কানে কানে বললেন- শুধু তো গায়ে হলুদ হয়েছে, বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দিলে কোন ক্ষতি নাই।
খান সাহেব কন্যা অন্ত প্রাণ- ইশারা করলেন পাড়ার ছেলেদের দিকে।
নিমিষেই বিয়ে বাড়ির সব সাজ-সজ্জা উধাও।
ছয় তলার চিলে কোঠা থেকে নামানো হলো বাদলের মরদেহ- গ্যারেজে। এখানেই মনে হয় মসজিদের কর্মীরা বাদলের গোসল-কাফন ইত্যাদি সম্পন্ন করবে।
আমি আবার ভাবতে বসলাম- বাদলতো মনে হয় চট্টগ্রামের ছেলে ছিলো। স্মার্ট এবং ব্রিলিয়ান্ট। অনেকদিন এ বাড়িতে ভাড়া আছে । সবাই জানে বাড়িওয়ালার একমাত্র মেয়ে রিমঝিমের সাথে ওর বন্ধুত্বের কথা।
বি.সি.এস পরীক্ষায় টপ করেছিল বাদল। কাস্টমস্ এর এসিসট্যান্ট কমিশনারের চাকুরি চয়েজ করেছিল। সাভারে ট্রেনিংয়ে ছিল। তখনই ধরা পড়ে ওর কিডনীর প্রবলেম এবং ক্যান্সারের আক্রমণ। আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো। দেখলাম, লাশ যথারীতি চলে যাচেছ কবরের উদ্দেশ্যে।
বাদলের চলে যাবার এক সপ্তাহের মধ্যে রিমঝিম আমার বাসায় এসে হাজির।
বলল- প্লানচেট কাকু, আত্মা অবিনশ্বর আপনি তো ভালই জানেন। আমি প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বনানীতে যাই ওর কছে। প্রার্থনা করি ওর জন্য। আচ্ছা, ও কি আমাকে দেখতে পায়। আমার কথা শুনতে কিংবা বুঝতে পারে। রিমঝিমের আকুল দৃষ্টি আমার দিকে।
আমিও পূর্ণ দৃষ্টিতে এই অনিন্দ্য সুন্দর মেয়েটির দিকে তাকালাম। ভাবলাম হায়, বিধাতা এই ইয়ং মেয়েটার জীবনে কেন এই অমানিশার অন্ধকার।
ওকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম। বললাম, সব ধর্মেই আছে, আত্মারা সন্ধ্যার পর বের হতে পারে কবর অথবা সমাধি থেকে। আর নিকটের জীবিত মানুষদের দেখতেও পারে। তবে এসব বিদেহী আত্মা তাদের আস্তানা ছেড়ে দূরে যাওয়া নিষেধ। কারণ- কবরের আযাব বলে একটা কথা আছে না।
রিমঝিম অকস্মাৎ ব্যাগ থেকে একটা চিরকুট বের করে আমাকে দিল। বলল জীবনের শেষ মুহূর্তে বাদল এটা আমাকে দিয়ে গেছে।
পড়লাম
“সহসা আমাকে চলে যেতে হবে,
এই সুন্দর পৃথিবী আর তোমাকে ছেড়ে
দূরে, বহু দূরে, ওপারে।
রিমঝিম তোমাকে একটা অনুরোধ রেখে যাচ্ছি,
এই অভাগারে মনে রেখো আজীবন ।
তারপর রিমঝিম আমাকে অনুরোধ রাখল- আমি যেন প্লানচেটের কোন আসরে বাদলকে আনতে চেষ্টা করি। ও কেমন আছে জানতে ইচেছ করে।
মাস দুয়েক পর আবার হাজির হল রিমঝিম। বলল- কাকু বিয়ে ভেঙ্গে দিলাম। পাসপোর্ট, ভিসা হয়ে গেছে, আমি আমেরিকায় চলে যাচ্ছি শিঘ্রী। ওখানে পড়াশুনা করব। বাবারতে টাকার কমতি নেই। আমিইতো একমাত্র কন্যা। অনেক কষ্টে মা বাবাকে রাজি করিয়েছি। তারপর আবার বললো- আপনার ভাই ও ভাবীরা তো আমেরিকায় আছে জানি। ওদের দেখতে হলেও একদিন চলে আসেন। আমিও দেখতে পাব আপনাকে। খুব ভাল লাগবে। এর মধ্যে কখনো যদি প্লানচেটে ধরা দেয় বাদল তাহলে ওর অজানা কথাও জানতে পারব।


প্লানচেটে: বাদলের আবির্ভাব।
একদিন সত্যিই বাদলকে পেয়ে গেলাম আমাদের প্লানচেটের আসরে। এসেই সে। বলল, প্লানচেট কাকুরা, রিমঝিম কিন্তু সেদিন ভোরে মানে যেদিন আমার মৃত্যু হল সেই কাক ডাকা ভোরে ও সত্যিই এসেছিল আমার চিলে কোঠার ঘরে। বলেছিলো
আমাকে তুমি নাও বাদল ভাই। উন্মাদিনীর মত হিসৃহিস্ করে উঠেছিলো রিমঝিম।
চিলেকোঠার ঘরে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে চমকে উঠি আমি। একেবারে হতভম্ব হয়ে যাই।
এখানে কি করে এলে তুমি। এখন রাত কত, বুবু কোথায়? এক নিশ্বাসে বলে উঠি আমি।
ভোর পাঁচটা বোধ হয়। তোমার বুবু নীচে গেছেন- ওজু করে নামাজে বসবেন। সেই সুযোগেই এসেছি। হাতে সময় বেশী নেই। আমাকে তোমায় গ্রহণ করতেই হবে। উত্তেজিত কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে রিমঝিম।
কি বলছ যা- তা। শান্ত হও, প্লিজ, এমন কি হয়েছে? এটুকু বলেই হাঁপ ধরে যায় আমার। হাজার হোক শরীরে ধার করা রক্ত- কত আর শক্তি জোগাবে। জোরে জোরে নিশ্বাস টানি আমি।
জানো নিশ্চয়, কাল বিকেলে আমার গায়ে হলুদ হয়ে গেছে। আজ দুপুরে বিয়ে- তারপর ওরা হয়ত বিকেলের মধ্যেই আমায় নিয়ে যাবে। অতএব, এখনই লাস্ট চান্স। সূবর্ণ সুযোগ। এ কথা বলে রিমঝিম বসে পড়ে আমার খাটের এক পাশে।
অবাক হয়ে যাই আমি রিমঝিমকে দেখে । সব কথার মানে বুঝতে পারি না। কি বলতে চায় ও? বাসি ফুলের গন্ধ ওর শরীরে। মনে হয় কালকের গায়ে হলুদের শাড়ীটাও বদলায়নি। চোখে-মুখে দারুণ উত্তেজনা, চাওয়া, পাওয়ার এক সর্বনাশা আহবান। আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে।
- তুমিই আমার ভালোবাসা। তুমিই প্রথম প্রেমিক। আমার এ মন যখন তোমার, এ দেহও তোমার। কেমন করে অন্যের হাতে তুলে দেব বল। নিয়তি আমি মানি না- কেন এমন হয়- ডুকরে ওঠে রিমঝিম।
কিছু ভেবে না পেয়ে বাদল সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে ওকে। আমার দিনতো প্রায় শেষ- কিন্তু তুমি কেন নিজেকে শেষ করে দেবে। তোমার বিয়ে হচ্ছে- স্বামী, সংসার নিয়ে সুখে থাক, এটাই আমি চাই ।
ফুঁসে ওঠে রিমঝিম- ভালোবাসার মানুষই যখন থাকবে না তখন কিসের সংসার- কার সংসার। অনেক ভেবেছি, কূল কিনারা পাইনি। আত্মহত্যা করতে পারব কি না। জানি না। তবে ভেবে ভেবে ঠিক করলাম এ দেহ তোমাকে আমি তুলে দেব। তারপর যা হবার হবে। পৃথিবীর কাছে তোমারওতো কিছু পাওনা আছে।
থর থর করে কেঁপে ওঠে বাদল- এ কি বলছে রিমঝিম? এ কোন বিস্ময়- এ কোন বিস্ফোরণ?
- কিন্তু তোমার স্বামীর কি দোষ। তাকে কেন ঠকাবে তুমি?
- দোষ কাউকে দিচ্ছি না। তোমার কি অপরাধ? কেন তোমাকে চলে যেতে হচ্ছে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে- আমাদের ছেড়ে। কি পাপ আমি করেছি- কি দোষ তোমার বাবা-মা, ভাই-বোনদের। নিয়তি, এই তো বলবে। ওসব আমি মানি না। বিশ্বস্ততা, পবিত্রতা আমার কাছে এখন অর্থহীন। তোমার পাওনা তুমি নেবে এই আমার কামনা। আর এটাই হবে আমার বেঁচে থাকার মূলধন। যে ভদ্রলোক আমায় বিয়ে করছে সে তো এই দেহ পাবেই, নিশ্চয়ই পাবে এই মাংস পিন্ড- কতটুকু আর ক্ষয়ে যাবে, বলো?
ভারী অবাক হয়ে বাদল শুনতে থাকে ওর ভয়ানক আর মর্মভেদী কথাগুলো। মাথা ওর ঘুরে যায়। এমনিতেই দুর্বল শরীর। সারা গায়ে কেমন যেন আগুণের হলকা অনুভব করে।
পাশাপাশ দোতলা বাড়ী। একই প্যাটার্ণের। শুধু পূবের বাড়িটার ছাদে একটা অতিরিক্ত রুম- চিলে কোঠাও বলা যেতে পারে। দু’বাড়ির মাঝখানের ফাক বেশী নয়। অনায়াসে এ ছাদ থেকে ও ছাদে যাওয়া যায়। দুটো বাড়ীর মালিক রিমঝিমরা। পশ্চিমের বাড়িটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে সেই কবে থেকে।
মনে পড়ে যায় বাদলের প্রথম যখন এ বাড়ীতে ওরা এল- সে তো প্রায় ৭/৮ বছর হয়ে গেল। বাদলের পিতা জামান সাহেব- কোন এক বিদেশী ব্যাংকের উঁচু অফিসার। স্ত্রী আর দুটো ফুটফুটে ছেলে মেয়ে- রিমঝিম আর নান্টু। রিমঝিমের বয়স বড় জোর ১৩/১৪ তখন। আর নান্টু বোধ হয় ৮/৯ বছরের হবে।
বাদলের নিজের বয়সয়ই বা তখন কত? সবে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পড়েছে। বয়স ২০ কি ২১। তখন ভার্সিটির ছাত্র, ইংরেজিতে অনার্স ।
পাশের বাড়ীর মেয়েটা বাদলের চোখের সামনেই বেতস- লতার মত আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো। কিশোরী থেকে যুবতী হয়। রিমঝিম এস.এস.সি এইচ.এস.সি পাশ করে ভার্সিটি প্রবেশ করে- মনোবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে ।

এদিকে বাদলও ইংরেজীতে এম, এ পাশ করে। বিসিএস পরীক্ষা দেয়। মেধাবী ছাত্র ছিল নির্বাচিত হয় এবং কাস্টমস্ সার্ভিস পায়- চলে যায় ট্রেনিং-এ সাভার। ঐ ট্রেনিং থাকা অবস্থায় প্রথম ধরা পড়ে- সেই ভয়ঙ্কর রোগটা। ট্রেনিং আর শেষ করা হয় না।
রোগের নাম ক্যান্সার। যার নেই কোন প্রতিকার। এ মহারোগের আবার নানান প্রকারভেদ। বালকে যেটা ধরেছে তার নাম-লিউকোমিয়া। যা শুধু দেহের রক্ত কণিকা দূষিত করে দেয়। অন্যের রক্তে ধার করে কিছুদিন হয়তো বেঁচে থাকা যায় কিন্তু সে আর কতদিন?
বাদলের ভাবনায় ছেদ পড়ে যায়। রিমঝিমের মিনতি মাখা কণ্ঠে- ক দিন ধরেই এ প্লান করছি। এই শেষ সুযোগ। আর দেরী নয়। এ কথা বলে রিমঝিম বাদলকে জড়িয়ে ধরে খাটের এক পাশে শুয়ে পড়ে।
বাদলের বুকের মধ্যে তখন হাতুড়ী পেটা শুরু হয়। বাধা দিতে পারে না। বাধা দেওয়ার শক্তি তার কই। এই অসুস্থ শরীরেও কেমন যেন উন্মাদনা অনুভব করে। প্রথম প্রেমের প্রথম নিবিড় পরশ- এ এক মত্ত- মদির-মাদকতা।
প্রথম কিছুদিন বাদলের এই ভয়ানক রোগের কথা জানতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু কিছু কি গোপন থাকে। নিজের শরীর বলে দেয়, মনও এক সময় মৃত্যুর ঘন্টা শুনতে পায় ঠিকই। তাছাড়া নিকট-আত্মীয়দের চোখও কি সব কিছু বলে দেয় না।
এই অসুখে পর রিমঝিমের আসা যাওয়া একটু কমে যায়। হয়তো বেশী আসতে দেওয়া হয় না। যখন আসে একা নয়, সঙ্গে ছোট ভাই নান্টুও থাকে। তাছাড়া রোগীর ঘরে কেউ না কেউ অবশ্যই থাকে। রাত্রেও পালা করে কেউ থাকে । রিমঝিমের সাথে তাই বেশী কথা হয় না বাদলের। যখন দেখা হয় তখন লক্ষ করে ওর চোখের দ্যুতি নিভে গেছে- হঠাৎ অনেক বয়সও বেড়ে গেছে মনে হয়। বাদলের


অন্তর দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। নিজের মৃত্যুর দিন গোনার চাইতে আপনজনের চোখে অকাল মেঘের ছায়া ওকে বেদনাতুর করে তোলে। ভাবতে থাকে কেন এমন হল।
কিছুদিন আগে ভিডিওতে একটি হিন্দি ছবি দেখেছিল- ক্যান্সার আক্রান্ত দুটি ছেলে মেয়ের ভালবাসার ঘটনা। তখন কি ভাবতে পেরেছিল- তার নিজের জীবনেও এমন ঘটনার সূত্রপাত হবে। হায় নিয়তি এ কেমন খেলা তোমার!
মনে পড়ে- দু’বাড়ির লোকদের চোখ এড়িয়ে কত না রাত জাগা ছাদের আলসেয়। দু’জন হাত ধরে রাতের তারাদের পানে শুধু চেয়ে থাকা। ভালো লাগা- ভালোবাসার প্রথম শিহরণ । কিন্তু ব্যাস ঐ পর্যন্তই। তারা কখনও ওদের চাওয়া পাওয়াকে ছোয়াছুয়ির উর্ধ্বে নিতে পারেনি। নিতে চায়ওনি। কেননা, ওরা জানত, ওদের প্রেম গোপনীয় কিছু ছিল না। দু’বাড়ীর লোক আশকারা না দিলেও কখনও বাধা দেয়নি। একরকম নীরব সমথন ছিল উভয় পক্ষের। সবাই জানত, আজ না হয় কাল ওদের বিয়ে হবেই। কিন্তু বিধি যে বাম।
এবার আর এক ভয়ানক কান্ড করে বসে রিমঝিম- অকস্মাৎ বাদলের ঠোট চেপে ধরে তার নিজের ওষ্ঠাধর।
বাদলের রক্ত কণিকায় ঘটে যায় বিদ্যুতের অদ্ভুৎপাত। শিরায় শিরায় মত্ত-মাতাল ভৈরবের নাচানাচি। ঝড় ওঠে অঙ্গে অঙ্গে। ভয়ঙ্কর প্রলয় নাচন। সর্বনাশা মহাবিপদ সংকেত।
বাদল আর পারে না নিজেকে ধরে রাখতে। কখন যে তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে রিমঝিমের সুঠাম দেহ- বলুরি। তল্লাশি নেয় ওর শরীরের মানচিত্র। উপত্যকা থেকে উঠে আসা পাহাড়ে। পাহাড় থেকে চূড়ায়- যেখানে লুকিয়ে আছে আগ্নেয়গিরি। একসময় সব ব্যবধান ঘুচে যায়। দুটি দেহ বিলীন হয়ে যায় কোন এক আদিম খেলায়।
বাদলের চোখে ফুটে ওঠে অনেক আলোর ফুলঝুরি। দেহ-মন পৌছে যায় উপত্যকা থেকে চরম সুখের স্বর্ণ শিখরে। আচমকা রক্ত কণিকায় ঘটে যায় প্রচন্ড বিস্ফোরণ ।
আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে যায় বেরিয়ে আসে লাভা। দুজনের জীবনের প্রথম পুলক।
অত:পর যুদ্ধক্ষেত্রে হয় সীজ- ফায়ার। নেমে আসে অপার্থিব নীরবতা। এতক্ষণে রিমঝিম ধাতস্থ হয়। সামলে নেয় নিজেকে। খাট থেকে উঠে দাঁড়ায়। ছোট জানালার বাইরে চোখ পড়ে, দেখতে পায় রাতের আকাশে একটা তারা খসে পড়ছে।
রিমঝিম বিছানার চাদরটা দিয়ে বাদলের গা ঢেকে দেয়। আর তখনই কেমন যেন সন্দেহ হলো তার। আপনাতেই বাদলের নাকের কাছে হাত চলে যায় ওর। বুকের উপর কান পাতে। তারপর এক অশরীরী ভয়ে তীব্র চিৎকার করে ওঠে রিমঝিম ।
আওয়াজ শুনে ছুটে আসে নান্টু। এতক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল ছাদে আলসেয় । আপুই সঙ্গে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে গেছে। ছোট ভাইকে অনেক অনুনয় করে নিয়ে এসেছিল রিমঝিম- আর ত ওর সাথে দেখা হবে না। চল, একটু চোখের দেখা দেখে আসি। রাত ভোর হবার আগেই নান্টুকে ডেকে তুলেছে রিমঝিম ।
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ধাক্কা দিয়েও খোলা গেল না। ভেতরে আর কোন সাড়া শব্দ নেই। নান্টু দরজায় আরও জোরে ধাক্কা দেয়- ডাকে আপু আপু। তবুও কোন সাড়া নেই। নান্টু ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। চারিদিক অল্প-অল্প ফরসা হয়ে আসছে। দরজার পাল্লার ফাঁকে নান্টু চোখ রাখে।
ভেতরে টেবিল লাইটের স্বল্প আলো হলেও নান্টু সব দেখতে পায়। আঁতকে ওঠে ও | বাদল ভাইয়ের বুকের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে আপু। কারো কোন সাড়া-শব্দ নেই। নান্টু মরিয়া হয়ে আরো জোরে ধাক্কা দেয় দরজায়। তবু কোন সাড়া নেই। ছিটকে সরে আসে নান্টু। এ বাড়ীর ছাদ ডিঙ্গিয়ে এক দৌড়ে নীচে ছুটে যায়।
দরজা ভেঙ্গে রিমঝিমকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাদল তার আগেই চলে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। দুবাড়ীর মানুষই নিথর। সবাই মুখে খিল এঁটে দেয়।
এই কথাগুলো বলেই প্লানচেটের আসর থেকে অকস্মাৎ বাদল তিরোহিত হয়ে যায়।
ঐ যে বললাম, সময় বয়ে যায় বহতা নদীর স্রোতের মত। হঠাৎ সেদিন আমার মেয়ে। আর নাতি ফোন কল, সূদর আমেরিকা থেকে। নানু তোমার পাসপোর্ট ভিসা রেডি




করে ফেলো সামনের সামার ভেকেশনে তোমাকে এখানে আসতেই হবে। নানী তো । চলে গেছে, তুমি একা ওখানে পড়ে আছ। আস এখানে ক’ মাস বেড়িয়ে যাও ।
হুট করে একদিন সত্যিই পৌছে গেলাম নিউইয়র্কের ম্যান হাটনে মেয়ে আর নাতির ওখানে। নাতি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। দু' বছরের স্কলারশীপ পেয়েছে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে।
দেখা হয়ে সবাই আপুত হলাম। কত কথার ফুলঝুরি। অতঃপর কয়েকদিন পর রিমঝিমের কথা মনে পড়লো। দেখলাম ওরাও ওকে চেনে। পরের দিন ফোন করলাম রিমঝিমকে। ফোন পেয়ে রিমঝিম ভীষণ উদ্বেলিত হলো। সেদিন বিকেলেই ম্যানহাটনের একটা রেস্টুরেন্ট ম্যাগডোনাল্ড-এ দেখা হলো ওর সাথে। সঙ্গে আমার মেয়ে ও নাতি।
উচচ্ছসিত হয়ে রিমঝিম বলল, কাকু আপনার জন্য কবে থেকে পথ চেয়ে বসে আছি।
আমি বললাম- কেনো, কেনো?
রিমঝিম বলল- যদি প্লানচেটে বাদলের সাথে যোগাযোগ হয়ে থাকে, তাই।
আমি বলাম- হে বাদলকে আমি একবার পেয়েছিলাম বটে প্লানচেটের আসরে। ও বলল, ভোর রাতে তোমাদের অদ্ভূৎ মোলাকাতের কথা। তুমি না কি ওকে ভালোবাসার স্বর্ণশি করে দিয়ে সেই ক্ষনে।
তাই বুঝি? কিন্তু ওতে যাবার আগে আমাকে একটা শেষ উপহার দিয়ে গেছে। আমি বললাম, সেই কবিতাটা বুঝি।
রিমঝিম আনমনে উপরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, হয়তো তাই কাকু, অথবা অন্য কিছু।
রেস্টুরেন্টের চত্বরের বাইরে খোলা আকাশের নীচে টেবিলে আমরা এই ভাবেই গল্প জুড়ে দিলাম।
হঠাৎ দেখি, ৭/৮ বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে হাতে আইসক্রিম নিয়ে রিমঝিমের কোলে ঝাপিয়ে পড়ল?
স্বচকিত হলাম-কে এই মেয়েটি রিমঝিম?
আমার নাতি ফাহিম বলল- নানু, এ তো রিমঝিমের মেয়ে। অবাক হলাম, বললাম ওকি তাহলে এখানে বিয়ে করেছে? কোথায় ওর স্বামী? কোথায়?

রিমঝিম উত্তেজিত হয়ে বলল- না কাকু। এ আমার মেয়ে ঠিকই, কিন্তু আমি কাউকে বিয়ে করিনি।
আশ্চর্য হলাম, বললাম- তাহলে এ কি তোমার পালিত কন্যা।
রিমঝিম ম্যান হাটনের বিশাল দালানকে ছাড়িয়ে উপরে আকাশের দিকে তাকালো। বলল, ঐ দেখো কাকু আকাশে কত তারা জ্বলছে। ওখানেই কোন একটি তারা হয়ত আমার মেয়ের বাবা।
আমি বললাম- হেয়ালি রাখো রিমঝিম।ওর নাম কি?
ওর নাম বৃষ্টি।
তারপর রিমঝিম মেয়েকে বলল- তোমার বাবুজীকে ডাকতো বৃষ্টি।
তখনই, বৃষ্টি ওর মায়ের কোল থেকে ঝাপিয়ে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আকাশের দিকে হাত তুলে ডাকল
বাবুজি দেখা দাও
আর তখনই অবাক কান্ড, আকাশের দিকে সবাই তাকিয়ে দেখি একটা তারা খসে পড়ল। আমরা সবাই অবাক হয়ে এ দৃশ্য দেখলাম।
আমি প্লানচেট লেখক। আমার ব্রেন তখন একটু একটু কাজ শুরু করল অপার্থিব নিয়ে। ভাবলাম- তাইতো এই সহজ আশ্চর্য ঘটনাটি কেন এখনো আমি বুঝতে পারিনি।
বুঝতে পারলাম বই কি:
তাহলে এই হচ্ছে ‘বৃষ্টি, বাদল আর রিমঝিমের মেয়ে। বাদলের মৃত্যুর এক লহমা আগে, রেখে যাওয়া সেই প্রথম পুলকের প্রথম ‘এক ফোটা বৃষ্টি উপহার। হায়- বিধাতার একি অনুপম খেলা!!!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement