আশিক তুমি ফিরে এসো

বাবা (জুন ২০২৬)

Ahad Adnan
  • 0
  • 0
  • 0
আশিক তুমি ফিরে এসো। তোমার ছোট আম্মা একবার শুধু তোমার কথা জিগ্যেস করেছিল। খুব দুঃখ পেয়েছে মনে হয় না। হয়ত আপদ বিদেয় হয়েছে বলে খুশিই হয়েছে। কালকের বাজারটা আমিই করেছি। খুচরা বাজার, লন্ড্রি, জুতা পালিশ এখন থেকে আমাকেই করতে হবে। তুমি আবার ফিরে আসলে এগুলো তোমাকেই করতে হবে। দাঁতে দাঁত চেপে আর কয়েকটা দিন চালিয়ে নিতে পারবে না, বাবা?
টুম্পা জানাল, জন্মদিনের সেই সেলফিটা ফেসবুকে আপলোড করেছে। শ’খানেক লাইক পড়েছে। ফেসবুক, লাইক আমি কিছু বুঝতাম না। এটা আমার প্রথম এবং একমাত্র আইডি। আমার কোনো ‘ফ্রেন্ড’ নেই। তোমার আইডি আছে কিনা আমি জানি না। যদি আমাই এই পোস্ট তোমার চোখে পড়ে, তাহলে পড়বে তো? এই একটাই পোস্ট আমার।
বাবা, ওই ব্যবহারের পরও আমি টুম্পাকে বকতে পারিনি। আপন না হোক, তোমারই তো বোন। তুমি কি ছোট বোনের উপর রাগ করে থাকতে পারবে, বাবা? রুম্পাকে ওর খালামনি যে পুতুলটা দিয়েছিল, চারটা পেন্সিল ব্যাটারি দিয়ে সুইচ চাপলে দুলদুল করে নাচত, আর ঘর ভরে যেত গানের শব্দে, ওটা ভেঙে ফেলেছে। ওর কোনো খেলনাই দুই দিনের বেশি টিকে না। অথচ সেদিনও তোমার ছোট বেলার গাড়ি, পুতুল, খেলনাগুলো শো’কেস উজ্জ্বল করে রাখত। একটা খেলনাও তোমার হাতে ভাঙেনি। ওই রুম্পাটাই না একটা একটা করে হাওয়া করে দিল। সবাই কি তোমার মত বুঝের হয়, বাবা?
তোমার প্রথম জন্মদিনের কথা মনে থাকার কথা না। তোমার মা বেঁচে ছিলেন সেদিন। পুরো ঘরটা আমরা এক স্বপ্নপুরি বানিয়েছিলাম। তোমার মা খুব সুন্দর আল্পনা করত। তোমার চেয়েও ভাল হয়ত। লাল নীল বেলুনে ঝলমল করছিল চারদিক। তোমার মা খুব সুন্দর গানও জানত। আলোকের এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও.....। আরও দুইটা জন্মদিন পরে অন্ধকার নেমে এলো আমাদের ঘরে। তোমাকে ছোট একটা বোন এনে দিতে যেয়ে কী যে হল। হাতে পায়ে পানি এসে, প্রেসার বেড়ে খিঁচুনি হয়ে পাড়ি দিল ওপারে। তোমার তখন সাড়ে তিন বছর বয়স। গলাগলি জড়িয়ে দুজন মিলে কান্না করতাম সারা রাত। তোমার অশ্রু ফোঁটা আমার কাছে মনে হত হাবিয়ার তপ্ত স্রোত। একেকটা রাত ছিল আমাদের নরকবাস। তোমার কান্না আমি কেন যেন সহ্য করতে পারিনা, বাবা।
এরপর তোমার একটা আম্মা আসল, ছোট আম্মা। প্রথম কয়েকটা রাত তুমি আমাদের সাথেই ছিলে। নিজের অযাচিত উপস্থিতি একটা চার বছরের বাচ্চা বুঝতে পারে আমি জানতাম না। তুমি কখন এত বড় হয়ে গেলে, বাবা? বছর ঘুরতেই তুমি তখন বড় ভাইয়া। কতদিন টুম্পা তোমার কোলে পেশাব করেছে, তুমি পাল্টে দিয়েছ। রাত দুইটায় কান্নায় ঘুমুচ্ছে না, তুমি হেঁটে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছ। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে চকলেট কিনে দিয়েছ। অনেক যত্নে সাজানো তোমার নিজের একেকটা খেলনা তুলে দিয়েছ, প্রথমে টুম্পা, পরে রুম্পা’র হাতে। ওরা একটা একটা করে ভেঙেছে। তুমি একটা একটা করে চুমু দিয়েছ। সেই টুম্পা এখন ক্লাস এইটে। আর সেদিনই রুম্পা পা দিল চারে। এই বয়সে টুম্পা’র হাতে স্মার্ট ফোন। অথচ বারোশ’ টাকার ফোন দিয়ে তুমি দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছ। সেই ফোন নিয়ে যখন টুম্পা পরিবারের একটা গ্রুপ সেলফি তুলছিল, আর তুমি দাঁড়িয়েছিলে ছবির একটা কোনায়, আর তোমাকে সরে যেতে বলল, এইটা আমাদের পরিবারের সেলফি, তুমি সর, তুমি আমাদের পরিবারের কেও না, সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলে না, বাবা? আমি মাথাটা নিচু করে ফেলেছিলাম। ভীতু, মেরুদণ্ডহীন একটা আমি। তুমি কি কেঁদেছিলে। আমি তাকাতে পারিনি। তোমার কান্না আমার সহ্য হয় না, বাবা।
সকাল বেলা উঠে দেখি তুমি নেই। ওরা তিন জন মিলে কতদিন তোমাকে বকেছে, তুমি শুধু শুনে গেছ। টুম্পা’র সেই কথার আঘাতটা সহ্য করতে পারনি, তাই না? কলজের ঠিক মাঝখানটায় গিয়ে বেঁধেছে, বাবা? আশিক, তুমি ভাল আছো তো বাবা? আমার পোস্টটা ‘পাবলিক’ করা। তোমার চোখে পড়বে তো? রাতে আমার ঘুম হয়না। তোমার বিছানাটায় বসে বসে কাঁদি। তোমার জামার গন্ধ শুঁকি। তোমার চিরুনির দাঁতগুলোয় আদর করি। আমি একটা নতুন ফোন কিনেছি, ক্যামেরা আছে। তোমাকে নিয়ে একটা সেলফি তুলব। তুমি আর আমি, আমার পরিবার। তুমিই আমার পৃথিবী। আশিক তুমি ফিরে এসো। ফিরে আয় বাবা তুই। ফিরে আয়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

ছেলের জন্য একজন বাবার আবেগ, হাহাকার আর কিছুটা অসহায় আকুতির গল্প এটা।

২৩ সেপ্টেম্বর - ২০১৮ গল্প/কবিতা: ৪৮ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬