ছেলেটি তখন বৃষ্টিতে ভিজছিল। একেবারে অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত আর হঠাৎ এই বৃষ্টি। তখনই মেয়েটা আসে দৃশ্যপটে। মেয়েটা কি তার চেনা, নাকি অপরিচিত। এই বৃষ্টি, এই শহরটাই কি তার চেনা? অচেনা শহরে ছেলেটা একা দাঁড়িয়ে থাকে। জীবনটাই তার বৃষ্টি ভেজা।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ মে ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ২২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বৃষ্টি ভেজা ...... (জুলাই ২০১৯)

অচেনা বৃষ্টির শহরে
বৃষ্টি ভেজা ......

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৮

আহাদ আদনান

comment ১১  favorite ০  import_contacts ৪৮৪
আরেকটা ব্যর্থ ইন্টার্ভিউ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ফার্মগেটের মোড়ে। আষাঢ়ের বিকেলের রোদে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসার লাগছে। কয়েকটা বাস এসেছিল। ভিতরে ওঠার যুদ্ধ করবার মত তাগিদ নেই। একটা ছোট মেয়ে, হাতে বেলি ফুলের মালা, অনেকক্ষণ ধরে ঘ্যান ঘ্যান করছে। ‘একটা মালা নেন স্যার, নেন না স্যার, দশ টাকা মাত্র দাম। দেই একটা’? বকা দিতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু শক্তি নেই।
একটা মালার দাম কত হয়, এই শহরে? মালা আমি কিনিনি কোনদিন। গ্রামের বাড়িতে ছিল নিজের হাতে লাগানো গোলাপ। রক্তের মত লাল গোলাপ। সেই গোলাপ নিয়ে তুলে দিতাম সুমি’র হাতে। এই শহরে সুমি নেই, ফুল নেই, গোলাপ নেই, কোন মালা নেই। মরে যাওয়া গোলাপ গাছটার মত এই শহরে অসহ্য একাকীত্ব। কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে আমি প্রচণ্ড একা।
আমি তাই দাঁড়িয়েই আছি। হঠাৎ চারদিক কালো হয়ে বাতাস এসে সব এলোমেলো করে দিল। লোকজন যেন দৌড়ে পালাতে শুরু করল। আমি তবু দাঁড়িয়ে। মালা হাতে মেয়েটাও দাঁড়িয়ে। ‘একটা মালা দেই, স্যার’? তারপর এলো সেই ঝড়।মুহূর্তে পথ ফাঁকা। আমার চশমার লেন্স ঘোলা হয়ে গেছে। সনদে ভরা ফাইল ভিজে যাচ্ছে। মুঠোফোনে জল ঢুকে যাবে যে কোন সময়। মেয়েটার মালাগুলো বেয়ে বেয়ে বৃষ্টির জল ঝরছে। চশমাটা খুলে ফেলি। অবাক তাকিয়ে দেখি রাস্তার ওপারে একটা মেয়ে একা দাঁড়িয়ে ভিজছে। ঠিক আমার মত একা। দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে, আকাশের দিকে মুখ করে, বন্ধ দুই চোখে নবধারা জলে স্নান করছে। সুমি’র মত লাগছে মেয়েটাকে। সুমি কি? আমার কেন যেন মনে হল, ওপারে ওই মেয়েটার সাথে একসাথে বৃষ্টি বিলাস না করলে এই জীবন বৃথা। আমার জড় শরীরে শক্তি ফিরে আসে। মালা হাতে মেয়েটার অবাক দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে আমি দৌড়ে যাই পদচারি সেতুর দিকে। এদিকে বৃষ্টির বেগ কমতে শুরু করেছে। বৃষ্টি কমে গেলে মেয়েটা আবার জনসমুদ্রে মিশে যাবে। আমাকে এর আগেই যেতে হবে। মেয়েটার কাছে গিয়ে বলতে হবে, আমায় তোমার বৃষ্টি-সখা, করবে নাকি মেয়ে?

আমার কাছে আবার ফিরে আসছে গালিমপুর। বৃষ্টিভেজা বিকেল। উথালপাতাল ইছামতি। সেই নদীর তীরে আমরা ‘কাশফুল কাশফুল’ খেলতাম। ও কাশের মত উড়ে বেড়াতো আর আমি ছুটে যেতাম ওর পিছুপিছু। ফুলের মত মেয়েটা যখন ধরা পড়ে যেত, লেপটে থাকত আমার বুকে। কাশের মত। তারপর একদিন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী একটা ছেলে আসল। যেই গাড়িতে করে এসেছিল, তার দামই আমার শিক্ষক বাবার সম্পত্তির চেয়ে বেশি। আর আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তবু আমরা ঠিক করলাম পালিয়ে যাব। সেই রাতে আমি ছিলাম বাসষ্টেশনে। কেও আসেনি সেই রাতে। আর কোনদিন দেখা হয়নি আমাদের। সুমি’র সিমটা বন্ধ সেই রাত থেকে।
আমি যখন মেয়েটার খুব কাছাকাছি হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় একটা কালো গাড়ি। জানালা খুলে তাকায় এক যুবক। ‘সুমি, তোমার ফোন বন্ধ কেন? বৃষ্টিতে ভিজে তো কাক হয়ে গেছ। এসো, গাড়িতে ওঠো। ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো জান’।
সিনেমার সেই নায়কটার মত আমি অদৃশ্য হয়ে গেছি। মেয়েটা বা কেও আমাকে দেখছে না। আমি এই শহরে চরম উহ্য হয়ে দাঁড়িয়ে। অথবা কেও চিনছে না আমাকে। এই শহরে এসে আমি মুটিয়ে গেছি। গাল ভরতি দাঁড়ি আমার। মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটাও ছিলনা গ্রামের দিনগুলোতে।
‘আমি যাব না। তোমাকে বলেছিলাম বেলি ফুলের মালা আনতে। এনেছো’?
বৃষ্টি থেমে গেছে। কালো গাড়িটা চলে গেছে। সুমি নেই। শুধু ওপারে বেলি ফুলের মালা হাতে মেয়েটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একটা ফুলও নিল না কেও আজ বিকেলে। আমার সনদ সব ভিজে গেছে। মুঠোফোন নষ্ট হয়ে গেছে। আমি আবার মিশে গেছি জনসমুদ্রে। বৃষ্টি ভেজা শহরে আমার না বলা দুঃখগুলো বেলি ফুলের সৌরভ হয়ে চারদিক আচ্ছন্ন করে ফেলছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement