আফসার সাহেবের স্ত্রী তানিয়া অলৌকিক একটা কিছু দেখে ভয় পায়। কিন্তু আফসার সাহেব বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পরবর্তীতে স্বয়ং তিনিও ভয় পেতে থাকেন। এই দুজনকে আবর্তিত করেই লেখা হয়েছে ভৌতিক গল্পটি।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ জুন ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (ডিসেম্বর ২০১৮)

অপার্থিব নুপুর
ভৌতিক

সংখ্যা

আবু আরিছ

comment ১  favorite ০  import_contacts ২৭
১৮-ই জুন ২০১৪। তানিয়ার জন্মদিন আজ। আফসার সাহেব অফিস থেকে বাসে করে বাড়ি ফিরছেন। একটি ফুলের স্টিক আর এক জোড়া নুপুর কিনেছেন তিনি। সামান্য উপহার। সর্বসাকুল্যে ছয়শ টাকার মত খরচ হয়েছে। তবু তানিয়া যে প্রচণ্ড রকম খুশি হবে এটা সে একশো ভাগ নিশ্চিত। তানিয়া মাঝেমধ্যেই নুপুরের কথা বলে। রুপার নুপুর। অভাবের সংসারে টাকা পয়সার সমস্যা বলে সেই সাধ অপূ্র্ণই রয়ে গেছে বেচারির।

ভালোই বৃষ্টি নেমেছে। বাসের ভিতর বসে থাকতে মন্দ লাগছে না। বাইরে ঘন অন্ধকার। আমিন বাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত রাস্তাটা যেমন ট্রাফিক শূন্য, তেমনি এলাকাটিও খোলামেলা। মুক্ত বায়ু পাওয়া যায় এদিকটায়। আফসার সাহেব জানালাটা সামান্য খুলে দিলেন। বৃষ্টির ছাট্ আসছে। সেই সঙ্গে ঠাণ্ডা বাতাস। থাক, কিছুক্ষণ খোলা থাক। পাশে বসা লোকটি মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, কি ভাই দেখছেন না, বৃষ্টি আসছে। সুবোধ বালকের মত জানালা টেনে দিলেন আফসার সাহেব। অন্যদিন হলে নির্ঘাত তর্কাতর্কি বাধাতেন। আজ ইচ্ছে করছে না। সবদিন সবকিছু ইচ্ছাও করে না। আফসার সাহেব লোকটির দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন। বললেন, ভাই, কোথায় যাবেন?
বেচারা চোখ মুখ শক্ত করে বলল, নবীনগর।
-ভাই, বাংলা এটা কি মাস চলছে জানেন?
-আষাঢ়।
-কত তারিখ জানা আছে?
-পাঁচ ছয় হতে পারে।
-ধন্যবাদ।
এতেও লোকটি বিব্রত হয়ে গেলেন। এভাবে বোধহয় আগে কখনো কেউ তাকে ধন্যবাদ দেয়নি।

বাস থেকে নামলেন আফসার সাহেব। সঙ্গে ছাতা নেই। ভিজতে ভিজতেই বাসার পথ ধরলেন। দমকা বাতাস দিচ্ছে। বৃষ্টি সমান্তরাল ভাবে পড়ছে না। পড়ছে তীর্যক ভাবে। পাতলা সূতি জামা ভেদ করে শলাকার মত গায়ে বিঁধছে বৃষ্টির ফোটা। পাঁচ সাত মিনিট হাঁটতেই কাকভেজা হয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। তিনি দুর থেকে লক্ষ করলেন ভান্ডারীর চায়ের দোকান খোলা আছে। একবার সেখানে বসলে হয়। না বসা ঠিক হবে না দশটা প্রায় বাজে। ঝড়বৃষ্টির রাত যত তাড়াতাড়ি ফেরা যায় ততই ভালো। তাতে আজ আবার তানিয়ার জন্মদিন। ভূলে গেছে কিনা কে জানে। নিজের জন্মদিন সাধারনত নিজের একটু কমই মনে থাকে। প্রকৃতি এই খেলাটা কেন খেলে কে জানে। হয়তো তাকে চমকে দেওয়ার জন্যে। প্রকৃতি মানুষকে চমকে দিতে বরাবরই পছন্দ করে। একারনেই হয়তো মানুষের জীবনে অত্যাশ্চার্য ঘটনাগুলি ঘটে খুবই অপ্রত্যাশিত সময়ে, হঠাৎ করে।

ভান্ডারী আফসার সাহেবকে দেখা মাত্রই হাক ছেড়ে ডাকলো, আফসার ভাই না, চা খাইয়া যান।
-এখন না ভাই।
-আরে আহেন কেটলিতে বেশি পানি নাই, দুই তিন কাপ হইব খাইয়া যান।
দোকানে ঢুকলেন তিনি।
ভান্ডারী চা বানাতে বানাতে বলল, ভিজা ন্যাতান্যাতা হইয়া গেছেন দেহি।
-ছাতা নিতে ভূলে গেছি।
-যে বাতাস ছাতা ফুডাইবেন ক্যামনে। দ্যাহেন না মোমবাতি কোন চিবিতে রাকছি।
-ও ভালো কথা মনে করেছেন আমার দুটা মোমবাতি লাগবে।
-ক্যা চার্জার লাইট নাই?
-ছিল, ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে।
- খাড়ান দিতাছি, আগে চাটা লন।

কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দিল তানিয়া। প্রতিদিন যেমন ত্রিশ চল্লিশ সেকেন্ড দেরি হয়। সেই তুলনায় আজ দেরি হয়নি। নয় থেকে দশ সেকেন্ড টাইম নিয়েছে তানিয়া।
তানিয়া ভীত গলায় বলল, আজ যে এতো দেরি করলে?
-কই দেরি? আজতো ত্রিশ পয়ত্রিশ মিনিট আগেই চলে এলাম।
-আমি খুব ভঁয় পেয়েছি।
-কিভাবে?
-ওই দরজার আড়ালে কে যেন দাড়িয়ে ছিল। ঝাড়ু নিতে গেছি দেখি আমি এতক্ষন রুমের বাইরে ছিলাম।
- আসোতো দেখি দরজার আড়ালে কি আছে?
-না, তুমি দরজা খুলবে না।
-কিনাতে কি দেখেছো, ভয়ে অস্থির হয়ে আছো, ভূত প্রেত বলে পৃথিবীতে কিছু নাই, আসো তোমার ভয়টা ভাঙিয়ে দেই।
তানিয়া কাতর মিনতি করে আফসার সাহেবের হাত টেনে ধরে বলল,না, না, প্লিজ দরজা খুলো না।

তানিয়াকে এক রকম জোর করে ধরে নিয়েই দরজা খুললেন তিনি। কই কিছুইতো নেই। দরজার ফাঁকে ঝাড়ুটা শুধু এক পায়ে দাড়িয়ে রয়েছে । তবু ভয় গেল না তানিয়ার। জমে রইল বরফের মত। কাঁপতে লাগলো একটু একটু। ভয় এবং বিষন্নতা এই দু'টি ব্যাপারের সাথে কোথাও হয়তো শীতের সামান্য সম্পর্ক রয়েছে? হয়তোবা আছে। কথায় আছে না অধিক শোকে কাতর। তেমন ভাবে বলা যায় অধিক ভয়ে বরফ। নুপুর ফুলের স্টিক কিছুই স্পর্শ করলো না তানিয়াকে। শুতে গিয়ে আফসার সাহেব বললেন, ঠিক আছে তুমি যখন এতই ভয় পেয়েছ, মোমবাতি জ্বালানোই থাক।

সে কথারও কোন জবাব দিল না তানিয়া। কম্বল মুড়ি দিয়ে দৃঢ় ভাবে জড়িয়ে ধরে রইল আফসার সাহেবকে। একটা সিগারেট ধরালেন তিনি। মৃদু সুরে ডাকলেন, তানিয়া, এই তানিয়া, ঘুমিয়েছ?
- উহু।
-এখনও ভয় লাগছে?
-উহু।
- গল্প শুনবে, হাসির গল্প?
-উহু।
-তাহলে তুমি একটা গল্প বলো, ওই যে তোমার বড় মামীর হাসির গল্পটা।
- এখন না।
- বল, তোমার ভয় কেটে যাবে?
-উহু।

রাতের দ্বিতীয় সিগারেটটি লাগালেন আফসার সাহেব। তিনি জানেন ভয় ও প্রসাব হলো সংক্রামক। অন্যজনের ভয় খুব দ্রুতই আরেক জনকে আক্রান্ত করতে পারে। কোনো বিচিত্র কারনে এতক্ষন তার ভয় লাগছিল না। বরং তানিয়ার ভয়ের পাশে তার সাহসিকতা পৌরুষত্বের আলাদা এক দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। কিন্তু এখন তিনি ভয় পাচ্ছেন। শীতল কালো এক ভয় তাকে আছন্ন করে নিচ্ছে। কোথায় যেন পড়েছিলেন, এক বিছানায় দুজন মানুষ জেগে আছেন তারা আলাদা নয়। কিন্তু যখন তারা ঘুমিয়ে পড়ল তখন তারা আলাদা দু'জন মানুষ। তানিয়ার টানা নিঃশ্বাস টের পাওয়া যায়। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। এখন সে তাহলে এই ঘরে একা।

ঝুনঝুন ঝুনুরঝুনুর.... কানা খাড়া করলো আফসার সাহেব। নুপুরের শব্দ থেমে গেল। তার শরীর কাপছে। তিনি কম্পমান হাতে সিগারেট ধরালেন। শব্দটা আসছে দরজার ওপাশ থেকে। অঘোরে ঘুমাচ্ছে তানিয়া। ওকে ডেকে তুললে ভালো লাগতো। কিন্তু না ওকে ডাকা যাবে না। ও আরো বেশী ভয় পাবে। বাজে কয়টা এখন। ঘরি দেখলেন বারটা সাত চল্লিশ। বলা যায় পুরো রাত এখনো পড়ে আছে। এই এলাকায় একজন সিকিউরিটি গার্ড আছে। তিনি এক মিনিট পর পরই বাঁশি বাজান। আজ তার বাঁশি শোনা যাচ্ছে না। এই ভয়ার্ত রাতে তার বাঁশি শুনতে পেলে অনেকটা সাহস ও সান্তনা খুঁজে পেতেন তিনি। নিজেকে বোঝানো যেত তার আশেপাশেই অন্তত একজন হলেও জাগ্রত মানুষ আছে।

বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে আবারো তিনি নুপুরের আওয়াজ শুনলেন। হঠাৎ তার মনে হলো খাটটা নড়ছে। ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি। কবে যেন যেন পত্রিকায় পড়লেন বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ দেশ। ও না শ্রীলঙ্কা আর জাপানের কথা পড়েছিলেন বোধহয়। হি হি হি....। ঘুমের মধ্যেই অপার্থিব সুরে হাসছে তানিয়া। এই, এই, কি হয়েছে তোমার....
তানিয়া বিচিত্র গলায় বলল, তুই খুব ভয় পেয়েছিস না?
- কিসব আবোল তাবোল বকছো, কি হয়েছে তোমার?
-দেখিস না অন্ধ, ঘরে কে এসেছে?
-কে আসবে ঘরে?
- ও এসেছে।
- কে ও?
- তোর বউ, পুরনো প্রেমিকা। ও আমাকে নিতে এসেছে।

তানিয়াকে খুব জোরে ঝাকুনি দিলেন আফসার সাহেব। মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। সঙ্গেই সঙ্গেই ইলেকট্রিসিটি চলে এলো। টিবি ফ্যান চালু করাই ছিল। টিবিতে লাইভ গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। আজ গান পরিবেশন করছেন ডলি সায়ন্তনী। এখন তিনি গাচ্ছেন, বুড়ি হইলাম তোর কারনে...।

তানিয়া ঘুম জড়ানো চোখে তাকিয়ে বলল, পানি খাবো। পানি খেয়ে সহজ গলায় বলল, কখন ঘুমাবা, কাল তোমার অফিস নেই।
-নেই, ছুটি নিয়েছি, কাল তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাব।
-কোথায় নিয়া যাবা?
-সদরঘাট, তুমি না বলছিলা এখনও লঞ্চ দেখোনি, আর সদরঘাট থেকে বেশ কাছেই আহসান মঞ্জিল, সেটাও দেখে আসবো।
-এখন ঘুমাও, টিবি বন্ধ করো, কয়টা বাজে?
-পৌনে দু'টা।
-আসো ঘুমাবে।
-তুমি ঘুমাও, এটাই শেষ গান, গানটা দেখে ঘুমাই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তানিয়ার নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে উঠল। একজন ভালো সাইকিয়াস্ট্রিটকে দেখাতে হবে তানিয়াকে। মাঝেমধ্যেই ভয় পায় ও। একটা মেয়ে নাকি রাত নিশিতে নুপুর পড়ে ঘুরে বেড়ায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement