পিতৃস্তব

বাবা (জুন ২০২৬)

এ কে সরকার শাওন
  • 0
  • 0
এক তপ্ত দুপুরের গল্প এটি। যে দুপুরে বাতাসের ঝাপটায় আগুনের হলকা থাকে আর রাস্তার পিচ গলে চটি জুতো আটকে যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত পাড়ার সেই পুরোনো দোতলা বাড়িটি মানে শাওনাজ ভিলা'র বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় বাইরের চেয়ে ভেতরের পৃথিবীটা একদম আলাদা, অনন্য ও নন্দিত। সেখানে এক বৃদ্ধ ইজিচেয়ারে অর্ধ শুয়ে আছেন। তাঁর নাম এ জি সরকার। পাড়ার মানুষ তাঁকে চেনে ‘সরকার সাহেব’ নামে। আজ জীবনের সবচেয়ে বড় নকশাটির তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি স্মৃতির পাতা ওল্টাচ্ছেন। সেই নকশাটির নাম সংসার।

এ জি সরকার সাহেবের একমাত্র ছেলে জগলুল হায়দার সরকার। সন্তান জন্মদানের সময় জগলুর মা চলে যায় না ফেরার দেশে। সেই থেকে সিঙ্গেল ফাদার হিসাবে নিরলস চলছেন নিরবধি। আজ তার ছেলে বড় স্থপতি। বনেদী ফার্মে কাজ করে। কিন্তু জগলু'র কাছে স্থাপত্য মানে কেবল ইট-পাথরের ইমারত নয়, বরং তাঁর বাবার জীবনটাই একটা জীবন্ত স্থাপত্য। জগলু ড্রয়িংরুমে বসে বাবার সেই পুরনো ডায়েরিটা দেখছিল, যেখানে বাবা ছোটবেলায় তার জন্য কবিতার ছন্দে ছন্দে জীবনের পাঠ লিখে রাখতেন।


এ জি সরকার পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না কিন্তু জগলু'র চোখে তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপকার। জগলু'র মনে পড়ে যখন সে ছোট ছিল তখন বাবা তাকে নিয়ে ভাঙা খেলনা ঠিক করতেন। বাবা বলতেন -খোকা, ভেঙে যাওয়া সহজ কিন্তু গড়ে তোলা সাধনার কাজ।

সরকার সাহেবের বাগানটা অনন্য সুন্দর ছিল। ফুলে ফুলে মৌমাছিতে ভরপুর।
জগলুর বাবা বলতেন
-ফুল ছিঁড়বে না বাবা, ফুলের সাথে, গাছের সাথে, লতার সাথে কথা বললে দেখবে ওরা উত্তর দিবে। ছোট্টো জগলু বলতো
-ওরা শুধু তোমার সাথেই কথা বলে বাবা, আমার সাথে কথা বলে না।
বাবা বলতেন
-একদিন ঠিক বলবে, ওরা বড্ড অভিমানি তো!
ছবি আঁকার সময় বাবা প্রজাপতির পাখাগুলো নানান রঙে রাঙিয়ে দিতেন। মোষের শিং বাঁকা করে দিতেন।

এ জি সরকার কেবল ইমারত গড়েননি, তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি আদর্শের ভিত। জগলু'র কাছে স্কুলের শিক্ষকরা ছিলেন পাঠ্যবইয়ের জোগানদার কিন্তু বাবা ছিলেন জীবনের তপোবন। যেখানে শান্তিনিকেতনের মতো নিস্তব্ধতা আর গভীরতা ছিল। বাবা শেখাতেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়। বাবা বলেছিলেন
-সিলেবাস নামক বৃত্তের পরিধির বাহিরে গিয়েও তোমাকে কিছু করতে হবে।
সেই থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে লেখক সমাজেও জগলু একটি বেশ পরিচিত নাম।

জগলু'র জীবনের একটি বিশেষ দিনের কথা মনে পড়ে। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে। আচমকা এক বিশাল আর্থিক সংকটে পড়ল পরিবার। জগলু ভাবল পড়াশোনা ছেড়ে পার্টটাইম চাকরিতে ঢুকে যাবে। বাবা সেদিন তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন প্রচণ্ড রোদ। বাবার কপালের ঘাম তাঁর রুমালটাকে ভিজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
বাবা বললেন
-তোর মাথার ওপর আকাশটা এখনো আমি ধরে আছি রে। রোদ লাগলে আমার গায়ে লাগবে তোর ওপর আমি ছাতা হয়ে থাকব যতকাল প্রাণ আছে। সেদিন জগলু বুঝেছিল বাবা মানে সেই বটবৃক্ষ যার তলায় দাঁড়ালে বাইরের ঝড়-ঝাপটা সব তুচ্ছ মনে হয়। ঝিনুকের ভেতর যেমন মুক্তো লুকানো থাকে বাবার কঠোর শাসনের ভেতরেও ঠিক তেমনি এক অব্যক্ত মায়ার ধন লুকানো ছিল। বাবা কখনো মুখে 'ভালোবাসি' বলেননি কিন্তু তাঁর ঘাম ভেজা শার্টের গন্ধে জগলু ভালোবাসার ঘ্রাণ পেত।

এ জি সরকার ছিলেন পাহাড়ের মতো। পাহাড় যেমন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সব ঋতু সহ্য করে তিনিও তেমনি ছিলেন ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা। জগলুর মনে পড়ে একবার এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাবা চাকরি হারিয়েছিলেন। মাসের পর মাস অর্থকষ্টে কেটেছে কিন্তু বাবার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না। তিনি ছিলেন সততার এক বশিষ্ঠ ঋষি। জগলুর জন্য তার বাবা দধীচি ও বটে।

অন্যায়ের সামনে তিনি যখন বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন তখন তাঁকে মনে হতো এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। জগলুকে তিনি সবসময় বলতেন, -মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার চরিত্র। সততার পথ পিচ্ছিল হতে পারে কিন্তু সেই পথে হাঁটলে রাতে শান্তিতে ঘুমানো যায়।

আজ জগলু যখন বড় বড় প্রজেক্টে কাজ করে, তখন অনেক প্রলোভন আসে। কিন্তু বাবার সেই পাহাড়ের মতো মৌনতা আর দৃঢ়তার কথা মনে পড়লে সে অনায়াসেই সেই প্রলোভন পায়ে ঠেলে দেয়।

জগলু'র ক্যারিয়ারের শুরুতে একবার এক বড় ভুল হয়ে গিয়েছিল। সে খুব ভেঙে পড়েছিল। চারপাশটা যেন অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। সেই গভীর অন্ধকারে বাবা এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন। বাবা যেন হয়ে উঠলেন আকাশের ধ্রুবতারা। তিনি দিকভ্রান্ত নাবিকরূপী জগলুকে পথ দেখালেন।
বাবা বললেন,
-ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়, এটা একটা নতুন নকশার শুরু মাত্র।
সেই মুহূর্তে বাবার কথাগুলো ছিল তপ্ত গ্রীষ্মের পর প্রশান্ত শ্রাবণের বৃষ্টির মতো। এক নিমেষেই জগলুর মনের সব জ্বালা জুড়িয়ে গেল। সে নতুন উদ্যমে কাজে ফিরল। বাবার সেই ধীরস্থির কণ্ঠস্বর তাকে সবসময় প্রশান্তি দেয়।

সংসার এক রণাঙ্গন। আর সেই রণাঙ্গনের সেনাপতি ছিলেন বাবা এ জি সরকার। তিনি নিজের জন্য কোনোদিন নতুন জামা কেনেননি, কিন্তু জগলু'র জন্মদিনে সেরা উপহারটা ঠিকই নিয়ে আসতেন। ত্যাগের যে শীর্ষবিন্দুতে বাবা পৌঁছেছিলেন, তা জগলু'র কাছে হিমালয়ের চেয়েও উঁচু মনে হয়। আসলে বাবা সাগরের চেয়ে বিশাল হয়।

বাবার বুকের ভেতরটা ছিল আকাশ সমান বড়। সেখানে সন্তানের সব আবদার, সব ভুল অনায়াসে হারিয়ে যেত। এ জি সরকার জানতেন সন্তানের উত্থান-শিখর তখনই মজবুত হবে যখন তার শিকড় মাটির গভীরে গেঁথে থাকবে। আর সেই শিকড় ছিলেন তিনি নিজে। তিনি নিজেকে মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন, যাতে তাঁর সন্তান মহীরুহ হয়ে আকাশে মাথা তুলতে পারে।

আজ জগলু তার নিজের অফিস উদ্বোধন করছে। ফিতা কাটার জন্য সে কোনো ভিআইপি-কে ডাকেনি। সে ডেকেছে তার বাবাকে। এ জি সরকার সাহেব আজ লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছেন। তাঁর কপালে এখন বলিরেখা কিন্তু চোখে সেই একই তেজোদীপ্ত দৃষ্টি।
জগলু মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল
-সবাই স্থপতি আর ডিজাইনারকে খুঁজছেন। কিন্তু এই যে মানুষটি আমার ডানে দাঁড়িয়ে আছেন, ইনিই আমার আসল স্থপতি। আমার সফলতার প্রতিটি ইটে তাঁর ঘাম মিশে আছে। তিনি শিখিয়েছেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে, শিখিয়েছেন আদর্শের পতাকা উঁচিয়ে ধরতে।

এ জি সরকার মিটিমিটি হাসছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, জীবনের রণাঙ্গনে তিনি জিতে গেছেন। পেয়ে গেছেন জীবনের সেল্ফ একচুয়ালাইজেশন। তাঁর প্রোথিত শিকড় আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। যে বৃক্ষ এখন অন্যকে ছায়া দিচ্ছে।

বাইরে শ্রাবণের মেঘ জমেছে। হয়তো একটু পরেই বৃষ্টি নামবে। জগলু বাবার হাত ধরে গাড়িতে ওঠার সময় দেখল, বাবার সেই পুরনো রুমালে আজও ত্যাগের গন্ধ লেগে আছে। বাবা মানে কেবল একটি শব্দ নয়, বাবা মানে এক বিশাল ভুবন, যেখানে সন্তান চিরকাল পরম শান্তিতে বাস করে।

পরদিন ছিলো বিশ্ব বাবা দিবস। জগলু তাঁর বাবাকে নিয়ে ক'টা চরণ লিখলো যা নিম্নরূপ

আগাগোড়া দেশ-প্রেমিক
সহজ সরল সৎ সুমন!
দেখেছি ঘুরে বিশ্ব জুড়ে
বাবার মত বিরল সুজন!

আমার বাবা আমার বিশ্ব
বাবা ছাড়া আমি নিঃস্ব!
গুনে-মানে ধ্যানে জ্ঞানে
বাবা গুরু আমি শিষ্য!

৯ মে ২০২৬
শাওনাজ ভিলা
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

বাবা আমার জীবনের ভিত্তি। তিনিই আমাদের জীবনের স্থপতি। গল্পে এমন একজন সিঙ্গেল ফাদারের কথাই বলা হয়েছে। বাবাকে ঘিরেই সন্তানের জীবন। বিষয়ের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যতা রয়েছে এই গল্পের।

১২ আগষ্ট - ২০১৮ গল্প/কবিতা: ৬ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬