শীলা নামের মেয়েটি নিজের ভাংগা মন জোড়া লাগানোর অনন্ত প্রচেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে.....
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ১৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভাঙ্গা মন (নভেম্বর ২০১৯)

এভাবে হয় না
ভাঙ্গা মন

সংখ্যা

আশা

comment ২  favorite ০  import_contacts ৫৪
ঢাকা শহরের কোন এক কানা গলিতে হাঁটতে হাঁটতে শীলা ভুলে যায় নিজের হাহাকারের কথা। অথচ বাড়িতে পা দিলেই শীলার দমবন্ধ হয়ে আসে। বিশেষ করে এ সময়টায়। দুপুর যখন বিকেলের গায়ে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে তখন শীলার ও ইচ্ছে করে ঠিক আগের মত আদনান ঘন ঘন অফিস ফাঁকি দিয়ে শীলার কাছে ছুটে আসুক।
শুনশান গলির বারান্দায় বসে আদনানের ভুল ভাল সুরে গেয়ে ওঠা গানের জন্য মাঝে মাঝে শীলার দম বন্ধ হয়ে আসে। শীলা হাঁসফাঁস করতে থাকে।
আজ বাইরে থেকে ফিরে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে শীলা একবার রান্নাঘরে উঁকি মারলো। শীলার শ্বাশুড়ির সাথে কমবয়েসী একটা মেয়ে বেশ সুখি সুখি মুখে গল্প করছে। শীলা ভ্রু কুঁচকে মেয়েটাকে চেনার চেষ্টা করলো। মনে পড়ছে না।
রান্নাঘরে ঢোকার পাট শীলার অনেক আগেই চুকেবুকে গেছে।
বিয়ের প্রায় এক যুগ পরেও যখন শীলা মা হতে পারেনি তখন শীলার শ্বাশুড়ি শীলার জন্য কিছু অলিখিত নিয়ম জারি করেছেন। রান্নাঘরে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত তার মধ্যে অন্যতম।
শ্বাশুড়ির নিয়ম করা জারি শুনে প্রথমে শীলা খুব অবাক হয়েছিলো। তারপর আদনানের কাছে খুব করে হেসেছিলো। কিন্তু আদনানের কঠিন চোয়াল দেখে একটু একটু করে শীলার হাসিতে কষ্টের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। শীলার শুধু মনে হয় কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। ঠিক ভুল হচ্ছে।

কিন্তু এখন শীলা বুঝতে শিখেছে জগৎ নিজের নিয়মে চলে। এখানে প্রত্যেকের ক্ষেত্র আলাদা। প্রত্যেকের নিয়ম কানুন আলাদা। এখানে যেকোন মুহূর্তে সম্পর্কের সুর কেটে গিয়ে তালে লয়ে গোলমাল হয়ে যায়।
অথচ প্রায় সতের বছর আগে সেই কিশোরী শীলা বন্ধুর মত স্বামী পেয়ে কত অবলীলায় নিজের অস্তিত্বকে স্বামীর অস্তিত্বের সাথে গুলিয়ে পেঁচিয়ে একাকার করে ফেলেছিলো। এতটা বছরে একবারের জন্যও শীলার নিজেকে স্বতন্ত্র মনে হয়নি। তবে এত কিছুর পরও আদনান কে আজও শীলার নিজের মানুষ মনে হয়।

শীলা বোঝে যে শ্বাশুড়ি তাকে রান্নাঘরে ঢুকতে বারন করেছে শুধু শীলা সন্তান জন্মদানে অক্ষম বলে নয়। বরং এ সংসার থেকে শীলার শিকড় একটু একটু করে উপড়ানো এর মূল উদ্দেশ্য। শীলাকে বুঝিয়ে দেয়া যে, দেখো তোমাকে ছাড়াও আমরা দিব্বি চলছি।
ভাবনাটা মাথায় ঢুকতেই সেদিন একটা তীব্র ভয় শীলাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। তবে কি এই ঝাপসা ঝাপসা ধারনাটাই সত্যি? মানুষ এত নিষ্ঠুর?
আজকাল অবশ্য শীলা মানুষের নিষ্ঠুরতা নিয়ে তেমন ভাবে না। এই শেষ পাঁচ বছরে শীলার মনটা ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। যেকোন সময় নিজের গোটা অস্তিত্ব নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। শীলা নিজেও জানে। শীলা এখন বিশেষভাবে নিজের ভাংচুরের জন্য অপেক্ষা করে।
শীলার মা বেঁচে নেই। বাবা থাকেন ভাইদের সংসারে। এত কিছুর পরও সেখানে গিয়ে ওঠার কথা শীলা ভাবতে পারেনা। তারচেয়ে বরং এই ভাল। অন্তত স্বামীর ঘর তো।
আদনান বোধহয় শীলাকে এখনো কিছুটা ভালবাসে। শীলার তাই মনে হয়। শীলা এখনো নিজের সুদিনের দারুন গন্ধ পায় এ বাড়িতে। শুধু এ সুগন্ধটুকুই। কারন সেই সুদিন আর আসেনা। শীলা বুঝে গেছে আর কখনো সেসব দিন আর আসবেনা।

প্রদীপ যেমন নেভার আগে দপ করে জ্বলে ওঠে তেমনি এক ভীষণ ইচ্ছে শীলাকে বেয়ে ক্রমাগত উঠছে।
তাই গত সাত দিন ধরে শীলা নীলক্ষেতের মোড়ে দাঁড়িয়ে স্বামীর জন্য মেয়ে খুঁজতে আরম্ভ করেছে। এমন একটা মেয়ে যার ব্যক্তিত্ব খুব মোটা দাগের হলেও অসুবিধে নেই। একটা সন্তান তো দিতে পারবে শীলার স্বামী আর শাশুড়ীকে।
পরিকল্পনাটা পুনরায় মাথায় আসার পরে শীলা এ কদিন হন্যে হয়ে মেয়ে খুঁজেছে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকেই শীলার মনপুত হয়নি। একেবারে যে কাউকেই পছন্দ হয়নি ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয়। তিন থেকে চারজনকে শীলার চলনসই মনে হয়েছিলো। কিন্তু বিপত্তিটা বেধেছে অন্যখানে।
পছন্দ করা মেয়েটিকে কল্পনার চোখে স্বামীর পাশে দাঁড় করেতে গিয়ে শীলা চোখে আঁচল চেপেছে। পথচারীদের অবাক চোখের সামনে ফোপাঁতে ফোঁপাতে শীলার মনে হয়েছে সে কিছুতেই পারবেনা,কিছুতেই না।

শ্বাশুড়ি আর আত্মীয় স্বজনদের হুল ফোটানো কথায় একসময় শীলা অতিষ্ঠ হয়ে আদনানকে আরেকটা বিয়ে করাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। বছর পাঁচেক আগে শীলার মুখে এমন প্রস্তাব শুনে আদনান কিছু সময় স্থানুর মত দাড়িয়ে থাকে। তারপর জোর করে গলা ছেড়ে হাসার চেষ্টা করে। কিন্তু হাসিটা কেন যেন ফোটে না। তবে শীলা নাছোড়বান্দা। যেমন করেই হোক আদনান কে রাজি করাতে হবে। আদনান যতই বোঝানোর চেষ্টা করে শীলা ততই মরিয়া হয়ে ওঠে। শীলার পাগলামিতে একপর্যায়ে আদনান হাল ছেড়ে দেয়।
অথচ আদনান যখন শীলার মতে মত দেয় তখন এক ধরনের নিস্পৃহতা শীলাকে গ্রাস করে।
হঠাৎ করে শীলা নিজের ভেতর এক অদ্ভুত পরিবর্তন টের পায়। শীলা আর এ ব্যাপারটা নিয়ে কথা বাড়ায় না। আদনান মাঝে মাঝে ঠাট্টার ছলে শীলাকে মনে করিয়ে দিলেও শীলা এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। এসব কথা শীলার আর ভালো লাগেনা।
প্রায় দুসপ্তাহ আগে আদনানের এক দূরসম্পর্কের বোন এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলো। সংগে বছর তিনেকের দুটো যমজ মেয়ে। বাচ্চা দুটোর সাথে সময় কাটাতে আদনান প্রায় দিনই অফিস কামাই করেছে।
একটা সন্তানের জন্য আদনানের ভেতরে যে হাহাকারের গহীন গহ্বর তৈরী হয়েছে তা সেদিনই শীলার চোখে নগ্ন ভাবে ধরা পড়ে। শীলা ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড রকমে নাড়া খায়।
তাই যে প্রস্তাবটা প্রায় তলিয়ে গিয়েছিলো সেটা শীলা আবার নতুন করে সাজায়।


গত দুদিন ধরে শীলা ঘরবন্দী হয়ে আছে।
কি হবে আর বাইরে বেরিয়ে? শীলার শ্বাশুড়ি শীলার কাজ কত সহজেই এগিয়ে দিলেন। রান্নাঘরে দেখা সেই সুখি সুখি চেহারার অল্পবয়সী মেয়েটার সাথে আদনানের বিয়ে ঠিক হয়েছে।
এতে শীলার খুশি হবার কথা। কারন একটা শিশু দত্তক নেয়ার ব্যাপারে যখন স্বামী বা শ্বাশুড়িকে কোনভাবেই রাজি করাতে পারেনি তখন নিজে থেকেই সে স্বামীকে আরেকটা বিয়ে করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।

নিজের ইচ্ছে-পূরণ চোখের সামনে দেখে শীলার কষ্টে বুক ভেংগে যাচ্ছে। শীলা নিজেকে বুঝে উঠতে পারছেনা। কেন এমন হচ্ছে? শীলা নিজেই তো কত করে আদনানকে বিয়েতে রাজি করিয়েছে। অথচ আদনানের আবার বিয়ে হবে এটা মনে পড়লেই কেন শীলার আরো বেশি আদনানকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে? শীলা নিজের মনের গোপন কুঠুরি তোলপাড় করেও এর হদিস পায়না।

একদিন একদিন করে কয়েকটা দিন কেটে গেল।
দুদিন বাদে বিয়ে। তবে বিয়ের কোন আয়োজন নেই বাড়িতে। এত কষ্টের মাঝেও হঠাৎ শীলার খুব উদার হতে ইচ্ছে করে।
ইচ্ছে করছে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়েটা দেয়। সিদ্ধান্ত নিয়েও শীলার ঘুম হয়না রাতে। সারারাত জেগে থাকায় চোখের নিচে মেঘের ছায়া পড়ে। আয়নায় নিজের মুখ দেখে শীলা চমকে উঠে দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেংগে পড়ে। শীলা নিজের সব অধিকার ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। অথচ এখনো কেন মনেহয় আদনান শীলাকে বুকের মধ্যে নিয়ে বলুক,এই বোকা মেয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ কাঁদে? কাঁদে না।

আজ আদনান আর সুখী মেয়েটির বিয়ে।
শীলা গত সতের বছর ধরে আগলে আগলে রাখা নিজেদের ঘরখানা নবদম্পতির জন্য ছেড়ে দিয়েছিলো। আদনান রাজি হয়নি। এত কিছুর পরও আদনান মনুষ্যত্বের শেষ সীমা লংঘন করেনি। তবে আদনানের এ উদারতা শীলাকে স্পর্শ করছেনা।
সকাল থেকে শীলার হতবিহ্বল দৃষ্টিতে অনেক কিছুই ধরা পড়ছেনা। শীলার অনুভূতি যদি ধারালো ভাবে কাজ করতো তাহলে শীলা আদনানের চোখের তারায় এক অন্যরকম দ্যুতি দেখতে পেত। যে দ্যুতিতে আছে নতুনকে আবিষ্কারের আগ্রহ। যেখানে শীলার ছায়াটুকু পর্যন্ত নেই। নাকি আছে?

সন্ধার দিকে ঘরোয়াভাবে আদনানের বিয়ে হয়ে গেলো।
বিয়ে শেষে কাজী সাহেব আর যে দুচারজন মানুষ বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন তাদেরকে শীলা নিজ হাতে আপ্যায়ন করে সুখি মেয়েটিকে দু একটা উপদেশ ও দিলো। রান্নাঘরের দখল নিয়ে শীলার শ্বাশুড়ি আজ আর কিছু বললেন না। বরং মনে হলো শীলার স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে তিনি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

সন্ধা থেকেই বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব ছিলো। এখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে অঝোর ধারায় শুরু হলো।
অতিথিরা চলে গেছে অনেকক্ষন। সুখী মেয়েটি তার সদ্য পাওয়া নিজের ঘরে বসে আছে। শীলা টের পাচ্ছে আদনান ড্রয়িং রুমে এলোমেলো হাটাহাটি করছে। শীলা জেগে আছে বলে কি তার নতুন স্ত্রীর কাছে যেতে লজ্জা পাচ্ছে? নাকি কোন অপরাধবোধ আদনানকে ঘিরে ধরেছে? নিজের প্রথম বাসরের কথা মনে পড়ছে না তো? সেদিনও তো এমন আকাশ ভেংগে বৃষ্টি নেমেছিলো।

শীলা বারান্দার দরজা থেকেই গোপনে আদনানকে দেখতে লাগলো।
ঐ ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরা লম্বা চওড়া মানুষটাকে শীলা একদিন নিজের ভেবেছিলো। মাতৃত্বের স্বাদ হতে বঞ্চিত শীলা আদনানকে জড়িয়েই বাঁচতে চেয়েছিলো। দিনের পর দিন ঐ প্রশস্ত বুকে ঘুমানোর কি দারুন অভ্যাস করে নিয়েছিলো। আজও শীলার ইচ্ছে করছে এমন বৃষ্টি বাদলার দিনে আদনানের বুকের মধ্যে গুটিসুটি মেরে ঢুকে যেতে। ঠিক আগের মত।
আদনানের এই এলোমেলো ভাব দেখে শীলার হঠাৎ খুব মায়া হলো। সবাই মিলে নাহয় একটা ছেলেমানুষী কাজ করে ফেলেছে,তাই বলে শীলা জেনেশুনে তো আদনানকে শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে পারেনা।

শীলা রান্নাঘরে গিয়ে আদনানের জন্য এক কাপ চা বানালো। বারান্দা থেকে এনে লেবু পাতা কুচি কুচি করে ফুটন্ত পানিতে ছেড়ে দিতেও ভুললো না।
চায়ের কাপ নিয়ে ড্রইং রুমে গিয়ে দেখলো আদনান সোফায় বসে দেয়ালঘড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঘড়ির কাটা ভেদ করে সেই দৃষ্টি চলে গেছে বহুদূর। শীলা আদনানের এই দৃষ্টি চেনে। আদনান চিন্তিত। আদনান ভালো নেই।
শীলার হাতে চায়ের কাপ দেখে আদনান চমকে উঠলো। কিন্তু মাথা নিচু করে চায়ের কাপটা নিলো। শীলার হাত থরথর করে কাঁপছে।
শীলা কাঁপা কাঁপা হাতেই আদনানের এক হাতে হাত রাখলো। মৃদু একটু চাপ দিয়েই ছেড়ে দিলো। এ নির্ভরতার ছোঁয়াটুকু আদনানের আজ ভিষণ প্রয়োজন। শীলা বোঝে।

রাত প্রায় বারোটা।
সবাই যে যার ঘরে। কেউ হয়তো স্বপ্ন বুনছে আর কেউ হয়তো গভীর ঘুমে।
শীলার ঘুম আসছে না। ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। আকাশ দেখতে ইচ্ছে করছে। বৃষ্টির সাথে প্রচন্ড ঝড় হচ্ছে। শীলা বিবর্ণ মুখে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের ঝাপটায় শীলা প্রায় ভিজে একাকার। শীলা আঁতিপাঁতি করেও কোথাও আকাশের অস্তিত্ব খুঁজে পায়না।
হঠাৎ চারদিক আলো করে প্রচন্ড শব্দে কোথাও বজ্রপাত হলো। বজ্রপাতের বিকট শব্দ শুনে শীলার ক্ষীন একটু আশা হলো আদনান এবার নিশ্চয়ই ছুটে আসবে। শীলা কাঠ হয়ে থেকে আদনানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
কিন্তু না। তবে অনেকক্ষন পরে শীলার শ্বাশুড়ি এলেন। বারান্দায় দাড়ানো আধভেজা শীলাকে দেখে একটু চমকালেন। কাছে এসে শীলার মাথায় হাত রেখে স্নেহের সুরে বললেন, 'বৌমা,শুয়ে পড়ো। রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে।'
শীলা কিছু বললো না। শ্বাশুড়ির মুখের দিকে কেবল একবার তাকালো। শীলার কোন অনুভূতি হচ্ছে না। না রাগ,না ক্ষোভ। শুধু শীলার মাথায় বহুদিন আগে পড়া কবিতার কয়েকটা লাইন মিছিল করে এগোয়।
'আমি হয়তো মানুষ নই,সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না,সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না।
কী করে তাও বেঁচে থাকছি,ছবি আঁকছি,
সকালবেলা,দুপুরবেলা অবাক করে
সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে। অবাক লাগে।'
এখন শ্বাশুড়ির জন্যও শীলার মনে এক ধরনের মায়া কাজ করছে। শীলার শ্বাশুড়ি হয়তো এখন নিজেকে শীলার স্থানে দাঁড় করিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। হয়তো মনে মনে চাচ্ছেন শীলা সবাইকে ক্ষমা করুক। কিন্তু শীলা কাউকে ক্ষমা করবেনা। শীলা ক্ষমা করার কে? কেউনা।

শ্বাশুড়ি চলে যাওয়ার পর শাড়ি পালটে শীলা বিছানায় এলো। শীলাকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে হবে এখন। অনেক অনেক রাত শীলা ঘুমাতে পারেনি। প্রকৃতিও আজ শীলার পক্ষে। ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস শরীরে নিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শীলা ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
একটু একটু করে অনেকক্ষন কেটে গেলো।
শীলার ঘুম আসছে না। একবার উঠে পানি খেল। আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলো। আবার। 'আদনান এখন কি করছে?' এ প্রশ্নটাকে প্রাণপণে চাপা দিয়ে শীলা অনবরত ঘুমের চেষ্টা করছে।

শেষ পর্যন্ত শীলাকে উঠতেই হলো। অতি সন্তর্পণে ড্রয়িং রুম পার হয়ে বাইরে বেরোনোর দরজা খোলার জন্য যখন হাত বাড়ালো তখন শীলার শ্বাশুড়ি ছুটে এসে শীলাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি কি তবে ভেবেছিলেন শীলা শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেবে?

শীলা মাকে হারিয়েছে অনেক ছোটবেলায়। মায়ের মুখ শীলার মনে পড়েনা। মাকে শীলার নিজের জীবনে কখনো প্রয়োজন হয়নি।
কিন্তু এই মুহূর্তে শ্বাশুড়ির মাঝে শীলা মাকে খুঁজতে লাগলো। যেমন করে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষগুলো 'মা' বলে চিৎকার করে ওঠে তেমন করে শীলা শ্বাশুড়িকে 'মা' বলে ডেকে উঠলো। শীলা কাঁদছে। শীলার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আজকের এ রাতটা দুহাতে দুমড়েমুচড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করছে। পাগলের মত চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে 'মা,আমার ঘুম আসছেনা। আমি ঘুমাতে চাই।'
শীলার শ্বাশুড়ি শীলাকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন। তারপর একসময় ধরে ধরে শীলাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন।

আদনানের বিয়ের পর একদিন দুদিন করে অনেকদিন কেটে গেলো। আদনানের নতুন স্ত্রী এখন সন্তানসম্ভবা। সময় প্রায় আসন্ন।
শীলা নিজে থেকেই মেয়েটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। এই সুখী চেহারার মেয়েটির জন্য সবসময় শীলার মধ্যে একধরনের মায়া কাজ করে। এই মেয়েটিরও মা নেই। শীলা তাই মায়ের ভালবাসায় মেয়েটিকে আগলে আগলে রাখে। মেয়েটিও শীলার উপর নিজের সব ভার ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তমনে সপ্ন বুনে যাচ্ছে।
শীলা এখন শ্বাশুড়ির ঘরে থাকে। দুজনে এক খাটে ঘুমায়। ঘটনার মধ্য দিয়ে যেভাবে মানুষে মানুষে ভাব হয় তেমনি শীলা আর শীলার শ্বাশুড়ি আজকাল একে অন্যের মনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে।
দুই প্রজন্মের দুই নারী প্রায়দিনই অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করে। হাসে,কাঁদে। তবুও প্রায়দিনই শীলার ঘুম হয়না রাতে। অনেকগুলো বর্ষার রাত নির্ঘুম কাটে।

শীলা এভাবেই বাঁচতে শিখে গেছে। তারপরও মাঝে মাঝে শীলার মনে কি একটা কাঁটার মত খচ খচ করে। বিশেষ করে আদনানকে দেখলে শীলার বুকটা ছটফট করে। শীলা উন্মুখ চোখে চেয়ে থাকে।
আদনান শীলার চোখের দিকে তাকায় না। তাকাতে পারেনা। শীলা মনেপ্রাণে চায় আদনানের সাথে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক। শীলা তো কবেই নিজের সব অধিকার ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। অথচ এখনো আদনানের এ লুকোচুরি শীলার ভাল লাগেনা। শীলা আদনানকে এখন আর তেমন করে বোঝেওনা।

অপারেশন থিয়েটারের সামনে শীলারা মিলে অপেক্ষা করছে। আদনানের নতুন স্ত্রীকে অনেকক্ষণ হলো ভেতরে ঢুকানো হয়েছে।
অল্পবয়সী মেয়েটার শরীরের ভেতরে নাকি কি এক জটিলতা বাসা বেঁধেছে। মা এবং সন্তান দুজনের অবস্থা বেশি সুবিধার না। মেয়েটির দ্বিতীয়বার মা হতে পারার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শীলার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। শীলার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে ঐ মেয়েটি হয়তো মাকে খুঁজছে। মেয়েটিকে ওটিতে নেয়ার সময় ভীত মেয়েটি অনেক অনুনয় করেছিলো। কিন্তু ডাক্তার,নার্স কেউ শীলাকে সংগে থাকতে দেয়নি।
আদনান একটু দূরের আরেক সোফায় চিন্তিত মনে বসে আছে।
আদনানের দিকে তাকিয়ে শীলার মনে হচ্ছে মেয়েটির যদি কিছু হয় তবে কি তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের উষ্ণতা আবার ফিরে আসবে? নিজের ভাবনায় নিজেই চমকে উঠলো শীলা। এসব কি ভাবছে সে? শীলা এখন নিজেও চায় একটা তুলতুলে বাচ্চা থপথপ করে ঘরময় হেটে বেড়াক। শীলা গত কয়েকদিন ধরে নিউমার্কেট ঘুরে ঘুরে অনাগত শিশুর জন্য কত কিছু কিনেছে।
অথচ এই মুহূর্তে মেয়েটার সুস্থতা যেমন চাইছে ঠিক তেমন মনের ভেতরের আরেকটা মন চাইছে মেয়েটা মরে যাক। মেয়েটা মরে গেলে শীলার কি? শীলা তাহলে সব ফিরে পাবে।

অনেকটা উৎকন্ঠিত অপেক্ষার পর একজন নার্স বেরিয়ে এসে বাচ্চা নিয়ে যেতে বললেন। আদনান তড়াক করে উঠে দাড়ালো। শীলার শাশুড়ীও হতচকিত হয়ে শীলার দিকে তাকালেন। শীলা ধীরস্থির ভাবে নার্সের পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলো।
বাচ্চাটাকে দুজন নার্স পরিষ্কার করছে। শীলা একজনকে জিজ্ঞেস করলো, বাচ্চার মা ভাল আছে? একজন নার্স মাথা নাড়লো। ভাল আছে।
শীলা গুটি গুটি পায়ে বাচ্চার দিকে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি এসে শিশুটির দিকে শীলা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো।
এক অদ্ভুত অবসাদ শীলাকে ঘিরে ধরেছে। শীলার ভেতরে শুধু ওলট পালট। ওলট পালট। আচ্ছন্নের মত শীলা শিশুটির দিকে হাত বাড়ায়। বিকলাঙ্গ নবজাতকটিকে দেখে শীলার কেবলই মনে হয় প্রকৃতি বুঝি কাউকেই ক্ষমা করেনা,না?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement