১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সেই কাপুরুষোচিত ঘৃন্যতম হামলাকে অন্যান্য অনেক নিরীহ মানুষের মত তরুন এক স্কুল শিক্ষকও মেনে নিতে পারেনি। তাই এই হামলার সমুচিত জবাব দিতে “স্বাধীনতা ” শব্দটিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত করে ২৬শে মার্চ রাতেই স্বাধীনতাকামী সেই শিক্ষক যুবক ঘর ছাড়ে। তার তরুণী স্ত্রীর স্বাধীনতার পূর্ব ও পরের সময়ের প্রেক্ষাপটকে ঘিরেই এই স্বাধীনতা দিবসের গল্প।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৬.০৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.০৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - স্বাধীনতা দিবস (মার্চ ২০১৯)

অনুভূতির দিনকাল
স্বাধীনতা দিবস

সংখ্যা

মোট ভোট ১০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.০৩

আশা

comment ৯  favorite ০  import_contacts ৫৪৯
[গল্পটি লেখার সময় কিছু তথ্য দিয়ে সহায়তার জন্য একজন মায়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ]
এক.
এই নিয়ে সপ্তম বারের মত সৌরভের বিয়েটা ভেংগে গেল। বিয়ে ভাংগার কথা শুনে যতটা না চমকালাম তার থেকেও বেশি চমকেছি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে। চমকেছি না বলে বরং বলা যায় হাতের উপর দৃষ্টি আহত পশুর মত আছড়ে পড়েছে। একসময় আমার এই আঙুলগুলো ছিলো মৃদু হাওয়ার দোলায় তিরতির করে কাঁপা কচি সজনে ডাটার মত সতেজ,জীবন্ত। অথচ আজ নানান রকম আকিঁবুকিঁ কাটা খসখসে হাতের চামড়া যেন আমার দিকেই নখ দাঁত বের করে তেড়ে আসে। এই প্রথমবারের মত আমার মন সত্যিকারভাবেই সময়ের পিচ্ছিল পথে হোচঁট খায়। জীবনের প্রতিটা মোড়ে লুকিয়ে কিংবা প্রকাশ্যে দাড়িয়ে থাকা দুঃখগুলোও যেখানে কোনদিন গায়ে আচড় কাটতে পারেনি সেখানে আজ এই ভগ্নদশা শরীরের দিকে তাকিয়ে ভাবছি সময় আমার ফুরিয়েই এলো।

নিজের কথা আমি ভাবিনা। কিন্তু সৌরভের জন্য আমার ভাবনা হয়। কারন সে যে আমার সন্তান! আমার শরীর আর মন দিয়েই যে তার গোটা অবয়বই তৈরী। আমার বত্রিশ বছর বয়সী সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় কোনদিন ব্যাকুল না হলেও এই মুহূর্তে ছেলের জন্য বুকটা টনটন করে ওঠে। গোটা একটা স্বাধীন দেশে বাস করেও ছেলের অমংগল আশংকায় মন ছেঁয়ে যায়। বসন্তের এই কাঁচা মিঠা রোদের আঁচ গায়ে মেখে প্রায় তেত্রিশ বছর আগে হারানো আমার স্বামীর কথা মনে পড়ে। আমার স্বামী আবিদ হাসান এই স্বাধীন দেশ দেখে যেতে পারেনি। স্বাধীন দেশের মুক্ত প্রকৃতিতে প্রথম বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে বলতে পারেনি আহ কি সুখ! কি সুখ! বাংলাদেশ নামক রক্তে নেশা জাগানো নামের জন্মলগ্নের তিন মাস আগেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।
স্বামীর কথা ভেবে চোখের জল তো দূরের কথা,ছোট্ট একটা গোপন দীর্ঘশ্বাসকেও আমি দমবন্ধ করে আটকে রাখি। আমি একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। আমার এই স্বাধীন দেশে নিজস্ব কোন হাহাকারের ছায়া আমি পড়তে দেবোনা। দেইও নি।
তবে আজ যখন মেয়ের বাড়ির একজন এসে সরাসরি জানিয়ে গেলো বিয়ে ভাংগার কথা তখন আমার গোটা অস্তিত্বই কুকড়ে গিয়েছিলো। আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছি শরীরের মাঝে যে মনের বাস সেটিও দিন দিন সময়ের কাছে প্রাণপনে আত্মসমর্পণের জন্য মুখিয়ে আছে। মনের সাথে গৃ্হযুদ্ধের পক্ষপাতী আমি কোনকালেই ছিলাম না। আমার স্বামী আমাকে শিখিয়েছে স্বচ্ছ কাঁচের মত একটা মনের সাথে বসবাস করতে। কিন্তু আজ সৌরভের কথা ভেবে সমস্ত অন্তরাত্মা বিদ্রোহী হয়ে এই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদের নেশায় পাগল হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করছে আমার শ্বশুরের রামদাটা নিয়ে আজই একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলি। যে ইচ্ছেটা এতদিন ভ্রুণের মত দলা পাকিয়ে ছিলো আমার ভেতরে,সেটা আজ দেয়াল ভেংগে আলোর দিকে ছুটতে মরিয়া।

সৌরভ ছোটবেলা থেকেই বড় অভিমানী ছেলে। পাঁচ বছর বয়সে যখন ওকে প্রথম স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম সেদিনই ওর অভিমানের সাথে আমার সুস্পষ্ট পরিচয় ঘটেছে। সেদিনের সেই ছোট্ট সৌরভের পিতৃত্ব নিয়ে যখন একজন শিক্ষক সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন সেদিনই আমি বুঝেছি এই স্বাধীন দেশেও আমার সন্তান দুধে ভাতে থাকবেনা। সেদিনের সেই ছোট্ট সৌরভ শিক্ষকের প্রশ্নের নিগুঢ় অর্থ বুঝেছিলো কিনা জানিনা,তবে ওর একছুটে বাড়ি পালিয়ে আসাটা আমার মনের গহীনে গভীর দাগ কেটেছিলো।

তারপর থেকে সৌরভ আর কখনো স্কুলমুখী হয়নি। আমিও যে চেষ্টা করিনি তা নয়,কিন্তু একসময়ে সৌরভের অভিমানের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছি। তবে সেটা শর্তহীন আত্মসমর্পণ ছিল না। কারন ওকে আমি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। রবীন্দ্রনাথ কিংবা রুদ্র মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহর কবিতা অন্তরে লালন করতে শিখিয়েছি।


দুই.
“মা...।”
সৌরভের ডাকে আমার ভাবনাগুলো থমকে যায়। আমি প্রশ্ন চোখে ওর দিকে তাকাই। ছেলেটা ঠিক ওর বাবার মত উচ্চতা আর গায়ের রঙ পেয়েছে,কিন্তু চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচে তৈরী। এটাই কি ওর পিতৃত্ব নিয়ে দুর্গন্ধময় প্রশ্নের উৎস?
এক হাতে বাজারের থলে আর অন্য হাতে প্রিয় সাইকেলখানাকে উঠানের মাটির উপর স্থির রেখে ওর ঋজু হয়ে দাড়ানোর ভংগী দেখে আমার মনে বরফ কুচির মত বাষ্প জমে। ছেলের চোখ থেকে দৃষ্টী নামিয়ে উঠানের এক কোনায় লাগানো সজনের সাদাটে ফুলের দিকে তাকিয়ে কোনরকম লুকোছাপা না করেই বলি, “ওবাড়ি থেকে লোক পাঠিয়েছিলো। মেয়ের বাবা নাকি এখনো মনস্থির করতে পারছেনা।”
“আর কত নীচে নামবে তুমি? এতবার বিয়ে ভাংগার পরও তোমার হুশ হলো না।”
“আমি কি জানতাম একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে এই স্বাধীন দেশে তোকে আজীবন হেনস্থা হতে হবে?”
“স্বাধীন দেশ,না! স্বাধীনতার কথা তুমি আমার সামনে আর বলোনা।”
সাইকেল ঠেলে ঠেলে সৌরভের এগিয়ে চলা আর ওর দৃড়পদক্ষেপের দিকে আমি আহত চোখে তাকিয়ে থাকি। ওর প্রতি কোমল মায়ায় বুকের ভিতরটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। ওর অভিমানগুলো পোকার মত মন্থর বেগে আমার মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

সৌরভের ক্লান্ত অভিমানগুলো একে একে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আজ এত বছর পরে আমাকে অন্যরকম এক ভাবনা আমাকে পেয়ে বসে। কি হতো আমার স্বামী যুদ্ধের সময় হাতপা গুটিয়ে সংসারের মাঝে সেঁদিয়ে থাকলে? যুদ্ধ পরবর্তী এই স্বাধীন দেশে কাপুরুষ নামে আখ্যায়িত হত? নাহয় হতই। তবু তো আমাদের সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে প্রতিনিয়ত ভুগতে হতোনা।
আমার শিক্ষক স্বামী যখন যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিতে প্রথম ঘর ছাড়েন তখন এই বাড়িতে ছিলাম আমরা দুটি মাত্র মানুষ। আমি আর আমার বৃদ্ধ শ্বশুর। আমার স্বামী খুলনায় একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। বিয়ের পর থেকে আমি আমার শ্বশুর শাশুড়ির সংগে এই গুলিশাখালি গ্রামেই থাকতাম। বছর দুয়েক আগে আমার শাশুড়ি মারা যাবার পর শ্বশুর আর আমিই থাকতাম। দুই মাস তিন মাস পরপর আমার স্বামী শহর থেকে বাড়ি আসতেন।
সে বার ডিসেম্বরের শেষ দিকে এসে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন। মার্চের শেষে আবার আসার কথা ছিলো। চিঠিতে তাই লিখেছিলেন। ছাব্বিশে মার্চ সকালে ঢাকার খবর পাওয়ার পর থেকে একটা ভীষন ভয় মাঘের শীতের মত বারবার আমার আপাদমস্তক নাড়িকে দিয়েছিলো। খুলনায় কিছু হয়নি তো! আমার স্বামী ভালো আছে!



ছাব্বিশে মার্চ সারাদিন উৎকন্ঠায় কাটানোর পরে মাঝরাতে হঠাৎ করেই আমার ঘরের টিনের বেড়ায় কারো সন্তর্পণ আচঁড়ের শব্দে আমি চমকে উঠি। কয়েকবার কান খাঁড়া করে শুনে পা টিপে টিপে গিয়ে আমার শ্বশুরকে ডেকে নিয়ে আসি। আমার শ্বশুর কি বুঝলেন জানিনা,তিনি সামনের ঘরে গিয়ে নিঃশব্দে বড় দরজার খিল খুলে দিলেন। দরজা খোলার সংগে সংগেই ছায়ার মত একজন মানুষ ঘরে ঢুকলেন। কালো চাদরে জড়ানো মানুষটা আর কেউ নয়। সে ই। যাকে একটুখানি কাছে পেতে কত যে অপেক্ষার প্রহর গুনে কাটিয়েছি সে ই। আমার স্বামী।

সেদিন প্রায় এক ঘন্টার মত আমরা একান্তে সময় কাটিয়েছিলাম। দেশের প্রতি ভাবনায় তার উদভ্রান্তের মত মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিলো। আমি প্রানপণে চাইছিলাম এমন কিছু ঘটুক যাতে আমার স্বামী আজীবন আমার কাছেই থাকে। শুধু একই প্রার্থনা মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছিলো..খোদা! এ সময়টা যেন ঘুমের ঘোরের কোন দুঃসপ্ন হয়।
স্বামীকে আটকে রাখতে পারবোনা জেনে মাটির ব্যাংকে জমানো আমার সবটুকু সঞ্চয় আর গয়না গুলো তার বাড়িয়ে ধরা গামছায় উপুড় করে ঢেলে দিয়েছিলাম। সে খুব খুশী হয়েছিলো তাতে। খুশীর পাশাপাশি দেশ স্বাধীনের প্রতিজ্ঞায় তার মুখের কষ্টের ছাপকে ভেদ করেও উপচে পড়া দৃড় প্রত্যয় ছিলো চোখে পড়ার মত।

সেদিন যদি জানতাম যে এই স্বাধীন দেশে আমার স্বামীর সাথে আমার কখনো দেখা হবেনা এমনকি তার মৃত মুখখানাও দেখতে পাবোনা তাহলে তাকে আরো কিছুক্ষণ প্রানভরে দেখে নিতাম,হাত বাড়িয়ে শেষ বারের মত একজন পবিত্র সৈনিকের দৃড় চোয়াল ছুঁয়ে দেখতাম।
সে রাতে আমি অবাক হয়েছিলাম আমার শ্বশুরের মনের শক্তি দেখে। কত অবলীলায় তিনি তার একমাত্র প্রিয় সন্তানকে হাসিমুখে বিদায় দিয়েছেন। আজ ভাবি আমার শ্বশুরেরমত পিতা আর আমার স্বামীর মত সন্তানের জন্যই আমরা এই মাতৃভূমি পেয়েছি,প্রানভরে নিজেদের মত কথা বলতে পারছি,নিজেদের সুরে গান গাইতে পারছি।
আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই রাতে,তার চলে যাওয়ার মুহূর্তে আমার শ্বশুরের বাম পায়ের পুরনো ব্যাথাটা খুব বেড়েছিলো। আমি ব্যাকুল হয়ে একবার আমার স্বামীর কাছে আসি আরেকবার দৌড়ে আমার শ্বশুরের কাছে ছুটে যাই। এই আসা যাওয়ার একফাঁকেই আমার স্বামী ঘর ছাড়ে। আমার শ্বশুরের খন্ড খন্ড পিছু ডাকও তাকে সেদিন আটকাতে পারেনি।
সেদিন সারারাত আমরা কেউ ঘুমাইনি। আমার শ্বশুরের দেখাদেখি আমিও সারারাত জায়নামাজে কাটিয়েছি। স্বামীর মংগল কামনায় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে কাঁপা কাঁপা দুটি হাত তুলে একমনে প্রার্থনা করেছি।
যে মানুষটা আজীবন পরিবারের স্নেহ ছায়ায় থেকেছে,আজ হঠাৎ করে একটানে গৃহচ্যুত হয়ে কোথায় যাবে কার কাছে যাবে ভেবে আমার মনটা দুশ্চিন্তার স্রোতে বালুর ঘরের মত বারবার ভেসে গিয়েছিলো। আমি ক্লান্ত ঠোটদুটি নেড়ে অস্ফুটে সৃষ্টিকর্তার কাছে বলেছিলাম...হে আল্লাহ তুমি দেখো তাকে। যে মানুষটা একফোটা রক্তের দাগ দেখেও সভয়ে পিছিয়ে যেত সেই মানুষটা আজ দেশের জন্য,তোমার সৃষ্টিকে ভালবেসে মা আর মানুষের জন্য নির্দ্বিধায় যুদ্ধে গিয়েছে আমি আজ তাকে তোমার হাতেই ছেড়ে দিলাম...।

তিন.
মানুষের দেহ যখন একটু একটু করে সম্মুখে অগ্রসর হয়,তার মনটা ততই পেছনদিকে ধাবিত হয়। অতীতের স্মৃতিচারণা তাকে আকন্ঠ পেয়ে বসে। আমারো হয়েছে সেই অবস্থা। বারমাসি ফলের মত স্মৃতি গুলো মনকে সবসময় আকড়ে ধরে পড়ে থাকে।
সৌরভের আনা কাঁচা শাক সবজি বাজারের থলে থেকে বের করতে করতেই কত কথা যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই দুপুর ছুঁই ছুঁই সকালে রান্নাঘরের উঁচু জলচৌকিতে বসে আনমনে ডুবন্ত তেলে পাপড় ভাজার মত পুরনো দিনগুলো উলটে পালটে দেখি। বর্তমান আর অতীত দিনগুলোর পার্থক্য আমার চোখে রাত আর দিনের মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার পরই শুরু হয়েছিলো আমার আসল জীবন। মাত্র একরাতের ব্যবধানেই যেন কত বছর পেরিয়ে কত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নিজের কাছে ফিরেছিলাম। সকালের তাজা সূর্যের মুখের একাংশ দেখে কিছুটা ভয় দূর হলেও কেমন একটা টানটান সময় কাটছিলো। সেদিন ভোরের প্রথম আলোতেই আমার শ্বশুর বাজারে গিয়েছিলেন আমার স্বামীর কোন খবর পাওয়া যায় কিনা সেই আশায়। শ্বশুরের পেছন পেছন আমিও বাড়ি থেকে বের হবার একমাত্র টিনের দরজার কাছে গিয়ে ঠায় দাড়িয়েছিলাম। যদি আমার শ্বশুর কোন সংবাদ নিয়ে আসেন!
কিন্তু না। আমার স্বামীর মাঝরাতের আগমনের খবর সকলেরই অজানা ছিলো। প্রায় ঘন্টা দুয়েক পরে আমার শ্বশুর আস্তে আস্তে দীর্ঘদিন অসুখে ভোগা মানুষের মত পা টেনেটেনে হেঁটে এসেছিলেন। তার সেই উদ্ভ্রান্তের মত মুখখানা দেখে আমার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করেছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো আমার চিৎকারে সুনিপুণ হাতে আঁকা আকাশটা ভেংগে পড়ুক,সমস্ত গাছ ছেড়ে পাখিরা ভয়ে পালিয়ে যাক। এই আকাশ বাতাস ফুল পাখি কিছুই আমার প্রয়োজন নেই। আমি দেশ চাইনা,মাটি চাইনা,যুদ্ধ চাইনা। আমি চাই স্নেহ আর কোমল ভালবাসাময় আমার স্বামীর হাত দুখানা। যে হাত দিয়ে সে আমাকে আমাদের দাম্পত্য জীবনের আটটি বছর আগলে আগলে রেখেছে। কিন্তু মানুষ যা চায় তাইই যে পাওয়া যায়না তা বুঝেছিলাম আরো কিছুদিন পর।

আমার স্বামী চলে যাওয়ার পরদিন থেকেই আমাদের এই শান্ত গ্রামের আনাচ কানাচের পরিবেশ ছিলো শ্রাবনের আকাশের মত থমথমে। বাজারের দোকানপাটও প্রায় সময়ই বন্ধ থাকে। গ্রামের বৌ ঝিরা পর্যন্ত বিনা কাজে ঘরের বাইরে বের হয়না,পাড়া বেড়ানো তো দূরের কথা। সারাক্ষণই মনে হতো কি একটা ঘটার আশংকায় পথঘাট,পথের দুধারের গাছগুলোও থমকে আছে।
আমি একবেলা রান্না করে দুজন মিলে তিনবেলা খেতাম। শ্বশুড়ের কড়া নিষেধে বাইরের উঠানেও পা রাখার উপায় ছিলোনা।


আমাকে আমার বাবার বাড়ি পাঠানোর চেষ্টা যখন পুরোপুরিই বিফলে গেলো তখন তিনি এক প্রকার হাল ছেড়ে দিয়েই নিজের মত করে আমাকে রক্ষার উদ্যোগ নিলেন। আমাকে যাতে ঘরের বাইরে যেতে নাহয় তাই তিনি গোসলের পানিটা পর্যন্ত টেনে এনে ঘরের লাগোয়া মাটির বারান্দার এক কোনায় রেখে দিতেন। তার আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো আমি যে এ বাড়িতে আছি তা যেন কাকপক্ষীও টের না পায়।
এভাবেই আমাদের দুঃসহ দিনগুলো কাটছিলো। একদিন গোপনে আমার ছোট ভাই এসে আমার সাথে দেখা করে গিয়েছিলো। মা বাবার একান্ত অনুরোধ ছিলো আমি যেন যেভাবেই হোক ভাইয়ের সংগে বাবার বাড়ি চলে যাই।
আমি যাইনি। আমার স্বামীর কথা,বৃদ্ধ শ্বশুরের কথা ভেবে আমি শ্বশুরালয়েই থেকে গিয়েছিলাম। সেই সময়ের কথাগুলো ভাবলে এখনো হাত পা কাঁপে। অথচ তখন কত সহজেই না এ বাড়িতে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম! তরুন বয়স ছিলো, বিপদকে এক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার আশায় মনপ্রাণ ছটফট করতো। ঘরের কোণে বসে যে সারাদিন কত কি ভাবতাম...মনে মনে যে কতবার স্বামীর পাশেপাশে থেকে সম্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের পাখির মত নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করতাম!

আমার শ্বশুরকে দেখতাম সারাদিন কেমন গাছের ছায়ার মত আলগোছে পড়ে থাকতেন। আমার সাথেও কথাবার্তা অনেক কমিয়ে দিয়েছিলেন। আমার স্বামী চলে যাবার পর মধ্য রাতেও রেডিও কানের কাছে ধরে কি এক অসহ্য যন্ত্রনায় লম্বা বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারী করে বেড়াতেন। আমি সবই দেখতাম। দুচোখের ঘুম আমারো বালিশে মাথা ছোঁয়ালেই কোথায় পালিয়ে যেত...স্বামীর কথা মনে পড়ে কখনো কখনো সারারাত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতাম। তাকে একটুখানি দেখার আশায় নিজের সবটুকু বোধবুদ্ধি গুলিয়ে ফেলেছিলাম সেসময়।


চার.
সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দে মুখ তুলে দেখি সৌরভ হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। আমাকে বিহব্বল চোখে চেয়ে থাকতে দেখে সাইকেলটা বারান্দায় রেখে এলো। রান্নাঘরের দরজার পাশে একটা পিড়ি পেতে বসে বললো,
“মা,সারাদিন তুমি কি এত ভাবো বলোতো?”
“কত কিই তো ভাবি। ভাবনা চিন্তার কি কোন শেষ আছে? ”
“এত ভেবে কি হবে বলো? লাভ তো হবেইনা উল্টো আরো তোমার শরীরটা অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
“কিচ্ছু হবেনা আমার। কি করবো বল? ঘরে যদি টুকটুকে একটা বৌ থাকতো তাহলে কি আর এসব মনের কথা মনের কাছে বলতে হতো?”
“বাদ দাওতো মা ওসব। দাও বটিটা আমার কাছে দাও,মাছ গুলো আমি কুটে দেই।”
আমার ছেলেটা একটু পাগলাটে স্বভাবের। মায়ের কাছে সব সন্তানই বোধহয় এমন। আমার প্রতি ওর মমতা দেখে এক নিমিষেই সমস্ত সংশয় দূর হয়ে যায়। হ্যা আমরা এমন এক খন্ড স্বাধীন আবাসই তো চেয়েছিলাম যেখানে একজন সন্তান তার মাকে ভালবাসা দিয়ে আঁকড়ে ধরবে,শিশু যেমন নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় প্রিয় খেলনাটিকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
টেংরা মাছের কাটা কাটতেই কাটতেই সৌরভ অনেকটা আপনমনে বলে,
“কাল স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে স্কুলের মাঠে অনুষ্ঠান হবে। চেয়ারম্যান নাকি আমাদের বাড়ির ত্রিশটা ডাব চেয়েছে। তার লোক আসবে ভোরবেলা। আমি বলে দিয়েছে ডাব তো দূরের কথা,এই বাড়ির ত্রিসীমানায় চেয়ারম্যান বাড়ির কেউ পা রাখলে এখানেই সবগুলোকে পুঁতে রাখবো।”
ছেলের কথা শুনে বুকের ভেতরটা ধ্বক করে ওঠে। বিশেষ করে চেয়ারম্যানের কথা শুনে। চেয়ারম্যানই তো সব জেনেশুনে বুঝে শুধুমাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী আর সন্তান হওয়ার অপরাধে দেশের এই পবিত্র মাটি থেকে উচ্ছেদের কামনায় আমাদের চারদিকে কলংকের দৃশ্যমান দেয়াল তৈরি করেছে।
সৌরভের অভিমানের সুপ্ত জায়গাটা আমার চিরচেনা। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও যদি পিতৃত্বের প্রশ্নের আবর্তে আজীবন ঘুরপাক খেতে হয়,বারেবারে প্রায় ঠিক হওয়া বিয়েও ভেংগে যায় তবে এই দেশের প্রতি,মানুষের প্রতি অভিমান হওয়াটাই স্বাভাবিক।

চেয়ারম্যান জাফর খাঁর বাড়ি আমাদের বাড়ির উত্তর দিকে দুই বাড়ি পরেই। একসময় এ বাড়িতে তার ঘনঘন আনাগোনা ছিলো। যে রাতে আমার শ্বশুর পাক সেনাদের গুলিতে নির্মমভাবে মারা যান সে রাতের পর থেকেই। সেই রাতের মত দীর্ঘ রাত আমার জীবনে আর আসেনি। গুলির শব্দ শুনেও বাইরের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখার সামর্থ ছিলোনা। পোঁয়াতি শরীর নিয়ে ভরপেট অজগরের মত নিথর নিশ্চল পড়েছিলাম। মাঝ রাতে ওঠা প্রসব বেদনার ভয়ানক যন্ত্রনাকে দাঁতে দাঁত চেপে আটকাতে গিয়ে ঘেমে পুরো বিছানা ভিজে গিয়েছিলো। জীবনে প্রথমবার মা হতে যাচ্ছি অথচ কেউ পাশে নেই,নিকষ কালো অন্ধকারে পায়রার খোপের মত জায়গায় সম্পূর্ণ একা একা অচেনা এক তীব্র যন্ত্রনার মাঝে সাতার কাটতে কাটতে এগিয়ে চলছি। কি ভীষণ যন্ত্রণা..... বিকেল থেকেই যখন কোমর থেকে একটু একটু ব্যাথা হামাগুড়ি দিয়ে পেটে ছড়িয়ে পড়ছিলো তখনই আমার শ্বশুর পাশের বাড়ি গিয়ে একজনকে খবর দিয়েছিলেন। সম্পর্কে তিনি আমার ফুফু শাশুড়ি হন।
কিন্তু তিনি আর আসতে পারেননি। সন্ধার আগে আগেই খবর রটে যায় পাকিস্তানী সেনাদের আগমনের। গ্রামের প্রতিটা মানুষ তখন যে যার মত মটরশুঁটির খোসার মাঝে গাদানো মটরদানার মত গুটিসুটি মেরে লুকাতে ব্যস্ত। আমাকে এই ভারী শরীরটা বয়ে নিয়ে কোথাও যেতে হয়নি। কারন আমার শ্বশুর একজন কর্তব্যপরায়ন পিতার মত আমার জন্য আগেই সুকৌশলে ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
তিনি বেশ কিছুদিন আগেই আমার ঘরের পেছনদিকের বেড়া যেখানে একটা ছোট্ট জানালা ছিলো সেটাকে পেরেক মেরে বন্ধ করে দেন। লাকড়ি রাখা ঘর থেকে মাপমত একটা টিনের বেড়া খুলে এনে একজন মানুষ শুয়ে বসে থাকতে পারে ঠিক অতটুকু জায়গা রেখে একটা ফলস বেড়া তৈরি করেন। নিঃশব্দে অনেক সময় নিয়ে ধীরে ধীরে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকে ঠুকে একটা ছোট্ট দরজারও ব্যবস্থা করেন। দরজার জায়গা ঢেকে দেয়ার জন্য শূণ্য কাঠের মিটসেফটা দরজা বরাবর এনে রাখেন। তার নিপুন কাজ আর কৌশল দেখে সেদিন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।
তবে পুরোটা জায়গা ভালমতো পর্যবেক্ষণ করে মনে মনে কিছুটা দমে গিয়েছিলাম,কারন কেউ যদি বেড়ার উপর অনুসন্ধানের দৃষ্টি চালায় তবে তার মনে সন্দেহ জাগবেই। তবে সেই সাথে আরো একটি ভয় মড়ার উপর খাড়ার ঘা'র মত ঝুলে ছিলো। পাক সেনারা যদি ঘরে আগুন দেয় তবে আর বাঁচার কোন পথই থাকবেনা। যা থাকে কপালে ভেবে পরম করুনাময়ের হাতে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে নির্দ্বিধায় ঐ বদ্ধ পকেট ঘরেই থাকার সিদ্বান্ত নিয়েছিলাম। তবে মনে খুব আশা ছিলো ঐ ঘরে ঢোকার প্রয়োজনই হয়তো পড়বেনা।

পাঁচ.
শেষ রাতেও যখন কোন সদ্যজাত শিশুর ক্রন্দন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনিত হয়নি তখনই নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলাম। বুঝেছিলাম জীবন নামক জ্বলন্ত মোমটুকু গলে গলে তলানিতে এসে ঠেকেছে। তাই বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছেটুকুও ছেড়ে দিয়ে চেতনা লুপ্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারপর কিভাবে কি হয়েছিলো কিছু মনে নেই। ঘোর কাটিয়ে দিনের প্রথম আলোয় চোখ মেলে দেখি আমার পাশে কাঁথায় মোড়ানো ছোট্ট একটি শিশু। আর শিয়রে বসা আমার সেই ফুফু শাশুড়ি। আমাকে চোখ মেলতে দেখে তার সশব্দে ছাড়া নিঃশ্বাস এখনো আমি শুনতে পাই। সেদিন বাদ জোহর চার পাঁচজন মানুষ নিয়ে আমার শ্বশুরের জানাজা হয়। জানাজা শেষে আমার শ্বশুরকে যখন দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তখন আমার চিৎকার করে কাঁদার শক্তিও ছিলোনা। অসহ্য কষ্টে আমি শ্বশুরের মুখখানা শেষবারের মত দেখার আশায় বেড়া খুবলে খামচে সরানোর চেষ্টা করি। পুরনো টিনের বেড়ায় লেগে আংগুলগুলো রক্তাক্ত হয়ে পড়ে কিন্তু তবু আমার শ্বশুরের শেষ যাত্রাটা আমি দেখতে পাইনি। প্রিয়জন ছাড়া সম্পূর্ণ একা একা তাকে অসীম গন্তব্যের দিকে যাত্রা করতে হয়েছে।

আজ এই স্বাধীন দেশে বসেও আমার আফসোস আমি আমার পিতার মত শ্বশুরকে শেষ দেখাটাও দেখতে পেলাম না। শুধুমাত্র এই জাফর খাঁর মত যুদ্ধাপরাধীর জন্য,ওদের মত বেঈমানদের জন্য। এই বেঈমানেরাই তো পাক সেনাদের মত জানোয়ারদের পেছনে নেড়ি কুকুরের মত ঘুরে ঘুরে প্রতিটা মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি চিনিয়েছে। নিরস্ত্র নারীর উপর বেহায়ার মত প্রকাশ্য দিবালোকে ঝাপিয়ে পড়তে ইন্ধন জুগিয়েছে। কখনোবা রাতের আঁধারে হায়েনার মত চুপিসারে গিয়ে স্বামীহারা একজন বৃদ্ধার শেষ আশ্রয়টুকু আগুনের লকলকে জিহবা দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।


আমার শ্বশুরের মৃত্যুর পর আমার ঐ ফুফু শাশুড়ি যিনি জাফর খাঁর মা তিনি ঐদিনই এক কাপড়ে আমাদের বাড়ি এসে ওঠেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ছেলে জাফর খাঁর হাতের পানিও স্পর্শ করেননি।

আমার প্রতি তার সেই উদারতা আমি কোনদিন ভুলবোনা। সেদিন তিনি যদি আমার পাশে এসে না দাড়াতেন তবে আজ আমি কোথায় থাকতাম জানিনা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমাকে মায়ের আচঁলের মমতায় ঢেকে রেখেছেন। যেদিন খবর পাই আমার বাবার বাড়ির সবাইকে বিনা অপরাধে বদ্ধ ঘরে ভরে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় সেদিনো আমার এই ফুফু শাশুড়ি বটের ছায়ায় ঘিরে রেখেছেন আমাকে। এ কথা সে কথা বলে ভুলিয়ে রেখেছেন,বাড়ির কথা ভাবারও অবকাশ দেননি।
কিন্তু এত কিছুর পরও জাফর খাঁ আমার পিছু ছাড়েনি। হাটবাজার বাড়িঘর সর্বত্রই ছিলো আমার বিরুদ্ধে তার অপপ্রচার। এই সন্তান নাকি আমার পাপের ফসল। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরের শেষে আমার স্বামী খুলনা যাবার পর আজপর্যন্ত কেউ তাকে এ গ্রামে পা রাখতে দেখেনি। তাহলে এ বাচ্চার বাবা কে? প্রথম যেদিন এ প্রশ্ন শুনি সেদিন আমার চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে,আমার আপাদমস্তক থরথর করে কেঁপে ওঠে। আমার স্বামীর লাগানো পেয়ারা গাছ ধরে কান্না গিলে নিজেকে সামলাই। মনে মনে ভাবি আর কত! আর কত! একে একে স্বামী,পিতা,ছোট ছোট ভাইবোন সহ সব প্রিয়জনদের হারিয়েছি,তবু স্বাধীনতার জন্য আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে?


স্বাধীনতার বত্রিশ বছর পরেও আমাকে আমার সন্তান নিয়ে একঘরে হয়ে থাকতে হয়েছে। শুধুমাত্র ঐ জাফর খাঁর মত ঘাতকব্যাধির জন্য। যারা স্বাধীন বাংলাদেশেও বুক ফুলিয়ে বাংলা মায়ের পবিত্র জমিনকে আঘাত করে করে দপ দপ করে হাটে।
আজ সৌরভের কাছে জাফর খাঁর ডাব চাওয়ার কথা শুনে পুরোনো ইচ্ছেটা আড়মোড়া ভেংগে জেগে ওঠে। জীবনের তৃতীয় ধাপে পা রেখেও এই সব জীবানুদের পায়ের তলায় পিষেপিষে মারতে আমার হাত পা বিদ্রোহ শুরু করে। কিন্তু সৌরভকে আমার মনের তোলপাড় বুঝতে দেইনা। ক্লান্ত হাতে রান্না করি। দৈনন্দিন কাজকর্ম সারি। জীবন থেকে আরো একটা দিন পার হয়ে যায়। জীবন আর মৃত্যুর মাঝের ব্যবধান আরো কিছুটা কমে আসে।

ছয়.
আজ ছাব্বিশে মার্চ। ভোর বেলা। সদ্য হাটা শেখা শিশুর মত একটু একটু করে সূর্যের নরম আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। উঠানের একাধারে লাগানো বছরের শেষ গাঁদা ফুলে তখনো সূর্যের আলোর রেশ লাগেনি। প্রতিদিন ফযরের নামাজ শেষ করে বিছানো জায়নামাজে বসেই কোরান পড়ি। আজও পড়ছিলাম।
কিন্তু উঠানের উপর কারো হাঁকডাক শুনে পৃষ্ঠায় চিহ্ন রেখে পড়া বন্ধ করে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দেই। দু তিন জন অচেনা জোয়ান ছেলে। বুঝতে পারছি এরা জাফর খাঁর নির্দেশে ডাব পাড়তে এসেছে। আমি বাইরে নামার আগেই সৌরভের গলা শুনতে পাই। “যা চেয়ারম্যানকে গিয়ে বল আমার গাছের ডাব দেবোনা।” আরেকটা কন্ঠস্বর শোনা যায়,
“কাজটা কিন্তু ঠিক করলি না সৌরভ।”
ছেলেগুলো চেয়ারম্যান বাড়িরদিকে যেতে যেতে বলে।
জাফর খাঁ যে হাল ছাড়ার মানুষ নয় সেটা জানি। নতুন আবার কি ঝামেলা করবে সেটা ভেবেই বুক শুকিয়ে আসছে। ছেলের রুদ্রমূর্তি দেখে ডাব দিয়ে দেয়ার কথা বলারও সাহস পাচ্ছিনা। নিজেকে বোঝাই এত ভেবে কি হবে! বিপদের ভয়ে সব কিছু বিসর্জনই যদি দেই তাহলে আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে স্বাধীনতার টানে আমার স্বামীর ঘর ছাড়ার কোন অর্থই থাকবেনা। আমার শহীদ স্বামীর মত আরো লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মা কষ্ট পাবে।

আমার অনুমানই ঠিক। প্রায় সোয়া একঘন্টা পরে সূর্য যখন সবগুলো পাপড়ি খুলে আলোর বন্যায় চারদিক ভাসিয়ে দিয়েছে তখন জাফর খাঁ ঐ তিনটা ছেলেকে সংগে নিয়ে আমাদের বাড়ির উঠানে এসে দাড়িয়েছে। আমি ঘরে বসেই শুনতে পাই সৌরভকে উদ্দেশ্য করে বলা ওর ফ্যাসফ্যাসে গলার আওয়াজ।
“ কিরে তুই নাকি ডাব পাড়তে দিবিনা?”
“বলেইতো দিয়েছি দেবনা।” সোরভের গলা।
এবার জাফর খাঁ টিটকিরি দিয়ে বলে, “যার বাপের নাই ঠিক সে আসছে আমার সাথে তর্ক করতে।” সাথের ছেলে তিনটা হো হো করে হেসে ওঠে। চেয়ারম্যান ছেলেগুলোকে হাসি থামিয়ে নারকেল গাছে উঠতে বলে। ছেলেগুলো লুংগি কাছা মেরে গাছে উঠতে গেলে সৌরভের বাজঁখাই গলার স্বর শুনে চমকে উঠি।
“খবরদার! গাছের দিকে কেউ পা বাড়ালে এই দাও দিয়ে তার পা টুকরো টুকরো করে ফেলবো।”
ছেলেগুলো এবার থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু চেয়ারম্যান দু'পা এগিয়ে এসে সৌরভের কলার চেপে ধরে বলে,”শালা বেজন্মা! আমার সাথে তেজ দেখাস? ”
বেজন্মা শব্দটি শুনে আমার শরীরের সবটুকু রক্তের অনু পরমানুতে আগুন ধরে যায়। প্রতিশোধের নেশায় শরীর বেয়ে যেন ফুটন্ত লাভা নেমে আসে। খাটের তলা থেকে আমার শ্বশুরের রাম দাটা নিয়ে দৌড়ে যাই। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একছুটে গিয়ে জাফর খাঁর পিঠ এফোড় ওফোঁড় করে দেই। ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত দেখে আমার ঘোর কাটে। কিন্তু এতটুকু অপরাধবোধ হয়না।
জাফর খাঁ উঠানের মাটিতে সজনে গাছের গোড়ায় লুটিয়ে পড়ে। রক্তের গাঢ় দাগ পড়ে মাটিতে। তাই দেখে দ্রুত ছুটে যাই রান্নাঘরের দিকে। পুরনো একটুকরা কাপড় এনে ক্ষিপ্রগতিতে রক্তের দাগ মুছি। এই মাটি আমার বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া,দুধের শিশুর অবুঝ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া,সন্তান হারা মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের বিনিময়ে পাওয়া। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা এই পবিত্র মাটিতে আজকের এই স্বাধীনতা দিবসে আমি একজন যুদ্ধাপরাধীর রক্তের দাগ লাগতে দেবনা।
স্কুলের মাঠের মাইকে আকাশ বাতাশ কাঁপিয়ে বাজছে...... মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি...মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি.....
আমি এক ঘোরলাগা মানুষের মত বাংলার পবিত্র মাটি থেকে একজন বেঈমানের রক্তের দাগ মুছেই যাচ্ছি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement