প্রমিকের ভালবাসায় পাগল হয়ে মিলি কোন এক মাঝ রাতেই তার কল্পনায় থাকা প্রেমিকের হাত ধরে হারিয়ে যায় দূরে বহুদুরে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩ আগস্ট ১৯৮৮
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬২

বিচারক স্কোরঃ ২.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

মাঝ রাতের জ্যোৎস্না
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ১২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬২

আবীর রায়হান

comment ১৩  favorite ০  import_contacts ৩৬১
কিছু ভালো লাগছেনা,কিছু না। বাসার সামনের কদম গাছটা ফুলে ফুলে ভরা,সেদিকে তাকিয়ে ইচ্ছে করছে গাছটাকে উপড়ে ফেলে দেই অথচ এই কদিন আগেও ফুল আসতে দেরী হচ্ছে কেন ভেবে অস্থির ছিলাম। কি করবো,কাকে বলবো, কোথায় যাব কিছুই বুঝতে পারছিনা। গতকালের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো বুঝতে পারিনি। হঠাত দেখি মা পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখ মুছে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। মা স্বগতোক্তির মত বললো
-তুই ক্যান কাঁদতেছিস? কাঁদবো তো আমি,পাপ তো আমার তোকে পড়াশুনা করাতে চাইছি।
আমি বললাম -মা বিশ্বাস করো আমি খারাপ কিছুই করিনি,বিশ্বাস করো মা। মা তুমি বাবাকে বোঝাও,অন্য কোথাও বিয়ে দিলে একদম মরে যাব আমি।
-তোর বাবা কি কারো কথা মানে? আমি ভাবতেই পারিনা এমন একটা ফ্যামিলির মেয়ে হয়ে তুই কিনা একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়ালি? কি লাভ হলো এত যুদ্ধ করে তোকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে? এখন তো মানসম্মান ও গেল পড়াশুনা ও গেল।
-মা তুমি বলো কি করবো আমি এখন?
মা কথা না বলে রান্নাঘরের দিকে গেল। মাকে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখে মনে পড়লো গতকাল দুপুরের পর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি,মা'র ও সাহস হয়নি বাবাকে না জানিয়ে কিছু খেতে দেয়। আমি জানিনা আমি কতখানি অন্যায় করেছি বাবার চোখে। একটা ছেলে কে পছন্দ করেছি শুধু এইতো। কিভাবে কি হয়ে গেলো আমি নিজেও কি তা জানি।
ছোট বোন লিলি এসে বললো বাবা ডাকে। শুনেই ভয়ে বুক শুকিয়ে গেলো,ওকে বললাম - রুমে মা আছে?
- না,বাবা একা তোমাকে যেতে বলছে।
কি আর করা,বুক যতই কাঁপুক বাবাকে বুঝতে দেয়া যাবেনা,আমি বাবার ই মেয়ে,রাগ আমারো কিছু কম নয় আর তাছাড়া ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি বাবা শক্তের ভক্ত। যাইহোক রুমের সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়ালাম,ভিতরে যাব কি যাব না ভাবতে ভাবতেই ঢুকে পড়লাম। বাবা দুইহাত মাথার পেছনে রেখে চোখ বন্ধ করে খাটে আধশোয়া হয়ে ছিলেন,ওই অবস্থায় বাবাকে দেখে কষ্টে আমার বুক ভেঙে গেল,ইচ্ছে করছিলো বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলি বাবা তুমি যা বলবে তাই হবে।
বাবা আমার সাড়া পেয়ে চোখ খুলে বললেন - আমার সামনে বোস।
আমি বসাতে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন,সম্ভবত মনে মনে কথা গুছিয়ে নিলেন। তারপর হঠাত ই বললেন
- তোর সেকেন্ড সেমিস্টার শেষ হইছে?
আমি মনে মনে অবাক হলাম এই ভেবে যে বাবা তো আমার পড়া লেখার খবর আমার থেকে কিছু কম জানেনা তবু এই প্রশ্ন কেন।মুখে বললাম -না।
- তোর মাকে বলে দিছি তোর আর ক্লাসে যাওয়ার দরকার নাই,ইন্টারমিডিয়েট পাস তো আছিস তাতেই চলবে।

আমি এই মুহুর্তে বাবার সাথে কোন তর্কে গেলাম না কারন পড়াশুনা নিয়ে পরেও ভাবা যাবে কিন্তু শখ করে খাল কেটে যে কুমির আমি এনেছি সেটা থেকে কিভাবে পরিত্রান পাব সেটাই চুপচাপ ভাবছি।
তারপরেই বাবা আসল কথায় আসলেন।
- তোকে মোবাইল দিছি চার মাস হইছে না?
-হু
- চার মাস মোটে মোবাইল পাইছিস হাতে এরমধ্যেই এত কিছু ঘটায়ে ফেলছিস?
আমি কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
-কথা বলিস না ক্যান? কথার উত্তর দে। আর তোর মোবাইল এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে,শুধু তোর টা না তোর মা'র মোবাইল ও।
আমি আস্তে করে বললাম
- মা তো কিছু করে নাই,মা তো কিছু জানতো ও না।
বাবা গর্জে উঠলেন
-চুপ কর। এই ফ্যামিলিতে আজ পর্যন্ত কোন মেয়ে বাবার অবাধ্য হয় নাই,বাবা মা'র পছন্দ করা পাত্রের সাথে বিয়েতে অমত করে নাই আর উনার কিনা ভার্সিটিতে গিয়া পাখা গজাইছে!
ছেলেটার নাম কি?
- আনিস।
- করে কি? অবশ্য করবেই বা কি? এইসব ছেলেরা তো রাস্তায় ঘুরাঘুরি ছাড়া আর কিছু করেনা।
- বাবা ও জব করে।
-পড়াশুনা কতদুর করছে?
-মাস্টার্স শেষ করছে তিন বছর হইছে।
-তাহলে তো ছেলে বুড়া,দ্যাখ বউ বাচ্চাও আছে। তবে ছেলে যে ই হোক আর যাই হোক আমার সাফ কথা এখানে আমি তোর বিয়ে দেব না,অন্য জায়গায় ছেলে আমার ঠিক করা আছে।এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে দেব আমি।
-অন্য কোথাও বিয়ে করবোনা আমি।
-তুই আমার সামনে থেকে যা,বিয়ে কিভাবে দিতে হয় জানা আছে আমার।
- বাবা আমরা বিয়ে করে ফেলছি।
বলেই আমি একরকম বাবার ঘর থেকে পালিয়ে এলাম। জানিনা এত বড় মিথ্যাটা আমি বাবার সাথে কিভাবে বললাম,তাও এমন একজনকে নিয়ে যার সাথে আমার মাত্র তিন মাস নয় দিনের পরিচয়,সম্পর্ক।আমি এও জানিনা সে আমাকে এই মুহুর্তে বিয়ে করবে কিনা। তার সত্যিকারের পরিচয় ও আমার অজানা। ফেসবুকে আমাদের পরিচয়,দেখা হয়েছে দুদিন। ফেসবুকে কয়েক সপ্তাহ শুধু চ্যাট হইছে তাও এমন কোন সিরিয়াস কিছু নয়,এমন তো অনেকের সাথেই হয় কিন্তু আমি কখনোই বুঝিনি এভাবে সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলবো।
আমি ভেবেছি কয়েকদিন চ্যাট করি তারপর যদি দেখি প্রেম ট্রেম করতে চায় তাহলে ব্লক করে দেবো কিন্তু দেখা কোনদিন ও করবোনা সে ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত ছিলাম। কারন সে আমার থেকে অন্তত ৮-৯ বছরের বড়। বয়সের এতখানি গ্যাপ নিয়ে তো আর প্রেম করা যায়না। কিন্তু সে এমন পিড়াপীড়ি শুরু করলো দেখা করা নিয়ে যে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তার একটাই কথা ছিলো
-প্লিজ একবার দেখা করো,এই জীবনে আর কোনদিন আসতে বলবোনা।
আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম
- মাত্র একবার আসতে বলছেন তাই আসবোনা,বারবার আসতে বললে আসবো।
তার এতবেশি জোরাজুরির কাছে হার মেনে বান্ধবীদের সাথে পরামর্শে বসেছিলাম দেখা করবো কি করবো না তা নিয়ে। ওরা বললো আমরা সবাই গিয়ে তাকে দূর থেকে দেখে চলে আসবো কিন্তু তাকে বুঝতে দেব না,পরে বলবো কই আপনি তো আসলেন না। কিন্তু দেখা করার আগের দিন থেকেই আমার মনটা এমন ছটফট করছিলো যে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি একাই যাব এবং তার মুখোমুখি হবো। এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই করেছিলাম।

হায় প্রেম আমার! তার সাথে এখন যোগাযোগের কোন উপায় ই নেই।তাকে কিভাবে জানাবো আমার এই গৃহবন্দিত্বের কথা! গতকাল থেকেই আমার ফোন বাবার কাছে।বাবা কিভাবে সব কিছু জেনে ফেললো এখনো তা জানিনা। একবার যদি তাকে সব জানাতে পারতাম!

লিলি এসে পাশে বসে আছে,আমাকে চুপচাপ দেখে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না সম্ভবত। এমনিতে আমরা দুই বোন ই খুব চঞ্চল,মা তো বলে আমরা নাকি হাওয়ায় ভেসে চলি। জানিনা এখন কোন সর্বনাশা হাওয়া এসে উড়িয়ে নিতে চায় আমায়।
আমি লিলির দিকে ফিরে বললাম- কি রে!
ও ভীত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে বাবার রুমের দিকে ইশারা করে বললো - ওই দিকে তো কালবোশেখি ঝড় হচ্ছে,তুমি বাবাকে কি বলে আসছো?
- মা কে বকাঝকা করতেছে?
-হু,মা কাঁদতেছে। আপু তুমি কেন এমন করলা? এত অশান্তি শুধু তোমার জন্য। বাবা আমাকেও আর ইস্কুলে যেতে দেবেনা।
- আচ্ছা মা কে ক্যান বকা দিতেছে? মা কি করছে?
- এ আবার নতুন কি! তুমি আমি কিছু করলেই তো সব মা'র দোষ। তোমার সাহস থাকলে বাবার সামনে গিয়ে দাড়াও,আমাকে আর মা'কে মুক্তি দাও।

লিলির কথা শুনে এমন রাগ হলো যে সরাসরি বাবার রুমে গেলাম।
- বাবা তোমার যা বলার আমাকে বলো,খবরদার মাকে কিছু বলবানা।
বাবা ঠাস করে আমার গালে চড় বসিয়ে দিয়ে বললেন- তুই আমার ঘর থেকে বের হয়ে যা,আমার বাড়িতে কোন বেয়াদবের স্থান নাই।
আমিও রেগে গিয়ে বললাম- ঠিকাছে আমি এক্ষুনি চলে যাব,এই মুহুর্তে।
বলেই আমি ঘুরে রুম থেকে বের হতে গেলাম ওম্নি মা আমার হাত টেনে ধরে বললেন- পাগলামি করিস না মিলি। বাবা বললেন- ওকে যেতে দাও,দেখি কোথায় কে ওর জন্য ঘর বানায়ে রাখছে। যার জন্য আমাদের সাথে বেয়াদবি করতেছে দেখি সে ওকে জায়গা দেয় নাকি! দুইদিন কথা বলছে আর ভাবছে ছেলে বিয়ে করে একবারে উদ্ধার করে ফেলবে!
বলেই বাবা এবার সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- তুই যে বিয়ে করছিস,বিয়ের কাবিননামা দেখা আমাকে।
শুনেই তো আমার বুক ধড়াস করে উঠলো। বিয়েই যেখানে হয়নি সেখানে কাবিননামা কোথায় পাবো। কাবিননামা কেমন বস্তু তাইতো জীবনে দেখিনি। বললাম- ওটা তো আমার কাছে নাই। বাবা বললো - ওই ছেলের কাছে আছে?
- জানিনা।
- কাবিননামা তুলছে?
-জানিনা।
-বিয়েতে সাক্ষি ছিলো কারা?
- তার ফ্রেন্ড রা।
- ওই গুলার নাম,ঠিকানা দে।
- আমি তো চিনিনা তাদের।
তারপর হঠাত ই বাবা অন্য প্রসঙ্গ টেনে এনে বললেন- কাল থেকে নাকি না খেয়ে আছিস? ভাত কি দোষ করছে? যা ভাত খা গিয়ে।

আমি আমার রুমে চলে আসলাম। মনে হচ্ছে ক্ষীন একটু আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।মন আমার আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলো। কদম গাছটার দিকে তাকিয়ে ইচ্ছে হচ্ছিলো প্রতিটি ফুল কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদর করে দেই।রবীন্দ্রনাথের মত বলতে ইচ্ছে করছে মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে.......।
আমাদের বাড়িটি শহরতলীতে,এ ধরনের জায়গায় যারা থাকে তারা জানে এখানকার প্রতিটি অলিগলি কেমন আশ্চর্য রকম মায়াময়।না গ্রাম না শহরের এ এক অপরূপ রূপ। আমার রুমের বারান্দার ঠিক সামনেই ৩-৪ কাঠার একটা খালি জমি,অবশ্য একেবারে খালি না,বিভিন্ন ধরনের গাছপালায় দিনের বেলায় ও জায়গাটাকে অন্ধকার লাগে। ডুমুর গাছ আছে বেশ কয়েকটা,থোকা থোকা ডুমুর গুলো যখন গাছের গায়ের সংগে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে তখন কি যে ভাল লাগে! আর তার পাশেই যে আতা গাছটা তার ঠিক মাঝখানে একটা কাকের বাসা,কদিন আগেও বাসাটায় তিন চারটা ছোট্ট ছানা ছিলো কিন্তু এখন বাসাটা একদম খালি,কি জানি কবে ছানা গুলো বড় হয়ে উড়তে শিখে কোথায় চলে গেলো খেয়াল ই করিনি।ইদানিং নিজের প্রতিই কোন খেয়াল নেই আর তাছাড়া গত এক মাস ধরে নিজেই নিজেকে কেমন চিনতে পারিনা,সব সময় কেমন পাগল পাগল লাগে আনিসের চিন্তায়।আচ্ছা প্রেম কি সত্যি ই এমন সর্বনাশা? মাঝে মাঝে এমনও মনে হয় যে এটা সত্যি ভালবাসা তো? নাকি আমার কম বয়সের মোহ? নিজেই নিজেকে বলি না এটা শুধু মোহ না,আরো বেশি কিছু। আমি যেমন ছেলে পছন্দ করি ও তো তেমন না,তবু কেন ও আমাকে এত টানে? এমনকি ওর নামটা পর্যন্ত আমার অপছন্দ তবু প্রতিটা সেকেন্ডে কেন আমি ওকে ভাবি? কেন ওর কথা মনে হলে বুকের ভিতর হাজারো গোলাপ ফুটে ওঠে?

আজ শুক্রবার। প্রতি শুক্রবারে আমাদের বাসা থেকে তিন কি.মি. দূরে বড় ফুফুর বাসায় আমরা বেড়াতে যাই। সেই ছোটবেলা থেকেই এই নিয়মের কখনো ব্যতিক্রম দেখিনি। যতদিন দাদা দাদি বেচে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত আমার বাবা চাচারা একসাথে থাকতেন,মানে যৌথ ফ্যামিলি ছিলো আমাদের।তখন সবাই মিলে একসাথে বেড়াতে যেতাম। আহা! কি মজার দিনগুলোই না ছিলো তখন! আমরা দুই বোন আর তিন চাচার ছেলেমেয়ে মিলে অনেক গুলো ভাইবোন আমরা একসাথে বড় হয়েছি।একসাথে খেয়েছি,একসাথে বসে পড়াশুনা করেছি। আমরা সবকটি ভাই বোন পড়াশুনায় খুব ভাল কিন্তু আমাদের বংশের মেয়েদের এসএসসি পাস করার পর ই বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়।সেখানে মা'র জন্য আমি পড়াশুনা টা এখন পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারছি। আদৌ শেষ করতে পারবো কিনা জানিনা।

দুপুরে খেয়েদেয়ে লিলি আর আমি খাটে শুয়ে গল্প করছিলাম,এর মধ্যে মা এসে বললো- আমি আর তোর বাবা বড় আপার বাসায় যাচ্ছি। আমি বললাম- আমি আর লিলি যাবো না?
- না।তোর বাবা নিষেধ করছে।
বলেই মা চলে যেতে যেতে লিলিকে ইশারায় ডেকে নিয়ে গেলো। ফুফুর বাসায় যেতে পারবোনা ভেবে মনটা একেবারে ভেংগে গেল,মনে মনে খুব আশা ছিলো ওখানে গেলে হয়তো আনিসের সাথে যোগাযোগের কোন একটা উপায় খুঁজে বের করতে পারবো,কিন্তু এখন সব আশাই শেষ।
মা বাবা চলে গেছে,লিলিকে বললাম- দরজা লাগাইছিস ঠিকমত?
- হু,কিন্তু বাবা বাইরে থেকেও তালা লাগিয়ে রেখে গেছে।
- মানে? কি বলিস? এসবের মানে কি?
-মানে আবার কি? তুমি যাতে বাইরে না বের হতে পারো তাই এই ব্যবস্থা। আর মা বলছে তোমাকে চোখে চোখে রাখতে।

আমার এমন কান্না পাচ্ছিলো কেন জানিনা,বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। হাত মুখ ধুয়ে বের হতে হতে শুনি লিলি আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে - কেউ যদি তার অকারন কান্নাকাটি বন্ধ করে তাহলে আমি তাকে একটা দারুন বুদ্ধি দিতে পারি।
ও এবার ক্লাস নাইনে পড়ে। পড়াশুনায় ও যেমন তুখোড় তেমনি দুষ্ট বুদ্ধিতেও। আমি ভাবলাম কোন ফাজলামো করছে তাই শুনেও না শোনার ভান করে রইলাম। আমার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে সামনে এসে বললো- ভাল বুদ্ধি চাওনা?
- না।
- সত্যি চাওনা? তোমার কিন্তু উপকার করতে চাইছিলাম।
- লাগবেনা।
- আপু চলো তুমি আর আমি মিলে বাবার আলমারিতে তোমার মোবাইল খুঁজি,পেলেই তো তুমি আনিস ভাই কে সব জানাতে পারবা।
শুনেই আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। তারপর মা বাবার রুমে গিয়ে দেখি আলমারি তালাবন্ধ,চাবি তো বাবার কাছে। এখন উপায়? লিলি বললো - ঘরের সব তালার ডুপ্লিকেট চাবি কোথায় থাকে জানো?
-না তো।
- নো প্রব্লেম। তুমি অন্য সব জায়গায় মোবাইল খুজো,আমি চাবি খুঁজে আনতেছি।
এই বলে ও এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। এদিকে আমি সব যায়গা খুঁজেও কোথাও আমার ফোন পেলাম না। একটুপরেই দেখি ও বিশাল এক চাবির গোছা নিয়ে হাসতে হাসতে হাজির। কয়েকটা চাবি নিয়ে চেষ্টা করার পর ই আসল চাবিটা পেয়ে গেলাম। উত্তেজনায় আমার তো পাগল হবার দশা। আলমারির ড্রয়ার খুলেই দেখি আমার ফোন! হাতে নিয়ে দেখি বন্ধ,চার্জ শেষ। মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে মোবাইল নিয়ে দৌড়ে আমার রুমে ঢুকে ফোন চার্জে দিয়েই দরজা বন্ধ করে দিলাম। অন হওয়ার সাথেসাথেই আনিস কে কল দিলাম। একবার রিং হতেই ও ধরেই বললো- মিলি!
আমি কিছুতেই কান্না আটকে রাখতে পারছি না। চোখের এত জল কোথায় লুকিয়ে থাকে? ও আবার ডাকলো - মিলি!
কিন্তু কান্না আমার গলায় আটকে আছে,আমি কোন কথাই বলতে পারছি না।
- মিলি,কি হয়েছে বলো আমাকে? কথা বলো প্লীজ। কোথায় তুমি?
অনেক কষ্টে কান্নার দমক সামলে বললাম
- আমি তোমার কাছে যাব।
শুধু এটুকু বলেই ফুঁপিয়ে উঠলাম।তারপর দুই তিন মিনিট পর নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ওকে সব খুলে বললাম। ওর একটাই কথা - তুমি কিচ্ছু ভেবোনা সোনা,আমি তোমার বাবাকে রাজি করাবোই। তুমি শুধু তোমার বাবার ফোন নাম্বার আর তোমাদের বাসার ঠিকানা দাও।
তারপর অনেক্ষন কথা বলে মোবাইল আবার আগের জায়গায় রেখে দিলাম।

এরপর থেকে শুধু অপেক্ষায় থাকি আবার কখন বাবা মা একসাথে কোথাও বের হবে,আবার কখন একটু ফোনে কথা বলতে পারবো! গতকাল মা বাবার ফুফুর বাসা থেকে আসতে আসতে অনেক রাত হয়েছিল তবু এসেই বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন - আগামীকাল তোকে নিয়ে বের হবো,১০ টার মধ্যে তৈরী থাকিস।
-কোথায় যাবো?
- সেটা গেলেই দেখতে পাবি।
সারা রাত ধরে ভেবেছি কোথায় নিয়ে যাবে।কোথাও নিয়ে গিয়ে আবার মেরে টেরে ফেলবে নাতো! নাকি আনিসের সংগে দেখা করতে যাবে! সম্পূর্ণ দুই ধরনের চিন্তা ভাবনা করতে করতে সারা রাত শুধু ছটফট করেছি,এক ফোটা ঘুমাতে পারিনি। আচ্ছা আমার মত এত অল্প সময়ের ভালবাসার জন্য কেউ এমন পাগল হয়! আমার এক বান্ধবীর চার বছরের সম্পর্ক ও ব্রেকআপ হয়ে গেলো কিন্তু তবু তো ওকে আমার মত এত ছটফট করতে দেখিনি।আমার এই ব্যাপারটা নিজের কাছেই কেমন পাগলামি মনে হয়। তবু!

কদম গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখি ফুলগুলো প্রায় শুকিয়ে এসেছে,দেখে মনটা অজানা আশংকায় ছেঁয়ে গেলো। কি হবে আমার শেষ পর্যন্ত! পাবো তো তাকে! হে খোদা,দয়াময়!
বাবা আর আমি বের হলাম। বের হয়েই বাবার প্রথম প্রশ্ন- বিয়ে কোন কাজী অফিসে হইছে?
আমার মাথায় তো আকাশ ভেংগে পড়লো। বাবা বলে কি! কি উত্তর দেব এখন? আন্দাজে একটা ঠিকানা তো দিতেই পারি কিন্তু সেখানে গিয়ে তো কিছুই পাবেনা। এখন উপায়! একটা মিথ্যা নাহয় ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছি কিন্তু তাই বলে এখন কি করে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আরো মিথ্যে বলবো!
এখন আমার পুরো শরীর জুড়ে,পুরো মন জুড়ে শুধু একটাই কথা 'আনিস'। সম্পূর্ণ পৃথিবীর বিরুদ্ধে গিয়েও যদি আমাকে দাড়াতে হয় আমি তাই দাড়াবো। কিন্তু পাশাপাশি এও জানি মা, বাবা,লিলি ওদেরকে ছেড়েও আমি থাকতে পারবোনা।সবাইকেই আমার প্রয়োজন। যাই হোক আমি এখন শুধু এটাই বুঝতে পারছি যে বিয়ে যে আমাদের হয়নি সেটা কোনভাবেই বাবা কে বুঝতে দেয়া যাবেনা, তাহলে আর কোন আশাই থাকবেনা।তাই বললাম- নাম তো মনে নেই।
- নাম ও জানিস না? তাহলে জায়গাটার নাম বল,কোন এলাকায়?
- কাজি অফিসে গিয়ে কি করবা?
- কাবিননাম তুলবো,তালাক পাঠাবো।
-বাবা প্লীজ! বাবা!
-রাস্তায় কান্না বন্ধ করে জায়গার নাম বল তাড়াতাড়ি।
আমি আন্দাজে একটা এলাকার নাম বলে দিলাম,ওই এলাকায় আদৌ কোন কাজী অফিস আছে কিনা তাও জানিনা। বিয়ে তো আমার হয়নি তবু তালাকের কথাটা শুনে বুকটা কেমন ফাকা হয়ে গেলো,আমি কাঁদতে কাঁদতে ওড়না দিয়ে চোখ মুখ মুছতে মুছতে বাবার সাথে অটোরিক্সায় উঠে বসলাম। তারপর সারা দুপুর এই গলি ওই গলি করে বাসায় আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেলো।মনে হচ্ছে বাবাকে শুধু বোঝাতে পেরেছি কাজি অফিস ঠিক কোনটা ছিলো মনে নেই আমার।
বাসায় এসেই বাবা মা'র সাথে তুমুল রাগারাগি শুরু করে দিলো। বাবার ধারনা তালাকের কথা শুনে আমি ইচ্ছে করেই তাকে এতটা পথ ঘুরিয়েছি। কি আর করা!সত্যি ই তো তাই। চুপচাপ থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই।

সন্ধে বেলা লিলি আস্তে করে আমার কানে কানে এসে বলে গেলো 'আনিস ভাই বাবাকে ফোন করছে,বাবা তার সাথে অনেক রাগারাগি করতেছে'। হে খোদা,দয়াময়! একটু দয়া করো!
রাতে আমরা দুবোন একসাথে ঘুমাই। প্রায় দিন ই আমরা অনেক রাত পর্যন্ত ফিস ফিস করে গল্প করি,আজকে ও এসেই উলটো দিকে ফিরে ঘুম! আমি আরো কত আশা নিয়ে ছিলাম ওর কাছ থেকে শুনবো বাবা আর আনিসের কি কথা হয়েছে,তা না সে এসেই ঘুম! আমি হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বললাম -এই উঠ!
- কাল বাবা তাকে দেখা করতে বলছে।
আমি লাফিয়ে উঠে বসে বললাম - বাসায় আসবে!
-জ্বি না,বাইরে কোথাও। আপু তোমার ইনি মনে হয় মিচকা শয়তান টাইপের,নাহলে বাবা কে রাজি করালো কি করে?
মনে আমার আনন্দের বাণ ডেকে গেল। একবার যদি ও বাবাকে বোঝানোর সুযোগ পায় তাহলে আমার বিশ্বাস ও বাবাকে রাজি করাতে পারবে।
পরের দিন লিলির কাছে শুনলাম বাবা নাকি ওর জন্য অনেকক্ষন অপেক্ষা করে চলে এসেছে,কিন্তু ওর দেখা পায়নি,ও আসেনি। বাবা অনেক বার ফোনে ট্রাই করে ফোন বন্ধ পেয়ে ফিরে এসেছে। মা'র কাছে শুনলাম বাবার নাকি ওর সাথে ফোনে কথা বলেই ওকে ভালো লেগেছে,মাকে বলেছে 'ছেলেতো একেবারে খারাপ না,চলে। কিন্তু বিয়েটা এমনভাবে দিতে হবে যেন কোন আত্মীয়স্বজন বুঝতে না পারে মেয়ের নিজের পছন্দ। সবাইকে বোঝাতে হবে আমরাই ছেলে পছন্দ করছি'।
কিন্তু ও কেন আসলোনা ভেবেই পাচ্ছিলাম না,আচ্ছা ওর কোন বিপদ হয়নি তো!দুই তিন দিন পর অনেক বলে বাবাকে রাজি করিয়ে আমার মোবাইল টা ফিরে পেলাম।কিন্তু এখনো আনিসের ফোন বন্ধ! ওর একটা ফ্রেন্ডের নাম্বার ছিলো,তাকে কল দিয়ে বললাম- ভাইয়া আমি মিলি।
- কোন মিলি?
- আনিসের ফোন বন্ধ কেন?
- ও তুমি! কেন তুমি জানোনা আনিস তো কাল দেশের বাইরে চলে গেছে।
- কি বলেন! আপনি ঠিক জানেন?
- হ্যা। কাল বিকেলের ফ্লাইটে গেছে।
- ফেইসবুকেও তো পাচ্ছিনা, ওখানকার কোন নাম্বার বা অন্য কিছু কি দিতে পারবেন আমাকে?
- আচ্ছা আমি দেখি কি করতে পারি,তোমাকে জানাবো।

আজ ছয় বছর ধরে ওকে সবাই খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও নাকি খুঁজে পায়না। অথচ এই যে আমি তো দেখি আনিস আমার পাশেই আছে সবসময়। আমার সাথে কথা বলে,আমার সাথে ঘুমায়,আমরা সারা রাত গল্প করি, এক ফোটা ঘুমাইনা। লিলি এখনো আমার সাথে ঘুমাতে চায় কিন্তু আমি ওকে আমার রুমে আসতে দেইনা। আনিস থাকে আমার সাথে তবু ও কেন আসতে চায় বুঝিনা। সবাই বলে আমি নাকি পাগল। অকারনে হাসি,অকারনে কাঁদি,একা একা নাকি কথা বলি। কিন্তু আমি তো আনিসের সাথেই হাসি,কাঁদি,গল্প করি। সবাই কেন বুঝতে চায়না! কেন মা বাবা আমার আর আনিস কে গল্প করতে দেখে কাঁদে।আমি গায়ে কোন কাপড় রাখতে চাইনা কিন্তু সবাই বোঝেনা কেন কাপড় পরলে অনেক বেশি গরম লাগে? সবাই এত বোকা কেন!
এখন মাঝ রাত,সবাই গভীর ঘুমে অচেতন। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক।ইচ্ছে করছে এমন জ্যোৎস্না রাতে আনিসের হাত ধরে বহুদূর চলে যাই। তাই চুপি চুপি দরজা খুলে আনিসের হাত ধরে বাইরে নেমে এলাম। সারা গায়ে জ্যোৎস্না মেখে চলে যাবো দুজন যেদিকে দু চোখ যায়....

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement