নীল দাগ

অভিমান সংখ্যা

পুলক আরাফাত
মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.০৭
  • 0
  • 0
  • ২২৮
চারদিকে ঘন কুয়াশা পড়েছে। আজ সূর্য উঠতে দেরী হবে হয়তো। জয়নাল সাহেব ভোরে হাঁটতে বের হন প্রতিদিন। তাঁর রুটিনমাফিক চলাফেরা। বাইরের খাবার তাঁর একদম অপছন্দ। স্ত্রী নেই। কিছুদিন আগে মারা গেছেন। হঠাৎ করে স্ত্রীর এমন তিরোধানে জয়নাল সাহেবের মনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। তাঁর ক্যান্সার হয়েছিলো। বিরল প্রজাতির ক্যান্সার। যেটা খুব কম মানুষেরই হয়। যার কারণে তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি। শান্তা একমাত্র মেয়ে। জয়নাল সাহেব তাঁর মেয়েকে খুব ভালোবাসেন। শান্তা ছোটবেলা থেকেই খুব সহজসরল ধরণের মেয়ে। অল্পতেই দুঃখ পেয়ে বসে। কারও দেয়া আঘাত সহ্য করতে পারে না। তার বাবা কোনোদিন তাকে কটু কথাটিও বলেনি। শান্তা তার মায়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে খুব। বাবাকে জড়িয়ে ধরে একদিন খুব কেঁদেছে। জয়নাল সাহেব স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁদের মাঝে কোনোদিন উচ্চবাচ্য পর্যন্ত হয়নি। ছোটবেলা থেকেই শান্তা আদরে আবদারে বড় হয়েছে। তার কোন শখই অপূর্ণ থাকেনি। মাত্র আঠারো বছর বয়সে মাকে হারিয়ে শূন্য তার পৃথিবী। আর ভাইবোনও নেই। কার কাছে দম ফেলবে। বাবাই একমাত্র আশ্রয়স্থল। ঢাকার উত্তরায় একটি এপার্টমেন্টে ভাড়া থাকে শান্তারা।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ে শান্তা। উঠেই বেল্কনিতে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ার পেতে বসে থাকে। ভোরের আকাশ আর চারপাশটা দেখতে তার খুব ভালো লাগে। সকাল হতে না হতেই রাস্তাটা মানুষে মুখর হয়ে পড়ে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষ চলছে। ঢাকা শহরের এই যাপিত জীবনে সবাই কমবেশি ব্যস্ত। কেউ কারও খবর রাখার তেমন ফুরসৎ পায় না কিছু ছাড়া।

জয়নাল সাহেব ব্যবসায়ী মানুষ। সকাল দশটার দিকে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হাজির হন। বাসায় আসতে আসতে তাঁর রাত আটটা। এসেই দ্বিতীয়বার গোসল সেরে নেন। তারপর টিভিতে খবর দেখেন।
“মা শান্তা, একটু শুনে যাও তো।“ “আসছি বাবা”, রান্নাঘর থেকে উত্তর দেয় শান্তা। হাতের কাজটা শেষ করেই তড়িঘড়ি বাবার রুমে আসে শান্তা। “কি বাবা, বল।“ “তোমার মা মারা যাবার পর থেকে আগের মতো আর কাজে মন লাগাতে পারি না। সবসময় তোমার মা’র কথাই মনে হয়। জানি তোমারও একই অবস্থা। পরিবারের সবসময় পাশে থাকা একজন মানুষ না থাকলে যা হয় তাই হচ্ছে। যেভাবে মনটা ভালো থাকে সেই চেষ্টাই করো। আমি যেমনই থাকি।“ “থাক বাবা, মন খারাপ করো না। আমি ছোট মানুষ। তবে একটা কথা বুঝি- সময়ই মানুষকে কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। ডাইনিং এ আসো বাবা। আজ তোমার প্রিয় টাকি মাছের ভর্তা বানিয়েছি আর শুঁটকি ভাজি করেছি। মা তোমাকে প্রায়ই রান্না করে খাওয়াতো।“ “আচ্ছা, চলো।“

সামনের মাসে শান্তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চেষ্টা করবে। জয়নাল সাহেব বললেন যে বিষয় এই পর্যন্ত পড়াশোনায় তোমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটাতেই চেষ্টা কর। সে বাংলা, নৃবিজ্ঞান আর ভূগোলের ফরম জমা দিয়েছে। তবে প্রার্থনা করছে যাতে বাংলায় টিকে। বাংলাই তার ভালো লাগে। সে অনুযায়ী শেষ প্রস্তুতিটা মন্দ নয়। এসএসসি পরীক্ষার গোল্ডেন ফাইভ আর এইচএসসি’র জিপিএ ফাইভ নিয়ে লড়বে সে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করার সময় এক ছেলের সাথে শান্তার ঘনিষ্ঠতা হয়। তা থেকেই ভালোবাসার সূত্রপাত। ভর্তি পরীক্ষায় ছেলেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে টিকে যায়। শান্তা দুই বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলায় টিকে। দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। চলতে থাকে তাদের প্রেম। ছেলের পরিবার ঢাকায় স্থায়ী। দেশের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। কলাবাগানে নিজেদের ফ্ল্যাট আছে। বাবা বড় চাকরিজীবী। ছেলেটির ছোট এক ভাই আছে। শান্তার দাদার বাড়ি জামালপুরে। একই অঞ্চলের মানুষ দু’জন।

দেখতে দেখতে আরও তিন বছর পার হয়ে গেলো। শান্তার বাবাকে ওর ফুপুরা আবার বিয়ে করতে পরামর্শ দিলো। শান্তার বাবা মোটেই রাজি নন। মেয়ে বড় হয়েছে। ক’দিন পর বিয়ে দিতে হবে। শেষ বয়সে কে দেখবে এই অজুহাতে শেষমেশ তাঁকে আবার বোনদের চাপে বিয়ে করতে হল। শান্তাও অমত করেনি এজন্য যে তার বাবার মনের শূন্যতা পূরণ হোক। সবাই একটা অবলম্বন চায়।

কিন্তু বিধিবাম, শান্তার নতুন মা মোটেই সুবিধার মানুষ নয়। সংসারে এসেই নিজের আধিপত্য বিস্তার করে বসে। শান্তার সাথে ভালো ব্যবহার তো করেই না উল্টো জয়নাল সাহেবকে সবসময় ত্রস্ত অবস্থায় রাখে। এক কথায় খুব মুখরা প্রকৃতির মানুষ। জয়নাল সাহেব তাকে বুঝানোর অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

শান্তার মা বাবার বাড়ি থেকে বেশ কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলেন। মারা যাবার আগে এই সম্পত্তিটুকু মেয়ের নামে লিখে দিয়ে যান। জয়নাল সাহেব মেয়ের নামে একটা ডিপিএস চালান অনেক আগে থেকেই। মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য আমানত তাঁর। দশ লাখ টাকার ডিপিএস।

ঘড়ির কাঁটা থেমে নেই। সময় গড়িয়ে চলছে। শান্তা আর নিয়াজ মাস্টার্স শেষ করলো। নিয়াজ একটা শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে ঢুকেছে। ভালো বেতনের। শান্তা একটা বেসরকারি কলেজে সুযোগ পেয়েছে।

বাসায় এসে শান্তার শান্তি নেই। তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর কথার অত্যাচারে রাতের ঘুম হারাম। মানুষ এতো ঝগড়াটে আর বিচ্ছিরি মেজাজের হয় কি করে? জয়নাল সাহেবকে অবলম্বন দিতে গিয়ে তার বোনেরা এ কাকে এনে জুটিয়ে দিলো? স্ত্রীর কাছে যদি মনের কথাগুলোই বলার সুযোগ না থাকে, যদি প্রশান্তিই না পাওয়া যায় তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু নেই।

বাবার কাছে একদিন শান্তা এতো দীর্ঘ সময় পর নিয়াজের কথা খুলে বললো। বললো তারা একে অপরকে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চায়। তিনি অনুমতি দিলে সামনের সপ্তাহেই নিয়াজের পরিবার আসতে চায়। কথামতো তাই হলো। নিয়াজের বাবা মা এসে শান্তাকে আশীর্বাদ করে আংটি পরিয়ে গেলো আর বলে গেলো পরের সপ্তাহেই তাঁরা শান্তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চায়। জয়নাল সাহেব অমত করলেন না।

ধুমধাম করে শান্তার বিয়ে হলো।
বিয়ের পর ছয়মাস কেটে গেলো।
এক রাতে শান্তা ঘুমিয়ে আছে হঠাৎ সাড়ে বারোটার দিকে নিয়াজের মোবাইলে কলের শব্দ পেয়ে জেগে উঠলো। নিয়াজ টের পায়নি। আবার কল আসলো। রিসিভ করার পর একটা নারীকণ্ঠ ভেসে আসলো। নিয়াজকে চাচ্ছে দেখে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বললো, “আমি কে কিছুদিন পরই টের পাবেন।“ বলেই কল কেটে দিলো। শান্তা ম্যাসেজ বক্সে ঢুকে দেখল দু’টা নাম্বার থেকে অনেকগুলো আবেদনময়ি ম্যাসেজ জমে আছে। শান্তা রিসিভ করা নাম্বারটা কল লিস্ট থেকে ডিলিট করে দিলো। শান্তার আর বুঝার বাকি রইলো না।

ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনকার মতোই আচরণ করলো শান্তা। কিছুতেই কিছু বুঝতে দিলো না নিয়াজকে। বিকেলে কলেজ থেকে নিয়াজকে কল করে সংযুক্ত পেলো। প্রায় আধাঘণ্টা চেষ্টা করার পর ওকে পেলো। কবে থেকে এসব চলছে এটাই শান্তার প্রশ্ন। ঘরে নববিবাহিতা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও নিয়াজ পরকীয়ায় আসক্ত, তাও দু’টো মেয়ের সাথে এটা ভাবতেই তার ঘেন্না হচ্ছে। দীর্ঘ ছয় বছর প্রেম করে ভালোবেসে নিয়াজকে বিয়ে করেছে শান্তা। আর নিয়াজ তাকে গোপনে এমন ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে ভীষণ।

উত্তরায় এসে বাবাকে বিষয়টি খুলে বলে শান্তা। আরও বলে যে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর ওই বাড়িতে যাবে না এবং নিয়াজকে সে দ্রুতই ডিভোর্স লেটার পাঠাবে। জয়নাল সাহেব সব শুনে খুব কষ্ট পেলেন। মেয়েকে কি বলবেন বুঝতে পারছেন না।

শান্তা নিয়াজকে ফোন করে সব সত্যি প্রকাশ করে বসলো। নিয়াজ আমতা আমতা করছে। সময় মতো ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে এই বলে শান্তা কল কেটে দিলো।

ঠিক কিছুদিন পরই শান্তা আর নিয়াজের সম্পর্কের ইতি ঘটলো।
শান্তা সিদ্ধান্ত নিলো দেশেই আর থাকবে না। একটা কনসালটেন্সি ফার্মের সাথে আলাপ আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো সুইডেন চলে যাবে। সুইডেনে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মাস্টার্স করবে আর পাশাপাশি চাকরি করবে। তারপর সময়মত স্থায়ী হয়ে যাবে।

কিছুদিন পর মা’র দেয়া সম্পত্তি বিক্রি করে আর তার নামে বাবার জমানো টাকা দিয়ে সুইডেনে চলে গেলো শান্তা।

এতো দীর্ঘ সময় প্রেম করে বিয়ে করে শান্তার জীবন কেন এমন হয়ে গেলো এটা নিজের কাছেই তার প্রশ্ন। বাবার সংসারে থাকার কোন উপায় নেই। জীবনে নীল দাগ নিয়ে প্রবাসই এখন তার ঠিকানা। বাকি জীবনটা আবার নতুন কাউকে বিশ্বাস করে কীভাবে কাটাবে সেই প্রতিকূলতার মাঝেই অন্তরিন সময়ের দাহ্য প্রশ্ন। যে চরম অভিমান আর যন্ত্রণার কারণে এখন থেকে সে একা এই তীব্র অভিমান ভাঙ্গার মতো অখণ্ড বিশ্বাস আর কেইবা তৈরি করতে পারবে। দেশান্তরী হয়ে নতুন বিবাগী সমাজে নিজেকে খুঁজে পাওয়া অবশ্যই কষ্টকর। জীবনের এই কষ্টকর অভিজ্ঞতায় শান্তা কি আরও আড়ষ্ট হয়ে পড়বে না? অবলম্বনহীন যদি হয়ে যায় তার জীবন, আক্ষেপে লীন হয়ে জীবনের প্রতিবিম্বে তখন কে কথা বলবে?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
Md.Maidul Sarker অভিনন্দন ভাই।
romiobaidya বাহ! খুব ভালো।
Dipok Kumar Bhadra সুন্দর লিখেছেন।
ফয়জুল মহী নৈপুণ্যতায় ভরা নিদারুণ লেখা ।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

এই গল্পে আমি তুলে ধরেছি জীবনের প্রতিবিম্ব। সময়ে হয়তো মানুষ সুখের ঠিকানা খুঁজে পায়। কিন্তু কিছু সময় যেন সত্যিই অবিবেচক। মানুষ কখনো কখনো সুখ খুঁজতে গিয়ে জীবনে অসুখ বাঁধিয়ে ফেলে। বিশ্বাস আর ভালোবাসা মুছে ফেলে মারাত্মক অভিমানে পুড়ে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় চেনা পৃথিবী থেকে। খুঁজে ফেরে নতুন পৃথিবী। কিন্তু নতুন পৃথিবীটাও যদি তার সাথে ছলচাতুরী করে তখন যেন জীবনের মানে বুঝাটাই খুব কষ্টকর কিছু। কখনো কখনো মানুষ অনেক কিছুই মেনে নিতে পারে না। আর এই না মেনে নিতে পারা থেকেই সৃষ্টি হয় প্রত্যাঘাত। অভিযোগের অনলে পোড়া অভিমানও অনেক সময় অভিশাপের মতো।

২৪ জুলাই - ২০১৮ গল্প/কবিতা: ১ টি

সমন্বিত স্কোর

৫.০৭

বিচারক স্কোরঃ ২.০৭ / ৭.০ পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "কষ্ট”
কবিতার বিষয় "কষ্ট”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২১