বিল্লাল ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র ছিল। খুব ভালো আঁকাআঁকিও করতে পারতো। বিল্লালের বাবা ছিলেন জেলা প্রশাসনে কর্মরত। নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিল্লাল ভর্তি হয় একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে। ওর বাবা-মা’র ইচ্ছেই ছিল ডাক্তারি পড়াবে। সরকারি মেডিক্যালে অল্পের জন্য সুযোগ পায়নি। ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই বিল্লাল কিছু কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ভাবতে থাকে নানান ধরণের সামাজিক দৈন্য-দুর্দশার কথা। একজন মানুষ হিসেবে সত্যিকার অর্থেই যা ভাবা উচিত তা থেকে তার চিন্তা চেতনার বিন্দুমাত্রও কমতি নেই এবং ছিলোও না। বিল্লাল ভাবতো দরিদ্র, অতিদরিদ্র মানুষের কথা। যারা হয়তো দু’বেলা ঠিকমতো খাবারই খেতে পারে না। যাদের জীবন নিয়ে কোন রসবোধ নেই, উচ্চাশা নেই, আবেগ-অনুভূতি যাদের বন্দি শুধুই বেঁচে থাকার মাঝে-তাদের নিয়ে ভাবতো বিল্লাল। কেমন জানি একটা অসহায়ের মতো তাকাতো বাসে চেপে বা রিকশা করে কোথাও যাবার বেলায় রাস্তার পাশে পথচারিদের হাঁটার জায়গায় খোলা আকাশের নিচে মাচাল ঘরে ধুলোবালিতে খেলায় মেতে থাকা শিশুদের দিকে। এই শিশুগুলো তো শূন্যতার মাঝে বেড়ে উঠছে। শিশুগুলোর মা-বাবাদের অবস্থাও করুণ। কেমন যেন এক উদাস করা চাহনি তাদের চোখে মুখে। শিশুগুলো না পারছে লেখাপড়া করতে না পারছে কোনকিছু। সমাজের মানুষের চোখ আছে চেয়ে দেখার। কিন্তু কেউ যেন নেই ওদের পাশে দাঁড়ানোর। বিল্লাল তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে আসা যাওয়ার মাঝে। কি যেন এক দায়িত্ববোধ আর কর্তব্যনিষ্ঠা ওর মনের মাঝে উঁকি দিতে চায়। কিছু একটা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওর হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়। মানুষের বিবেক জানা কারণে জেগে উঠে। এ যেন বিবেকের তাড়না। বিল্লাল কিছু একটা করবেই বলে ভাবছে। একা একা হয়তো কঠিন হবে। তাই সে আরও কয়েকজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে কর্তব্যের পরিধিতে নিজেকে জড়াবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। বিল্লাল পর্যবেক্ষণ করে দেখলো শিশুশ্রম আরেকটি বেদনাদায়ক বিষয়। সে ভাবলো ওদেরকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিলে কেমন হয়। ওদের তো এই অধিকার আছে। বিল্লাল এদের মাঝ থেকে চটপটে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে চলে গেলো স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওরা ছোট শিশু। বাবা-মা’র কোন উপায়ই নেই লেখাপড়া করাবে। বিল্লাল প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলো। প্রধান শিক্ষক তাকে আশ্বস্ত করলো ওদেরকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে নেবার ব্যাপারে। বিল্লালের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। সরকার ওদেরকে বিনামূল্যে বই দেবে, বিদ্যালয়ের পোশাক দেবে। আর যাই হোক ওদের মাঝেও মেধা আছে, আছে সৃষ্টিশীলতা। লেখাপড়া লেখাপড়াই। এটি মানুষকে বিকশিত করে। নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্যের কোন শেষ নেই। প্রতিটি দিন মানুষকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। নতুন আলোয় নতুন কিছু। মানুষ যখন বিশেষ বিশেষ কাজ করে তখন তার পেছনে বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। অনেক সময় মানুষ স্বার্থ ছাড়া কাজ করে। এমন মানুষ সবাই হতে পারে না। যাঁদের কর্ম-পরিকল্পনা বিস্তর তাঁদের মাঝে লুকিয়ে থাকে নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা হলো নিজের কাছে, তবে সিদ্ধান্ত নেবার আগে অবশ্যই সেটার সার্বিক অবস্থান কার কার মতে কীরকম তার অনুপাতে গ্রহণযোগ্যতা নির্ণয় করা খুবই ভালো। সবার মনের ব্যাপ্তি সমান নয়। বিল্লালের সবচেয়ে ভালো লাগছে বাচ্চাগুলো পড়াশুনা করতে পারবে তার মতই। তার মনে যে রঙিন ঘুড়িটা ছিল সেটি যেন আজ উড়ার অপেক্ষায়। সত্যিই স্বপ্ন তো রঙিন ঘুড়ির মতোই হয়। আমরা সমাজের গণ্ডিতে থেকেও অনেক কিছুই দেখি না। দেখেও না দেখার ভান করি। তবে সবাই এক নয়। বিল্লালের সহযোগীরাও খুব আগ্রহী সুবিধাবঞ্চিত শিশুগুলোর পাশে দাঁড়ানো নিয়ে। মানুষের মাঝে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকে। একটি হলো খুব খারাপ দিক, একটি খুব ভালো দিক আর আরেকটি হলো ভালোও না খারাপও না এমন দিক। খুব খারাপ দিকে থাকে প্রায় সম্পূর্ণই খারাপ। খুব ভালো দিকে থাকে প্রায় সম্পূর্ণই ভালো আর শেষেরটি হলো আধাআধি; ভাল-খারাপের মিশ্রণ। বিল্লাল এরই মাঝে একদিন বিদ্যালয়ে গেলো। কে কেমন পড়তে পারছে প্রাক-প্রাথমিকে সেটি দেখার জন্যই তার উপস্থিতি। প্রধান শিক্ষক তাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে দিলো। শ্রেণীকক্ষে পৌঁছার সাথে সাথে সবাই দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দিলো। এ এক অন্যরকম দৃশ্য। বিল্লাল আবেগাপ্লুত হয়ে গেলো। বিল্লালের বন্ধুরা আগামীকাল আসবে শীতের কাপড়চোপড় নিয়ে। বেশ শীত পড়েছে। সবাই মিলে চাঁদা তুলে এই সাহায্যটা করবে তারা। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও তাদের সাথে এক হয়ে এতে অংশগ্রহণ করতে চায়। ভালোলাগা বুকে নিয়ে বিল্লাল বিদ্যালয় প্রাঙ্গন ছেড়ে আসলো। এর নামই তো সত্যিকারের ভালোবাসা। আজকাল ছেলেমেয়েরা প্রেম করে। মুঠোফোনে টাকা খরচ করে। একে অপরকে খাওয়ায়, ঘুরাঘুরি করে। সময় পার করে। প্রেম জমলে ভালো লাগলে বিয়ে করে। কিন্তু হাতে গোনা ক’জন আছে যারা কিনা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছে? বিল্লালের এ ভালোবাসা এক বিশুদ্ধ ভালোবাসা যাতে কোনই স্বার্থ নেই। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। বিল্লাল বাবা-মা’র কাছে জীবনে যা কিছু চেয়েছে তার সবই পেয়েছে। কিছু জীবন সংকীর্ণ, চাইলেও অনেক কিছুই পাওয়ার কোন উপায় থাকে না। মানুষের জীবন হলো চাওয়া না চাওয়া আর পাওয়া না পাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ। অনেকেই অনেক কিছু চাইতে গিয়েও চায় না। মনে হয় যেন কোন একটা সংকোচের বেড়াজালে নিভৃত তারা। আবার অনেকেরই অনেক কিছুর দরকার, অনেক কিছুই পেতে চায়। পেতে চেয়েও তারা অনেক কিছুই পায় না। প্রতিটি মানুষ জীবন-জালে বন্দি। সমাজের কতজন আলোকিত হয়? দুঃখবোধের জায়গা বা সুখের আবর্তিত অনুভূতিতে সবাই তো শীতাবৃত। শীতাবৃত; কারণ কুয়াসায় ঘেরা প্রতিটি সকাল মানুষকে টোকা দেয় যা অনেকের কাছে নিছক কষ্টকর বিষয় আর অনেকেইবা নির্বাপিত। নির্বাপিত; কারণ শীতের মিষ্টি সকালটা কেউ কেউ উপভোগ করে। বিল্লাল ওর বন্ধুবান্ধবকে সাথে নিয়ে আজ বিকেলে শীতবস্ত্র কিনবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেয়া টাকা আর নিজেদের হাতের সব টাকা মিলিয়ে জামা-কাপড় কিনবে ওরা। ওরা করলো কি সব শিশুদের আলাদা আলাদা ছবি তুলে নিলো। যাতে প্রত্যেকটি শিশুর গড়ন আর বর্ণ অনুযায়ী বস্ত্র কিনতে পারে। বিকেলের একটু আগেই সবাই বেরিয়ে পড়লো। বঙ্গবাজারে গেলো তারা। সেখান থেকে সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি শিশুসহ তাদের বাবা-মা ও ভাই-বোনদের জন্যও কেনাকাটা করলো। সত্যি এ এক অন্যরকম অনুভূতি। সবাই খুব খুশি মনে ফিরে এলো। পরদিন সবাই বিদ্যালয়ে গেলো শিশুদের মাঝে কাপড় বিলিয়ে দেবে বলে। শিশুরা সবাইকে দেখে আনন্দে মেতে উঠলো। ছোট ছোট বাচ্চারা কিচিরমিচির শুরু করে দিলো। ওদের প্রত্যেকের মাঝে আছে প্রাণ-শক্তি। এ শক্তিকে যতদূর সম্ভব কাজে লাগাতেই হবে। সবারই ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। প্রধান শিক্ষক সহ সব শিক্ষক-শিক্ষিকা আর সব শিক্ষার্থীর মতো ওদের জন্যও আন্তরিক মনোভাব পোষণ করছে। বর্তমান সরকার শিশুদের মেধা বিকাশে সর্বোপরি কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী-জাগরণের এই যুগে নারীদের শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নেয়ার সার্বিক সহযোগিতার যে প্রয়াস তা রীতিমতো প্রশংসনীয়। আমাদের হৃদয় একটি মসজিদের মতো; মন্দিরের মতো। মসজিদে-মন্দিরে আমরা যে আবেগের সাথে যে নিষ্ঠার সাথে মহান সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজি; পূজা করি; ঠিক তেমনি মানুষের মাঝেও সৃষ্টিকর্তা বসত করেন। মানুষের আত্মা থেকে যে দোয়া আসে সেটাও তো অভিপ্রেত। আজ বেশ শীত। শিশুরা ওদের ভাই-বোন আর বাবা-মা’কেও শীতবস্ত্র উপহার দিলো। এক মা দোয়া করলো, “ও আল্লাহ্‌, আমগো দিহে যারা ফিইরা চাইছে হেগো তোমার আরশের নিচে জায়গা দিও।“ এ যেন হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে গভীর আবেগের দোয়া। মানুষকে মন থেকে ভালোবাসার কোন মন্ত্র নেই। উদারতা, সম্মান প্রদর্শন, প্রেমময়তা, মমতা, ঐকান্তিকতা, আর সচেষ্ট অনুভূতির সংমিশ্রণেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে হৃদয়ের খুব গভীর স্থান থেকে। বিল্লালের আরেকটি পরিকল্পনা আছে। আর তা হলো শিশুগুলোর বাবা-মা’দের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়ার। বিল্লাল তার বন্ধুদের সাথে নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে যায়। সেখানে তারা সরাসরি উত্তরের মেয়র সাহেবের কাছে তাদের ব্যাপারে কি করা যায় সে বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করে। আলোচনা ফলপ্রসূ হয়। সম্মানিত মেয়র তাদেরকে নগর পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিল্লাল আর তার সহযোগীরা খুশি মনে বাড়ি ফেরে। সবার প্রাসঙ্গিক ভাবনা সত্যি সত্যি মিলে গেলো। কারও জন্য কিছু একটা করতে পারার যে কি আনন্দ তা যারা করে তারাই ভালোভাবে বলতে পারবে। আমাদের মনে নিজেকে নিয়ে আলাদা আলাদা স্বপ্ন থাকে। আলাদা করে একটা জগত থাকে। সবার চিন্তার পরিধি এক না। কিছু মানুষ আছে স্বার্থপর। শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবে। মনে করে এটাই উত্তম। আসলে এ ধারণা ঠিক না। মানুষকে আঘাত দিতেও মন কাজ করে। আবার মানুষের উপকার করতেও মন লাগে। মন থেকে সবাই আলাদা ধরনের বলেই পৃথিবী চলছে। সবাই যদি একই রকম হয়ে যেতো তবে তো বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়তো না। সবাই তো মনের উঠোনে রোদ উঠাতে পারে না। বিল্লাল তার বন্ধুদের নিয়ে একটি ফান্ড গঠন করলো। এই ফান্ড থেকেই চলবে শিশুদের সব খরচ। এলাকায় এ নিয়ে মানুষের মাঝে গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি মাসে যে যা পারে সাহায্য করতে কিছু কর্মজীবী মানুষও এগিয়ে আসলো। ভালো লাগার বিষয়। প্রতিটি শিশু একটি ফুলের কলি। ওদেরও আছে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার অধিকার। সরকারি ও বেসরকারিভাবে যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা চলছে। এর বাইরেও যতোটুকু পারা যায় পাশে দাঁড়ানোর তা যদি আমরা করি এতে করে একসময় আমরাই গর্ব করে বলতে পারবো হ্যাঁ; ব্যাক্তি বিশেষে আমরা কিছু একটা করতে পেরেছি। সমাজটা আমাদের সবার জন্য।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৯ মে ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শীত (জানুয়ারী ২০২০)

মনের উঠোনে রোদ
শীত

সংখ্যা

পুলক আরাফাত

comment ৪  favorite ০  import_contacts ১২৪
বিল্লাল ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র ছিল। খুব ভালো আঁকাআঁকিও করতে পারতো। বিল্লালের বাবা ছিলেন জেলা প্রশাসনে কর্মরত। নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিল্লাল ভর্তি হয় একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে। ওর বাবা-মা’র ইচ্ছেই ছিল ডাক্তারি পড়াবে। সরকারি মেডিক্যালে অল্পের জন্য সুযোগ পায়নি। ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই বিল্লাল কিছু কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ভাবতে থাকে নানান ধরণের সামাজিক দৈন্য-দুর্দশার কথা। একজন মানুষ হিসেবে সত্যিকার অর্থেই যা ভাবা উচিত তা থেকে তার চিন্তা চেতনার বিন্দুমাত্রও কমতি নেই এবং ছিলোও না। বিল্লাল ভাবতো দরিদ্র, অতিদরিদ্র মানুষের কথা। যারা হয়তো দু’বেলা ঠিকমতো খাবারই খেতে পারে না। যাদের জীবন নিয়ে কোন রসবোধ নেই, উচ্চাশা নেই, আবেগ-অনুভূতি যাদের বন্দি শুধুই বেঁচে থাকার মাঝে-তাদের নিয়ে ভাবতো বিল্লাল। কেমন জানি একটা অসহায়ের মতো তাকাতো বাসে চেপে বা রিকশা করে কোথাও যাবার বেলায় রাস্তার পাশে পথচারিদের হাঁটার জায়গায় খোলা আকাশের নিচে মাচাল ঘরে ধুলোবালিতে খেলায় মেতে থাকা শিশুদের দিকে। এই শিশুগুলো তো শূন্যতার মাঝে বেড়ে উঠছে। শিশুগুলোর মা-বাবাদের অবস্থাও করুণ। কেমন যেন এক উদাস করা চাহনি তাদের চোখে মুখে। শিশুগুলো না পারছে লেখাপড়া করতে না পারছে কোনকিছু।

সমাজের মানুষের চোখ আছে চেয়ে দেখার। কিন্তু কেউ যেন নেই ওদের পাশে দাঁড়ানোর। বিল্লাল তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে আসা যাওয়ার মাঝে। কি যেন এক দায়িত্ববোধ আর কর্তব্যনিষ্ঠা ওর মনের মাঝে উঁকি দিতে চায়। কিছু একটা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওর হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়। মানুষের বিবেক জানা কারণে জেগে উঠে। এ যেন বিবেকের তাড়না। বিল্লাল কিছু একটা করবেই বলে ভাবছে। একা একা হয়তো কঠিন হবে। তাই সে আরও কয়েকজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে কর্তব্যের পরিধিতে নিজেকে জড়াবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো।

বিল্লাল পর্যবেক্ষণ করে দেখলো শিশুশ্রম আরেকটি বেদনাদায়ক বিষয়। সে ভাবলো ওদেরকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিলে কেমন হয়। ওদের তো এই অধিকার আছে। বিল্লাল এদের মাঝ থেকে চটপটে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে চলে গেলো স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওরা ছোট শিশু। বাবা-মা’র কোন উপায়ই নেই লেখাপড়া করাবে। বিল্লাল প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলো। প্রধান শিক্ষক তাকে আশ্বস্ত করলো ওদেরকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে নেবার ব্যাপারে। বিল্লালের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। সরকার ওদেরকে বিনামূল্যে বই দেবে, বিদ্যালয়ের পোশাক দেবে।

আর যাই হোক ওদের মাঝেও মেধা আছে, আছে সৃষ্টিশীলতা। লেখাপড়া লেখাপড়াই। এটি মানুষকে বিকশিত করে। নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্যের কোন শেষ নেই। প্রতিটি দিন মানুষকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। নতুন আলোয় নতুন কিছু। মানুষ যখন বিশেষ বিশেষ কাজ করে তখন তার পেছনে বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। অনেক সময় মানুষ স্বার্থ ছাড়া কাজ করে। এমন মানুষ সবাই হতে পারে না। যাঁদের কর্ম-পরিকল্পনা বিস্তর তাঁদের মাঝে লুকিয়ে থাকে নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা হলো নিজের কাছে, তবে সিদ্ধান্ত নেবার আগে অবশ্যই সেটার সার্বিক অবস্থান কার কার মতে কীরকম তার অনুপাতে গ্রহণযোগ্যতা নির্ণয় করা খুবই ভালো। সবার মনের ব্যাপ্তি সমান নয়।

বিল্লালের সবচেয়ে ভালো লাগছে বাচ্চাগুলো পড়াশুনা করতে পারবে তার মতই। তার মনে যে রঙিন ঘুড়িটা ছিল সেটি যেন আজ উড়ার অপেক্ষায়। সত্যিই স্বপ্ন তো রঙিন ঘুড়ির মতোই হয়। আমরা সমাজের গণ্ডিতে থেকেও অনেক কিছুই দেখি না। দেখেও না দেখার ভান করি। তবে সবাই এক নয়। বিল্লালের সহযোগীরাও খুব আগ্রহী সুবিধাবঞ্চিত শিশুগুলোর পাশে দাঁড়ানো নিয়ে। মানুষের মাঝে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকে। একটি হলো খুব খারাপ দিক, একটি খুব ভালো দিক আর আরেকটি হলো ভালোও না খারাপও না এমন দিক। খুব খারাপ দিকে থাকে প্রায় সম্পূর্ণই খারাপ। খুব ভালো দিকে থাকে প্রায় সম্পূর্ণই ভালো আর শেষেরটি হলো আধাআধি; ভাল-খারাপের মিশ্রণ।

বিল্লাল এরই মাঝে একদিন বিদ্যালয়ে গেলো। কে কেমন পড়তে পারছে প্রাক-প্রাথমিকে সেটি দেখার জন্যই তার উপস্থিতি। প্রধান শিক্ষক তাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে দিলো। শ্রেণীকক্ষে পৌঁছার সাথে সাথে সবাই দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দিলো। এ এক অন্যরকম দৃশ্য। বিল্লাল আবেগাপ্লুত হয়ে গেলো। বিল্লালের বন্ধুরা আগামীকাল আসবে শীতের কাপড়চোপড় নিয়ে। বেশ শীত পড়েছে। সবাই মিলে চাঁদা তুলে এই সাহায্যটা করবে তারা। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও তাদের সাথে এক হয়ে এতে অংশগ্রহণ করতে চায়। ভালোলাগা বুকে নিয়ে বিল্লাল বিদ্যালয় প্রাঙ্গন ছেড়ে আসলো। এর নামই তো সত্যিকারের ভালোবাসা।

আজকাল ছেলেমেয়েরা প্রেম করে। মুঠোফোনে টাকা খরচ করে। একে অপরকে খাওয়ায়, ঘুরাঘুরি করে। সময় পার করে। প্রেম জমলে ভালো লাগলে বিয়ে করে। কিন্তু হাতে গোনা ক’জন আছে যারা কিনা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছে? বিল্লালের এ ভালোবাসা এক বিশুদ্ধ ভালোবাসা যাতে কোনই স্বার্থ নেই। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।


বিল্লাল বাবা-মা’র কাছে জীবনে যা কিছু চেয়েছে তার সবই পেয়েছে। কিছু জীবন সংকীর্ণ, চাইলেও অনেক কিছুই পাওয়ার কোন উপায় থাকে না। মানুষের জীবন হলো চাওয়া না চাওয়া আর পাওয়া না পাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ। অনেকেই অনেক কিছু চাইতে গিয়েও চায় না। মনে হয় যেন কোন একটা সংকোচের বেড়াজালে নিভৃত তারা। আবার অনেকেরই অনেক কিছুর দরকার, অনেক কিছুই পেতে চায়। পেতে চেয়েও তারা অনেক কিছুই পায় না। প্রতিটি মানুষ জীবন-জালে বন্দি। সমাজের কতজন আলোকিত হয়? দুঃখবোধের জায়গা বা সুখের আবর্তিত অনুভূতিতে সবাই তো শীতাবৃত। শীতাবৃত; কারণ কুয়াসায় ঘেরা প্রতিটি সকাল মানুষকে টোকা দেয় যা অনেকের কাছে নিছক কষ্টকর বিষয় আর অনেকেইবা নির্বাপিত। নির্বাপিত; কারণ শীতের মিষ্টি সকালটা কেউ কেউ উপভোগ করে।

বিল্লাল ওর বন্ধুবান্ধবকে সাথে নিয়ে আজ বিকেলে শীতবস্ত্র কিনবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেয়া টাকা আর নিজেদের হাতের সব টাকা মিলিয়ে জামা-কাপড় কিনবে ওরা। ওরা করলো কি সব শিশুদের আলাদা আলাদা ছবি তুলে নিলো। যাতে প্রত্যেকটি শিশুর গড়ন আর বর্ণ অনুযায়ী বস্ত্র কিনতে পারে। বিকেলের একটু আগেই সবাই বেরিয়ে পড়লো। বঙ্গবাজারে গেলো তারা। সেখান থেকে সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি শিশুসহ তাদের বাবা-মা ও ভাই-বোনদের জন্যও কেনাকাটা করলো। সত্যি এ এক অন্যরকম অনুভূতি। সবাই খুব খুশি মনে ফিরে এলো।

পরদিন সবাই বিদ্যালয়ে গেলো শিশুদের মাঝে কাপড় বিলিয়ে দেবে বলে। শিশুরা সবাইকে দেখে আনন্দে মেতে উঠলো। ছোট ছোট বাচ্চারা কিচিরমিচির শুরু করে দিলো। ওদের প্রত্যেকের মাঝে আছে প্রাণ-শক্তি। এ শক্তিকে যতদূর সম্ভব কাজে লাগাতেই হবে। সবারই ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। প্রধান শিক্ষক সহ সব শিক্ষক-শিক্ষিকা আর সব শিক্ষার্থীর মতো ওদের জন্যও আন্তরিক মনোভাব পোষণ করছে। বর্তমান সরকার শিশুদের মেধা বিকাশে সর্বোপরি কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী-জাগরণের এই যুগে নারীদের শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নেয়ার সার্বিক সহযোগিতার যে প্রয়াস তা রীতিমতো প্রশংসনীয়।

আমাদের হৃদয় একটি মসজিদের মতো; মন্দিরের মতো। মসজিদে-মন্দিরে আমরা যে আবেগের সাথে যে নিষ্ঠার সাথে মহান সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজি; পূজা করি; ঠিক তেমনি মানুষের মাঝেও সৃষ্টিকর্তা বসত করেন। মানুষের আত্মা থেকে যে দোয়া আসে সেটাও তো অভিপ্রেত।

আজ বেশ শীত। শিশুরা ওদের ভাই-বোন আর বাবা-মা’কেও শীতবস্ত্র উপহার দিলো। এক মা দোয়া করলো, “ও আল্লাহ্‌, আমগো দিহে যারা ফিইরা চাইছে হেগো তোমার আরশের নিচে জায়গা দিও।“ এ যেন হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে গভীর আবেগের দোয়া।

মানুষকে মন থেকে ভালোবাসার কোন মন্ত্র নেই। উদারতা, সম্মান প্রদর্শন, প্রেমময়তা, মমতা, ঐকান্তিকতা, আর সচেষ্ট অনুভূতির সংমিশ্রণেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে হৃদয়ের খুব গভীর স্থান থেকে। বিল্লালের আরেকটি পরিকল্পনা আছে। আর তা হলো শিশুগুলোর বাবা-মা’দের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়ার। বিল্লাল তার বন্ধুদের সাথে নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে যায়। সেখানে তারা সরাসরি উত্তরের মেয়র সাহেবের কাছে তাদের ব্যাপারে কি করা যায় সে বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করে। আলোচনা ফলপ্রসূ হয়। সম্মানিত মেয়র তাদেরকে নগর পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিল্লাল আর তার সহযোগীরা খুশি মনে বাড়ি ফেরে। সবার প্রাসঙ্গিক ভাবনা সত্যি সত্যি মিলে গেলো। কারও জন্য কিছু একটা করতে পারার যে কি আনন্দ তা যারা করে তারাই ভালোভাবে বলতে পারবে। আমাদের মনে নিজেকে নিয়ে আলাদা আলাদা স্বপ্ন থাকে। আলাদা করে একটা জগত থাকে। সবার চিন্তার পরিধি এক না। কিছু মানুষ আছে স্বার্থপর। শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবে। মনে করে এটাই উত্তম। আসলে এ ধারণা ঠিক না। মানুষকে আঘাত দিতেও মন কাজ করে। আবার মানুষের উপকার করতেও মন লাগে। মন থেকে সবাই আলাদা ধরনের বলেই পৃথিবী চলছে। সবাই যদি একই রকম হয়ে যেতো তবে তো বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়তো না। সবাই তো মনের উঠোনে রোদ উঠাতে পারে না।

বিল্লাল তার বন্ধুদের নিয়ে একটি ফান্ড গঠন করলো। এই ফান্ড থেকেই চলবে শিশুদের সব খরচ। এলাকায় এ নিয়ে মানুষের মাঝে গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি মাসে যে যা পারে সাহায্য করতে কিছু কর্মজীবী মানুষও এগিয়ে আসলো। ভালো লাগার বিষয়।

প্রতিটি শিশু একটি ফুলের কলি। ওদেরও আছে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার অধিকার। সরকারি ও বেসরকারিভাবে যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা চলছে। এর বাইরেও যতোটুকু পারা যায় পাশে দাঁড়ানোর তা যদি আমরা করি এতে করে একসময় আমরাই গর্ব করে বলতে পারবো হ্যাঁ; ব্যাক্তি বিশেষে আমরা কিছু একটা করতে পেরেছি। সমাজটা আমাদের সবার জন্য।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement