মা শব্দটি সকলের কাছেই প্রিয় একটি শব্দ। জীবনের প্রথম বন্ধুতো মা নিজেই। যে শিখিয়েছে কিভাবে হাঁটতে হয়, কিভাবে বড়দের সাথে কথাবলতে হয়, কিভাবে বড়দের সন্মান করতে হয়, কিভাবে সঠিক পথে চলা যায়। মায়ের কাছে থেকেই প্রথম জানা বন্ধুত্ব মানে কি? ভালবাসা/অনুভুতি মানে কি? আসলে মা হলো নিত্য সঙ্গী। যাকে ছাড়া কোন কিছু ভাবা যায় না। পৃথিবীতে এমন একজন'ই আছে যে শত কষ্টের মাঝে-ও হাসি ফুটাতে সক্ষম। পৃথিবীতে একজনকেই পাবেন যার কোন চাওয়া নেই, বেতন ভাতা নেই, অহংকার নেই, লোভ লালসা নেই, শুধু সবসময় সকলের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াই যেন নেশা আর পেশা। আর পৃথিবীতে মা-ছেলের সম্পর্কটা একটু অন্য ধরনের। মায়ের কাছেই সবচেয়ে বেশি আবদার থাকে ছেলেদের। শত শত বায়না, আর এটাসেটা ইনিয়েবিনিয়ে নেওয়ায় মায়ের জুড়ি নেই। এজন্য মা'ই প্রথম মা-ই সেরা। উল্লিখিত বিষয়ের ভাবগত, এমনকি অর্থগত সামঞ্জস্যতা রয়েছে। আশাকরি পাঠক হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ এপ্রিল ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ২৬টি

সমন্বিত স্কোর

২.২৯

বিচারক স্কোরঃ ১.০৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মা (মে ২০১৯)

সুঁই সুতোর সম্পর্ক
মা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.২৯

নৃ মাসুদ রানা

comment ৮  favorite ০  import_contacts ১৯৫
খুব সকালে মোবাইল স্কিনে ভেসে আসা রিংটোনের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের মধ্যে তড়িঘড়ি করে কলটা রিসিভ করেই বলে উঠি পরে কথা হবে। এখন রাখছি। কিন্তু মনে হলো ওপাশ থেকে বারবার বলছে এই কথা শোন। ফোন কেটে দিস না। ইতিমধ্যে লাইনটি ডিসকানেকটেড হয়ে গেছে।
পাঁচ সেকেন্ড যেতে না যেতেই আবার পূনরায় কল। মেজাজটা একদম বিগড়ে গেল। এতো সকালে কল! কোন কিছু না ভেবেই ফোন কেটে দিয়ে মোবাইলটা বন্ধ করে দিলাম। এইবার একটু শান্তিতে ঘুম দেওয়া যাবে। ঘুমাচ্ছি তো ঘুমাচ্ছি। কোন রকম ডিস্টার্ব হচ্ছে না।
হঠাৎই মিনিট দশেক পরে ঘুম ভেঙে যায়। শরীরের ভেতর কেমন একটা অস্হিরতা ফুটে ওঠে। গলাটা শুকিয়ে গেছে। হাতের কাছে পানির বোতলটা নিয়ে দেখি বোতলে পানি নেই। কি আর করা! অলসতায় ডুবে না থেকে উঠে পরলাম।
পরনের লুঙ্গিটা খোলা খোলা ভাব। কোনরকম ঝুলে আছে। বাম হাত দিয়ে ধরে একটু শক্ত করে বেঁধে নিলাম।
পানি পান করে মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটু ফেসবুকে চোখ বুলিয়ে আসবো এমন সময় দেখি মোবাইলটা বন্ধ আছে। ঠিক তখনই ঘুমের মধ্যে ফোন কেটে বন্ধ করার বিষয়টা মাথায় এসে ঘুরপাক খেতে লাগলো। মনের মধ্যে ফাঁকা জায়গাটুকু নিমিষেই ভয়ে পূরণ হয়ে গেলো। মনে হতে লাগলো এতো সকালে তো কেউ কখনো ফোন দেয়নি। তাহলে কি দূর্ঘটনা? চোখদুটো ঝাপসায় ভরে যাচ্ছে। দ্রুত মোবাইলের অন বাটন চেপে ধরেছি। কিন্তু আজ যেন মোবাইলটাও হাসিঠাট্টার খেলা খেলছে। কোনক্রমেই মোবাইলটা দ্রুত চালু হচ্ছে না। হয়তোবা নিয়তি খেলছে তার নিয়মে। নতুবা বিপদের সংকেত দিয়ে যাচ্ছে ক্ষণেক্ষণে।
মোবাইলটা কোনরকম চালু হওয়ার সাথে সাথেই কল হিস্টোরির অপশনে গিয়ে চাপ দেই। কিন্তু মোবাইলটাও কেন যেন কাজ করছে না। যেটুকুও করছে খুব ধীর গতিতে। অবশেষে নাম্বারটা চোখে পড়লো।
পরিচিত নাম্বার। খুবই কাছের আত্মীয়। যার সাথে হৃদয়ের লেনাদেনা। আত্মার অস্তিত্বে মিশে যাওয়া সম্পর্ক। প্রিয় শব্দজোড়া। পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষ। যার সাথে আর কারও তুলনা হয়না তিনি হলো আমার গর্ভধারিণী মা।
সাথে সাথেই কল দিলাম। কিন্তু মোবাইল ব্যালেন্স আজ লুকোচুরি খেলছে অবিরত। কয়েকটা সিম পরিবর্তন করেও যখন কোন কূল কিনারা হলো না তখন আর কি করা ঠাঁই বসে রইলাম। এতো সকালে ফ্লেক্সিলোডের দোকানটাও খোলেনি।
বালিশের পাশে রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে সবেমাত্র সিগারেট জ্বালিয়েছি তখনই অনলাইনে ফ্লেক্সিলোডের কথাটি মাথায় এসে নাড়া দেয়।
কল দেওয়ার সাথে সাথেই রিসিভ হয়ে যায়। অনেকবার হ্যালো হ্যালো করেও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শুধু কেমন যেন একটা হইচই এর শব্দ কানে আসছিলো। কিন্তু ভালো করে বোঝা যাচ্ছিলো না আসলে কি ঘটেছে। তবে একটু একটু কান্নার শব্দ পাচ্ছিলাম। মনটা তখনই ঘাবড়ে যায়। ভয়ে ভয়ে শরীর ঘেমে যেতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে আবার হুড়াহুড়ির শব্দ শুনে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। অসহ্য জ্বালাতন বুকে এসে জ্বালাপোড়া করতে থাকে। পুড়ে পুড়ে মনের মধ্যে গন্ধ তৈরি করে।
আবার পূনরায় কল দিলাম। ঠিক একইভাবে রিসিভ হলো কিন্তু এবারেও কোনরূপ সাড়াশব্দ নেই। রাগে বুকটা ফেঁপে ফেঁপে উঠতে শুরু করেছে। ঘনঘন নিশ্বাসে নাকটা ভারি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল মোবাইলটা আচার দিয়ে ভেঙে ফেলি।
তৃতীয়বার রিংটোন বাজতেই ফোন রিসিভ করে বললো - খোকা তারাতাড়ি বাড়িতে চলে আয়।
কেন মা কি হয়েছে?
আমি বলছি - তুই চলে আয়। পরে সব বলবো।
তোমার এখন বলতে কি সমস্যা? কথাটি বলতেই ওপাশ থেকে লাইনটি কেটে দেয়।
তখন যেন বিপদের গন্ধ তেড়ে তেড়ে আমার দিকে আরও বেশি ছুটে আসছিলো। গন্ধটা এতোটাই কড়া ছিলো যে নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
হ্যালো - আব্বু! কি হয়েছে বলোতো?
কান্না কান্না স্বরে বললো - কিছু হয়নি। তুই দ্রুত চলে আয়। বেশি দেরি করিস না।
আব্বু তুমিও বলছো না আম্মুও বলছে না। আসলে খুলে বলোতো কি হয়েছে?
এইবার আব্বু কেঁদেই ফেললো। দ্বিতীয় বারের মতো আব্বুর কান্নার শব্দ আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। ২০১৬ সালের আগস্টের ১৩ তারিখ শেষবার কাঁদতে দেখেছিলাম। সেদিন নিজেও অঝোরে কেঁদেছিলাম। ভুলিনি সেদিনের আত্ম চিৎকারের বেদনা। দাদিকে হারানোর ব্যথা এখনো কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
৩০ মিনিট যাবৎ রেলস্টেশনে দাড়িয়ে। বিমানবন্দর রেলস্টেশন। চারদিকে যেন আজ হাহাকার লেগে আছে। কোথাও একটু স্বস্তি মিলছে না। আজ দিনটাই গড়মিলের দাবানলে বন্দী। খাঁচায় পোষ্য ময়না টিয়াপাখিটাও আজ শ্বাসরুদ্ধ। দম নেওয়ার মতো শান্তির পরশপাথরও আজ উধাও। ভাগ্য যেন আজ অলৌকিক নিয়মে খেলছে বারবার।
ভাই - পদ্মা ট্রেন কখন আসবে?
না ভাই। আমি জানিনাতো। আপনি স্টেশন মাস্টার কিংবা গার্ডের কাছে খবর নিতে পারেন।
ও আচ্ছা। ঠিক আছে ভাই। ধন্যবাদ।
একটু মুচকি হাসি অভিনয়ের ছলে খেলছে অবিরাম অবিরত। স্বাচ্ছন্দ্যটা অনেক আগেই গায়েব হয়ে গেছে।
আরও ১৫ মিনিটের মতো অপেক্ষা। অপেক্ষার সময়, সময়ের অপেক্ষা। প্রত্যেকটি সেকেন্ড, মিনিট আজ আফসোসের কারণ। বারবার শুধু ঘড়ির কাঁটার দিকে নজর। মাথাটা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছি বারবার। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম বাসে উঠেই চলে যাই। ভাবতে দেরি কিন্তু হাটতে দেরি নয়। স্টেশনের প্রধান গেইট পার হবো এমন সময় মাইকিং এ পরবর্তী ট্রেনের সময় সূচির কথা জানালো। এবার যেন একটু স্বস্তি ফিরে পেলাম। ঠিক গ্রামের মাঠেঘাটে পরিশ্রম করা কৃষকের মতো, পানির দেখা পেয়ে সূর্যমুখী হাসি।
ট্রেনে উঠে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রত্যেকটি বগি আস্তে আস্তে কানায় কানায় ভরে যাচ্ছে। তবে বাড়তি লোক নেই বললেই চলে। হঠাৎই এক অপরিচিত কন্ঠস্বরে হুঁশ ফেরে আমার।
বড় ভাই এখানে বসুন। সিট খালি আছে।
কোনকিছু না ভেবেই সরাসরি বসে পরলাম।
অপরিচিত ভাইটি আবারও জিজ্ঞাসা করলো - কোথায় যাবেন ভাই?
আমি শহীদ এম মুনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত যাবো। আপনি?
আমিও একই স্টেশনে নামবো। আসলে সিট দুটোই আমার। আমার এক বন্ধুর আসার কথা ছিলো কিন্তু একটা কাজের জন্য ও আসতে পারিনি।
ও, আচ্ছা। কথা বলেই মুখ বন্ধ করে বসে আছি। দেহের ভিতরে থাকা কথাগুলো যেন শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে কেউ। কোনক্রমেই বের হতে চাচ্ছে না। তবে পাশে যে ভাইটি বসেছিলো তিনি বেশ পটপট করে কথা বলেই যাচ্ছিলো। আর আমি বেশ অস্বস্তি.......! তারপর বেশ কিছু সময় তিনি চুপ করে রইলো।
ট্রেন থেকে উঠে দাড়ালাম। তখন পাশে বসে থাকা ভাইকে বললাম - ভাই ক্ষমা করবেন। আপনার সাথে কথা বলতে পারিনি। আসলে বাড়িতে কিছু ঘটেছে সেজন্য মনটা ভিষণ খারাপ। বাড়িতে বেশ কয়েকবার কল দেওয়ার পরও কিছুই জানতে পারছি না। এজন্য আপনার সাথে.....!!
আরে ভাই! সমস্যা নেই। দোয়া করি বিপদ কেটে যাক। আল্লাহ পাক সবাইকে ভালো রাখুক।
রিকশা থেকে নামতেই বুকের পাঁজরটায় ব্যথা করতে লাগলো। শরীর থেকেও শক্তিগুলো কেমন যেন কমতে শুরু করেছে। শরীরটা বেশ অস্হির অস্হির লাগছে। পা থেকে শক্তি যেন উধাও হতে শুরু করেছে। যতই সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছি ততই যেন শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। আগে কখনো এরকম অনুভুতি হয়নি আমার। তবে আজ কেন?
দূরের মাইকিং- এ মৃত্যুর খবর শুনে বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে লাগলো। ঢোলের মতো বুকের পর্দাগুলো বারবার শব্দ করতে লাগলো। নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হলো।
পুকুর পাড়ে আসতেই সেজনু কাকু আমাকে দেখে কাঁদতে শুরু করলো। আমি বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলাম- কি হয়েছে? কি হয়েছে? কিন্তু কোন উত্তর পেলাম না। সেজনু কাকু শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। আমি সেজনু কাকুকে জরিয়ে ধরে বাড়ির মধ্যে ঢুকবো ইতিমধ্যে দেখি বেলগাছ তলায় টুপি মাথায় অনেক মানুষের ভিড়। সবাই পরিচিত আত্নীয় স্বজন। তখনই শরীরের লোম গুলো শিউরে উঠলো। অজানা এক শিহরণে গলাটা এক ধাক্কায় শুকিয়ে গেলো। বারবার দম ফেলতে চাইলেও গলার ভেতরটা আটকিয়ে যাচ্ছিলো বারবার। মনে হচ্ছিল কেউ যেন বঁড়শি দিয়ে বেঁধে রেখেছে।

বাড়ির গেইট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই দেখি মানুষের মহামারী লেগে আছে। পুরো বাড়ি মানুষে ভরা। বেশ কয়েকজন আত্নীয় বেহুঁশ হয়ে পরে আছে। কান্নাকাটির শব্দে বাড়িটা......।
কাঁদতে কাঁদতে হয়রান হয়ে মাটিতে লুটে পরেছি। তবুও কান্না থামার কোন কায়দা কৌশল জানা নেই। মানুষ কিভাবে এতো কাঁদতে পারে জানা না থাকলেও আজ বুঝেছি কিভাবে মূহুর্তের মধ্যে চোখে অশ্রু আসে, বুকটা কিভাবে শোকের তাপে দগ্ধ হয়, হৃদয় ভেঙে কিভাবে নিমেষেই কাঁদতে পারে।
জ্ঞান হারিয়েছিলাম সেদিন। কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে পরে ছিলাম মাটির বিছানায়। ধুলাবালি লেপ্টে ছিলো পুরো শরীরে। গরমে শরীর থেকে ঘাম ঝরে দেহটা ফ্যাকাসে হয়েছিলো। জ্ঞান ফিরে দেখি - পৃথিবীটা ঘুরছে চোখের চারপাশে। আকাশপাতালের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। চারদিকে মিশে একাকার। শুধু ভোঁভোঁ করে ঘুরছে তো ঘুরছে।
মাকে জরিয়ে ধরে কাঁদছি আর বলছি - একি হলো মা? একি হলো? শেষবার একটু কথা বলারও কোন সুযোগ হলোনা।
খোকা! কাঁদিস না। আল্লাহকে ডাক। আল্লাহ পাক যা করে ভালোর জন্যই করে।
মা! মনটাকে কেমন করে শান্ত করবো? কিভাবে বোঝাবো? আমি আর পারছি না।
কি আর করার আছে আমাদের? দোয়া করা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন রাস্তা নেই খোকা (মা হুঁহুঁহুঁ করে কাঁদতে শুরু করলো)।
গ্রামের মসজিদে তখন জোহরের নামাজের আযান হচ্ছিল। গ্রামের মুরুব্বিরা বলতে শুরু করলো - আর কেঁদেকেটে কি হবে? আল্লাহর কাছে দোয়া করো। আর চলো সবাই নামাজের জন্য মসজিদে যাই। বাড়ির মহিলারাও নামাজ পড়ুক, কোরআন তেলওয়াত করুক। সময় তো আর বেশি নেই।
মসজিদ থেকে নামাজ পরে বের হলাম। সবাই যার মতো করে নামাজ মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইমাম সাহেব মসজিদের মাইকে বলে দিলেন - আর দেরি না করে আমরা সবাই মাঠের দিকে এগিয়ে যাই।
আম্মু! আম্মু (জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে)! তুমি আমার ডাক শুনছো না কেন? তুমি কথা বলোনা কেন?
এরকম মিষ্টি গলায় কাঁদো কাঁদো হয়ে কথাগুলো ধারালো ছুড়ির মতো বুকের পর্দাগুলো কেটে ফ্যালফ্যাল করে ফেললো। পৃথিবীতে এর চেয়ে দুঃখের দৃশ্য বুঝি আর কিছু মিলবে না। এতো মায়ায় প্রিয়জনকে, প্রিয় মানুষটাকে আর ডাকবে না।
আমি গিয়েই বাবুকে জরিয়ে কাঁদতে থাকি। হাউমাউ করে কান্না। বারবার মনে হচ্ছিল সবাই বুঝি আজ প্রতিযোগিতায় নেমেছি। তবে জয়ী হওয়ার মতো কেউ নেই।
মাসুদ ভাইয়া! ও মাসুদ ভাইয়া! আম্মু শুনছে না। আম্মু ঘুম থেকে উঠছে না কেন? তুমি আম্মুকে ডেকে দাওনা। যুহরের নামায পড়ার সময় হয়েছে। মসজিদে তো আজান দিল।
এইবার কলিজায় বেতের আঘাতে পৃথিবী ভাগ হতে শুরু করলো। উপস্থিত সবাই যেন হতভম্ব। পরিবারের লোকজন, আত্নীয় স্বজন সবাই এসে বাবুকে জরিয়ে ধরে আরও বেশি করে কাঁদতে শুরু করলো। এতোগুলো দুঃখ, এতোগুলো আবদার, এতোগুলো অনুরোধ কিভাবে মিটাবো? আমার যে সাধ্যের বাইরে।
বাবু। আমার মেজ কাকুর ছেলে। বয়স পাঁচ বছর। দেখতে বেশ নাদুসনুদুস। খুবই সুন্দর করে কথা বলতে পারে। সে আমার খুবই ভক্ত। প্রতিবার বাড়িতে গেলেই তার নানারকম আবদার আর বায়না। তার জন্য প্রতিবার কিছু না কিছু নিয়ে যেতেই হবে। তা-না হলে সে আমার পিছু ছাড়বে না।
ভাইয়া - আম্মু কি আর প্রতিদিন একবার করে কোরআন পাঠ করবে না? প্রতিদিন আম্মু আমাকে বলতো তিনবার সূরাহ ইখলাস পাঠ করলে একবার কোরআন পাঠ হয়ে যায়।
ভাইয়া - তুমি আম্মুকে ডেকে দাওনা। আমি আম্মুর সাথে তিনবার সূরাহ ইখলাস পাঠ করবো।
আমি না-বুঝের মতো শুধু জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। সান্ত্বনা দেওয়ার কোন কায়দা কৌশল আমার জানা নেই। এতো বায়না ধরে কান্নাকাটি নয় যে দোকান থেকে মুড়ির মোয়া কিনে দিলাম আর কান্না থেমে গেলো।
বড় আম্মু! ও বড় আম্মু! তুমি আম্মুকে ডেকে দাওনা। আম্মুর সাথে সাথে আমি একবার কোরআন খতম দেব। আম্মু আমাকে বলেছে - চারবার সূরাহ কাফিরুন পাঠ করলে এক খতম কোরআন তেলওয়াত হয়।
কলিজায় আগুন লাগানো কথাগুলো ক্রমশই মাটি খুঁড়ে বের হতে শুরু করেছে। ডুকরে ডুকরে কেঁদে কেঁদে উপস্থিত সবাইকে মায়ার জালে বেঁধে ফেলছে। অপরিচিত অনেকেই অশ্রু ধরে রাখতে পারেনি। যারা কাঁদতে পারেনি তাদের চোখেও সেদিন অশ্রুগুলো টলমল করছিলো।
বড় আব্বু - তুমি আম্মুকে ডেকে দাওনা বলতেই আব্বু বাবুকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগলো। চুমায় চুমায় বলতে লাগলো তোমার আর ডাক শুনবে না। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছে।
তাহলে আমি কিভাবে কবরের আজাব থেকে মুক্তি পাবো? কে আমার সাথে প্রতিরাতে সূরাহ মূলক পাঠ করবে? তুমি বলোনা বড় আব্বু। তুমি বলো।
আব্বু নিজেও আজ হতভম্ব। কথা বলার সামর্থ্য টুকুও যে আজ বিলীন। চোখ বেয়ে শুধু অশ্রুজলের গড়াগড়ি।
মেজ কাকু এসে বাবুকে জরিয়ে ধরতেই - বাবু বলতে শুরু করে, আব্বু তুমি ডেকে দাওনা। আম্মু না উঠলে রাতে কে আমায় গজল শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দেবে?
মেজ কাকুও এইবার আরও বেশি করে কাঁদতে শুরু করলো। বারবার থামানোর চেষ্টা করেও.........!
ইমাম সাহেব এসে বললেন - সময় হয়ে গিয়েছে। এবার চলুন। মাঠে সব মুসল্লী এসে হাজির। আর দেরি করা চলবে না। তখন আব্বু ইমাম সাহেবকে বললেন - শেষবারের মতো আমার বাবুকে ওর আম্মুর মুখটা দেখতে দিন। বাবু মুখটা দেখেই বলতে শুরু করলো - আম্মু দোয়া করে দিলাম। দেখা হবে জান্নাতে।
ইমাম সাহেবসহ উপস্থিত সবাই বাবুর কথা শুনে চমকে গেলেন। ইমাম সাহেব বাবুর মাথায় হাত রেখে বললো - যে পৃথিবীতে এতো সুন্দর একটি বাচ্চা রেখে যায়। তার জান্নাতের অভাব হবে না।
বছর দশেক পার হয়েছে। আজ ঈদের দিন। মসজিদে ফজরের নামাজ পরে বের হয়ে বাবুকে খুঁজিতেছিলাম। কিন্তু পাচ্ছিলাম না। মসজিদ থেকে বের হওয়ার রাস্তা বরাবর তাকিয়েও বাবুকে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ হাসান এসে বলতে শুরু করলো - কি রে কি খবর তোর? অনেক দিন হলো তোর সাথে দেখা নেই। তো কেমন আছিস?
এইতো, আল্লাহ পাক ভালোই রেখেছে। তোর খবর বল।
আল্লাহ পাক আমাকেও বেশ ভালো রেখেছে। তুই কাকে খুঁজছিস রে?
আর বলিস না... কবর যিয়ারত করতে যাবো কিন্তু বাবুকেই.....!
আরে বেটা! ও কি তোর অপেক্ষায় আছে। ও অনেক আগেই বের হয়ে গেছে। চল আমরাও যাই। যেতে যেতে কথা হবে ।
স্ট্রোক কোন ধরনের রোগ? আজও জানা বাকী। কতো মানুষ যে এই শব্দটির সাথে পরিচিত হয়েছে হিসেব নেই। ভবিষ্যতেও হিসেব থাকবে কিনা বলা মুশকিল। প্রিয় মানুষগুলো এভাবেই প্রতিনিয়ত এই একটি শব্দের কাছে পরাজিত হয়ে নিমেষেই হারিয়ে যাচ্ছে।
এই শব্দটির জন্যই হারিয়েছি মায়ের মতো মেজ চাঁচিকে। এসম্পর্ক কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে? এতো দিনে মাটির সাথে মিশে বিলীন হয়ে গেছে।
দুই বছর হলো মেজ কাকু বিয়ে করেছে। বাবুর বয়স এখন ১৫। কোরআনের হাফেজ। এখন গড়গড় করে প্রতিনিয়ত কুরআন তেলওয়াত করাই প্রধান পেশা। কাকু নিজেও ব্যস্ত ব্যবসা নিয়ে।

বি দ্রঃ আসুন আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের গানবাজনা না শিখিয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ শেখানোর চেষ্টা করি। যা আমাদের মৃত্যুর পরেও কাজে লাগবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement