ভ্যালেন্টাইন শব্দের অর্থ প্রেমিক প্রেমিকা, প্রেম, ভালবাসা, প্রণয়, ভালবাসা খোঁজা, প্রেমিক যুগল, ভালোবাসার নানান অভিবাদন ইত্যাদি। সেই ক্ষেত্রে ভ্যালেন্টাইনকে নানাভাবে সংঙ্গায়িত করা যায়। কখনো কখনো ভ্যালেন্টাইন শব্দটি ভালোবাসার সুফলকে বুঝায়। আবার একটা নতুন প্রেমের সূচনা হতে পারে ভ্যালেন্টাইন শব্দের মাধ্যমে। আলোচ্য অংশে বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ রেখে একটি ভালোবাসার গল্প উপস্থাপন করেছি। আশাকরি গল্পের সাথে বিষয়ের চমকপ্রদ মিল রয়েছে। তাছাড়া ভাবগত ভাবে বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মিল রয়েছে। এবংপাঠক হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকরবে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ এপ্রিল ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ২৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

ভ্যালেন্টাইনঃ ২০১২ সালের ঘটনা
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

নৃ মাসুদ রানা

comment ৫  favorite ০  import_contacts ১৯৮
খুবই ইচ্ছে শেলিনীর। সময় পেলে মন খারাপের দিনেও লিখে ফেলে কবিতা, গল্প ও ছড়া। গোটা একটি ডায়েরি কবিতা আর ছড়ায় ভরে গেছে। কলেজের ম্যাগাজিনে কয়েকটি কবিতা ও ছড়া প্রকাশ পেলেও এখন পর্যন্ত কোন পত্রিকার পৃষ্ঠায় ছাপা হয় নি। তবুও থেমে নেই তার লেখার চাহিদা। খুবই ইচ্ছে আছে তার একটি বই প্রকাশ করার। তবে হবে কিনা সেটাও জানে না সে।
এবারের পুজোর ছুটিতে নিজের আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে তার। অবশ্য গতবারেও গিয়েছিল। কিন্তু কেন যেন এবার প্রবল আগ্রহ নিয়ে যেতে যাওয়ার ইচ্ছে তার। গতবারের চেয়ে এবছর আরও বেশি রহস্যময় কিছু লেখার প্রবল আগ্রহ তার। গতবারে যে গল্পের সমাপ্তি ঘটে নি সেই লেখাটিই আবার নতুন করে লিখে সমাপ্ত করতে চায় শেলিনী। এজন্য বারবার শেলিনী পীরগঞ্জে যাওয়ার বায়না ধরেছে মায়ের কাছে।
পুজোর ঠিক তিন দিন আগে শেলিনী রওনা হল পিসির বাড়ি যাওয়ার জন্য।
শহর থেকে বাসে উঠে পীরগঞ্জে নেমে পরলো শেলিনী। অবশ্য পীরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে শেলিনীর জন্যে অপেক্ষা করছিল তার পিসির ছেলে। বাসস্ট্যান্ডে নেমেই শেলিনী যাদবকে ফোন করলো।
হ্যালো, কোথায় তুই?
যাদবঃ আমিতো বাসস্ট্যান্ডে দাড়িয়ে আছি।
শেলিনীঃ কোন বাসস্ট্যান্ড? আমিতো রনি মিষ্টান্ন ভান্ডার দোকানের সামনে দাড়িয়ে আছি।
যাদবঃ আচ্ছা! দিদি তুমি ওখানেই দাড়িয়ে থাকো আমি মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আসছি।
শেলিনীঃ আচ্ছা,ঠিক আছে। আমি এখানেই আছি।
দিদি (হাসি মুখে যাদব)। কিরে যাদব, যাদব কেমন আছিস? হুমম, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? আমিও ভালো আছি। এই পিসি কেমন আছে রে? আম্মু খুব ভাল আছে। তোমাকে নিয়ে তারাতারি যেতে বলেছে। ও, তাই। চল তাহলে।
এই যাদব তোর মোটা আব্বু কেমন আছে রে? (শেলিনী, রিক্সায় উঠে)
যাদবঃ দিদি!(একটু রাগ করে)
আচ্ছা, ঠিক আছে। আর বলবো না। এই বল তো তোর ঠাকুরানী কেমন আছে? (ঠাকুরানী শেলিনীর পিসির বড় মেয়ে)
যাদবঃ সে খুবই ভালো আছে। সারাদিন শুধু ফোনে কথা বলে।
ও, তাই নাকি। এই যাদব তুই কিছু খাবি নাকি।
যাদঃ না দিদি কিছু খাবো না।

(শেলিনী এদিকে সেদিকে তাকাচ্ছিলো) কি দিদি কি হয়েছে?
নারে, যাদব কিছু হয়নি।
যাদবঃ তাহলে এদিকে সেদিকে তাকাচ্ছিলে কেন?
আরে কিছু না। এমনিতেই। এই যাদব ওই পাগলটা কোথায় রে?
যাদবঃ কোন পাগল দিদি?
আরে! এখানে এই বটগাছ তলায় শিকলে বাঁধা থাকতো যে (রিক্সা থেকে নেমে শেলিনী বলছে)। তোর মনে গতবছর আমি রুটি আর কলা দিয়েছিলাম।
যাদবঃ ও আচ্ছা। সে তো আর নেই।
নেই মানে? হাসপাতালে ভর্তি নাকি?
যাদবঃ আরে না দিদি। ওই লক্ষণ পাগল তো মরে গেছে।
(হঠাৎ চমকে উঠে) কি বলিস? তুই কি আমাকে বোকা বানাচ্ছিস?
যাদবঃ আরে না দিদি সত্যি সত্যি বলছি বলছি লক্ষণ পাগল মরে গেছে।
কেমনে মরে গেলো রে যাদব?

আরে শেলিনী যে! কেমন আছিস? তোর মা কেমন আছে? আর ছোট ঠাকুর?......
পিসি... আবার শুরু করলে। চলো আগে বাড়ির ভিতরে যাই তারপর বলছি। (বাড়ির ভেতরে যাওয়ার সাথে সাথে)
ও, আমার বউদি ঠাকুরানী। আপনি কোথায় আছেন?
পিসিঃ সে কি তোর কথা শুনবে? কানে হেডফোন লাগিয়ে রুমের ভেতর কি যেন করছে।
শেলিনীঃ ও আচ্ছা। তাই। আমি যাচ্ছি।

অবশেষে বলে ফেল তোর কি খবর? (ঠাকুরানীর সাথে অনেক্ষণ হাসিঠাট্টা করে) ঠাকুরানীঃ হুমম, ভালোই আছি। তুমি কেমন আছো দিদি?
আমিও ভালো আছি। তারপর তোর বয়ফ্রেন্ডের খবর কি?
ঠাকুরানীঃ আমার বয়ফ্রেন্ড!! মানে কী? তোমাকে কে বললো?
শোন। আমাকে মিথ্যা বলিস না। আমি কিন্তু সবই জানি।
ঠাকুরানীঃ ও আচ্ছা, যাদব তোমাকে বলেছে।
আরে না। ও আমাকে বলে নি। ও শুধু বলেছে তুই নাকি সারাদিন ফোনে কি যেন করিস।
ঠাকুরানীঃ আচ্ছা, ঠিক আছে সব বলবো। আগে চলো কিছু খেয়ে নেবে। তারপর আমরা ঠাকুর দেখতে যাবো।
রাত দশটা। শেলিনী ব্যাগের মধ্যে কি যেন খুঁজছে। ঠাকুীরানী মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। হঠাৎ ঠাকুরানী কান থেকে হেডফোন খুলে শেলিনীকে বললো, কি রে দিদি! কি খুঁজছিস?
শেলিনীঃ কিছু না রে।
ঠাকুরানীঃ তাহলে কাপড়চোপড় এভাবে ওলটপালট করছিস কেন?
শেলিনীঃ আরে পাচ্ছি নাতো। সেই জন্যে।
ঠাকুরানীঃ কি পাচ্ছিস না। আমাকে বল আমিও খুঁজে দেখি।
শেলিনীঃ আমার নীল ডায়েরি য কোথায় রেখেছি মনে পরছে না। ব্যাগের মধ্যে খুঁজলাম আঁতিপাঁতি করে কিন্তু পেলাম না।
ঠাকুরানীঃ তাহলে তুমি মনে হয় নিয়ে আসো নি। অথবা ব্যাগে তুলতে ভুলে গেছো।
শেলিনীঃ আরে না। আমি তুলে ছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে।
ঠাকুরানীঃ তাহলে পাবে না কেন? তুমিতো আবার তোমার ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে রাখো নি।
শেলিনীঃ এই তো মনে পরেছে। ধন্যবাদ রে। মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
নীল ডায়েরি। প্রচ্ছদটা দেখতেও ভিষণ সুন্দর। ঠিক যেন আকাশ থেকে গোধূলির কিছু রং নিয়ে প্রচ্ছদটা তৈরি করা হয়েছে। আর তাছাড়া নারীদের নীল রঙের সাথে অনেক কানেকশন আছে। প্রায় নারী বা মেয়ে মানুষ নীল রংটা ভীষণ ভাবে পছন্দ করে। বিশেষ করে বয়ফ্রেন্ডের গায়ে যদি নীল রঙের পান্জাবী থাকে তাহলে তো আর কোন কথাই নেই।
ঠাকুরানীঃ কিরে দিদি! কি হলো? ডায়েরি নিয়ে পরে আছিস যে।
শেলিনীঃ তুইতো জানিস নীল রং আমার ভীষণ প্রিয়। আর এই ডায়েরিটা আমার অনেক অনেক পছন্দের।
ঠাকুরানীঃ কিরে দিদি! স্পেশাল কিছু মনে হচ্ছে (মিষ্টি হেসে হেসে)।
শেলিনীঃ আরে সেরকম কিছু না। আমি অনেক খুঁজে ডায়েরিটা কিনেছি। এজন্য আর কি।
ঠাকুরানীঃ তা ডায়েরিটা একটু খোলা যাবে কি? ভিতরটা কি রকম দেখি। আর যাই হোক তুই পছন্দ করে কিনেছিস।

.......ভ্যালেন্টাইন........
শেলিনী চক্রবর্তী

ভ্যালেন্টাইন - নামটি শুনলেই বুকের মাঝে নানান অনুভূতি ভেসে ওঠে। এই শব্দের সাথে পৃথিবী নানা ভাবে জড়িত। কখনও মৃত্যুর সাথে আবার কখনও ভালোবাসার সফলতার সাথে পরিচিত। আবার কখনও দেহত্যাগী দেবদাস রূপে। কখনও কখনও আত্নহত্যা, খুন- মামলা, নিউজ পত্রিকার সাথেও নানা ভাবে জড়িত এই ভ্যালেনটাইন নামক শব্দটি।
ডায়েরির সূচনা পৃষ্ঠায় এরকম একটি শব্দ দেখে ঠাকুরানী অবাক। কোন কিছু না জেনে শুনেই ঠাকুরানী শেলিনীকে জিঙ্গেস করলো কি রে দিদি? এটা কি? কোন স্পেশাল মানুষকে নিয়ে কিছু লিখেছিস নাকি।
শেলিনীঃ আরে না। সেসব কিছুই না। তুইতো জানিস আমি একটু আধটু লেখালেখি করি। এই নামে একটি গল্প লিখবো সেই জন্যে ডায়েরির সূচনা পৃষ্ঠায় শব্দটি লিখেছি। আর তোদের এখানে থেকে তোর সাথে আর যাদবের সাথে সময়গুলো ভালো কাটবে আর শান্তিতে লিখতে পারবো বলেই পুজোর ছুটিতে এখানে এসেছি।
ঠাকুরানীঃ বেশ ভালোই করেছো।
শেলিনীঃ আচ্ছা ওই পাগলটা নাকি মারা গেছে ঠাকুরানী।
ঠাকুরানীঃ ওই লক্ষণ পাগল! হুমম গতবছর তুই চলে যাওয়ার মাস দুয়েক পরে মারা গেছে।
শেলিনীঃ কিভাবে মারা গেল রে?
ঠাকুরানীঃ আরে সে অনেক কাহিনী। তুমি শুনবে নাকি।
শেলিনীঃ হুমম, অবশ্যই। কেন নয়। যদি ভালো লাগে তাহলে গল্প হিসেবে লিখে ফেলবো।
ঠাকুরানীঃ তাহলে মন দিয়ে শোন।
ঠাকুরানী বলতে শুরু করলো..... রাস্তার পাশে বটগাছের সাথে শিকড়ের সাথে শিকলে বাঁধা থাকতো লক্ষণ পাগল। উশকোখুষকো লম্বা চুল, জটলা করা মুখের দাড়ি, পরনে পুরনো কাপড়। কেমন যেন দেখতে লাগতো লক্ষণ পাগলকে। ছোট ছেলেমেয়েরা লক্ষণ পাগলের কাছে যেতে ভয় পেত।অবশ্য লক্ষণ পাগল কখনো কাউকে ভয় দেখায় নি বা কাউকে কোন কিছু দিয়ে আঘাত কিংবা ঢিল ছোড়েনি। এই দিক থেকে লক্ষণ পাগল অনেক ভাল। তবে তাকে মুখ বিরবির করে সারাক্ষণ কি যেন বলতে শুনেছি। চেষ্টা করলেও তার কথার মানে বুঝতে পারি নি। তবে সে পরিচিত কাউকে দেখলে হেসে হেসে কথা বলতে চাই তো। কাছে ডাক তো। তবে তার কাছে কেউ যেতো না। লক্ষণের মা সময়মতো লোক দিয়ে খাবার দিয়ে যেতো। সময় মতো ঘরে নিয়ে যেতো। সৎ মা হওয়া সত্বেও তিনি লক্ষণের যথেষ্ট সেবা যত্ন করেছে। এজন্য গ্রামের মানুষ, পুরোহিত মহাশয় লক্ষণ পাগলের মাকে ভীষণ ভাবে সন্মান করতেন। সবাই বলাবলি করতেন সৎ মা হওয়া সত্বেও তিনি লক্ষণের সেবা যত্ন, দেখভাল করেন।
লক্ষণ পাগলের পুরো নাম শ্রী লক্ষণ ঠাকুর। শ্রী রাম ঠাকুরের পুত্র। লক্ষণ পাগলের যখন ৭-৮ বছর বয়স তখন তার মা মারা যায়। তখন থেকেই লক্ষণ পাগল অনেকটা একা হয়ে যায়। ঠিক খাঁচার মধ্যে আটকে থাকা পাখির মতো। জেলখানার কয়েদীর মতো। শুধু বাড়ির মধ্যে নিজের জীবন সীমাবদ্ধ। স্কুল ভালো লাগে না। খেলতে ভালো লাগে। এমনকি কারো সাথে কথা বলতেও চাই তো না লক্ষণ। তার আচরণ অনেকটা খিটখিটে হয়ে যায় মাতৃবিয়োগের জন্যে। লক্ষণ পাগল শুধু মায়ের ছবি দেখে দেখে কাঁদতো। আর বলতো মা তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে।
রাম ঠাকুর পুত্রের এমন অবস্থা দেখে পরিবারের অন্য সবার সাথে কথা বললেন। কীভাবে এই সমস্যার সঠিক সমাধান পাওয়া যায় সে বিষয়ে সবার কাছে জানতে চাইলো। রাম ঠাকুরের পিসিমা বললেন বাইরের কোন হোস্টেলে লক্ষণকে রাখলে অনেক ভালো হতো। তাতে করে ওর লেখাপড়াও ঠিকঠাক হবে। নতুন নতুন বন্ধুও হবে। আশাকরি লক্ষণ সেখানে অনেক ভালো থাকবে। পরিবারের আরও দুয়েকজন ভিন্ন মতামত পোষণ করলেও তিনি তার পিসিমায়ের কথাটির জোর দিলেন। এবং বললেন ঠিক আছে ওকে শহরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।
রাম ঠাকুরের ছিলো অনেক বড় ব্যবসা। বাজারে, মার্কেটে বড় দোকানগুলোই ছিলো তার। টাকা পয়সা, জমিজমার কোন কমতি ছিলো না রাম ঠাকুরের। মানুষ হিসেবে যে তিনি খারাপ ছিলেন সেটাও কিন্তু না।
লক্ষণ ঠাকুর তখন থেকেই হোস্টেলে থাকতো। বেশ ভালোই চলছিল তার জীবন। মাঝেমধ্যে গ্রামে এসে ঘুরে যেতো। ছাত্র হিসেবে লক্ষণ পাগল ছিলো বেশ ভাল। সে কখনও সেকেন্ড কিংবা থার্ড হয়নি। ক্লাসে সবসময় সে প্রথম হতো। এজন্য সে মোহনপুর স্কুল এন্ড কলেজে বেশ পরিচিত ছিলো। ক্লাসের সহপাঠীরা, শিক্ষক সবাই তাকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসতো। শুধু সে ক্লাসে নয় ক্লাসের বাইরে খেলাধুলা, নাচগান, এমনকি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সে ছিলো অন্যতম। মনে হয় সেই সব কিছুর রাজা। তার সাথে কেউ কোন কিছুতেই জয়ী হতে পারতো না। তবে মানুষ হিসেবে খুবই ভালো মনের ছিলো লক্ষণ পাগল। কখনো কারো সাথে মারামারি, ঝগড়াঝাটি, কথা কাটাকাটি করতো না।
সৎ মা হওয়া সত্বেও লক্ষণ সীতা দেবীকে খুবই ভালোবাসতো। যতবারই লক্ষণ শহর থেকে গ্রামে আসতো ঠিক ততবারই সে তার মায়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। সীতা দেবীও লক্ষণকে নিজের সন্তান হিসেবে দেখ তো। সীতা দেবী কখনো বুঝতে দেয়নি যে সে তার সৎ মা। সৎ মা আর ছেলের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো।
শেষ কয়েকবার লক্ষণ পাগলকে দেখে দেখে একটু অন্য রকম লেগেছিল। আগে যতবার তাকে দেখেছি তখন সেরকম লাগে নি। কিন্তু শেষ কয়েকবার যতবারই তার সাথে আমার দেখা হয়েছে ততবারই সে ফোনে কথা বলাই ব্যস্ত ছিল। আর আমি যতবারই পুকুর পাড়ে যেতাম ততবারই দেখতাম লক্ষণদা ফোনে কথা বলছে। তখনই আমার মনে হয়েছিল সে ডুবে গেছে। প্রেমের জলে ডুবে গেছে। প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। একবার তো আমি লক্ষণদাকে সাহস করে জিঙ্গেস করেছিলাম যে, প্রেমে পরেছেন নাকি? লক্ষণদা কিছু না বললেও আমার বুঝার বাকি ছিলো না।
মেয়েটির নাম ছিলো নাকি কৃষ্ণকুমারী। এইচএসসি বোর্ড পরীক্ষা দেওয়া শেষে করে শহর থেকে বাড়িতে আসার পথে নাকি তাদের দুজনের দেখা হয়েছিল। একই বাসে পাশাপাশি সিটে বসে এসেছিলো তারা। সেখান থেকেই কথাবার্তা, মোবাইল নাম্বার আদানপ্রদান। তারপর থেকেই কথাবার্তা শুরু। আমার যখনই তার সাথে দেখা হতো দেখতাম সে কথা বলছে। আবার যখনই পুকুর পাড়ে যেতাম তখনও দেখতাম লক্ষণদা মোবাইলে কথা বলছে।
এভাবে কেটে গেল দুই তিন মাস। এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হলেও সে শহরে না গিয়ে গ্রামের কলেজে অনার্সে ভর্তি হলো। ইতিমধ্যে গ্রামের মধ্যে তার অনেকগুলো বন্ধু জুটে গেল। যাদের সাথে আড্ডা, এটা সেটা করে, হইহুল্লোড় করে এখানে সেখানে যা ইচ্ছে তাই করতে লাগলো। মা মরে গিয়েছে বিধায় রাম ঠাকুরেও লক্ষণ পাগলকে কিছু বলতো না।এমনকি কখনো লক্ষণ পাগলকে জোর করে কোন কিছু করতে বলতেন না। যদি লক্ষণ পাগল এমনিতেই করতো তো ঠিক আছে। নইলে নাই।
কৃষ্ণকুমারীর গ্রামের বাড়ি ছিলো বিক্রমপুর। আমাদের পাশের গ্রাম। হেঁটে গেলে ত্রিশ মিনিটের মতো সময় লাগে। অবশ্য প্রাইমারী স্কুল মাঠে দাঁড়ালে বিক্রমপুর গ্রাম দেখা যায়। পাশের গ্রাম হওয়া বিধায় কৃষ্ণকুমারীর সাথে প্রায়ই লক্ষণ পাগলের দেখা হতো। প্রতিদিন বিকেল বেলায় লক্ষণ পাগলসহ কয়েকজন বন্ধু মিলে বিক্রমপুর প্রাইমারী স্কুল মাঠে আড্ডা দিতো তারা। এমন একদিনও বাদ পরেনি যে লক্ষণ পাগল বিক্রমপুর গ্রামে যায়নি। স্কুল মাঠের কাছেই ছিলো কৃষ্ণকুমারীদের বাড়ি। যখন লক্ষণ পাগল মাঠে বসে থাকতো তখন কৃষ্ণকুমারী নানান কিছুর বাহানায় মাঠে আসতো। কখনো দোকান থেকে এটাসেটা কিনে নিয়ে যেতো। আবার কখনো ছোট পিচ্চি বয়সের কাউকে নিয় হাটতে আসতো। যেদিন কৃষ্ণকুমারী মাঠে আসতো না ঠিক তার পরের দিন লক্ষণ পাগল কৃষ্ণকুমারীর কলেজের সামনে দাড়িয়ে থাকতো।

এভাবে রোজ রোজ থাকিয়ে থাকার কারণে, স্কুল মাঠে প্রায়ই ঘুরাঘুরি করার কারণে কৃষ্ণকুমারীর বড় ভাইয়ের বুঝতে আর বাকি রইলো না কেন প্রত্যেক দিন লক্ষণ পাগল সেখানে আসে। অবশ্য প্রতাপ (কৃষ্ণকুমারীর বড় ভাই) প্রথম কয়েকদিন লক্ষণ পাগলকে কিছু বলেননি। স্কুল মাঠের দোকানদাররা এবং কলেজের দুয়েকজন শিক্ষক বিষয়টি প্রতাপকে জানায়।এতে করে প্রতাপ অপমানিত বোধ করে। তারপর একদিন বিকেলে লক্ষণকে স্কুল মাঠে দেখতে পেয়ে প্রতাপ লক্ষণকে ডাকে এবং শাসন করে। স্কুল মাঠে আর যেন না আসে সেজন্য লক্ষণকে কড়া করে কথা বলেন। এতে করে লক্ষণ পাগল ও প্রতাপের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি ও রাগারাগি হয়। মাঠের মধ্যে থাকা বেশ কয়েকজন মানুষ এসে দুজনকে থামিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
তারপর বেশ কিছুদিন লক্ষণ পাগল ও কৃষ্ণকুমারীর মধ্যে কোন যোগাযোগ হয়নি। ওই দিনের পর থেকে প্রতাপ কৃষ্ণকুমারীর কাছে থাকা মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার পর থেকে কোন ভাবেই তাদের মধ্যে যোগাযোগ হচ্ছিল না। এতে করে লক্ষণ পাগল খুবই ভেঙে পরে। এবং নেশায় আসক্ত হয়ে পরে। শেষমেশ কোন খোঁজখবর না পেয়ে লক্ষণ পাগল আবার ঠিক আগের মতো প্রাইমারী স্কুল মাঠে এবং কলেজের আসে পাশে ঘুরাঘুরি করতে থাকে। কলেজের অন্য সহপাঠীদের দিয়ে কৃষ্ণকুমারীর কাছে খবর পাঠায়। এতে করে আবার দুজনের মধ্যে নতুন করে সম্পর্ক জোরা লাগে। এসময় তারা আসেপাশে দেখা না করে বিভিন্ন পার্কে এবং রেস্টুরেন্টে দেখা করতে শুরু করে।
লক্ষণ পাগলের নিজের মায়ের পেটের ভাই না থাকলেও তার সৎ ভাই ছিল। অবশ্য অশোকের (লক্ষণ পাগলের সৎ ভাই) সাথে লক্ষণ পাগলের তেমন একটা কথাবার্তা হতো না। কারণ অশোক ছিলো অনেকটা হিংসুটে। সে লক্ষণ পাগলকে মোটেই পছন্দ করতো না। সবসময় এড়িয়ে যেতো। কখনো লক্ষণের কোন কথার দাম দিতো না।
অশোক ছিলো লক্ষণ পাগলের বছর দুয়েক ছোট। ও একটা কথা বলা হয়নি রাম ঠাকুর কিন্তু দুই বিয়ে করেছিলেন।
এই দিদি ঘুমিয়ে পরলে নাকি?
শেলিনীঃ আরে না। তুই বলতে থাক।
ঠাকুরানীঃ ও, আমিতো ভাবলাম তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো।
শেলিনীঃ এমন এক রহস্য আর মজার প্রেমের ঘটনা না শুনে কি ঘুম আসে। তুই বলতে থাক। তবে মাঝেমধ্যে আমাকে একটু ডাকিস। হয়তো ঘুমিয়েও যেতে পারি।
ঠাকুরানীঃ আচ্ছা ঠিক আছে। শোনো....
অশোক ছিলো কৃষ্ণকুমারীর ক্লাসমেট। দুজনে একই বিভাগের ছাত্রছাত্রী ছিলো। এজন্য তাদের মধ্যে যোগাযোগ এবং বেশ ভালো বন্ধুত্বও ছিলো। কিন্তু কৃষ্ণকুমারী জানতো না যে অশোক আর লক্ষণ একে অপরের ভাই। বেশ ভালো বন্ধু হওয়ায় অশোক কৃষ্ণকুমারী আর লক্ষণের প্রেমের বিষয়টি জানতে পারে। এতে করে অশোক লক্ষণের ওপর অনেকটা ক্ষেপে যায়।বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি তার মায়ের কাছে জানায়। কারণ, অশোক কৃষ্ণকুমারীকে বেশ পছন্দ করতো এবং ভালোবাসতো। অবশ্য একথা কখনো কৃষ্ণকুমারীকে সে বলে নি।
লক্ষণ আর কৃষ্ণকুমারীর যোগাযোগটা নিয়মিত হওয়ার কারণে অশোক কথাটি কৃষ্ণকুমারীর ভাই প্রতাপকে জানায়। প্রত্যেক দিন কলেজ ফাঁকি দিয়ে তারা পার্কে পার্কে, রেস্টুরেন্টে সময় কাঁটায়। আরও অনেক কথা এদিকসেদিক বুঝিয়ে প্রতাপের কান ভারী করে ফেলে। এদিকে প্রতাপ অশোকের কথা শুনে রাগে ছটফট করতে থাকে। কৃষ্ণকুমারী কিছু না বুঝার আগেই তাকে ঘরবন্দী করে রাখে।
এদিকে অশোক তার পছন্দের কথা সীতা দেবীকে জানায়। সীতা দেবী যেন আকাশ থেকে পরে। চমকে গিয়ে বলে তোর কি মাথা ঠিক আছে। যে মেয়েকে তোর দাদা পছন্দ করে তুইও সেই মেয়েকে.....ছি ছি ছি!!!
অশোকঃ মা যদি কৃষ্ণকুমারীকে না পাই তাহলে কিন্তু অনেক বড় ঘটনা ঘটে যাবে।
আমার যাচ্ছে তাই করে ফেলবো। কথাটি মনে রেখো কিন্তু। কথা বলেই অশোক দ্রুত ঘর থেকে বাইরে চলে যায়।
এদিকে সীতা দেবী অশোককে ডাকতে থাকে। এই অশোক শোন। আমার কথা শুনে যা।
আবার পরপর কয়েকদিন কৃষ্ণকুমারীর সাথে লক্ষণের দেখা, কথাবার্তা না হওয়াতে লক্ষণ অনেক চিন্তায় পরে যায়। কি দিয়ে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। শুধু সিগারেট নিয়ে পুকুর পাড়ে বসে থাকতো। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর লক্ষণ কোন গতি না দেখে আবার প্রাইমারী স্কুল মাঠে যাওয়া আরম্ভ করলো। একদিন, দুইদিন এভাবে কয়েকদিন কেটে গেলেও লক্ষণ পাগল কৃষ্ণকুমারী কোন খোঁজখবর পাচ্ছিলো না। এজন্য একদিন কোনকিছুই না ভেবেই লক্ষণ কৃষ্ণকুমারীদের বাড়িতে গিয়ে কৃষ্ণকুমারীকো ডাকতে থাকে। কৃষ্ণকুমারী ঘরের মধ্যে বন্দী থাকায় লক্ষণ পাগলের ডাকে বাইরে আসতে পারেনি। এদিকে কোন উপায় না দেখে কৃষ্ণকুমারী মা হাত জোর করে অনুরোধ করে চলে যেতে। কেননা এই ঘটনাটি যদি প্রতাপের কানে পৌঁছায় তাহলে অনেক বড় ঘটনা ঘটে যাবে। কৃষ্ণকুমারীর মায়ের অনুরোধে লক্ষণ পাগল চলে আসে। কিন্তু পরবর্তীতে কৃষ্ণকুমারীদের আশেপাশের প্রতিবেশীরা ঘটনাটি জানায়। এবং বলে প্রতিবেশী হিসেবে আমাদেরও মান সন্মান আছে। এতে করে প্রতাপ আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এবং ওই দিন বিকেল বেলায় স্কুল মাঠে লক্ষণ পাগলকে দেখতে পাওয়ায় প্রতাপ আরও বেশি ক্ষেপে যায়। এবং বাড়িতে লোহার রড নিয়ে এলোপাথাড়ি লক্ষণ পাগলকে মারতে থাকে। রডের আঘাতে লক্ষণ পাগলের মাথা ফেটে যায় এবং প্রচন্ড রক্ত ক্ষরণ হতে থাকে। আশেপাশের লোকজন দেখতে পেয়ে প্রতাপকে বাঁধা দেয় এবং দ্রুত লক্ষণ পাগলকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আর লক্ষণ পাগলের বাড়িতে খবর পাঠায়।
ঘটনাটি শুনে সীতা দেবী রাম ঠাকুর দ্রুত হাসপাতালে চলে আসে। আর ভগবানের কাছে হাত তুলে কান্না করতে থাকে যাতে করে লক্ষণ পাগল বেঁচে যায়। এদিকে অশোক ঘটনাটি শুনে মনে মনে খুবই আনন্দিত হতে থাকে। আর বলতে থাকে মরলেই ভালো হতো তারাতারি চিতায় তুলে দিয়ে আসতাম। কোন ঝামেলা থাকতো না। এদিকে কৃষ্ণকুমারী ঘটনাটি শুনে কেঁদে কেঁদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কয়েকবার এভাবে জ্ঞান হারানোর কারনে কৃষ্ণকুমারী অসুস্থ হয়ে পরে। এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে।
কেটে যায় মাস দুই তিনেক। হাসপাতাল কতৃপক্ষ বলে দেয় লক্ষণ আর কোনদিন ভালো হবে না। মাথায় প্রচন্ড আঘাত লাগার কারনে সে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আর কোনদিনও সে স্বাভাবিক হবে না। আপনারা চাইলে নিয়ে যেতে পারেন।
মাস দুই তিনেক গায়েব থাকার পর প্রতাপও ফিরে এসেছে। কৃষ্ণকুমারীও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তবে সে কারও সাথে তেমন কথা বলে না। সবসময় একা একা থাকে। কলেজে যাওয়াটাও বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়ি থেকে বললেও সে কলেজে যায়না। আশেপাশের প্রতিবেশীরা বলতে শুরু করেছে ওকে বিয়ে দিয়ে দেন আসতে আসতে সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রতাপ আর কোনকিছু না ভেবে বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজছে।
বাড়িতে নিয়ে আসার পর লক্ষণদার আচরণের মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা দেয়। সবসময় লাফাতে থাকে। আবার কখনো কখনো একদম শান্ত হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো জোরে গান গাইতে থাকে। আবার কখনো মাটিতে কি যেন লিখতে থাকে। এরকম নানা ঘটনার কারনে বাড়ির লোকজন অতিষ্ট হয়ে পরে। অবশ্য ঔষধ খাওয়ালে কিছু সময়ের জন্য লক্ষণদা ভালো থাকলেও আবার নতুন করে শুরু করতো তার পাগলামি। এজন্য বেশ কয়েকবার অশোক লক্ষণদাকে মেরেছেও।
বেশকিছুদিন পর দেখি লক্ষণদাকে বাড়ির সামনে ওই বটগাছের সাথে লোহার শিকলে বেঁধে রেখেছে। তারপর থেকেই যারা সামনে দিয়ে যেতো তারাই বলতো লক্ষণ পাগল। সেদিনের পর থেকেই লক্ষণদার নাম হয় লক্ষণ পাগল। গ্রামের ছোট বড় সকলেই তাকে লক্ষণ পাগল বলে ডাক তো।
রাম ঠাকুর সেদিন ব্যবসার উদ্দেশ্য অন্যত্র চলে গেছেন। সারারাত সেদিন প্রবল বর্ষণ আর ঝড়ে বাড়ির বাইরে কেউ বের হয়নি। খুবই ভোরে হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে সবার। আমিও হঠাৎ এমন কোলাহলে তারাতারি বিছানা ছেড়ে উঠে পরি। আম্মুকে জিঙ্গেস করলে সে নিজেও কিছু জানে না বলে আমাকে জানায়। আমি আবার জিঙ্গেস করি তাহলে এতো মানুষের আওয়াজ কেন। আম্মু বলে বাড়ির ভেতর না থেকে বাইরে গিয়ে দেখ কি হয়েছে? আমি আর যাদব বাড়ির বাইরে যাই। দেখি অনেক মানুষ লক্ষণদারদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আর কানাকানি করে কথা বলছে। আমি আর যাদব আর দেরি না করে তারাতারি দ্রুত হেটে যাচ্ছি। যাওয়ার পথে কেউ একজন বলে উঠলো সীতা দেবী এমন একটা কাজ করবে এট ভাবা যায় না। একজন মা হয়ে সে এরকম করতে পারলো। রহস্য যেন তখন আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আমার প্রচন্ড জানতে ইচ্ছে করছে কি এমন ঘটেছে? আমি যাদবকে বলি তারাতারি হাটতে পারিস না।
লক্ষণদাদের বাড়ির সামনে বটগাছের একটু দূরে থাকতেই দেখি অনেক মানুষের জটলা বেধে আছে। সবাই কি যেন দেখছে। ছোট ছেলেমেয়েসহ সব বয়সের মানুষের ভিড়। আমি তারাতারি এসে দাঁড়ায়। কিন্তু অনেক মানুষের কারনে সামনে কি হয়েছে দেখতে পাচ্ছি না। তবুও ঠেলেঠুলে সামনে যেতেই বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে। এক নিমিষেই গলাটা শুকিয়ে গেল। পিপাসায় ভেতরটা যেন হাউমাউ করে কাঁদছে। পলকেই মুখের ভাষাগুলো স্তব্ধ হয়ে গেছে। থমকে দাড়িয়ে শুধু তাকিয়েই রয়েছি। হঠাৎই চোখের কোণে অশ্রুজলের আবির্ভাব। চোখের পাতা নড়তেই অশ্রুসজল ভিজিয়ে দিল। মনকে কোনভাবেই সান্ত্বনা দিতে পারছিলাম না যে লক্ষণ পাগল আর নেই। চিরতরের জন্য দেহত্যাগ করেছে। শিকলে বাঁধা থাকা শব্দগুলো আর শুনতে পারবো না। আজ থেকে আর কেউ লক্ষণ পাগল বলে আর ডাকবে না। তাকে নিয়ে কেউ আর হাসিঠাট্টাও করবে না। তবে মাটিতে কি যেন লিখে গেছে সে। মনে হয় বৃষ্টি একদম থেমে যাওয়ার পর লেখা হয়েছে। আবার অনেকগুলো পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মনে ধস্তাধস্তি করে ফেলে দিয়ে গেছে। মাটিতে লেখা রয়েছে মা শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে...। এরপর আর কিছু লেখা নেই। লেখাটি দেখেই সবাই সন্দেহ করছে নিশ্চয়ই সম্পত্তির লোভে লক্ষণকে মেরে ফেলেছে তাী সৎ মা। কারণ, তার তো এক ছেলে আছে। লক্ষণ না থাকলে সমস্ত সম্পদের মালিক হবে সে। তাই পথের কাটা উপড়ে ফেলেছে। সন্দেহ হওয়ার আরেকটি কারণ আছে। লক্ষণদার বাম হাতে শাড়ির আঁচল ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো আছে। আর তাছাড়া লক্ষণদার গলায় লোহার শিকলের দাগ রয়েছে। সবাই মনে করছে লক্ষণকে পরানো শিকল দিয়েই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। যত দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে তত মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। মানুষের কানাকানিও ততটা বেড়েছে।
আশেপাশের গ্রামের মানুষজন আসলেও তখন অবধি সীতা দেবী এমনকি অশোক একবারের জন্যেও আসেনি। এজন্য সন্দেহটা আরও বেশি মনে হচ্ছে। সবাই বলাবলি করছিলো সীতা দেবী যদি এরকম কাজ নাই করে থাকে তবে কেন এখনো আসেনি। নিশ্চয়ই কোন গন্ডগোল আছে।
ইতিমধ্যে মৃত্যুর খবরটা রাম ঠাকুরের কাছে পৌঁছে গেছে। রাম ঠাকুরের পরিবারের আত্মীয় স্বজনেরা আসতে শুরু করেছে। সমস্ত গ্রামে যেন মানুষের মেলা বসে গেছে। আগে কখনো এত মানুষের ভিড় দেখিনি। রাম ঠাকুর এসেই লক্ষণ পাগলকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। রক্তের টান, পিতৃত্ের সম্পর্ক আসলে বড়ই কঠিন সম্পর্ক। না দেখলে বুঝতে পারতাম না।
পুলিশ আসলো। লাশ দেখে বললো নিজে নিজেই মরে গেছে। পাগল ছিলো হয়তো গলার সাথে পেঁচিয়ে নিজে নিজেই......। পুলিশ অনুমতি দিয়ে গেল আপনারা আপনাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। তখন আর সবার বুঝতে বাকি রইলো না কি ঘটেছে। কিন্তু দেখা ছাড়া কারোরই কিছু করার ছিলো না। আমিও সবার মতোই নিশ্চুপ দর্শক। হাহুতাশ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। যার ছেলে যার সন্তান সে যদি নিজের চোখে সবকিছু দেখে চুপ থাকতে পারে তাহলে গ্রামবাসী পারবে না কেন।
হিন্দু রীতিনীতি মতো সকল কাজ সম্পন্ন করা হলো। সমস্ত গ্রাম যেন শোকে স্তব্ধ। সবাই এখানে সেখানে শুধু বলাবলি করতো। মা হয়ে এমন কাজ করতে পারলো।
কৃষ্ণকুমারী যে খবরটি পায়নি তা কিন্তু নয়। সে নিজেও খবর পেয়েছিল। কিন্তু আসেনি। শুনেছি বাড়ি থেকে আসতে দেয়নি।
মাসখানেক পর গ্রাম ঠান্ডা হলে অশোকের বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। সমস্ত বাড়ি লাল নীল বাতি দিয়ে সাজানো হলো। আত্মীয় স্বজনের আনাগোণায় রাম ঠাকুরের বাড়ি আবার পুনরুজ্জীবন ফিরে পায়। কিন্তু তখন একটি কথা ব্যাপক ভাবে প্রচার হতে থাকে যে যার সাথে অশোকের বিয়ে ঠিক করা হয়েছে সে নাকি কৃষ্ণকুমারী। সবাই কানাঘুষো করছে যে সৎ ছেলেকে মেরে নিজের ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছে। ছি ছি ছি!!! এই মহিলা কিভাবে মা হতে পারে। তাছাড়া যে পুলিশ ময়নাতদন্ত করতে আসছিলো সে নাকি সীতা দেবীর ভাইপো।
(হু হু শব্দ)। কিরে দিদি কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন?
শেলিনীঃ তেমন কিছু না রে।
ঠাকুরানীঃ তাহলে যে........
শেলিনীঃ এমনিতেই চোখে জল এসে গেল। আসলে কথা গুলো শুনে ঠিক থাকতে পারলাম না।
ঠাকুরানীঃ আমার জীবনে এই ২০১২ সালের ঘটনাটি অন্যতম। সারাজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে। জানিস দিদি, মাঝেমধ্যে লক্ষণদার কথা মনে পরলে অনেক খারাপ লাগে। এরকম একটা নিষ্পাপ প্রাণ এভাবে অকাতরে ঝরে গেল।
শেলিনীঃ (স্বাভাবিক হয়ে) তবে যাই হোক। একটি বাস্তবধর্মী প্রেমের গল্প পেলাম। আমি গল্প আকারে আমার নীল ডায়েরিতে উপস্থাপন করবো। আর নতুন করে নাম দেব "ভ্যালেন্টাইনঃ ২০১২ সালের ঘটনা"।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement