জীবন যুদ্ধে টিকে থাকা কোন একজন মায়ের কষ্টের দিনগুলি তুলে ধরা হয়েছে এই গল্পে ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ জুন ১৯৯৪
গল্প/কবিতা: ৯টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মা (মে ২০১৯)

আমার মা
মা

সংখ্যা

আইরিন

comment ৫  favorite ০  import_contacts ১৫৬
আমার মা, ১২ বছর বয়সেই তার বিয়ে হয় ।তখনকার আমলে নাকি পরিবহন ব্যাবস্থা তেমন ভালো ছিলনা । ৩ মাইলের পথ ৪০ টাকা ভাড়ায় গরুর গাড়িতে করে সে শ্বশুরবাড়িতে আসে । তার শ্বশুরবাড়ি আসার পেছনের ঘটনাটাও বিভ্রান্তিকর । আমার মায়ের বয়স যখন ১২ ছুই ছুই ঠিক তখনই বনেদী ঘর থেকে তার বিয়ে আসতো। আমার নানা ছিলেন সে আমলের একজন সরকারি প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ছিলেন। তিনি ন্যায় ও নিতিবান লোক ছিলেন বলেই মায়ের ভালো ঘর থেকে সম্মন্ধ আসতো। আর যখন আমার দাদার বাড়ির পক্ষ থেকে আমার মাকে ঘরে তোলার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়, তখন রীতিমতো অপমানিত হতে হয় তাদের। লোকে ঠাট্টা করে বলতো অমন ঘরের মেয়েকে কি কেও কখনো এমন ঘরে বিয়ে দিতে চায় ? ওই ঠাট্টাকে ত্রিশুল হিসাবে বুক পেতে নিয়েছিলেন আমার দাদা । আমার মাকে এ বাড়িতে নিয়ে আসা যেন তার এক প্রকারের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ।
যেই কথা, সেই কাজ । একদিন আমার নানাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিলো । আমার নানা যেদিন দাদার বাড়িতে আসে , সেদিন অজানা আশঙ্কায় ভুগেছিল আমার নানী। হাজার হলেও মায়ের মন বলে কথা । সেকালের নিয়ম অনুযায়ী কি হয়েছিলো ঠিক বলতে পারবোনা তবে মাকে ছারাই মায়ের বিয়ের কাবিন হয়ে গিয়েছিলো। মলিন মুখখানা নিয়ে নানা যখন বাড়ি ফিরেছিল, সবার আশঙ্কাই সত্যি বলে প্রমানিত হল।
আমার মা একজন সুন্দরি মহিলা, তবে পৃথিবীতে সব মানুষের কাছেই সবার মা সুন্দরীই হয়ে থাকে। তিনি ছোটবেলা থেকে এমন স্বামী প্রত্যাশা করতেন যে, সে একজন সৎচরিত্রবান এবং ধার্মিক হবে। নানাবাড়ির পরিবার অনেক বড় ছিল বিধায় সারাক্ষন বাড়িতে হইচই লেগেই থাকতো। বিশাল এক জমিদার বাড়িতেই মায়েরা থাকতেন । যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো তখন কোন এক হিন্দু জমিদার তার জমিদার বাড়ি খুব কম দামে নানার কাছে বিক্রি করে ভারতে চলে যান।
বাড়ির ফাঁক ফোঁকরে কোন ঠাসা শোনা গেল আমার দাদার বাড়ির কথা। আমার বাবার সমন্ধে ওই সময় ভালো কোন কথাই আমার মায়ের কান পর্যন্ত ঠেকলোনা। এই বিষয়টা নিয়ে আমার মা চিন্তিত ছিলেন, এবং ওই সময় তার সব চেয়ে অভিমান হয়েছিলো আমার নানার উপর । এই ঘরোয়া সমাজ সংসারে ওইটুকু মেয়ের অভিমানের প্রাধান্য কারও কাছে ছিলোনা বললেই চলে, যদিওবা আমার নানা আমার মাকে খুব ভালবাসতেন ।বিয়ের পর দীর্ঘদিন যাবত মা নানার বাড়িতেই ছিল । বিয়ের পর কোন মেয়ে অধিক সময় বাপের বাড়ি থাকলে তাকে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়, সেই কারনে মা দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিষণ্ণ থাকতেন ।
প্রায় এক বছর পর কোন এক কারনবশত আমার বাবা আমার ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে মায়ের কোন এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হয় । আমার ফুফুর বাড়ি আর আমার নানার বাড়ি একই এলাকাতেই থাকার কারনে লোকজন কানাকানি করতে থাকলো, নতুন জামাই গ্রামে আসলো কেউতো খোজই নিলো না। নানা তখন বাধ্য হয়ে আমার দুই মামাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলো বাবাকে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য।বাবা আসার পরে মা বাবার সামনে এসেছিলো একবার। বাপের বাড়ির লোকের উপর অভিমান করে মা ওইদিনই বাবাকে বলেছিল ‘আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবে কবে?’। প্রতিউত্তরে বাবা বলেছিলো ‘ বাড়িতে গিয়ে আলাপ আলোচনা করে তোমাকে নিতে আসবো’ ।একথা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় কতটা অভিমানি ছিলো আমার মা, তা না হলে নতুন বউ কখনও তার স্বামীকে প্রথম দেখায় এ কথা বলার সাহস পেতনা।
কিছুদিন পর মাকে দাদার বাড়ি থেকে নিতে আসলো। শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে না দিতেই আমার দাদা মাকে বলেছিলো – ‘ শোন মেয়ে – তোমার বাপের বাড়ির লোক আমাদের পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করতে চায়নি, আমরা গরিব বলে। তোমার বাপের বারির লোকজন সম্পত্তি চেনে, আমাদের চেনেনা । তাই আজ থেকে তোমার সাথে আমাদের গৃহযুদ্ধ শুরু’ । আজ পর্যন্ত কোন শ্বশুর তার বউমার উদ্দেশে এমন কোন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে কিনা আমার জানা নেই ।একটা ১২ বছর বয়সী কোন মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার পর কোন প্রকার কারও সাহায্য সহযোগিতা না পেয়ে অসহায়ত্ব নিয়ে দিন কাটাতে শুরু করে, অনেক বড় পরিবার ছিল আমার দাদার বাড়িতে। ৬ ভাই ২ বোন ছিলো বাবারা, বাড়ির রাখাল, কাজের লোক সহ অনেক বড় গৃহস্থ পরিবার। প্রতিদিন অনেক রান্না-বান্না ছাড়াও নানা ধরেনের কাজ করতে হতো, এছারা বছরব্যাপী নানা ফসল ঘরে আসতো, সেগুলোর কাজ করতে হতো। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়া তার জন্য অনেক কষ্টকর ছিলো । আমার বাবা ওই সময় বেকার ছিলো বলে , মায়ের পাশে দাড়াতে পারতোনা এবং আমার দাদির নানা ধরনের কুমন্ত্রনার শিকার হয়ে হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে মাকে অবহেলা করতে শুরু করলেন। একজন নারীর শ্বশুরবাড়িতে সবচেয়ে আপন যে মানুষটি সেই মানুষটি হলো তার স্বামী।যার হাত ধরে নতুন পরিচয়ে, নতুন পরিবেশে আসা।যাকে কিনা জিবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাশে পাওয়ার আশায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। সেই স্বামী যখন আসামীতে পরিনত হয় সেই মেয়ের জিবনে দুর্দিন নেমে আসে। মায়ের জিবনেও তেমনি অন্ধকার নেমে আসে। সে প্রায়ই নিজের অসহায়ত্বকে মেনে নিতে না পেরে গভীর রাতে কান্না করতো । সারাদিনের কাজ শেষে তিন বেলা খেতেও পারতোনা ঠিকমতো।

এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলো, বাবার বেকারত্বকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে আমার দাদা একদিন মা আর বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো ।আমার নানীর সহায়তায় আমার মা থাকার জন্য একটা জমি কিনেছিলে, যেখানে একখানা কুরেঘর বানিয়ে থাকতে শুরু করলেন, আর বাবা তখন জিবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় রওয়ানা হলো, তখনও আমার জন্ম হয়নি। আমার মা, আর বড় বোন বাড়িতে একা থাকতেন। বাবা ঠিকমত খোজ খবর নিতেন না, বাসায় আসতেন না , টাকা পয়সা পাঠাতেন না, দুঃখ দারিদ্র্যের মদ্ধে দিয়ে তিনি প্রতিটা দিন পার করতেন।ওইটুকু বয়সে ঘরে এসে স্বামীর অবহেলা, শ্বশুর শাশুড়ির যন্ত্রণা কাটিয়ে তার টিকে থাকার লড়াইয়ে সে যে এখনও টিকে আছে তার জন্য তাকে আমি স্যালুট জানাই।
এই অভাব অনটনের মদ্ধেই এক সময় আমি জন্ম নেই। ছোটবেলা থেকে আমিও এই পরিবেশে বড় হতে হতে দাদা বাড়ির লোকদের ঘৃণা করতে শুরু করি । তবে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে আমার জন্মের পর থেকে আমার বাবার আমার প্রতি এক অগাধ মায়া তৈরি হয়, যেটা কিনা এত বছরেও তার পরিবারের প্রতি তৈরি হয়নি ।আমিই হয়ে উঠি তার চোখের মণি। সেই সুবাদে তার ঘরের প্রতি মনোযোগ আসে, খোঁজ খবর নিতে থাকে নিয়মত ।আমার বাবা সৎ ছিলেন , তার কোন মানুষের সাথে কোনদিন ঝগড়া বিবাদ লাগেনি।আশেপাশে দশ গ্রামের লোক তার নাম শুনলে চিনতো, সুনামও ছিলো গ্রামে গ্রামে ।কিন্তু তিনি একটা জায়গায়ই অন্যায় করে গেছেন সবসময়, সেটা আমার মায়ের প্রতি ।
একটা সময় পর বাবা আর মায়ের মধ্যে খুব ঝগড়া হতো । ঝগড়ার মুল কারন ছিলো ভালোবাসা । মা বাবাকে খুব ভালোবাসতো, আর বাবা মাকে অবহেলা করতো , অবহেলা মেনে নিতে না পেরে একসময় মায়ের আচরন ভয়ংকর রুপে রুপ নিলো ।কোথাও একটা বইতে পড়েছিলাম ‘ প্রিয়জনের অভাবে মানুষ রুক্ষ হতে থাকে’ ।মায়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমনি হলো । আমার বয়স যখন ২২ , আপুর বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের কিছুদিন পরে ওর পরিবারেও অশান্তি শুরু হলো। একসময় ওকে আব্বু শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে এলো। এভাবেই চলছিলো আমাদের সংসার ।
আমার পড়াশোনা শেষ হতে যখন আরও ২ বছর বাকি , এমন সময় আব্বুর স্ট্রোক হলো, সেই অসময়েও আত্মীয় স্বজন কাওকেই তেমন পাশে পাইনি, প্রিয়জন হারানোর ভয়ে দিনের পর দিন কত আহাজারি , আল্লাহের কাছে কত প্রার্থনা করেছি বাবাকে ফিরে পাওয়ার জন্য । কিন্তু না, এক সময় বাবা সকল মায়া মমতা ছিন্ন করে পরকালে পাড়ি জমালো ।আমার চোখ জুড়ে নেমে এলো অন্ধকার ।
আমার মায়ের জন্য কোন সান্ত্বনাই ছিলোনা আমার কাছে ওইদিন । মারা যাওয়ার পরের দিন জানতে পারলাম বাবা নাকি আরও একটা বিয়ে করেছিলেন গোপনে, পাশের বাড়ির এক চাচি আমাকে গোপনে ডেকে বলেছিলো বিষয়টা। শোনা মাত্রই বুকের মদ্ধে এক ধরনের চিনচিনে বাথা অনুভব করেছিলাম । কথাটা নানাভাবে লুকানোর চেষ্টা করে ব্যার্থহয়েছিলাম, কারন ততক্ষনে ওই মহিলা বাসায় এসে হাজির । মা সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলো, সেদিন বুঝতে পেরেছিলো সারাটাজীবন সে কেন স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলো ।সেই ছোট বয়সেই সে বাপের বাড়ি ফিরে যেতে পারতো, সমস্ত প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে টিকে ছিলো একটা সম্পর্কের বাঁধনে, সেই বাঁধনটাই যে এতটা ঠুনকো ছিলো সে বুঝতে পারেনি, আন্দাজ করেছিলো মাত্র । সেই আন্দাজটা যে এতটা কঠিন ভাবে ধরা দিবে সে ভাবতেই পারেনি ।
বাবা মারা যাওয়ার পর দাদার পরিবার থেকে অনেক কথা শুনতে হয় মাকে ।আমাদের ৩ জনকে গ্রাম ছাড়া করতে অনেক অকথ্য কথাও ছরায় তারা । আমার মা একজন ধৈর্যশীল মানুষ, সে আজও কাদে নিরবে, আড়ালে।সে আজও আমাদের ২ জনকে তার কোমল আশ্রয়ে নিয়ে সান্ত্বনা দেয় ।তার জিবনের গল্প এত করুন তবুও সে আমাদের পাশে ছায়ার মত দাড়িয়ে আছে কত মমতায় । অনেক ভালোবাসি তোমাকে মা ।তোমার কষ্ট আমি কোনদিনও লাঘব করতে পারবোনা , আমি জানি কোন সান্ত্বনাই তোমার মনকে সান্ত্বনা দিতে পারবেনা, আর তোমার ক্ষত জায়গাটার ঘা কোনদিনও সারবেনা। তবে আল্লাহের কাছে প্রার্থনা সে যেন তোমাকে পরকালে সুখ দেয়, শান্তি দেয় ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রণতূর্য ২
    রণতূর্য ২ মায়ের প্রতি আপনার ভালোবাসা অনুকরণীয়। শুভকামনা রইল।আমার কবিতায় আমন্ত্রণ রইল।মন্তব্য জানালে অনুপ্রানিত হব।
  • সেলিনা ইসলাম
    সেলিনা ইসলাম মায়েরা কষ্ট করেই বলেই হয়ত সন্তান কিছুটা হলেও শান্তির ছায়া পায়। অদৃশ্য পর্বত পাড়ি দেয়া এক মায়ের কাহিনী মনের মাঝে ক্ষত তৈরি করল। পৃথিবীর সব মায়েদের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা যেন সৃষ্টিকর্তা দেন সেই দোয়া ও কামনা। শুভকামনা রইল।
  • মোঃ মাসুদ রানা
    মোঃ মাসুদ রানা দোয়া রইলো, এরকম হাজারো ঘটনা এখানো পাওয়া যায়। পৃথিবীর মানুষগুলো ধীরেধীরে ভালোবাসাহীন হয়ে পরেছে। আমার পাতায় আমন্ত্রণ রইলো।
  • বাসু  দেব নাথ
    বাসু দেব নাথ এবারের সংখ্যায় মা কে নিয়ে সব লেখায় যেন ভালো লাগছে। কিছু সত্য তুলে ধরলেন। ভালো লাগলো
  • রওনক নূর
    রওনক নূর অাল্লাহ্ মায়ের সব যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিক। অামিন।

advertisement