সবকিছু জোড়া লাগানো গেলেও ভাঙ্গা মন জোড়া লাগে না । সেতু আর রঞ্জন এই দুটি বালক বালিকা মুক্তিযুদ্ধের সময় খেলাচ্ছলে এত কাছাকাছি এসেছিল যে অজান্তে দুজনের মধ্যে নিস্পাপ প্রেমের সঞ্চার হয়েছিল । যুদ্ধশেষে সেতুরা বাংলাদেশে চলে যায় । রঞ্জনের দিনের আলো নিভে যায় । ঘটনাপ্রবাহ দুজনকে আবার কাছাকাছি এনে দিয়েছিল ,তখন সেতু পূর্ণ যুবতী । সেতুর বিয়ে হয়ে যায় সেদেশে ।রঞ্জনের মন ভেঙ্গে যায় । তার পৃথিবীর আলো উধাও হয়ে যায় । অনেকদিন পর খবর আসে সেতুর বর বিদেশে মারা গেছে । রঞ্জন চায় সেতুর সঙ্গে যেন আর দেখা না হয় । কিন্তু দেখা হয়ে যায় । মেঘনা ডাকাতিয়ার মোহনায় ক্রন্দনরত সেতুর মুখ তুলে ধরে রঞ্জন দিশেহারা হয়ে যায় । সেতুর ভাঙ্গা মনের গভীর থেকে উৎসারিত গোঙানির শব্দ মেঘনার উত্তাল তরঙ্গমালার শব্দকে ছাপিয়ে রঞ্জনের মনকে উথালপাথাল করে দেয় । দুটি ভাঙ্গা হৃদয় এখন কী করবে ?
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৬২
গল্প/কবিতা: ১১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভাঙ্গা মন (নভেম্বর ২০১৯)

সেতু
ভাঙ্গা মন

সংখ্যা

ARJUN SARMA

comment ৬  favorite ০  import_contacts ৬৪
‘মেঘনা-ডাকাতিয়ার মোহনায় প্রবল ঘূর্ণাবর্ত, সাবধানে নৌযান চালান’-এই সতর্কবার্তা হোর্ডিং-এ বারবার পড়েছে রঞ্জন । মোহনা থেকে সরে এসে মেঘনার রূপ দেখছে । জলের উত্তাল রূপ দেখে হোর্ডিং-এর কথার সত্যতা অনুমান করতে পারছে । মেঘনার রূপ তার কাছে অবর্ণ্নীয় । সে আত্মহারা । তাকিয়ে আছে কূলহীন মেঘনার বুকে । উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে জেলে পরিবার কেমন অবলীলায় ছোট্ট ডিঙ্গি বেয়ে চলে যাচ্ছে তা তার বোধের অগম্য । অগণিত যাত্রীবোঝাই লঞ্চের যাওয়া আসা দেখে সে বিস্মিত । মনে হচ্ছে এই বুঝি গেল ডুবে ! কিন্তু এই আনন্দ ,বিস্ময় সে প্রকাশ করতে পারছে না । ঘন্টাখানেক আগেও কেমন উচ্ছল ছিল সেতু । প্রাণের কণা যেন টগবগিয়ে ফুটছিল তার মধুময় বুলিতে । এখন সে মৌনতায় মগ্ন । মেঘনার গর্জনই শুধু বাস্তব । গতকাল রাতেও বলেছিল,তোকে মেঘনার পারে নিয়ে যাব । জানিস তো তোদের ব্রহ্মপুত্র নদ আমাদের দেশে হয়েছে মেঘনা নদী । উপরে পুং লিঙ্গ , নীচে স্ত্রী লিঙ্গ ! অথচ এখন সেতু হাঁটুর উপর থুতনি রেখে পলকহীনভাবে চেয়ে আছে মেঘনার ঘূর্ণির দিকে । সেতুর মনের ঘূর্ণাবর্তের খোঁজ রঞ্জনের কাছে অধরা ।
বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেও প্রাণবন্ত ছিল সেতু । বলছিল,রঞ্জন, কাল তো চলেই যাবি। চল তোকে মেহেরেশ্বরী কালীবাড়ি আর মেঘনা দেখিয়ে আনি । বাড়ি বলতে চারপাশের অসংখ্য মুসলিম বাড়ির মাঝে সেতুদের একমাত্র হিন্দুবাড়ি। খানকয়েক পরিবার,দুতিনটে উঠোন গায়ে গায়ে । গ্রামে ঢোকার মুখেই হোর্ডিং-এ লেখা আছে ,আদর্শ ইছাপুরা,থানা-শাহরস্তি,জেলা-চাঁদপুর ।
সেতুর বাবা রঞ্জনের দূর সম্পর্কের দাদু । এখন রিটায়ার্ড । গতবার যখন রঞ্জন এসেছিল তখনও মাস্টারি চাকুরীটা ছিল । মুক্তিযুদ্ধের সময় দাদুরা যখন রঞ্জনদের বাড়িতে ছিল তখন সবাই সেতুর বাবাকে ‘সুন্দরদাদু’ বলে ডাকতো ।দাদুর ছিল দুধে-আলতা রঙের শরীর । খুব উদার প্রকৃতির লোক ছিলেন । সেবার দিদাও ছিলেন । এবার নেই ,পরপারে ।
কালীবাড়িতে এসে সেতু রঞ্জনের হাত ধরে তাকে রিক্সা থেকে নামতে সাহায্য করে । রঞ্জনের গায়ে শিহরণ লাগে । সে ভাবতেই পারে নি সেতু তার হাত ধরবে । সেতুর চোখেমুখে যেন বাঁধনহারা পুলক । মন্দিরে কোন কালীমূর্ত্তি নেই । সেতু বলছিল ,জানিস তো এটা সর্বানন্দ ঠাকুরের সাধনপীঠ । তিনি নাকি আজ থেকে সাত আট শত বছর আগে এখানে দশমহাবিদ্যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন ।তাকে দর্শন দিয়েই মা অন্তর্হিত হন । তাই এখানে সাকার পুজা হয় না । মায়ের উদ্দেশে প্রতিদিন পুজা হয় বট অশ্বত্থ গাছের সমন্বিত বেদিতে । রঞ্জন খেয়াল করে দেখল,সত্যিই বট আর অশ্বত্থ গাছ যেন জড়াজড়ি করে আছে ,সেতু আরও বলেছিল ,পৌষ সংক্রান্তিতে এখানে সপ্তাহ ধরে মেলা হয় । শুধু দিনের বেলা পুজা হয় ,রাতের বেলা হয় না । রঞ্জন সেতুর হাতখানা তখন থেকেই শক্ত করে ধরে রাখে । পাথরের বেদির উপরে বট অশ্বত্থের যুগল শাখায় অসংখ্য রঙিন সুতো বাঁধা । সেতু বলেছিল , যে যা কামনা করে সুতো বাঁধে ,তাই পূর্ণ ফলে যায় । রঞ্জন বলেছিল , চল সেতু আমরাও সুতো বাঁধি । মুহূর্তেই সেতু স্থির হয়ে দাঁড়াল । রঞ্জনের চোখে চোখ রেখে অপলক চেয়ে থাকে । রঞ্জন হতবিহ্বল হয়ে যায় । একটু বাদেই হাতের মুঠো আলগা হয়ে গেল । সেতু চুপ হয়ে গেল । ভয়ে রঞ্জন আর কিছু বলতে সাহস করে নি ।
ডাকাতিয়া নদীটা কোথা থেকে যেন দুম করে এসে পরেছে মেঘনার বুকে । তারপর একাত্ম হয়ে ছুটছে সাগরে । মেঘনার বুকে লাফিয়ে ওঠা ঢেউয়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ডিঙ্গির মতো রঞ্জনও হারিয়ে যায় বিগত কুড়ি বছরের ঘটনাক্রমে - - - - - - -।
ঊনিশশো একাত্তর সাল । ক্লাশ সেভেনে পড়ে সে । নসুদার টংদোকানে প্রতিদিন খবর শুনত বাবা ,জেঠু , হারু কাকারা । একদিন শুনল পাকিস্তানি সেনা অতর্কিতে ঢাকার বুকে আক্রমণ করেছে । শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে । নসুদা বাবাকে বলল , কাকা, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল । বাঙালির উপর বর্বর ইয়াহিয়া আর ভুট্টো বাহিনির পাশবিক অত্যাচার শুরু হল বলে । বিবিসির নিউজ শোনার জন্য নসুদার দোকানে প্রতিদিন ভিড় বাড়ে । একদিন গ্রামের অসংখ্য লোক দত্তপাড়ার দক্ষিণে বিশাল আম-কাঁঠালের বাগানে সমবেত হয়েছে । সেখান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আর ইণ্ডিয়ার সীমানা পঞ্চাশ মিটারের বেশি হবে না । ইণ্ডিয়া সরকার বর্ডার খুলে দিয়েছে । রঞ্জনরা দেখল হাজার হাজার মানুষ বর্ডার পেরিয়ে কাতারে কাতারে চলে আসছে তাদের গ্রামে । ছোটো শিশু ,বৃদ্ধ,বৃদ্ধা,বউ ,ঝি দলে দলে সীমানা পার হয়ে আসছে । সবার হাতে, মাথায় , কাঁধে পুঁটুলি । কেউ কাঁদতে কাঁদতে আসছে , কারও চোখে মুখে আতংক ,কারও চোখে বিস্ময় । এসেই যে যেখানে পারে আস্তানা গেড়ে বসে যাচ্ছে । যাদের আত্মীয় আছে তারা সেই বাড়িতে ,অন্যরা কেউ গাছতলায় , কেউ জঙ্গল কেটে বসে গেল জান বাঁচাতে ,মান বাঁচাতে । ধনী গরিব , মানী সাধারণ ,বামুন জেলে কোন ভেদাভেদ নেই । সব পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে গেছে । যুদ্ধ সবাইকে সমান করে দিয়েছে । মা’র দূর সম্পর্কের কাকারা দুই ভাই সপরিবারে উঠেছে রঞ্জনদের বাড়িতে । বাবা বলেছে , আমরা যা খাই আপনারাও তাই খাবেন । আর উপোস করলে একসঙ্গে করব । দুই দাদুর মধ্যে বড়োজন মাস্টার । রঞ্জনরা ডাকত ‘সুন্দরদাদু’ বলে । ছোটোদাদু খুব দিলদরিয়া আর হাসিখুশি প্রকৃতির । তার এক ছেলে , নাম সুভম । বয়স নয় কি দশ । সুন্দরদাদুর এক ছেলে ও এক মেয়ে । মেয়েটির নামটা খুব সুন্দর লাগে রঞ্জনের –‘সেতু’ । এমন নাম সে আগে কখনও শোনে নি । দেখতেও খুব সুন্দর , পুতুলের মত । সেতু সিক্সে পড়ে । সেতুর ভাইটি খুবই ছোটো । প্রথম থেকেই সেতুর সঙ্গে ভাব হয়ে যায় রঞ্জনের । ছোড়দি ,সুভম ,সেতু সবাই মিলে শুধু খেলা আর খেলা । স্কুল তো ছুটি দিয়ে দিয়েছে । সুন্দরদাদু প্রতিদিন সবাইকে মজা করে পড়াতেন ।
প্রতিদিন গুলির শব্দ শোনা যেত । পুকুরের পাড়ে বাঁশঝাড়ের নিচে বড়ো বড়ো দুটো বাঙ্কার করা হয়েছে । গুলির শব্দ হলেই বাঙ্কারে ঢুকে যেত সবাই । সকলেই সুন্দরদাদুদের বলত ‘রিফিউজি’ । ইণ্ডিয়া সরকার তাদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করেছে । বলেছে ক্যাম্পও করে দেবে । বাবা ,জেঠু ,দাদু মিলে ঠিক করল বর্ডার থেকে বহু দূরে চন্দপুরে চলে যাবে । ইন্ডিয়ানরাও ইচ্ছে করলে ক্যাম্পে থাকতে পারবে । তাই ঠিক হল । বাবা আর জেঠু রয়ে গেলেন বাড়িতে ,বাকি সবাই চলে এল নূতন ক্যাম্পে । পাশাপাশি দুটো ক্যাম্প ,রিফিউজিদের একটা আর ইণ্ডিয়ানদের একটা । ছোটোদাদু একবার দেশে যাবেন ঠিক করলেন । সবাই মানা করলেও দাদু শুনলেন না । গেলেন ,আর ফিরে এলেন না । খবর এল কোন্ এক কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে রাজাকাররা নাকি ছোটোদাদুকে হাঁড়িকাঠে বলি দিয়ে দিয়েছে । খবর শুনে ছোটোদিদা মূর্ছা গেলেন । সুভমের জন্য ভীষণ কষ্ট হত । দাদুর এক মামাতো বোন বলেছে তাদের বাড়ির সবাইকে একদিন রাজাকাররা উঠোনে লাইন করে দাঁড় করিয়ে বলেছে গুলি করে মেরে ফেলবে । শেষে সোনাদানা ,যার যা ছিল সব দিয়ে প্রাণে বেঁচেছে । ভিখারি হয়ে , দুই দিন উপোস থেকে এক কাপড়ে এপারে উঠে এসেছে ।
ক্যাম্পের দিনগুলি ছিল রঙিন । দাদুর কাছে পড়ার সময়টুকু ছাড়া শুধু খেলা আর খেলা । সেতুকে দুদণ্ড না দেখলে কেমন অস্থির লাগত রঞ্জনের । সে নাম ধরেই ডাকত । জেঠিমা বলতেন ,রঞ্জু ,বয়সে ছোটো হলেও সেতু তোর মাসী হয় । তাকে নাম ধরে ডাকিস না , মাসী বলে ডাকিস । রঞ্জন পারে নি । ‘সেতু’ নামটা তার খুব প্রিয় ,উচ্চারণ করতেই কেমন মজা লাগে । তারা লুকোচুরি খেলে ,কিতকিত খেলে ,যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে ,ইয়াহিয়া সাজে ,ভুট্টো সাজে ,মুজিব সাজে । কতরকম খেলা যে খেলে তার ঠিক নেই । শুধু মনে হত দিনগুলো আরও লম্বা হলেই ভাল ছিল । সুন্দরদাদু নূতন নূতন ছড়া শেখাতেন । সবাই সুর করে বলত । যেমন ,ভুট্টোর বুকে লাথি মার,বাংলাদেশ স্বাধীন কর । আবার বলত,ইয়াহিয়ার দুই গালে জুতা মার তালে তালে ইত্যাদি। মুক্তিবাহিনি নামে একটা সৈন্যবাহিনি তৈরী হয়েছে । ক্যাম্পের অনেক ছেলেও মুক্তিবাহিনিতে যোগ দিয়েছে । বাবা মাঝে মাঝে ক্যাম্পে আসতেন । সঙ্গে করে আনতেন সব্জি,পায়েসের চাল আরও কত কী । শ্রীরামপুরে নাকি মুক্তিবাহিনির এক বিরাট ট্রেনিং ক্যাম্প হয়েছে । তার নেতৃত্বে তাজউদ্দিন নামে কে একজন নাকি খুব নাম করেছে ।

যখন যে খেলাই হোক সেতু অবশ্যই রঞ্জনের দলে থাকবে । এই নিয়ে ছোড়দি ,শুভম সকলের সঙ্গে কী ঝগড়া ! একদিন তো সেতুকে দলে না পেয়ে কেঁদেই ফেলেছিল । তবে কথা না শুনলে সেতুর উপর ভীষণ রেগে যেত । সন্তুর মা বুড়িটা খুব নচ্ছার ছিল । তাকে বলত, এই রঞ্জন,সেতু কী তোর বিয়ে করা বউ যে এত খবরদারি করিস ? দেখিস একদিন বিয়েই দিয়ে দেব । রঞ্জন একদিন নিজের কানেই শুনেছে বুড়ি মাকে বলছে ,নূতন বউ,এই দুটিতে খুব মানিয়েছে । বাল্য বিবাহ দিয়ে মেয়েটিকে ঘরে তুলে রাখো । কবে আবার সে দেশে চলে যাবে ঠিক নেই । শুনে রঞ্জনের কেমন যেন লেগেছিল । সেতুর চোখে চোখে তাকাতে পারত না । অথচ সেতুর গভীর চোখের দিকে পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকা ছিল তার এক প্রিয় খেলা । পড়ার সময় একদিন সে খাতার একটা পাতা শুধু ‘সেতু’ শব্দটি লিখে ভরিয়ে দিয়েছিল । দেখে তো সেতুর লাল মুখ আরও লাল হয়ে গিয়েছিল । একদিন খেলতে খেলতে বালির মধ্যে লিখল, সেতু + রঞ্জন= সেতুরঞ্জন । দুজনের সে কী হাসি ! তারপর ক্যাম্পের ব্যারাকের বেড়ায়, গাছের গায়ে , খাতার পাতায় কতবার যে এমন লিখেছে তার হিসেব নেই । রঞ্জন লিখত, ‘সেতু’ + ; আর ‘রঞ্জন’ লিখে সন্ধি শেষ করত সেতু । এ যেন তাদের এক নূতন খেলা হয়েগেল ।
নসুদার রেডিওর শ্রোতা ক্যাম্পে আরও বেড়ে গিয়েছিল । দোকানদারি আরও জমেছে । একদিন খবর হল যে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে ‘বাংলাদেশ’ হয়ে যাবে । কোন্ কোন্ দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে সব নসুদার রেডিও থেকে সবাই জেনে যেত । একদিন খবর হল ,ইণ্ডিয়ার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাক লেঃ জেঃ নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেছে । যুদ্ধ শেষ । পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেল ‘বাংলাদেশ’ । নসুদা চীৎকার করে বলল, জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি ছাড়ি ধূতি ফিন্দ্ । রঞ্জনের মনে খুব আফসোস হয়েছিল যুদ্ধটা আরও গড়ালো না বলে । সেতুরা এবার চলে যাবে । বাবা বলেছেন , নন্দী স্যার বলে দিয়েছেন যে এবার বার্ষিক পরীক্ষা দিতে হবে না ,পরের ক্লাশে উঠিয়ে দেবেন । একদিন সত্যি সত্যিই সেতুদের যাবার দিন এল । সেদিন রঞ্জনের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কী কান্না ! সেতুও কেঁদেছিল , তবে তার মত ব্যক্ত হয় নি । সুন্দরদাদু বাবা মাকে বারবার বলেছেন,আপনারা না থাকলে কোথায় ভেসে যেতাম । বাংলাদেশে যাবার জন্য বারবার করে নিমন্ত্রণ করেছে । রঞ্জনের দিনের সোনালী আলো দপ্ করে নিভে গেল । বছর তিনেক পর সুন্দরদাদুরা সবাই এসেছিল ছোড়দির বিয়েতে । সকলের জন্য দামী দামী জামা ,শাড়ি এনেছিল । বিয়ের ক’দিন সেতুকে নিয়ে রঞ্জনের সে কী বাঁধনহারা উচ্ছাস ! বিয়ের আলপনা থেকে শুরু করে নূতন জামাইকে নাস্তানাবুদ করা সবকিছু দুজনের পরিকল্পনা অনুসারে হয়েছিল । সেতু যেন আরও সুন্দর হয়েছে ,পরীর মত লাগে । বিয়ের দিন দুপুরে আলপনার রঙ নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে রঞ্জন সেতুকে জড়িয়ে ধরে ফেলেছিল বুকে । সেতুর গায়ে কী মিষ্টি সুগন্ধ ! দুজনে লুকিয়ে বিয়ের পিড়ির পেছনে লিখকল, সেতু +রঞ্জন=সেতুরঞ্জন।
সুন্দরদাদুর অনুরোধে রঞ্জনরা একবার গিয়েছিল বাংলাদেশে ,যুদ্ধের প্রায় বছর দশেক পর । সেতু কেমন ভারিক্কি হয়ে গেছে । মা’র কাছে শুনেছে সেতুর বিয়ের কথা হচ্ছে । সুন্দরদাদু বলল,চল সেতু ,রঞ্জনদের একদিন ঢাকা দেখিয়ে নিয়ে আসি । লালবাগ ফোর্টে গিয়ে দাদু বলল,যা তোরা ঘুরে দেখ । রঞ্জনের সে কী আনন্দ ! সেতু বলছিল ,মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর প্রিয় কন্যা পরিবিবির সমাধি আছে এখানে । এই ফোর্ট নির্মান শুরু করে আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মোঃ আজম ১৬৭৮ খ্রীষ্টাব্দে । তারা ঘুরে ঘুরে দেখল দরবার হল । এক জায়গায় লেখা আছে , হাম্মামখানা(রাজকীয় গোসলখানা) । গরম পানী,ঠাণ্ডা পানীর আলাদা ব্যবস্থা এখনও খেয়াল করা যায় । মেঝের কারুকার্য কী সুন্দর ! রঞ্জন বলে ,আয় এই গোসলখানার গায়ে আমাদের নাম খোদাই করে দিই । সে লিখল ,সেতু +; কিন্তু খালিস্থান পূর্ণ করার জন্য সেতুর দিকে লক্ষ্য করে দেখে সেতু দূরে দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছে । রঞ্জন আছে এসে হাত ধরে বলল,তোর কি হয়েছে সেতু ? সেতু মুহূর্তে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল । রঞ্জনের চোখেও জল এসে গেল । দ্রুত চোখ মুছে সেতু বলল, চল যাই । নিঃশব্দে রঞ্জন পিছু নিল । হাম্মামের পাথরের গায়ে নামের সন্ধিটা অসমাপ্তই রয়ে গেল ।
তারপর আরও প্রায় দশবছর কেটে গেল দ্রুত । রঞ্জনরা শুনল সেতুর বিয়ে হয়েছে । তাদের যাওয়া হয় নি । বর গার্মেন্টস্ কোম্পানিতে কাজ করে । মধ্যপ্রাচ্যের কোন্ এক দেশে থাকে । এর মধ্যে রঞ্জনের জীবনে কত কিছু ঘটে গেছে । বাংলাদেশ থেকে ফেরার পরের বছর মা এবং বছর না ঘুতেই বাবাও চলে গেল । জেঠিমা তখনও বেঁচে । তার চাকুরি হল । শত চেষ্টা করেও জেঠিমা তাকে বিয়েতে রাজি করাতে পারে নি । একদিন বাংলাদেশ থেকে খবর এল সেতুর বর বিদেশেই মারা গেছে । কেউ বলেছে মেরে ফেলেছে । রঞ্জনের কাছে সব ঘটনা উপন্যাসের মত মনে হল । সে মনে মনে বলেছে ,ঠাকুর , সেতুর সঙ্গে আর যেন দেখা না হয় । গত বছর জেঠিমাও চলে গেলেন । রঞ্জন একা হয়ে গেল ।
পাসপোর্ট করাই ছিল । গত সপ্তাহে কীসের যেন এক প্রবল টান তাকে আবার এদেশে নিয়ে এল তা সে নিজেও জানে না । সুন্দরদাদু বুড়িয়ে গেছেন । সেতুর দিকে সে তাকাতে পারে না । সেতু দাদুর স্কুলেই এখন ছাত্র পড়ায় । তাকে যেন আগের চেয়েও সুন্দর লাগছে । কিন্তু সেতুকে ভয় পায় রঞ্জন । সেতুই বলেছে ,চল তোকে মেহেরেশ্বরী কালীবাড়ি আর মেঘনা দেখাব ।
একটালঞ্চএকেবারেকাছেদিয়েচলেযাচ্ছে।একটালঞ্চেএতলোকএকসঙ্গেযেতেপারেতারঞ্জনেরকল্পনারবাইরে।মনেহলএক্ষুনিবুঝিডুবেযাবে ! ভয়েরঞ্জনেরগাশিউরেউঠল।সেসম্বিতফিরেপেল।কতক্ষণকেটেছেঅনুমানকরতেচেষ্টাকরলযখনদেখলসূর্য মেঘনার বুকে প্রায় ডুবে যাচ্ছে তার রক্তিম আভাটা আকাশের গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে । সেতুর দিকে চোখ পড়তেই দেখে দুই হাঁটুর উপর থুতনি রেখে এখনও বসে আছে আর কপোল বেয়ে জলের ধারা নামছে । সেতুর দৃষ্টি যেন মেঘনার অতল জলের গভীরে কোন্ পাতাল পুরীতে চলে গেছে । রঞ্জন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে । মেহেরেশ্বরী কালীবাড়ি থেকে এই অবধি প্রায় কোন কথাই বলে নি সেতু । রঞ্জন সেতুর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল ,সেতু , যাবি আমার সঙ্গে ? বাগ না মানা জলের ধারার সঙ্গে সেতুর মুখ থেকে এক করুণ গোঙানির শব্দ বেরিয়ে মিশে গেল মেঘনার উত্তাল গর্জণের সঙ্গে । রঞ্জনের কানে মেঘনার গর্জণ প্রবেশ করছে না । সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সেতুর গোঙানি । পৃথিবীর সব শব্দ ছাপিয়ে সেতুর বুকের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত কান্নার রোল তার মনকে উথাল পাথাল করে দিল । সেতুর চোখে যেন মেঘনার দ্বিগুণ প্রবাহ । রঞ্জন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না । দিশেহারা সে । মেঘনার জলে অস্তরবির শেষ আভাটা ততক্ষণে মুছে গেছে ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement