অলিক বা ভারচুয়াল মানে-অস্তিত্ত্ব আছে অথচ গোচরে নেই। যাকে সোজা কথায় আমরা আবাস্তব বলে থাকি। সাধারন ভাবে আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা যা কিছু আমরা দেখি বা অনুভব করি সেটাকেই বাস্তব বলি। এর বাইরে যা কিছু সব অবাস্তব, অলিক। সত্যি কথা বলতে গেলে উপরোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী বাস্তব জগৎ অনেকাংশে সীমিত তুলনামূলক ভাবে অলিক জগৎ থেকে। এটা আমার সীমিত জ্ঞানে পরিপুষ্ট ব্যক্তিগত ধারণা আমার গল্পটিও সে রকম এক অলিক অভিজ্ঞতার প্রতিবেদন এবং তাই গল্পের নির্ধারিত বিষয়ের সাথে আমার গল্পের সামঞ্জস্য আছে বলে মনে করছি। ধন্যবাদ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
গল্প/কবিতা: ১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৩২

বিচারক স্কোরঃ ১.৫২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - অলিক (অক্টোবর ২০১৮)

নষ্টচন্দ্র
অলিক

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৩২

মোহন মিত্র

comment ২  favorite ০  import_contacts ২২৮
গ্রাম বাংলার অনেক গল্প আপনারা শুনেছেন। আমরাও শুনেছি - ভূতুড়ে অদ্ভুতুড়ে অনেক । ছোটবেলায় তো সব চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে এবং শিক্ষার জগতে প্রবেশ করার পর মনে অনেক জিজ্ঞাসা আসত। বিজ্ঞানের ছাত্রদের পক্ষে পরীক্ষা – প্রমান ছাড়া সব কিছু মেনে নেয়া কিছুতেই সম্ভব হতনা। তবে কিছু কিছু বিষয় ছিল বা আছে যার অস্তিত্ব আছে যেমন মানতে পারিনা, ঠিক তেমনি একেবারে কিচ্ছু নেই সে কথাও হলফ করে বলতে পারিনা। গ্রামের ছেলে হিসাবে আমরা দৈনন্দিন জীবনে অনেক কিছু অনুভব করেছি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। যেগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা করা আজও সম্ভব হয়নি।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। উত্তরবঙ্গে বর্ধিষ্ণু গ্রামে আমাদের বাড়ি। গ্রামের জীবন যাত্রা শহরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। দিনের বেলার গ্রাম আর রাতের বেলার গ্রাম একাবারে ভিন্ন। দিনের বেলা গ্রামে চলে যেন উৎসব। ডাকা ডাকি, চিৎকার চেঁচামেচি, নিত্যদিনের ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে। লোক জন ছেলে মেয়ে বুড়ো বুড়ি অনবরত চলছে পথে ঘাটে। কত জন কত কাজে ব্যস্ত। বাড়িতে কাজ, মাঠে কাজ, পুকুর ঘাটে কাজ, নদীতে কাজ। গরু ছাগল হাঁস মুরগী চড়ছে এদিক ওদিক। সব নিয়ে মানুষ খুব ব্যস্ত। ঘর-বাড়ী, খেত-খামার, বাগান-পুকুর মিলিয়ে তাঁদের বিশাল কর্মক্ষেত্র। গ্রামের লোক ধূলো মাটিতে, জলে কাদায়, বনে জঙ্গলে সারাদিন অবলীলায় ঘুরে বেড়ায়। রাতেও চলাফেরা চলতে থাকে প্রয়োজনের তাগিদে। বিদ্যুৎ সরবরাহ তখন শুধু যে শুরু হয়নি তাই নয়, গ্রামের বহু মানুষ জানতই না বিদ্যুৎ কী এবং কী তার উপযোগীতা। যেখানে বিদ্যুৎ নেই সেখানে অন্ধকার দূর করতে লোক কেরসিনের ল্যাম্প ব্যবহার করে। যাতায়াতের সময় রাতে লোক লন্ঠন বা টর্চ লাইট ব্যবহার করে। যারা ব্যবহার করেছে তারা জানে এগুলির সীমাবদ্ধতা। খুব অল্প পরিসর আলোর বলয়ে দেখা যায়, আর তার বাইরে একটা বিশাল ছায়াময় পরিবেষ ছড়িয়ে থাকে। সেখান থেকেই সূচনা হয় অনেক গা ছম ছম করা অলিক কাহিনীর। সে কাহিনী ছিল সততই ভয়ের, বিশেষ করে ছোটদের কাছে তো অবশ্যই। উঠতি বয়সে আমরা বড় হবার তাগিদে সেই ভয়গুলোকে জয় করার চেষ্টা করেছি সাহস ও যুক্তি দিয়ে। তবে সব সময় যে সফল হয়েছি এমন নয়। তাছাড়া কিছু ভয়ের ব্যাপার তো সত্যি সত্যি ছিল অন্ধকার রাস্তায়। অলিগলি ঝোপঝাড় থেকে সাপ বিছা প্রায়ই বের হত। অনেক সময় সে সব ঘাতক প্রতিপন্ন হয়েছে। এছাড়া বন্য জন্তু বলতে শেয়াল ছিল অনেক। অবশ্য শেয়াল মানুষ দেখে ভয় পায়, পালিয়ে যায়। কাছে আসে না। হাতে টর্চ থাকলে তো কোন চিন্তাই থাকেনা। অনেক সময় আমরা গ্রামের রাস্তায় অন্ধকারে ঘুরেছি। দুই হাতে তালি বাজাতে বাজাতে আগানে বাগানে ঘুরেছি। আমাদের মোটামুটি চার পাঁচ জনের একটা দল ছিল। আমরা নানা রকম কাজ-অকাজ করে বেড়াতাম রাতের বেলা। অবশ্য এই ধরণের অকাজ করার কথা মাথায় এসেছিল বড়দের কাছ থেকে শুনে শুনে। বড়রা তাঁদের ছোটবেলার কীর্তিকলাপ বাড়িয়ে-চাড়িয়ে বলতো ছোটদের। তাঁরাও শিখেছিল তাঁদের বড়দের কাছ থেকে। অর্থাৎ এগুলি গ্রামের স্বীকৃত দুষ্টুমি, বংশপরম্পরায় চলে আসছে। ছোটরা এসব করে থাকে। এগুলো গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হয়না। গ্রামের মানুষ সবাই আপন। গ্রামের ছেলে মেয়ে মানে সবার ছেলে মেয়ে। তাই সবাই সবার ভালো মন্দ দ্যাখে। দরকার হলে শাসন করে। আবার বিষয় গম্ভীর হলে বাড়িতে রিপোর্টও করে। তাই ছোটরা গ্রামের বড়দের সমীহ করেই চলে। আমরা এখনও বড়দের যথেষ্ট সম্মান করে চলি।

পূজা পার্বণ উপলক্ষে গ্রামে অনেক কিছু সার্বজনীন হয়। অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। যাত্রা, থিয়েটার, পালাগান, আরও কত কি! কিশোর বয়সে আমরা সবাই সে সব দারুণ উপভোগ করে। কারণ সে সব উপলক্ষে সন্ধ্যার পর আমরা বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি পেতাম। নচেৎ সূর্য অস্ত যাবার আগে সবাইকে ঘরে ঢুকতেই হত। রাতে বাড়ির বাইরে থাকার সুযোগে ঐ বয়সে আমরা কিছু কিছু দুষ্টুমি বা অকাজ করেছি। যদিও সেগুলি নৈতিকভাবে ঠিক নয়। কিন্তু ঐ বয়সে এগুলি সবাই করে এসেছে। যা বলেছিলাম, জেনারেশন আফটার জেনারেশন চলে আসছে। সে রকম একটা কিছু করতে গিয়ে একবার কী যে ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়েছিল তাই বলব এই গল্পে।

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ চতুর্থী বা শুক্লা চতুর্থী। পঞ্জিকাতে এই তিথিকে নষ্টচন্দ্র বলে উল্লেখ করা হয়। কথিত আছে যে এই তিথিতে চাঁদ দেখা নাকি অশুভ। চাঁদের কলঙ্ক মানুষের গায়ে লাগে। সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছোট খাট অনৈতিক কাজ করার রীতি। অর্থাৎ ছোট মাপের কলঙ্ক গায়ে মেখে বড় সড় কলঙ্ক থেকে বাঁচা যায় এই নষ্টচন্দ্রে। আমার প্রশ্ন ছিল কলঙ্ক যদি লাগে তাহলে চাঁদ দেখার দরকারটাই বা কী সেদিন? আসলে এটা একটা বাহানা কিছু দুষ্টামি করার জন্য, বিশেষ করে উঠতি বয়সে ছেলে ছোকরাদের রাত্তিরে বাড়ির বাইরে ঘোরার রোমাঞ্চ। একবার ভাবুন মাঝরাতে গ্রামের ঐ নিস্তব্দ পরিবেশ। সমস্ত গ্রামের লোকেরা ঘুমিয়ে আছে। নানা ধরণের বড় ছোট গাছপালা বিশালাকায় কালো দৈত্যের মত ভৌতিক চেহারা ফুটিয়ে তুলেছে। মৃদুমন্দ হাওয়াতে সে সব গাছের সচল ছায়া মায়াময় পরিবেশ সৃষ্টি করছে। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোককেও চেনা যাচ্ছেনা। এখানে সেখানে ঝোপ জঙ্গল। অসংখ্য জোনাকি উড়ে বেড়াচ্ছে। গাছের ডালে ঝুলছে বাদুর, বসে আছে প্যাঁচার মত পাখী। এই সব নিশাচর পাখীদের কর্কশ ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম ঝিঁঝিঁ রব রাতের নিস্তব্দতা চিরে আমাদের কানে আসছে। হঠাৎ পাখীদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজে গাঁ শিঊরে উঠছে। দূর গাঁয়ের কুকুরদের ঘেউ ঘেউ ডাক শোনা যাচ্ছে। তারমাঝে হাঠাৎ সামনের জঙ্গল থেকে একসাথে অনেকগুলো শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শোনা গেল। দ্বিতীয় প্রহরের ঘোষণা। তাই শুনে কুকুরেরা ভুকতে লাগলো। হাওয়ার ঝোকায় কোন গাছের পাতা জোরে নড়ে উঠল কিংবা পাশ দিয়ে স্যাত করে সরীসৃপ চলে গেল। আশে পাশে কোথাও থেকে সাপ ব্যাঙ ধরলে যে রকম আওয়াজ হয়, তাও আসছে। কেমন গা ছম ছম করছে না? আসলে এই গা ছম ছম কে জয় করে আমরা কিছু একটা করব এই রোমাঞ্চের জন্যই তো আমাদের রাতের অভিযান।

নষ্টচন্দ্রে কী ধরণের অনৈতিক কাজ করা হয়? কারও বাড়ির গোয়ালঘর থেকে একটা বা দুটো গরু খুলে নিয়ে অন্য কারও গোয়ালঘরে বেঁধে রাখা হয়। কারও বাড়ির গরুর গাড়ী টেনে নিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও রেখে আসা হয়। কারও কুয়োর পাড় থেকে বদনা সরিয়ে রেখে দেয়া হয়, যাতে সকালে উঠেই ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। কারও গাছ থেকে নারকেল, শসা, বাতাবীলেবু পেড়ে খাওয়া হয়। পরদিন সকালে উঠে ঐ সব বাড়ির লোকেরা অজানা লোকেদের উদ্দেশ্যে গালমন্দ করবে। আমরা শুনে মজা পাব।

কিছু কিছু লোক আছে যারা ছেলেদের বেয়ারাপনা দ্যাখে সবেতেই। সামান্য কারণে খ্যাচখ্যাচ করে সারা বছর। তাঁদের জন্য একটু বড় মাপের কিছু করতে পারলে বেশী মজা হয়। যদিও একটু বেশী গালমন্দ খেতে হয়, তাতে কোন রাগ আমাদের নেই। বরং তাতে পূণ্য আরও বেশী, মজাটাও অনেক। ভূতের মত দেখতে কাকতাড়ুয়া অথবা কাদামাটির কোন মূর্তি বানিয়ে কারও বাড়ির দরজায় রেখে, তেল সিঁদুর লাগিয়্‌ ফুল বেলপাতা দিয়ে পূজো করে আসতে পারলে তো আর কথাই নাই। সকালে উঠেই তীব্র গালাগাল শুরু হয়ে যায়। এইগুলি করতে হলে একটু বেশী রাতে বের হতে হয় এবং বেশী সাহসেরও দরকার। বেশী রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসা অনেক বিপজ্জনক। বাড়ির কেউ জানতে পারলে আর রক্ষা থাকবে না। কিন্তু আমরাও নানা ফন্দি করে বাইরে বের হোতাম।

হারাধন ওরফে হারু ছিল আমাদের ওস্তাদ। সে গাছে চড়া থেকে শুরু করে সব রকম কাজে ছিল পটু। কিন্তু তাঁর দুটো সমস্যা ছিল। এক, খাওয়ার পর রাত্তিরে আর সে জেগে থাকতে পারত না। ঘুমিয়ে পড়ত। দুই, হারুর মা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে সংসারের কাজ করত। নষ্টচন্দ্রে কী করা হবে তার প্ল্যান দিনের বেলাতেই করা হয়। হারু তাঁকে ডেকে তোলবার অভিনব পন্থা বের করেছিল। তাঁর শোবার ঘরটা ছিল ঠিক পাঁচিলের গাঁয়ে লাগানো। ও শোবার ঘর থেকে জানালা দিয়ে পাঁচিল পার করে একটা সূতো বাইরে ঝুলিয়ে রাখত বিকেল বেলাতেই। সরু সুতো কারও নজরে আসতো না। রাত্রে ঘুমোবার আগে এই সূতোর অন্য প্রান্ত ওর এক হাতে বেঁধে নিত। কোন একজন বন্ধু এসে বাইরে থেকে সূতো ধরে টানলে ওর ঘুম ভেঙে যেত। সূতোটা ভেতরে টেনে নিলে বোঝা যেত যে সে জেগে গেছে। তারপর হারু বাইরে বেরিয়ে আসত।

দিনের বেলায় প্ল্যান করে যতিন একবার সারাগ্রাম চক্কর মেরে নিয়েছে। যাকে এখন রেকি করা বলে। আমাদের মনে আছে বিশুকাকা গতবার খুব গালাগাল দিয়েছিল। অবশ্য সেবারে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছিল। বিশুকাকা রাতে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিবাদল না হলে ওদের বৈঠকখানার বাইরে খাটিয়া পেতে ঘুমত। বিশুকাকার আবার প্রতিদিন রাতে একটু মদ্য সেবনের অভ্যাস ছিল। তাই একবার ঘুমিয়ে গেলে সে একেবার কুম্ভকর্ণ। গতবার নষ্টচন্দ্রে আমরা চারজনে মিলে ঘুমন্ত অবস্থায় ওকে খাটিয়া সুদ্ধ তুলে নিয়ে বাড়ির পাশে আম বাগানে রেখে এসেছিলাম। নেশাগ্রস্থ বিশুকাকা টেরও পায়নি। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ভয়ে “ভুত ভুত” করে প্রাণপণ চিৎকার করতে করতে ছুটে এসেছিল বাড়ির দিকে। সে চিৎকার শুনে পাড়ার অনেকে ছুটে গেছিল। সে ভেবেছিল তাঁকে ভূত তুলে নিয়ে এসেছে বাগানে। যদিও সকালে আমাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হাতে হাতে ধরতে না পারলে তো আর কিছু করার থাকেনা। তবে নাম না করেই সে যথেচ্ছ গালাগাল দিয়েছিল। সবাই পরে বুঝে গেছিল যে এটা নষ্টচন্দ্রের নষ্টামি।

কেউ কেউ মন্তব্য করেছিল, “গ্রামের ছেলে ছোকড়ারা আজকাল বড্ড বেয়ারা হয়ে উঠছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার”।
কেউ আবার বলেছিল “নষ্টচন্দ্রে এমনটা হয়েই থাকে”।

তাই ঘটনার বেশী উথাল পাথাল না করে সবাই শান্ত করেছিল বিশুকাকাকে। এবারে আমরা প্ল্যান করেছি ওদের গরুর গাড়ীটা ওদেরই পুকুরের জলে ফেলে দেব। ডুবে গেলে চট করে দেখতে পাবে না। খুঁজে খুঁজে হয়রান হবে। অবশ্য দুপুরে রোজ অনেকেই ঐ পুকুরে চান করে। তখন তো পেয়েই যাবে। সেই মত ঠিক হল, আমি, হারু, বারীন আর যতিন চার জন একটু বেশী রাতে বের হব। আমি হারুকে ডাকব হারুর মা শুয়ে পড়লে, রাত এগারোটার পর। তারপর আমরা দু’জনে বিশুকাকার বাড়ির দিকে যাব। যতিনের বাড়ি ঐ দিকে তাই বারীন পড়ার নাম করে যতিনের বাড়িতে রাতে থাকবে। ওরা দুজনে ওখানে ঠিক সাড়ে এগারোটায় এসে যাবে। ততক্ষনে আমি হারুকে নিয়ে পৌঁছে যাব।

হারু প্ল্যানমাফিক হাতে সূতো বেঁধে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন অনেক রাত। চারিদিক নিস্তব্দ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। গ্রামের লোক কাজে কাজে ক্লান্ত থাকে। তাই চট করে কারও ঘুম ভাঙে না। ঘুমের মধ্যে হারুর মনে হল হাতের সূতোয় টান পড়ছে। ওর ঘুম ভেঙে গেল। হারু উঠে দেখল ঘড়িতে তখন ঠিক এগারোটা বাজে। ভাবল সমু এক্কেবারে ঠিক সময়েই এসেছে। হাতে বাঁধা সূতোটা টেনে ঘরে নিয়ে এলো। লন্ঠনের আলোটা একটু বাড়িয়ে টর্চটা খুঁজল। পেলো না। মনে পড়ে গেল টর্চটা ওর বাবা নিয়েছিল সন্ধ্যাবেলা বাইরে যাবে বলে। ফিরে এসে হারু ঘুমিয়ে গেছে দেখে আর দেয়নি। ঘুম চোখে হারু কালো রঙের শার্টটা গাঁয়ে চড়াল। দরজার শিকলে আওয়াজ যাতে না হয় সেইভাবে খুব সন্তর্পণে হারু দরজা খুলে প্রথমে উঠোনে নামল। এদিক ওদিক দেখে বুঝে নিল বাড়ির কেউ জেগে আছে কিনা। তারপর উঠোন পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজাটা খুলল। বাইরে বেরিয়ে হারু সোজা হাঁটতে লাগলো যেমন প্রতিবার করে থাকে। এই সময় এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা উচিৎ হবে না এবং দু জনকে একটু তফাৎ রেখেই হাঁটতে হবে। একসঙ্গে দুজনকে যদি কেউ দেখে ফ্যালে সন্দেহ হবে। কিন্তু একজন কারও নজরে এলেও, তেমন কিছু সন্দেহের ব্যপার থাকবে না। কারণ গ্রামে অনেকের বাড়িতে তখন শৌচালয় ছিলনা। তাই তাঁদের অনেকেি বাইরে বেরিয়ে আসত বাথরুমের কাজ সারতে। তবু হারু একবার আলো আঁধারে নিশ্চিত হবার জন্য দেখেছিল ওর সামনে আমি আছি কিনা। ঘুমচোখে সে দেখছিল কেউ তো একজন হাঁটছে ওর সামনে - একটু দূরে। অস্ফুট স্বরে নাকি আমাকে একবার ডাকবার চেষ্টাও করেছিল হারু। কেউ শোনেনি, কোন উত্তর আসেনি। সাধারনত ঐ সময় কেউ কোন কথা বলা হয়না। পাড়ার কুকুরগুলো আমাদের চেনে। দেখলেই দৌড়ে কাছে আসে। কোন আওয়াজ করেনা। গায়ের গন্ধ শুঁকে আবার ফিরে গিয়ে গুটিমেরে শুয়ে পড়ে। ওরা জানে আমরা নিশাচর। মাঝে মাঝে রাতে বের হই। হারু হাঁটছে। হারু দেখছে তাঁর আগে আমি হাঁটছি। হারু চাপা গলায় সামনের লোকটিকে আস্তে হাঁটতে বলছে। কিন্তু সামনের লোকটি কিছু শুনছে না। হারু জোরে জোরে হাঁটছে তাঁকে ধরবে বলে। কিন্তু তখন সামনের লোকটিও জোরে হাঁটছে। “এই সমু দাঁড়া, একসাথে যাব”। চাপা গলায় হারুর কথা শুধু হারুই শুনল।

এইভাবে বেশ কিছুটা দূর চলে গেছে। আর একটু গেলেই বিশুকাকার বাড়ি। সেখানেই রাখা আছে গরুরগাড়ী। বিকেল বেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেখে রাখা হয়েছিল। হারু ভাবছে সমু দাঁড়াচ্ছে না কেন? হঠাৎ তাঁর মনে একটা ভয় মিশ্রিত সন্দেহ হল, সামনে সমু আছে তো? কথা না হয় বলা যাবে না, কিন্তু এখন তো দাঁড়াবে? এখান থেকে একসাথেই যাওয়ার কথা। আজ ওর হোল কি? ভাবতে ভাবতে হারু একেবারে বিশুকাকার গাড়ীর কাছে এসে পৌঁছে গেছে। হারু দেখল সে ওখানে একা। সেখানে আর কেউ নেই। “সমু? তুই কোথায়? তোকে দেখতে পাচ্ছি না”। দু’তিন বার ডেকে, সামনে পেছনে কোথাও যখন সমুর দেখা পেলনা, তখন মনে হল তাহলে ওর সামনে এতক্ষণ কে হাটছিল?

ওর মনে পড়ে গেল “নিশিডাকা”র কাহিনীগুলো। রাত্রে কাউকে ডাকতে বলে ঘুমোলে মানুষ এই নিশিডাকের খপ্পরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ঘুমন্ত অবস্থায় শুনতে পায় যাকে ডাকতে বলা হয়েছে সে এসে তাঁকে ডাকছে। সে ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলে সোজা হাঁটতে লাগে। দ্যাখে যে ডেকেছিল সে তাঁর সামনেই আছে। হারু জানত নিশিডাক কী। এও জানত যে রাতে ঘুমিয়ে থাকলে যেই ডাকুক না কেন, একডাকে সাড়া দেয়া বা বাইরে বেরিয়ে আসা একদম উচিৎ নয়। অন্যথায় এই ধরনের অলৌকিক ঘটনা ঘটতে পারে। কখনও কখনও প্রাণ সংশয়ও দেখা দেয়। অথচ হারুর মনে ঘুনাক্ষরে মনে আসেনি যে এটা “নিশিডাক” হতে পারে। “নিশিডাক” মনে হতেই হারুর হাত পা কাঁপতে লাগলো। ঘুমের ঘোরে তাঁর মনে হয়েছিল কেউ সূতো ধরে টেনেছে। সমুর ডাকার কথা ছিল তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে সমুর মতই কাউকে দেখেছিল। এখন বুঝতে পারছে যার সাথে সে এসেছে সে সমু নয়। তাহলে কে ছিল? হাত পা যেন ঠান্ডা বরফ হয়ে আসছে। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। চিৎকার করতে গেলে গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না। তারপর কি হয়েছিল হারুর আর মনে নেই কিছু।

ওদিকে আমি হারুর বাড়ির বাইরে পাঁচিলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত তন্নতন্ন করে খুঁজে কোথাও সূতোর দেখা পেলাম না। ভাবলাম, “ব্যটা নিশ্চয় ভুলে গেছে সূতো ঝোলাতে”। আমি মরিয়া হয়ে দেয়ালে ঠুক ঠুক করে আওয়াজ করলাম। বেশী জোরে করতে পারছিলাম না। পাছে কেউ জেগে গিয়ে আর এক অনর্থ বাধায়। বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরও যখন হারু বের হল না, তখন আমি আর দেরী না করে বিশুকাকার বাড়ির দিকে রওনা হল। বারীন আর যতিন ওদের জন্য অপেক্ষা করবে। যতটা সম্ভব পা চালিয়ে হাঁটছিলাম। ভাবছিলাম এমন ভুল তো হারু কখনও করেনা। অন্য কোন ব্যপার নেই তো! হয়তো হারুর বাড়ির লোক টের পেয়ে গেছে। তাই ওকে আজ একলা শুতে দেয়নি।

আমি বিশুকাকার বাড়ির কাছে পৌঁছে দেখি যতিন আর বারীন অচেতন হারুকে উঠাবার চেষ্টা করছে।
ভয় পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে হারুর? ও এখানে আগে এলোই বা কেন”?
“ওসব কথা পরে হবে। এখন একে নিয়ে তাড়াতাড়ি চল এখান থেকে”। বারীন বলল।
আমরা তিনজন মিলে হারুকে যতিনের বাড়িতে নিয়ে এলাম। মাথায় ও চোখে মুখে জল দেয়া হল। হাত পাখা চালিয়ে মাথায় হাওয়া করা হচ্ছিল। আমরা সবাই প্রার্থনা করছিলাম, “ঠাকুর ওর জ্ঞান ফিরিয়ে দাও”।

হারুর জ্ঞান ফিরল। ও শুয়ে আছে যতিনের বাড়িতে। সামনে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও অবাক। তাড়াতাড়ি উঠে বসবার চেষ্টা করছিল। ওরা ওকে শুইয়ে দিল।
চোখেমুখে অনেক জলের ঝাপটায় জামার অনেকটা ভিজে গেছে। সে সব দেখে হারু জানতে চাইল, “কি হয়েছে আমার”?
“তুই বল তোর কি হয়েছিল?” আমি বললাম।


হারু তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মনে করবার চেষ্টা করছে রাতের ঘটনা। আমরা প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম হারুকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।

হারু বলল, “আমার হাতে সূতোর টান পড়তেই বূঝলাম, তুই এসে গেছিস। আমি আর দ্বিতীয়বার সূতো টানার অপেক্ষায় থাকিনি। মনে হয় সেটাই ভুল হয়েছে। উঠে দেখলাম ঘড়িতে এগারোটা বাজে। আমি তাড়াতাড়ি সার্ট গাঁয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। সদর দরজা খুলে দেখলাম ‘ঐ তো সমু দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে’। আমি চলতে শুরু করতেই সমু চলতে শুরু করলো। ঠিক সেই সময় পাশের বাড়ী থেকে নরেনদা কাশতে কাশতে বের হয়ে আসছিল। সে যাতে আমাকে না দেখে ফ্যালে, আমি তাড়াতাড়ি হেঁটে ঐ রাস্তাটুকু পার হয়ে এসেছিলাম। সমু আমার সামনেই হাঁটছিল। তোকে ডেকেছি, যদিও খুব নীচু গলায়। কিন্তু তুই দাঁড়াচ্ছিলি না। এখানে এসে দেখলাম তোরা কেউ নেই। তখন আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছিলাম। তারপর আমি আর জানি না”।

তখনও সকাল হয়নি। আমরা চার জন খুব নীচু গলায় কথা বললেও যতিনের মা টের পেয়ে গেলেন। যতিনের মা সব কিছু জানতে পেরে খুব বকেছিলেন যতিনকে। হারুর জ্ঞান ফিরলে যতিনের মা হারুকে এক কাপ গরম দুধ এনে দিলেন। চার জনের মধ্যে হারুই ছিল সবার ছোট। ক্লাস এইটের ছাত্র।

মাসীমা মানে যতিনের মা বলেছিলেন, “রাত-বিরাতে একা কখনও এই ভাবে বের হয়ো না, বাবা। বিশ্বাস-অবিশ্বাস কোন মানে রাখেনা। বিশ্বাসের যেমন অস্তিত্ব আছে। অবিশ্বাসেরও তেমনি অস্তিত্ব আছে। মনে রেখ কল্পলোকও একটা জগৎ। তোমরা দেখতে পাওনা বলে তা নেই, এই ধারণা ভুল। ভগবান দেখনি কিন্তু তাঁকে বিশ্বাস তো করছ। ঠিক তেমনি শয়তানও দেখনি। তাহলে তাঁকে অবিশ্বাস করবে কেন? এই ধরণের ঘটনা ঘটে বলেই সাবধান করা হয় তোমাদের। আমাদের চারিদিকে অনেক রকম শক্তি ঘুরছে। কোনটা কখন কোথায় থাকে, আর কী ঘটায় কেউ জানে না”। গ্রামের সামান্য লেখাপড়া জানা মহিলা এতবড় একটা তত্ত্ব খুব সাধারন ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের। গ্রামের লোকেরা স্কুল কলেজে যান না বটে কিন্তু তাঁদের জ্ঞান অনেক উঁচুতে। জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখা জ্ঞান আমরা সেদিন গ্রহণ করেছিলাম।

সকাল হবার আগেই হারুকে ওদের বাড়ীর দরজায় ছেড়ে দিয়ে আমরা যে যার বাড়ি চলে গেছিলাম। সে রাতে আমাদের “নষ্টচন্দ্র” মিশন অসফল হয়েছিল। কিন্তু আমরা একটা শিক্ষা নিয়েছিলাম। তারপর থেকে আমরা কখনও ঘুম থেকে একডাকে সাড়া দিইনা। “নিশিডাকা” দ্বিতীয় বার ডাকে না, তৃতীয় বার তো কখনও না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement