আমি মনে করি, আমার লেখা "রাত্রি" গল্পটা কাঠখোট্টা বিষয়ের সাথে পুরোপুরি যায়। কারণ, গল্পতে রাত্রি'র বর শাহেদের চরিত্রটা বিষয়ের সাথে খুব যায়। রাত্রি'র ভালো লাগা, ভালোবাসা, মনের চাওয়া পাওয়াতে শাহেদের কিছুই যায় আসেনা। সে তার মনগড়া যুক্তি দেখিয়ে রাত্রিকে চুপ করিয়ে রাখে। শেষপর্যন্ত, রাত্রি অভিমান করে ভেবে নেয়, বুড়ো বয়সে সে ওল্ড হোমে থেকে হলেও তা পূরণ করবে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৮টি

সমন্বিত স্কোর

৩.১৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৮২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৩৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - কাঠখোট্টা (মে ২০১৮)

রাত্রি
কাঠখোট্টা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.১৭

ফারহানা সিকদার (বহ্নি শিখা)

comment ১৪  favorite ০  import_contacts ১,১৫১
রাত্রি ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে আয়না দেখে চুল আছড়াচ্ছিলো। বারোটা দিনের প্রতিটি মুহূর্ত তার ভেতর দিয়ে কি ঝড় যাচ্ছে, শুধু সেই জানে।
রাত্রি তো নারী, মানুষ নয়। তাই তার মধ্যে একটা মন থাকতে পারে, তা সবার কাছে যেন অবিশ্বাস্য।
নারীদের আবার মন থাকে নাকি!?
সেতো কাইয়ের দলা, যেমনভাবে তার উপর দিয়ে বেলুন ঘুরাবে, তেমনই আকার নিতে বাধ্য সে!

রাত্রি আয়নায় নিজেকে দেখে।
না, এই আয়নার রাত্রি সাঁইত্রিশ বছর বয়সী রাত্রি নয়। এ যেন সাতচল্লিশ বছরের অর্ধ বয়সী কোনো মহিলা!
অথচ, সে শারীরিক ভাবে পুরো সুস্থ একজন। কিন্তু মন?
অশান্ত মন বয়স বাড়িয়ে দিতে বছর পেরুবার অপেক্ষা করেনা। তার জন্য সামান্য কিছু সময়ই যথেষ্ট।
তবে রাত্রি'র নিজেকে বুড়ো লাগাতে আফসোস হয়না। ও যেন মনে মনে খুশিই হয়। হয়তো তাতে মুক্তি মিলবে...

বিয়ের ক'বছর পর, রাত্রি'র একা একা সময় কাটতোনা। খুব ইচ্ছে করতো, শাহেদকে ফোন করে খুব জ্বালাতে ।

কিন্তু শাহেদ অতো রোমান্টিক নয়। সে এসব ছেলেমানুষি পছন্দ করেনা, বিরক্ত হয়।

ফোন করলেই রাগ হয়, রিসিভ করেই জানতে চায়,

-কিজন্য ফোন করেছো?

-এমনি...

-এমনি! এমনি কেউ ফোন করে নাকি?

-কেনো, এমনি ফোন করলে কি হয়?

-এসব এমনি টেমনি ফোন আমাকে করবেনা। প্রয়োজন ছাড়া কোন ফোনই না। এখানে কাজ করতে আসছি, ফোনালাপ, প্রেমালাপ করতে নয়।

রাত্রি'র বুকে কষ্ট দলা জমতে শুরু করে।

তার আর বলা হয়না,

-খুউব মিস করছিলাম, তাই তোমার কণ্ঠ শুনতে ফোন করেছি।

হয়তো এটা বললে, সে জবাব দিতো,

-এতো তাড়াতাড়ি কিসের মিস করা? এলাম তো চারঘণ্টাও হয়নি! এসব ঢঙ না করে বসে বসে টিভি দেখো।

এটাই বলবে। বাসায় কখনো যদি রাত্রি বলে,

-সারাদিন সময় কাটতে চায় না, বোর হই।

-টিভি দেখতে পারোনা? কতো চ্যানেল, কতো হাজার রকমের প্রোগ্রাম! সময় কোথায় চলে যাবে বুঝতেই পারবেনা। এসে দেখবো, তুমি আমার জন্য খানা ই বানাওনি, সময়ের অভাবে, হাহাহা...

রাত্রি'র এই হাহা করে হাসিটা এতো ভালো লাগে...

ইচ্ছে করে শাহেদকে তখনই চুমু খেতে। কিন্তু সে অতো সহজ হতে পারেনা। মাঝেমাঝে শাহেদের দেয়া ধমক তাকে জড়োসড়ো করে রাখে।

খুব কাছের আপন হতে গিয়েও সে বারবার ফিরে আসে।

আচ্ছা, রাত্রি যদি তখন চট করে চুমু খাই, তবে শাহেদের কি প্রতিক্রিয়া হবে? সে কি ধমক দিয়ে বলবে,

-এটা কি ছিলো!? এমন নাটক আর করবেনা, কক্ষনো না, বুঝছো?

নাকি সে বুকে টেনে নিয়ে আদর করবে?

রাত্রি'র খুব জানতে ইচ্ছে করে।

সে ভেবে রাখে, আরেকবার এমন মিষ্টি করে মজার হাসি হাসলেই সে চুমু খাবে। কিন্তু কখনোই হয়না তা। রাত্রি শুধু একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে শাহেদের দিকে।

সে এমন হাসি খুশি মুখের শাহেদকে চায়। যে কখনো কখনো কৌতুক করবে, ভালোবাসবে, ঘুরতে যেতে বলবে। তা না শুধু টিভি দেখা!

তবে সে আরও একদিন ফোনে ধমক খেয়েছিলো। অবুঝ মনের অবাধ্য আবেগে মাঝেমধ্যে ফোন না করে থাকতেই পারেনা রাত্রি।

-হ্যালো..

-হ্যাঁ, শুনছি বলো।

-লাঞ্চ করেছো?

-হ্যাঁ করেছি।

তারপর বলো, কেনো ফোন করলে?

-খেয়েছো কিনা জানতে।

-কি!

এমনভাবে প্রতিক্রিয়া করলো, রাত্রি'র মনে হয়েছে, ঘোরতর অন্যায় কিছু করে ফেলেছে সে।

-আমি খেয়েছি কিনা জানার জন্যই ফোন করেছো !

-হ্যাঁ।

-খেয়েদেয়ে আর কাজ নাই তোমার? খাবার সময় না খেয়ে ঘাস কাটতে যাবো নাকি!

রাত্রি কি বলবে জবাব খুঁজে পায়না। আস্তে করে বলে,

ওকে, রাখছি.. বলেই ফোন কেটে দেয়।

আর তার দু'চোখ বেয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও জল গড়িয়ে পড়ে।

তাই রাত্রি আর ফোন করে ডিস্টার্ব করেনা।

রাত্রি'র টিভি দেখা পছন্দ নয়।

তার শুধু শাহেদের সাথে কথা বলতে মন চায়, গল্প করতে ইচ্ছে করে। আর ইচ্ছে করে গল্প বই পড়তে।

কিন্তু শাহেদের, রাত্রি'র গল্পবই পড়া পছন্দ নয়।
সে বলে,
-গল্পবই পড়ার কি আছে? শিক্ষণীয় তো কিছুই নেই তাতে। লেখক তার কল্পনা, অবাস্তবতা সব পাঠকের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়। বেশিরভাগ লেখক নাস্তিকও হয় জানো? তাদের চরিত্রেরও ঠিক নেই।
লেখিকাদের সবাই হয় ডিভোর্সি। এদের সংসারে মন নেই, অগোছালো। আমি অনেক প্রমাণ দিতে পারবো।

রাত্রি বেশি বাড়াবাড়ি করেনা। বলেনা যে, সংসারী মহিলারাও যে শত শত লেখিকা আছেন, আমিও তার প্রমাণ দিতে পারবো।
সে জানে, হাজার যুক্তি দাঁড় করালেও শাহেদ এর মাথায় ঢুকে যাওয়া কথার নড়চড় হবেনা এতোটুকু।
তাই সে গল্পবই পড়াই ছেড়ে দিয়েছে। প্রতিদিন কারই বা একই ঘ্যানঘেনে রেকর্ড শুনতে ইচ্ছে করে!
খুব কষ্ট হয়েছিলো যদিও। রাত্রি ভীষণ মন খারাপ করেছিলো কিছুদিন।
সে তার নয় বছর বয়স থেকে টিনটিন, চাচা কাহিনী, তারপর কিশোর থ্রিলার পড়ে আসছে। হাইস্কুল, কলেজে যখন গল্পবই পড়তো, ছুটিরদিনে তিন চারটা বই একসাথে শেষ করে মাথা ব্যথা করে ফেলতো সে। পরীক্ষার সময় নতুন বই হাতে পেলে, সেটা শেষ না করে রাত্রি পাঠ্যবই পড়াই মন দিতে পারতোনা। এতই বইপাগল ছিলো।
আর সেই বই শাহেদের পছন্দ নয় বলে ছাড়তে হলো।
অথচ, রাত্রি'র বাবা বই পড়াতে কতো উৎসাহ দিতেন। তার ধর্মীয় বইয়ের একটা শেলফ ছিলো। রাত্রি খুঁজে খুঁজে মনীষীদের জীবনী পড়তো।

তাই এখন সময় কাটাতে, রাতে শাহেদ যখন শুতে যায়, তখনো গল্প করতে ইচ্ছে করে রাত্রি'র।

কিন্তু শাহেদ টিভি অন রেখে মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। সেখানে পেপার পড়ে, ফেসবুক দেখে, ভিডিও দেখে। আর রাত্রি শাহেদকে দেখে।

রাত্রি চায়, শাহেদ কাজে থাকলে সে মেসেজ করবে,

-কি করো, খুব বিজি?

আর শাহেদ লিখুক,

-হুম, একটু তো বিজিই, তবে তোমার জন্য বিজি নই, অফুরন্ত সময়...
কিছু বলবে?

-উহুঁ।

-তাহলে!

-মিস করছি।

-তাই?

-হুম।

-চলে আসবো?

-আসো।

-একটু পর আসি?

-আচ্ছা, হিহিহি

-হাসলে যে?

-একটু পর মানে যখন কাজ শেষ, ছুটি...

-হুম।

-তবে বললে যে?

-তুমি যে মিস করছো, তাই বললাম।

-মিথ্যুক।

-হুম আমি মিথ্যুক।

-রাগ করলে?

-না

-কেনো?

-পাগলি'র সাথে কে রাগ করে, হুম?

-আমি পাগলি?

-তাইই।

আচ্ছা, একটু ওয়েট করো। আবার আসবো। মিটিং আছে।

-ওকে।
শাহেদ আবার মেসেজ দেবে,
-খুব কি দেরী করলাম?

-না, মাত্র দেড় ঘণ্টা হলো!

-আর আমি তো ভয়ে ভয়ে এলাম। ভাবলাম, রাগ করেছো..

-আমি তেমন না।

-হুম, লক্ষি আর পাগলি।

-আবার!?

-কি!?

-পাগলি বললে কেনো?

-যাও, কানে ধরলাম, আর বলবো না।

-না, বলতে হবে..

-ওকে, বলবো ।

-এখন বলো।

-না, রাতে বলবো।

-রাতে কেনো?

এমন অগোছালো, দুষ্টুমি, লুতুপুতু প্রেমের চ্যাটিং শাহেদ কখনোই করবেনা।

বিয়ে হয়েছে মাত্র দুই বছরও হয়নি। লুতুপুতু প্রেম করতে চাওয়া, সারাক্ষণ শাহেদকে কাছে পেতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শাহেদ একটু যেন কাটখোট্টা।

আচ্ছা, সব হাজব্যান্ডরাই কি একই, কাটখোট্টা?

বিয়ের আগে কারো বন্ধু থাকে, প্রেমিক থাকে। তখন তাদের সাথে একরকম ব্যবহার। আর বিয়ের পর, স্ত্রী'র সাথে কি শুধুই স্বামী হয়ে থাকে?

তখন বন্ধু হলে কি হয়? সাথে প্রেমিকও। বর তো অবশ্যই থাকবে।

কিছু খুনসুটি করলো, কিছু আদর, কিছু প্রেম। কখনো ঝগড়াও করবে, সারাক্ষণ প্রেমও কি ভালো লাগে!?

ঝগড়া করবে, তবে তা সিরিয়াস নয়, মধুর হতে হবে।

রাত্রি শুধুই ভাবে শাহেদকে নিয়ে। আর প্রতিদিনই বারবার ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে।

একদিন রাত্রি খুব করে সাজে। বিয়ের অনেক বছর পর।

ওর খুব করে সাজা মানে মুখে ফেয়ার এন্ড লাভলী, চোখে কাজল, আই লাইনার, মাশকারা আর ঠোঁটে হালকা রংগের লিপস্টিক।

শপিং করতে গেলে এতো এতো সাজের জিনিষ দেখলে রাত্রি অবাক হয়ে ভাবে, এসব কোনটা কিভাবে মুখে লাগায়!

শাহেদ আসার আগেই ফটাফট কয়েকটা সেল্ফি নিয়ে নেয় সে।

আজ বছরের শেষ দিন। শাহেদকে খুশি করার জন্য পুরো বছরটাই সে সাজেনি। পুরো বছর নয় শুধু, দশটা বছর!
আজ না সাজলে যে, এইবছরটারও সাজা হলোনা, মনে হবে।

সাজ যে রাত্রি'র খুব প্রিয় তা শাহেদকে কখনোই বলতে বা বুঝাতে পারলোনা সে।

শাহেদ বাসায় ঢুকেই রাত্রিকে দেখে হেসে ফেলে।

রাত্রিও মুচকি হাসে লজ্জায়।

-সত্যি কথা কি জানো, রাত্রি?

-কি?

-তোমাকে সাজলে খুবই বিশ্রী দেখায়, রাগ করোনা।

রাত্রি রাগ করেনা।

আসলে রাত্রি জানে, এমন একটা কথা শাহেদ বলবেই। তাই সে শুনার মানসিকতা নিয়ে তৈরি ছিলো।

এরপরেও কেনো জানি, কষ্ট লাগে বুকে।

শাহেদ দশবছরের সংসারে কোনোদিন একটা কাজলও কিনে দেয়নি। তার কাছে সাজগোজ দুই চোখের বিষ, তা রাত্রি জানে।

আর জানে বলেই, সাজেনা।

রাত্রিই আগ্রহ নিয়ে কাজল জিনিষটা কিনে।

কিচ্ছু মুখে না লাগালেও, কাজল সে চোখে লাগাবেই।

এই এতোটুকু না সাজলে সে মরেই যাবে মনে হয়।

আইলাইনার মাশকারা কবেকার আগের পড়ে ছিলো ড্রয়ারে, শুকিয়ে প্রায় তলাতে পড়ে আছে।

লিপস্টিকটাও মনে হয় আধা যুগ আগের!

শাহেদের কখনোই রাত্রি'র সাজগোজ করা পছন্দ নয়। শুধু রাত্রি'র নয়, কারু সাজগোজই তার ভালো লাগেনা।

রাত্রি'র বড় বোন যখন টকটকে লাল লিপস্টিক দিয়ে কোনো অনুষ্ঠানে যায়, সাথে প্রায় বিনা সাজের রাত্রিকে মৃত বাড়িতে বেড়াতে আসা মেহমান মনে হয় নিজেকে।

তাকে সান্ত্বনা দিতেই যেন শাহেদ বলে,

-দেখো, সবচেয়ে বেশি সুন্দরী তোমাকেই লাগছে। আর সব ময়দা সুন্দরী!

রাত্রি জবাবে শুধু হাসে।

সে হাসি নিজের কাছেই কান্না মনে হয়।

মনে মনে সে বলে,

-হুম, আমি জানি, কেমন সুন্দর লাগছে! মাঝেমাঝে আমারও ময়দা সুন্দরী হতে যে ইচ্ছে করে!
তাই এই মনের দু:খে মন খুলে হাসতেও পারছিনা এই অনুষ্ঠানে। সাজহীন মুখের মতো প্রাণহীন কাষ্ঠ হাসি বেরুচ্ছে!

-রাত্রি , বেরুবেনা? শাহেদ জানতে চায়।

-হুম, বেরুবো।

বাইরে যাবার আগে বাথরুমে ঢুকে ভেজা টিস্যু দিয়ে ভালোভাবে ঢলে ঠোঁট থেকে লিপস্টিক মুছে ফেলে রাত্রি। মুখে হালকা টিস্যু ঘষে ফেয়ার এন্ড লাভলীর সাদা ভাবটাও মুছে।

নইলে সারাপথ শাহেদের হাসি হাসি মুখ সহ্য করতে হবে।

ঐ হাসিতে প্রেম থাকেনা কিছু, রাত্রি'র পছন্দের সাজ করেছে বলে অবজ্ঞা ভাব থাকে।
একটা সময় ছিলো, শুক্রবার বিটিভিতে বাংলা সিনেমা দেখাতো। সিনেমা শুরু হবার আগে রাত্রি খুব করে সাজতো। কৈশোর বয়সের খেয়াল, হয়তো নায়িকা'র মতো সুন্দরী হতে চাইতো সে। কোথাও বেড়াতে গেলেও সাজতো। বাবা স্নো, পাউডার, লিপস্টিক, কাজল, গালে লাগাবার রোজ সব শেষ হতেই এনে দিতো।

এরপরেও, শাহেদের সাথে বেরুতে রাত্রি'র খুব ভালো লাগে ।
কার না, ভালো না লাগে বর এর সাথে ঘুরতে?
সে একা বের হলে, বেশিক্ষণ ঘুরা যায়না, কোথায় ঘুরবে পিচ্চি মেয়ে নিয়ে!
তাই রাত্রি, শাহেদের সাথে যেতে চায়, দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকতে পারবে বলে।
রাত্রি আর তাদের মেয়ে দুইজনই বাইরে ঘুরার জন্য পাগল।
ছোট্ট ঘরে তাদের সারাদিন বসে শুয়ে থাকতে হয়, ভালো লাগেনা। বড় বাচ্চা দুইজন তো স্কুলেই থাকে।

তবে রাত্রি ঘরে ফিরে আসতে আসতে প্রতিবারই থমথমে মুখে প্রতিজ্ঞা করবে, আর কখনোই সে শাহেদের সাথে বেরুবে না, কখনোই না।

শাহেদ যখনই বলে,
-রেডি হও, চলো একটু হেঁটে আসি।
আমি নিচে নামছি, তোমরা তাড়াতাড়ি আসো।
-দশ মিনিট সময় দাও বলে,
পাঁচ মিনিটেই সে মেয়েকে ঘরে পরা জামার উপর জ্যাকেট চাপিয়ে দিয়ে, জুতো পরিয়ে, মাথায় টুপি দিয়ে রেডি করে দেয়।
তারপর নিজেও প্যান্ট, জ্যাকেট, স্কার্ফ, সু পরে রেডি হয়ে চোখে একটু কাজলের টান দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামে।
দেখে তখনো দশমিনিট পার হয়নি। শাহেদও তার সিগারেট শেষ করতে পারেনি ।
মেয়েকে পুশচেয়ারে বসিয়ে তারা হাঁটা শুরু করে।
তারপর, হাঁটতে হাঁটতে কোনো শপিং মলে ঢুকে।
মেয়ে তার আগেই পুশচেয়ার থেকে নেমে যাবে।

সে প্রত্যেকটি দেয়ালে লাগানো এড, ছবি সব ধরে দেখতে চাইবে।

কোনো দোকানের আয়নার বাইরে থেকে দেখা সোপিস গুলোকে আয়নার উপরই চুমু খাবে, ছুঁতে চাইবে।

দোকানে ঢুকার পর সে খুঁজে পেতে খেলনার সেকশনে চলে যাবে। প্রতিটি খেলনা ধরে ধরে দেখবে, চাবি গুড়িয়ে দেবে।

তখন খেলনা বেজে উঠলে, সে মিউজিকের তালে নাচবে।

পছন্দ করে একটা পুতুল নিয়ে ওটাকে বুকে জড়িয়ে রাখবে, বারেবারে চুমু খাবে। ফ্লোরে শুইয়ে দিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে পুতুলকে ঘুম পাড়িয়ে, অন্যপুতুল গুলো দেখবে।

শাহেদ কিছু কেনার হলে, ঘুরে ঘুরে সেসব দেখবে আর রাত্রি সারাক্ষণ পুশচেয়ার হাতে মেয়ের পেছন পেছন ঘুরবে।

ঘুরা শেষ হলে, মেয়ে কিছুতেই তার বেবিপুতুল ছাড়বেনা। কাঁদবে, চিল্লাবে।

আর শাহেদ প্রতিবারই খুবই অসন্তোষ হয়ে রাত্রি'র সাথে রাগারাগি করবে, আর কখনো তাদের বাইরে না আনার প্রতিজ্ঞা করবে। যেন সব দোষ রাত্রি'র!

আর যদি তারা কোনো বাজার করতে যাই, তবেই হয়েছে।

শপিং মলগুলোতে একেক পাশে একেক জিনিষ রাখা হয়। উপরে লেখা থাকে, এই পাশে কি কিংবা ঐ পাশে কি। খুঁজতে সমস্যা হয়না।

মেয়ের পেছনে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আর শাহেদ এর প্রায়ই চিল্লানি শুনে, রাত্রি অনেকটা নার্ভাস থাকে। আর তাই ভুল করে প্রথম সারিতে যা আছে, তা আগে না নিয়ে তৃতীয় বা অন্য কোনো সারির জিনিষ নিতে চলে যায়।

শুরু হয়, শাহেদ এর চ্যাঁচামেচি, চিল্লানি,

-কোথায় যাচ্ছো?

-দুধ নিতে।

-কেনো রুটি লাগবেনা?

-লাগবে।


-তাহলে আগে রুটি না নিয়ে দুধ নিতে যাচ্ছো কেনো?
চোখ নেই, দেখবেনা কোনটা আগে?
এতো বছর ধরে আসছো, এরপরেও মনে থাকেনা তোমার, কোথায় কি আছে, আশ্চর্য!!
একা আসলে কি করো, পুরো শপিং মল দশবার চক্কর দাও, না? বেকুব কোথাকার!

রাত্রি'র চোখ ভিজে উঠে, কথা গলায় আটকে যায়।

আসলে সে একা আসলে খুব তাড়াতাড়িই কিনতে পারে বরং।

কারণ, শাহেদ এর চোখ রাঙানো, চিল্লানির ভয় থাকেনা তখন।

মেয়ের পেছন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তার, দশ নয়, মলে বিশ চক্কর দিতেও তখন কষ্ট হয়না, মজাই লাগে।

আর শাহেদের সাথে আসলে বুকে একটা চাপা ভয় থাকে, কখন কি ভুল হচ্ছে, কখন তার প্যানপেনে, ভুল ধরা স্বভাব শুরু হবে, এই টেনশনে।

রাত্রি যদি বলে,

-এই জিনিষটা এই মার্কেটে দাম বেশি, ঐ শপিং মলে সস্তা, ওখান থেকে নিই?

তাহলে শাহেদ আরেকপ্রস্ত ঝেড়ে নেবে তাকে।

-এই সামান্য জিনিষের জন্য ঐ মলে যেতাম!তুমি পাগল?

-আজ নয়, অন্যসময় না হয় নেবো। আজ বেশি প্রয়োজন নেই এটার।

-অন্যসময় বের হবে এই একটা জিনিষের জন্য! শোন, আমার সাথে এলে এসব ফালতু কথা বলবেনা। এক শপিংমল থেকেই সব নিতে হবে। এক দোকান থেকে অন্য দোকানে দৌঁড়াদৌঁড়ি, এতো ফালতু সময় আমার নেই। তুমিই করো ওসব, ওকে?

আর তারা যদি কার নিয়ে বের হয় বা বাজার করতে যায়, তবে তো শাহেদের চোখ রাঙানো আরো আগে শুরু হবে।

দুই বছরের মেয়েটা কার একেবারে পছন্দ করেনা।

তার কাছে তা অসহ্য মনে হয়।

সে তার কার সিটে বসবেই না। বারবার ডোর খুলে বের হয়ে যেতে চাইবে, কাঁদবে।

আর তার বাবা শাহেদও প্রতিবার কসম খাবে, এই মেয়ে আর তার মাকে নিয়ে কোনোদিন বের হবেনা। সারাপথ সে এটাই বারবার বলতে থাকবে।
রাত্রি, মেয়ে সামলাবে নাকি শাহেদের বকা শুনবে, খুব কষ্ট লাগে তার।
বাজার শেষে আবার মেয়ের কান্না, কার এ কিছুতেই উঠবেনা সে।
বাজার যদি সামান্য দূরে হয়, শাহেদ একাই কার নিয়ে বাসায় চলে যায়।
রাত্রি তার কন্যাকে নিয়ে হেঁটে আসে।
মেয়ে মনের আনন্দে এতোটা পথ হেঁটেই আসবে, রাত্রিকে হাত ধরতে পর্যন্ত দিতে চাইবেনা। সে তখন স্বাধীন। আর রাত্রি অতি সাবধানে মেয়ের সামনেপিছনে আগলে আগলে পথ চলতে থাকে।

শাহেদ যদি কোনো জিনিষ, জামা কাপড় এসব কিনতে যায়, তবে তো রাত্রি পথেই কান্না করবে, গোপনে। আর শাহেদও খুব বিরক্ত হয়ে থাকে সারাক্ষণ।
-কি কিনবে, শাড়ি না থ্রিপিস?
-থ্রিপিস।
-ওকে পছন্দ করো।
-তুমি পছন্দ করে দাও...
এ কথা শেষ করতে দেবেনা শাহেদ।
-সারাজীবন এই এক কথা, তুমি পছন্দ করে দাও।
কেনো তোমার নিজের কোনো চয়েস নেই? তুমি পরবে নাকি আমি পরবো?
এতোটা বছর ধরে জ্বালাচ্ছ তুমি। বিরক্ত এসে গেছে, পছন্দ করে দাও-এই কথার উপর।

রাত্রি'র মুখ গম্ভীর হওয়া শুরু হয়।
রাত্রি'র মাথায় ঢুকেনা, এটাতে সে কি জ্বালালো!
বরং বরের খুশি হবার দরকার, বউ তার পছন্দে কিনতে চাইছে বলে।
তারপর রাত্রি একটা পছন্দ করে দেখালে, শাহেদ ভেংচি কাটবে।
-এটা একটা কাপড় হলো, কি দেখছো এসব!
তখন সে পছন্দ করে দেয় একটা।
-সুন্দর না? শুধু সুন্দরই নয়, সেরা কাপড় এটা। তুমি কিসব পছন্দ করো! এখনো পছন্দ করতেও শিখলেনা!
রাত্রির পছন্দ হোক বা না হোক, তারা ওটাই কিনে নিয়ে আসে।
আর আসতে আসতে রাত্রি প্রতিজ্ঞা করে,
পরের বার সাথে যেতে বললেও যাবেনা সে।

তবে এক সপ্তাহের ভেতর আবার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয় তার।
শাহেদ যখন বলে, চলো ঘুরে আসি।
সেও দশমিনিটের ভেতর আসছি বলে, চোখে কাজল লাগায়।

একবার দেশে গেছে তারা। ভার্সিট'র সব বন্ধুরা গেট টুগেদার করবে বলে ঘোষণা দেয়। রাত্রি শাহেদের সাথে আলোচনা করে।

- এ্যাই, শাহেদ, জানো, ভার্সিটি তে আমাদের কয়েক ব্যাচের মিলন মেলা হবে!
আমার যা খুশি লাগছে! কতো পুরনো বন্ধু বান্ধবীদের সাথে দেখা হবে আর নতুন অনেকের সাথে পরিচয়।
- হুম, তা কবে যাচ্ছো রাত্রি?
-আগামী মাসের ০৫ তারিখ, শুক্রবার, সবার বন্ধের দিন।
-ভালো, যাও। ঘুরে আসো, ভালো লাগবে। নতুন পুরনো মানুষ দেখবে। অনেক কিছু জানবে, দেখবে, শিখবে, ভালোই তো। মাঝেমাঝে এমন গেট টুগেদার হওয়া খুব ভালো।

শাহেদের কথা শুনে রাত্রি খুশিতে আরও উতলা হয়।
-সত্যি, তাই না!
-হুম তাই, তবে কি জানো....?
-কি?
-সবার সাথে দেখা হবে, কথা হবে...
-হুম, তারপর?
-ফোন নাম্বার, ফেসবুক আইডি আদান প্রদান হবে।
-হুম।
-তারপর চ্যাটিং
-তো?
-চ্যাটিং মানে শেষ পর্যন্ত কি চায়, জানো?
-কি?
-বিছানা..
-মানে!?
-মানে সহজ। তোমার ইমোশন নিয়ে খেলবে, শেষে বিছানায় যাবার আমন্ত্রণ জানাবে।
-এসব কি বলছো!?
কেউ বিছানায় ডাকবে, আর আমি দৌড়ে চলে যাবো!? এটা কোনো কথা!
-সিচুয়েশনই এমনভাবে তৈরি করবে, তুমি বাধ্য হবে।
-আর আমি যদি পুরুষ কাউকে আইডি, ফোন নাম্বার না দিই? তাহলে তো আর সমস্যা নেই।
-মেয়েরা আরও ডেঞ্জারাস!
-মেয়েতে কি প্রবলেম আবার!
তারা তো আর বেডে যেতে বলবেনা...
-বলবে, অনেক মেয়ে এমনও আছে।
-ছিঃ কি বলো এসব!
-ছিঃ না, বাস্তবতা। আর একেকজন তোমাকে একেক তাল দিবে?
-আমাকে কি তাল দিবে?
-তুমি বোকা তাই বুঝতে পারছোনা।
-বলো, শুনি..
-একজন বলবে, তোর জামাই ভালো? প্রশংসা করছিস! দেখ, তলে তলে পরকিয়া করছে কিনা!!
আরেকজন বলবে,
সে তোমাকে ধমক দেয়! কি বলছো! সহ্য করো কিভাবে? আমি হলে কবেই ত্যাগ করতাম!!
তুমি কনফিউজড হবে। ভালো মন্দ না বুঝে সংসারে অশান্তি আনবে।
-হুম, যেতে মানা করছো, এইতো?
-না, মানা করছিনা, যাও। তবে সাবধান করছি।

দুই একজন বান্ধবী'র সাথে রাত্রি'র যোগাযোগ আছে। তারা ফোন করে।
-রাত্রি, আসছিস তো?
-হুম।
-চল, সবাই শাড়ি পরি। এমনি তো ব্যস্ততায় আর পরা হয়না।
-আচ্ছা।
-কি রঙের পরবি?
-তোরা বল।
-সবাই নীল পরি, কি বলিস? আছে তো তোর?
-হ্যাঁ, আছে।
-ওকে তবে, নীল। ডান।
-ডান।

৫ তারিখ।
-রাত্রি, তুই কই? দেখছিনা কোথাও?
-মেয়েটার খুব অসুখ, আসতে পারছিনারে। স্যরি।
-স্যরি কেনো? আহারে..
মেয়ে দেখ, তোকে খুব মিস করবো।

শাহেদ এর এতো এতো সাবধান বাণী'র পর রাত্রি'র আর যাওয়া হয়না।
শাহেদ এর কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে রাত্রি'র,
তুমি এমন কয়জন মেয়েকে বিছানায় নিয়ে গেছো?
জিজ্ঞেস করা হয়না, অন্যরা ঘরে অশান্তি আনবে বলে এতো সাবধান করছে। সে নিজে কিভাবে আনে!?

তবে শাহেদ খুউব ভালো, কোত্থাও যেতে বারণ করেনা।

একদিন রাত্রি শাহেদকে জিজ্ঞেস করে,
আচ্ছা, আমাদের ছোট মেয়েটাকে স্কুলে দিলেই তো আমি কোনো কাজে ঢুকে যেতে পারি, কি বলো?
অবশ্যই পারো।
রাত্রি জবাব শুনে খুশি হয়ে যায়।
বলে, হুম।
তবে...শাহেদ কিছু বলতে চাই।
কি?
আমি চাকরি ছেড়ে দেবো। দুইজন চাকরি করলে সংসার দেখবে কে?
বারে আমি দেখবো।
তা হয়না।
কেনো, অনেক মেয়েই তো সংসার চাকরি দুটোই ঠিকঠাক করছে।
উঁহু। খবর নিয়ে দেখো, তাদের সংসারে শান্তি নেই। ঝগড়া ঝাটি অশান্তি লেগে আছে। কাজ নিয়ে ভাগাভাগি। মেয়েরা কাজ করলে, দুই পয়সা হাতে আসলে স্বামীকে মানুষ ভাবেনা আর। চাকর বাকর ভাবে। তাদের পিঠে দুইটা ডানা গজায়। তাদের স্পর্ধা বেড়ে যায়। হাঁটতে বসতে স্বাধীনতার গান গায়। কলিগের সাথে বেলাল্লাপনা করে। শেষ পর্যন্ত কি হয় জানো? ডিভোর্স।
কাজ করতে মানা করছো, এইতো?
না, না মানা করবো কেনো, ভবিষ্যৎ টা কেমন হবে একটু ধারণা দিলাম। তুমি কাজ করতে যেও। আমার কোনোই সমস্যা নেই। বাস্তবতা কেমন তোমারও জানা দরকার, বুঝা দরকার। আমি এখন যা করছো তাই করবো, সংসার সামলাবো। আমার কোনো আপত্তি নাই।
রাত্রি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

রাত্রি প্রায়ই কিছু না কিছু ভুলে যাচ্ছে আজকাল।

আজ টাকা রেখেছে, মোবাইল কেইসে।

কিন্তু সে বেমালুম ভুলে বসে আছে।

রাত্রি, টাকা খুঁজতে খুঁজতে ব্যাগের সব জিনিষ ফ্লোরে রাখলো। সব কোট জ্যাকেটের পকেটে খুঁজলো।

আলমারি, বালিশ, বেডের নিচ, কোথাও বাদ রাখেনি।

শেষ পর্যন্ত, ডাস্টবিনে খুঁজে। অন্যমনস্ক হয়ে, কাগজ ভেবে দলা করে ফেলে দিলো কিনা, তাও চেক করলো!

বাচ্চারা তো হায় হায় করে উঠলো,

-ছিঃ আম্মু, ডাস্টবিনে খুঁজছো!?

-ছিঃ করার কি আছে, ডাস্টবিনে তো বেশিরভাগ তোদের ছেঁড়া কাগজ, আর মনের আনন্দে সারাদিন যা খেয়েছিস, তার কিছু এঁটোই থাকে।

-তবুও..

-তবুও কি... এত্তোগুলো টাকা ফেলে দিবো?

তবে রাত্রি সিউর, টাকা ঘরেই আছে। সে এখনো কোথাও বের হয়নি। আর ঘরেও কেউ আসেনি। বাচ্চারা না বলে, এক পয়সাও ধরবেনা।

এবার রাত্রি, শাহেদকে টাকা হারিয়ে গেছে এবং আর কোথাও সে কোনো টাকা রেখে গেছে কিনা, তা জানতে যেই ফোন হাতে নিলো, দেখে টাকার এক কোণ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে...

তখন তার ইচ্ছে করছিলো, টাকাগুলো ছিঁড়ে ফেলে। আজ অনেক জ্বালিয়েছে তারা।

এতো টেনশনের পর আর বাজার করতে যেতে ইচ্ছে করেনা রাত্রি'র।

কিন্তু বাসায় আসলে এসব শুনার পর, শাহেদ কেমন প্রতিক্রিয়া করবে, এই ভেবে সে তৈরি হতে লাগলো।

শাহেদ অবশ্যই বলবে,

তুমি বেকুব, ভুলো মন, বোকা ইত্যাদি ইত্যাদি...

এসব শুনতে শুনতে, এতোদিনে তার অভ্যস্ত হয়ে যাবার কথা। সময় তো কম হয়নি তাদের দাম্পত্যের, প্রায় চৌদ্দ বছর!

কিন্তু রাত্রি'র অভ্যাস হচ্ছেনা। সে যথেষ্টই কষ্ট পায়। যদিও সে প্রতিবাদ করেনা।

প্রতিবাদ করা মানে তর্ক, ঝগড়া, চিল্লাচিল্লি যা রাত্রি'র কখনোই পছন্দ নয়।

এমন ভুল শাহেদেরও অনেকসময় হয়। রাত্রি তা দেখিয়ে না দিয়ে শাহেদকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে,

-ভুল হওয়া স্বাভাবিক। চাবি, মোবাইল রেখে যাওয়া, ওয়ালেট ভুলে যাওয়া খুব বড় ভুল নয়, এমন ভুল সবারই হয়।

কিন্তু এটা রাত্রি'র বেলায় ঘটলে শাহেদের রক্তচক্ষু, বকাঝকা না শোনাটাই অস্বাভাবিক ব্যাপার বা ঘটনা হবে।

রাত্রি, খুব খেয়াল করে করে সব নিয়ে তবেই বের হয়। চাবি, মোবাইল, হাত ব্যাগ, ব্যাগে পানি, মেয়ের খাবার সবই নেয়।

এরপরও ভুল হয়ে যায়। ব্যাগের ভেতর টাকা রাখা হয়না।

অনেকসময় সে ইচ্ছে করেই টাকা নেয়না, কারণ শাহেদ তো সাথে আছে।

কিন্তু এটাই তার ভুল।

তখনই শাহেদ ইচ্ছে করে হলেও বলবে,

-দেখি পঞ্চাশটা টাকা দাও..

-টাকা তো আনিনি।

-কেনো?

-তুমি সাথে আছো তাই...

এরপর, শুরু হবে শাহেদের দীর্ঘ ভাষণ...

-তোমার কাছে টাকা রাখি কেনো?
আমি সাথে নাও আসতে পারতাম, তখন?
আমার টাকা নাও থাকতে পারতো..
তোমার আক্কেল কখন হবে আর.. ইত্যাদি ইত্যাদি।

রাত্রি প্রতিদিনের সব কথা ডায়রিতে লিখে রাখে। আসলে কারো সাথে শেয়ার করা যায়না।

কার সাথেইবা করবে, শেয়ার করা মানে, নিজের দুর্বলতা কারো কাছে প্রকাশ করা।

আর একবার প্রকাশ হয়ে গেলে, তার কাছে বাঁধা পড়ে যেতে হয়। ভয়ে ভয়ে চলতে হয়, কখন আবার দেখিয়ে দেয়, কাউকে বলে দেয়!

তবে কারো সাথে শেয়ার করতে পারলে হয়তো শান্তি লাগতো, মন হালকা লাগতো।

রাত্রি'র বিশ্বস্ত তেমন কেউই নেই, যে গোপন কথা গোপন রাখবে।

আরেকটা কথা সে প্রায়ই ভাবে, সে নিজের কথা গোপন রাখতে পারলোনা বলেই, অন্যকে বললো। যেখানে সে নিজেই গোপন করতে পারলোনা;
সেখানে, অন্য আরেকজন তা অন্য কারো সাথে তার কথাগুলো শেয়ার করবেনা, তার কি গ্যারান্টি!?

তাই ডাইরি তার সুখ দু:খের সাথী।

সে তার কষ্টের কথা যেমন লিখে, তেমনি শাহেদ এর সাথে কাটানো ভালো লাগার মুহূর্তগুলোও গুছিয়ে লিখে রাখে।

ভালো লাগা, ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস সবকিছু লিখতেও সে কার্পন্য করেনা।

বরং মনের আনন্দে তা অনেক সুখ নিয়েই লিখে।

রাত্রি খুব ভালোবাসে এসব।
যেমন লিখেছিলো, প্রথম বাচ্চা পেটে আসার পর শাহেদ তাকে কি ভালোবেসেই না খাবার তৈরি করে খাইয়েছিলো তা। এখনো যেন সেরাত রাত্রি'র চোখে ভাসে।

রাত্রি খিদেয় ছটফট করছিলো সে রাতে। একেবারে রাক্ষুসে খিদে।
অথচ রাতে পেটভরে খেলো, দুইমাস ধরে সব লজ্জার মাথা খেয়ে প্লেটভরে ভাত নিয়ে খাচ্ছে সে।
বিয়ের প্রথম প্রথম, কয় মাস লজ্জায় খুব অল্প খেতো, কিন্তু তবুও তখন তেমন করে খিদে লাগতো না।
কিন্তু এখন চারঘণ্টাও হয়নি, ভীষণ খিদে পেয়ে গেলো । ছয়মাস হলো তাদের বিয়ের।

দশটায় খেয়েছে তারা। কাজ সেরে কিছুক্ষণ টিভি দেখে, সাড়ে এগারোটায় শুতে এলো। বারোটা বাজতেই শাহেদের নাক ডাকা শুরু।
রাত্রির কোনোভাবেই ঘুম আসছেনা। প্রথমত, শাহেদের নাক ডাকা।
ঘুমে কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেনা সে।
তারপর, রাত একটা হতেই পেটের ভেতর খিদে জানান দিচ্ছে।
মাত্র চারমাসে পড়েছে, পেটের বাচ্চাটার। এখনই এমন খিদেয় অস্থির হচ্ছে সে, বাকি আরো পাঁচমাসের বেশি সময়, সে কিভাবে কাটাবে বুঝে উঠতে পারেনা !
অবশ্য প্রতিদিন ঘুম না আসলে সে ফ্রুটস কিছু খেয়ে নেয়।
শ্বাশুড়ি নিয়ম করে, তার আর শাহেদের জন্য হাতে দিয়ে দেন। শাহেদ প্রায়ই খায়না, রাত্রি খেয়ে নেয়, আর খিদেও লাগেনা তার।
কিন্তু আজ তিনি সম্ভবত ভুলে গিয়েছেন। রাত্রিরও চেয়ে আনতে লজ্জা লেগেছে।
এদিকে, শাহেদকেও ডেকে তার কাঁচা ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করছেনা।
কি সুন্দর মুখ হা করে বাচ্চাদের মতো ঘুমুচ্ছে সে!
মৃদু মৃদু নাকও ডাকছে।
শাহেদ প্রতিবার দুপুরে ঘুমালে, উঠে জানতে চায়,
-এ্যাই রাত্রি, এখন কি আমি ঘুমে নাক ডেকেছিলাম?
-হ্যাঁ।
-তাহলে ঠিক আছে, ফ্রেশ ঘুম দিয়েছি। এখন বাকি দিন ঝরঝরা লাগবে।
-নাক ডাকা মানে ফ্রেশ ঘুম!? আমি তো শুনেছি অন্যকিছু...
-অন্যকিছু কি?
-শোয়ার সমস্যা, বেশি শারীরিক ওজন, শ্বাস

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement