ভ্যালেন্টাইন তো ভালোবাসার সাথেই সম্পর্কিত, নয় কি? এটা নিখাদ ভালোবাসার এক গল্প। একজন বিদেশিনীর প্রেম ভালোবাসা দিয়ে আমাদের মত কাউকে আপন করে নেবার গল্প। গল্পের নাম কি হবে সেটা নিয়ে ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম। গল্পের নায়িকা ভালোবাসায় মজেছেন গল্পের নায়কের আত্মার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে। কাল্পনিক পরশ পাথর লোহাকে সোনা বানায় কিনা জানিনা, তবে আমাদের নায়কের আত্মিক পরশ পাথর কিন্তু বিদেশিনী পাথরকে সোনা বানিয়ে ফেলেছে। 'পরশ পাথর' থেকে গল্পের নাম 'পরশ'।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৮টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

পরশ
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

আসাদুজ্জামান খান

comment ৪  favorite ০  import_contacts ২৬৬
(১)
সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টটা দারুন। অনেকের মতেই এশিয়ার সেরা। সুবিশাল, সাজানো গোছানো, পরিচ্ছন্ন, চমৎকার যাত্রীসেবা, বিনামুল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট, হালাল খাবার, আর সবচেয়ে যা ভাল লাগে, তা হল বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রার্থনা কক্ষ। দেশে ফেরার পথে আমি সাধারনত বেছে বেছে সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টেই ট্রানজিট নেই। এবারে প্রায় ১২ ঘন্টার ট্রানজিট।
জোহরের নামাজের পরে একমগ কফি নিয়ে এককোনে কার্পেটের উপর কম্পিউটার খুলে বসি। কিছু প্রয়োজনীয় মেইলের উত্তর দেয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটু ঘোরাঘুরি ইত্যাদির ফাকে সামনে তাকাই। এক আরব দম্পতি যাচ্ছে। দুজনের সাথে দুটো ট্রলি। মাঝখানে জুতায় 'পিক পিক' শব্দ তুলে লাফাতে লাফাতে কখনো হাঁটছে কখনো দৌড়াচ্ছে ২-৩ বছর বয়সী কন্যা। মা গুনগুন করে করে কোন এক অজানা আরবীয় সুর গেয়ে চলেছেন, আরেক পাশে বাবার গর্বিত মুখ। মাঝখানে যেন এক রাজকন্যা।
ঘড়িতে দেখি আমার ফ্লাইটের আরো আট ঘন্টা বাকি। ভাবছিলাম, একটু ঘুমিয়ে নেবো নাকি। চোখের কোনে দেখতে পেলাম, সামনে দিয়ে হেটে যাওয়া মানুষদের মধ্যে দুজন হঠাত সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আচমকা ঝুঁকে একজন আমার কাঁধে হাত রেখে বলল "দোস্ত কেমন আছিস?"
চমকে সামনের মানুষটির দিকে তাকালাম। হোসেন! ‘ডক্টর হোসাইন আলী’। ছেলেবেলার বন্ধু। সে ছিল আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী। ইউনিভার্সিটি অব হংকং থেকে পিএইচডি করে এখন পাপুয়া নিউগিনির একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা পড়ায়। বছর দুয়েক তেমন কোন যোগাযোগ ছিলনা। ওরধরনের মানুষেরা সাধারনত ফেসবুক ধরনের জিনিস তেমন একটা ব্যাবহার করেনা। অনেকদিন পরে দেখা হয়ে বেশ ভালো লাগল। আমার এই বিদ্বান বন্ধুটি সবসময় অতি সাধারন এবং বিনয়ী। কিন্তু পাশের মানুষটির দিকে তাকিয়ে আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। লম্বা ঢোলাঢালা কাপড়ে শরীর ঢাকা, মাথায় হিজাব নিয়ে এক শ্বেতাঙ্গ তরুনী। আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। হোসেন পরিচয় করিয়ে দিল-
"তোর ভাবী। ফাতিমা। ইউরোপিয়ান মুসলিম। কনভার্টেড অবশ্য"
ইউরোপিয়ান ভাবী আমাকে ইশারায় সালাম দিল।

(২)
আমার বিস্ময় যাচ্ছেনা। হোসেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লাজুক ছেলে ছিল। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের খুব এড়িয়ে চলত। সবাই হাসি-ঠাট্টা করত এ'নিয়ে। এমনকি মেয়েরাও। কয়েকবছর আগে ওর সাথে একবার হংকংএ দেখা হয়েছিল। দু'দিন ওর কাছে থেকে হংকং ঘুরে দেখছিলাম। ভিক্টোরিয়া হার্বারের তীরে দাঁড়িয়ে নতুন-পুরাতন ধরনের রঙবেরঙের জাহাজের ভেসে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গল্প করছিলাম। তখন গরমের দিন। চারপাশে প্রচুর স্বল্পবসনা তরুনী।
আমি ঠাট্টা করে বললাম, "দেশেতো মেয়েদের একেবারে এড়িয়ে চলতি। এখানে এতসব স্বল্পবসনাদের চারপাশে রেখে চলিস কিভাবে?" হোসেন মৃদু হেসে বলল-
"তুইতো বায়োলজীর ছাত্র ছিলি। তোকে বোঝানো সহজ হবে। মানুষের জীবনের সব কিছু নিয়ন্ত্রন করে কোন অঙ্গ?”
“মস্তিষ্ক”,
“হ্যা, মস্তিষ্ক। মস্তিষ্ক বলে এটা ঠিক, এটা বেঠিক। এই যে গতকাল আমরা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলাম। হালাল খাবারের দোকান না পেয়ে আমাদের বিকেল অব্দি না খেয়ে থাকতে হল। আশেপাশের খাবার দোকান থেকে শুকরের মাংস রান্নার ঘ্রান আসছিল। তোর কি মনে হয়েছিল, কিংবা আগ্রহ হয়েছিল ওখান থেকে খেয়ে নিতে?"
"না"
"কেন?"
"কারন ওটা হারাম"
"হ্যা, ঠিক তাই। আমাদের মস্তিষ্ক বলে ঐ শুকরের মাংসটা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ বা হারাম। তাই যদিও সুস্বাদু, আমাদের কোন আগ্রহ হয়নি। আবার ধর, তুই যে ম্যাকাও ঘুরে এলি, যেখানে সবজায়গায় জুয়া চলছে, তুই খেললিনা কারন এটা নিষিদ্ধ বা হারাম। আমাদের মস্তিষ্কই বলে দেয়, এই কাজটা আমার জন্য নিষিদ্ধ। তো আমরা যদি আমাদের মস্তিষ্কে ভালোভাবে সেট করে দেই যে নিজের বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া সকল রমনীই আমার জন্য নিষিদ্ধ বা হারাম, অর্থাৎ এই তরুনীরা যতই আকর্ষনীয়া হোক না কেন আমার জন্য নিষিদ্ধ, তাহলে তো আমাদের মনমধ্যে কোন সমস্যা হওয়ার কথা না"। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম ওর দর্শন আর চারিত্রিক দৃঢ়তায়।
সেই হোসেনের ইউরোপিয়ান বউ! নাহয় বুঝলাম, এই মেয়ে এখন আমাদের ধর্ম-সংস্কৃতি অনুসরন করছে, কিন্তু একে তো পটাতে হয়েছে! সেটা হোসেন কিভাবে করল! নাকি এ’ই হোসেনকে পটিয়েছে! হোসেন বোধহয় বুঝতে পারল আমি খুব অবাক হয়েছি। হেসে জিজ্ঞাসা করল-
"বাংলাদেশে যাচ্ছিস? তোর হাতে কতক্ষন সময় আছে? "
"হ্যা, দেশেই যাচ্ছি। আরো ৬-৭ ঘন্টা আছে"
"চল কোথাও গিয়ে বসি। আমাদের হাতেও ৩-৪ ঘন্টা আছে। নিউগিনি যাচ্ছি।"
"কোথা থেকে আসলি?"
"পোল্যান্ড। ফাতিমা পোল্যান্ডের মেয়ে"।

(৩)
কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে হোসেন তার গল্প বলা শুরু করলঃ…………………
বছর তিনেক আগে আমি যখন আমার দ্বিতীয় পোস্টডক রিসার্চ শুরু করতে গেলাম, ইউনিভার্সিটি আমাকে জানালো আমার ডর্মে থাকার মেয়াদ শেষ। এখন আমাকে বাইরে আবাসন খুজে নিতে হবে। বিষয়টা আমার প্রোফেসর জিয়াং সাহেবও জানতেননা। আমি মহা মুশকিলে পড়লাম। হংকংএর মত জায়গায় হঠাত করে আবাসিক বাসা পাওয়া এত সহজ নয়। সপ্তাহখানেকের মধ্যে ডর্ম ছেড়ে দিতে হল। একদিন প্রোফেসর জিয়াংএর বাসার ড্রয়িংরুমে আর তিনদিন এক মোটেলে রাত কাটালাম। অনলাইন অফলাইনে পাগলের মত বাসা খুঁজি। হঠাত করেই পেয়ে গেলাম। দুই-বেডরুমের ফ্লাট। আরেকজনের সাথে শেয়ার করতে হবে। তিনমাসের ভাড়া অগ্রীম দিয়ে দিতে হবে। হংকংএর বাসাভাড়া জানিসতো! খুবই ব্যায়বহুল। আমি যদি একা বড় ফ্ল্যাট নিতে যাই, আমার বেতনের সব ডলার এখানেই শেষ। তাছাড়া দেশে বাবা-মা আর ভাই-বোনদের কাছে টাকা পাঠিয়ে আমার হাতে আর ক’টাকাই বা থাকে! আমি ভাড়ার টাকা অগ্রীম দিয়ে সাথেসাথেই বাসাটা নিয়ে নিলাম। জানিয়ে দিলাম পরদিনই উঠছি।
হাউজিং কোম্পানির কাছ থেকে চাবি নিয়ে বাসায় নিজের রুমে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। ছোটফ্ল্যাট কিন্তু সাজানো গোছানো। দুই বেডরুম বাথরুমসহ, সামনে ছোট একটা ড্রয়িং রুম, এক চিলতে রান্নাঘর। হংকংএ এই অনেক। আমার হাউস-মেটের সাথে দেখা বা পরিচয় হলনা। তার রুম বন্ধ। আমি আমার বাক্স-পেটরা থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে গুছিয়ে রেখে ইউনিভার্সিটিতে চলে এলাম। সন্ধ্যায় যখন ফিরলাম তখনও হাউসমেটের দরজা বন্ধ। অনেক রাতে টের পেলাম, সে বাইরে থেকে ফিরেছে। যাইহোক প্রথম তিনদিনে তার সাথে আমার দেখা হলনা। এবং আমি তার রুটিন বুঝে ফেললাম। সে গভীর রাতে ফেরে আর অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমায়।
শনিবার সকালে ফযরের নামাজের পরে একটু ঘুম দেই। পুরো সপ্তাহের জমানো ক্লান্তি যেন এতে দূর হয়। বেলা দশটার দিকে রুমের দরজা খুলে বের হয়ে ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। ড্রয়িংরুমের সোফায় হাতে মগ নিয়ে এক শেতাঙ্গীনি তরুনী বসে আছে। আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে বলল “হাই, মর্নিং। আই অ্যাম মাগদালেনা। নাইচ তু মিত ইউ”। উচ্চারনে বুঝলাম সে পুর্ব-ইউরোপিয়ান হবে। সে জানালো সেই আমার হাউসমেট। এবং তিনদিন ধরে আমার সাথে দেখা করতে পারেনি বলে সে দুঃখ প্রকাশ করল।
আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম। একটা মেয়ে আর আমি একবাসায় থাকব! একি করে হয়! আমাদের সংস্কৃতিতে এটা ভাবাই যায়না। কিন্তু কি করতে পারি! তিনমাসের ভাড়ার টাকা অগ্রীম দিয়ে দিয়েছি। আমার হাতে তেমন টাকাও নেই। তাছাড়া এই সংকট সময়ে আমি সাথে সাথে নতুন বাসাই বা কোথায় পাবো! এক বন্ধুর কাছে পরামর্শ চাইলে সে বলল, “এখানে এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সে তার মত থাকুক, তুমি তোমার মত।” সপ্তাহখানেকে বুঝলাম, এই বাসায় কোন সমস্যাই নেই। সকালে উঠে আমি যখন নাস্তা করে চলে যাই, ম্যাগডালেনা তখন ঘুমে। সন্ধ্যায় আমি ফিরে রান্নাবান্না করে খাওয়াদাওয়া করে যখন ঘুমাতে যাই, তারও বেশ পরে সে ফেরে। রাতে হয়ত রান্না করে অথবা বাইরে খেয়ে আসে, তা নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকালে দেখা হয়। হাই হ্যালো হয়, এই।
একদিন সে আমাকে ধরল। পূর্ব ইউরোপিয়ান উচ্চারনের ভাঙ্গাভাঙ্গা ইংলিশে আমাকে জিজ্ঞাসা করল “আচ্ছা, তুমি কেমন মানুষ হে। তোমার সাথে আমার দেখা প্রায় হয়ই না। ছুটির দিনেও ভালো করে দুটো কথা বলার সুযোগ হয়না। পালিয়ে বেড়াও মনে হয়! তিন সপ্তাহ হয়ে গেল, অথচ আমরা এখনো একজন আরেকজনকে জানতেই পারলাম না ঠিকমত। তুমি আমাকে এড়িয়ে চলো কেন? আমি কি সুন্দরী নই?”

মনে মনে বলি “তুমি মহা সুন্দরী, কিন্তু আমি কিভাবে বুঝাই আমার অবস্থা!” বাংলাদেশের অজপাড়াগাঁয়ের রক্ষনশীল পরিবারের এক ছেলে বিদেশে এসে ভিনদেশী এক মেয়ের সাথে এক ফ্ল্যাটে থাকছে, চিন্তা করা যায়! আমি মনে মনে স্থির করে ফেলেছি, তিনমাসের মধ্যেই এই বাসা ছেড়ে দেবো। নতুন বাসা খুজছি। তবে সেদিনই আমরা পরিচিত হলাম। জানতে পারলাম, সে এখানে একটা বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে।
ম্যাগডালেনা আমাকে সন্ধায় ডিনার আর মদ্যপানের আমন্ত্রন জানালো। এই সেরেছে! আমি সবিনয়ে ধন্যবাদ দিয়ে জানালাম আমি মদ্যপান করি না। তাছাড়া আমার অন্যকাজও আছে। তাই আপাতত ডিনারটাও সম্ভব হচ্ছেনা। আমার কথায় হয়ত একটুখানি উদ্ধত ভাবও ছিল, যেটা নিয়ে খানিক পরেই আমার লজ্জা লাগছিল অবশ্য।
ম্যগডালেনা হয়ত মনেমনে ভাবছিল “এ কোন অভদ্র অর্বাচীন! আমার মত সুন্দরীর আহবান প্রত্যাখ্যান করে! আবার মদ্যপানও করেনা!”
তারপরের দিনগুলো একভাবেই কাটতে লাগল। আমি সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে থাকি। সন্ধ্যায় ফিরে খাওয়া শেষে ঘুমাই। ম্যাগডালেনার সাথে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কিছু সময়ের বাইরে দেখা হয়না। দেখা হলেও ঐ হাই হ্যালো পর্যন্তই। মাঝে মাঝে টের পাই কোন কোন রাতে কেউ কেউ হয়ত তার সাথে এসে এখানে রাত্রিযাপন করে। মাঝেমাঝে শনিবারে সন্ধ্যায় বাসায় ড্রয়িং রুমে বন্ধুবান্ধব নিয়ে পার্টি করে। পার্টি শেষে যেহেতু সব পরিষ্কার করে ফেলে, এতেও আমার কোন সমস্যা হয়না। তার জীবন তার মত, আমার জীবন আমার মত। তাকে নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই, আমাকে নিয়েও তার কোন আগ্রহ থাকার কথা নয়।
কিন্তু সবকিছুই একইভাবে গেলনা। একদিন গভীর রাতে হঠাত ঝনঝন শব্দে ধরমরিয়ে উঠলাম। বের হয়ে দেখালাম মাতাল অবস্থায় ম্যাগডালেনা টেবিলের উপর ঝুঁকছে। ঠিকমত দাড়াতে পারছেনা। কাচের জগ ফেলে ভেঙ্গে ফেলেছে। আমাকে দেখে ঘুরে আমার দিকে চলে এলো। টলমলে পায়ে হেটে এসে আমার কাঁধ ধরে ঝুলে পড়ল। অতি সুন্দরী এক শেতাঙ্গীনি তরুনী সংক্ষিপ্ত রাত-পোষাকে মাতাল অবস্থায় আমার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটা আমার জন্য ভয়াবহ অবস্থা। এই প্রথম আমি ম্যাগডালেনাকে স্পর্শ করলাম। ওর মাথায় হাত দিয়ে ওকে ঘুরিয়ে ওর রুমের ভেতরে নিয়ে গেলাম। এই প্রথম আমি ওর রুমে প্রবেশ করলাম। ওকে ওর বিছানায় শুইয়ে দিলাম। পাতলা চাদরটা টেনে দিলাম। সম্ভবত এই প্রথম আমি এই ভিনদেশি মেয়েটার জন্য কিছু অনুভব করলাম। না, সেটা কামনা নয়। সহানুভূতি। কি জীবন! কাজ করো, টাকা রোজগার করো, বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করো, মাতাল হও, তারপর এরকম অসহায়ের মত পড়ে থাকো!
পরদিন সন্ধ্যায় যখন ফিরলাম দেখি ম্যাগডালেনা ড্রয়িং রুমে বসে আছে। আমি অবাক হলাম। একে এর আগে কখনো কর্মদিবসে সন্ধ্যায় বাসায় দেখিনি।
নিজ থেকেই বলল, “আজ ছুটি নিয়েছি। আমি কি তোমার সাথে এককাপ কফি পান করতে পারি?” আমি হ্যা-সুচক মাথা নাড়াতেই খুশি হল। আমি রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই দেখি সে দু মগ কফি বানিয়ে বসে আছে।
“কাল রাতের জন্য দুঃখিত। আমি খুব মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম, তাইনা?”
“হ্যা। হলে কেন?”
“খুব দুঃখ। তুমি বুঝবেনা। আচ্ছা একটা বিষয় আমাকে অবাক করল; ঐ অবস্থায়ও আমার শরীর তোমাকে আকৃষ্ট করলনা কেন? আমি কি খুবই অনাকর্ষনীয়?”
আমি হেসে ফেললাম। “না, তুমি অনাকর্ষনীয় নও। অবশ্যই তুমি দারুন সুন্দরী। তবে তুমি আমার জন্য তুমি নিষিদ্ধ।”
“নিষিদ্ধ!”
“হ্যা, শুধু তুমি নও, আমার নিজের বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া আর সকল রমনীই আমার জন্য নিষিদ্ধ”
“তুমি কি বিবাহিত?”
“না”
“তারপরও কিভাবে এত সংযমের পরিচয় দিলে! এখানে তো কেউ দেখত না, কেউ তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারত না। কিংবা তোমার স্ত্রীর কাছে তোমার বিবেকের দায়ও থাকত না, কারন এখনো তোমার স্ত্রীই নেই”
“কে বলছে দেখতনা। আল্লাহ, যাকে তোমরা গড বলো, তিনি তো সব দেখেন!”
হঠাত চোখ পড়তে আমি দেখলাম ম্যাগডালেনার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“কাল রাতে কেন খুব বেশি ড্রিংক করে মাতাল হয়েছিলাম, শুনবে?”
“তোমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। আমার মত স্বল্প পরিচিতের সাথে শেয়ার না করাই ভালো।”
“কিন্তু আমার বলা দরকার। আমার ঘনিষ্ট এক বন্ধু আছে। ঠিক ‘বয়-ফ্রেণ্ড’ না আবার ওরকমই। আমি জানিনা তুমি লক্ষ করেছো কিনা, মাঝেমাঝে রাতে আমার সাথে এখানে থাকত। আজ পার্টিতে ওকে আমি আরেক মেয়ের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখি। এর প্রতিবাদ করলে ও ওর আরেক বন্ধুকে আমার পেছনে লাগিয়ে দেয়। সে বন্ধুটি যখন আমার সাথে জোর করে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করছিল, আর আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিলাম, আমার বন্ধুটি তখন হেসে লুটিয়ে পড়ছিল। এক চড় মেরে চলে এসেছি। বাসায় এসে খুব করে পান করলাম। ব্যালেন্স হারিয়ে যখন টেবিলের উপর পড়লাম, জগটা পড়ে ভেঙ্গে গেল। তুমি বেরিয়ে এলে। সাথে সাথে মনে হল, রাতটা তোমার সাথে কাটালে মন্দ হয়না। দুঃখবোধ কাটানোর জন্য এটাই মনে আসল। প্রতিশোধও বলতে পারো। কিন্তু তুমি যা করলে, আমার পরিচিত অন্যকোন পুরুষমানুষ তা করত বলে আমার ধারনাতেই আসছেনা। সম্ভবত এই পৃথিবীর পুরুষমানুষদের কিছু মাত্র আমার দেখা হয়েছে, বিশাল এক অংশই হয়ত অজানা।”
সপ্তাহদুয়েক পরে আমি সে বাসা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবে শেষের ক’দিনে ম্যাগডালেনার মধ্যে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। সম্ভবত সে রাত-পার্টি বাদ দিয়েছিল। আমার সাথে অবশ্য আগের মতই খুব কম কথা হত। তারপর আমি আমার নিজস্ব রিসার্চ কাজ নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। ধীরেধীরে ম্যাগডালেনাকে প্রায় ভুলেই গেলাম।
পাপুয়া নিউগিনির একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের সুযোগ আসল। তুই বোধহয় জানিস, কারন হংকং থেকে পাপুয়া নিউগিনি যাওয়ার আগে দেশে গিয়েই তো তোর সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল।
ওখানে জয়েন করার মাস ছয়েক পরে, ম্যাগডালেনা অধ্যায় শেষ হবার ঠিক এক বছর তিন মাস পরে একদিন আমার অফিসরুমের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে সামনে তাকিয়ে দেখি শেতাঙ্গীনি এক ভদ্রমহিলা আমার দরজায় দাড়িয়ে। লম্বা কাপড়ে শরীর আবৃত। মাথাও ঢাকা হিজাবে। খুব পরিচিত মনে হল।
“ভেতরে আসতে পারি?”
“ম্যাগডালেনা! তোমার এ কি পরিবর্তন! নিউগিনিতে কবে এলে? এখানকার ঠিকানা কিভাবে পেলে?”
“এত প্রশ্ন এক সাথে! দাঁড়াও, বসতে দাও। বলছি। ......... আজই এলাম এখানে। তোমাকে খুজে পাওয়া কঠিন কিছুনা। তুমি এখন মোটামুটি নামকরা পদার্থবিদ”।
আস্তে-ধীরে রয়েসয়ে ম্যাগডালেনা তার কথা বলে গেল। আমি বাসা ছেড়ে দেয়ার মাস দুই পরেই হংকং থেকে সেও চলে যায়। তার বন্ধুর আর আমার সাথে ঘটে যাওয়া সেই রাতের ঘটনা ওকে নতুন ভাবে ভাবতে শেখায়। ওর কোন ধর্ম ছিলনা। কিন্তু এর পরে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করে। খুব শীঘ্রই ওর মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ম্যাগডালেনা এখন ‘ফাতিমা ম্যাগডালেনা’ হয়ে গেছে। আমাকে খুজে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে পাপুয়া নিউগিনি চলে আসে। তারপর ও আমাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমার না করার কোন কারনই ছিলনা।
সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল, তোদের ঠিকমত জানাতেই পারিনি। মাস দুই আগে দেশে নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে দিন সাতেকের জন্য। আর গত সপ্তাহে পোল্যান্ড গিয়েছিলাম ওর পরিবারের সাথে দেখা করতে। এই ফিরছি।

(৪)
কফির পেয়ালা খালি হয়ে গেছে সেই কখন, টেরও পাইনি। বন্ধুর জীবনের গল্প শুনছিলাম। নিখাদ ভালোবাসার গল্প। ফাতিমা ম্যাগডালেনা ভাবীও চুপচাপ বসে তাকে নিয়ে করা গল্প শুনছিলেন, আর মাঝেমাঝে মিটিমিটি হাসছিলেন। ওদের যাওয়ার সময় প্রায় হয়ে এলো। ফ্লাইটের আর ঘন্টাখানেক বাকি। আমরা উঠলাম। হেটে নির্দিষ্ট টারমিনালের দিকে যাচ্ছিলাম। ভাঙ্গাভাঙ্গা বাংলা উচ্চারনে আমার বিদেশিনী ভাবী বলে উঠলেন “ভাই, আমাদের কাছে বেড়াতে আসবেন। আর দোয়া করবেন।” আমি অবাক হয়ে তাকাতেই হোসেন বলল যে বিয়ের দিন থেকেই ভাবী বাংলা শিখছেন আর এই ক'দিনে দারুন উন্নতি করেছেন।
ওদের বিদায় দিয়ে আমি আমার গন্তব্যে হাটছি। পাশের কোন এক ভারতীয় দোকান থেকে ভেসে আসছে মোহাম্মদ রফি সাহেবের গান "ইয়ে জিন্দেগী কিতনি হাসিন হ্যায়"। আহা জীবন! কখনো কখনো বড়ই মধুর মনে হয়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement