লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftনববর্ষ (এপ্রিল ২০১৮)

অর্কিড ও শেষ টেলিফোন
নববর্ষ

সংখ্যা

মোস্তফা হাসান

comment ১  favorite ০  import_contacts ১৩৫
অর্কিড ও শেষ টেলিফোন
নতুন বছর, নতুন দিন।
আইমানের হৃদয়টা মুহূর্তে চঞ্চল হয়ে উঠল। মেয়েটির ঠোঁট দুটো দেখে। কি অপূর্ব! চিকন নদীর রেখা; যেন স্বর্গের বুক চিরে বয়ে গেছে। গোলাপী একটা আভা লেগে আছে সমস্তটা জুড়ে। মিষ্টি একটা সরলতার ছায়া ওআভাকে আরো স্নিগ্ধ করে তুলেছে। একটা মেয়ের শুধু ঠোঁট দেখে কারো চিত্ত এভাবে চঞ্চল হয়ে উঠতে পারে, আইমানের তা ধারণা ছিল না। এই প্রথম সে টের পেল কোন মোহিনী মেয়ের স্নিগ্ধ ঠোঁটের সম্মোহিনী ক্ষমতা। মেয়েটি ফুল হাতে দাড়িয়ে আছে। অন্য আরও কয়েকটি মেয়ের সাথে। দর্শক সারিতে সামনের দিকে একটি আসনে বসে আইমান মেয়েটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এই মুহূর্তে, মনে তার একটাই ভাবনা যেন ঐ মেয়েটির হাত থেকে সে ফুল নিতে পারে।
আজ আইমানের বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠান। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছে সে, তবে বাবার ইচ্ছানুসারে। তার ভাবনায় ছিল ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার। কিন্তু বাবা চান অন্যকিছু। মেলামাইন তৈজসপত্রের ব্যবসায়ী বাবার অনেক টাকা পয়সা হয়েছে- এখন সামাজিক সম্মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাবা চান ছেলে জজ হোক।
মেয়েগুলো যখন সবাইকে ফুল দেওয়া শুরু করল, আইমান যেদিকের বেঞ্চে বসেছে, মেয়েটি সেদিকেই সবাইকে ফুল দিতে দিতে আসছিল। যে মুহূর্তে তার হাতে ফুল দিতে যাবে, সে মুহূর্তে একজন শিক্ষক ডাক দিল- ‘ফারিয়া’। মেয়েটি ত্রস্তভাবে চলে গেল। আশাভঙ্গ হল আইমানের। মেয়েটির নাম তবে ফারিয়া। ভাবল আইমান। আরও ভাবল মেয়েটি তার সিনিয়র, কেননা সাধারনত সিনিয়র ভাই বা আপুরাই নবীনদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়।
ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। পড়ালেখা শুরু হয়নি। এত তাড়া কিসের! পড়ালেখা না করেও তো জগতে কতজন কতকিছু করেছে। আইমান তার অস্থির মনকে স্বান্তনা দিতে থাকে। আইমানের মন জুড়ে যে শুধু ওই মেয়েটি- ওর ঠোঁটদুটো। বাকা চাঁদ হয়ে নিত্য উদয় তার অস্থির মনাকাশে।
ইতোমধ্যে আইমান জেনেছে, ফারিয়া দ্বিতীয় বর্ষে। তার ইমিডিয়েট সিনিয়র। আর অন্যরা জেনেছে, প্রথম বর্ষের একটা ছেলে সিনিয়রদের ক্লাসের সামনে নিয়মিত ঘোরাঘুরি করে। কেবলার মত মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আইমানের কি দোষ! ওই ঠোঁটদুটো যে তাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু ভয় আর শঙ্কা আইমানকে প্রতিনিয়ত পিছনে টেনে আটকে রাখে। নিজের নামটুকু ফারিয়া আপুকে সে বলতে পারেনি ঠিকমত। আইমান বলতে গিয়ে ‘জাই..জাই...মান’ বলে ফেলেছিল একদিন। তারপর থেকে এ পর্যন্ত সে আর ফারিয়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি।
এখন সবাই জেনে গেছে, প্রথম বর্ষের যে ছেলেটি সিনিয়রদের ক্লাসের সামনে যখন-তখন ঘোরাঘুরি করে, সেই ছেলেটির নাম আইমান। বড় আপু ছাড়া তার মনে নাকি প্রেম আসে না!

বছর শেষে কোন একদিন ।
আইমান আইন বিভাগের সামনের মাঠে হলুদ ফুল গাছটির নিচে দাড়িয়ে। ফারিয়া আপুদের ক্লাস প্রেজেন্টেশন আজ। শেষ হবে একটু পরেই। প্রেজেন্টেশনের শেষে ফারিয়া আপু এদিক দিয়েই হলে ফিরবে। ধূ ধূ করা বুক আর ভয়ে ভীত শুকনো মুখ নিয়ে সে অপেক্ষা করছে ফারিয়া আপুর জন্য।
প্রেজেন্টেশন শেষে আইমানকে দেখে এগিয়ে আসে আইমান। অনেক কৌতূহল তার ছেলেটাকে নিয়ে। কিন্তু জল ঘোলা হবে তাই সে ছেলেটির সাথে আগে কখনও কথা বলেনি। অবশ্য ‘আহা! বড় আপুদের জন্য ওর কত মায়া’- এসব বলে সে অনেকবার হাসাহাসি করেছে নিজেদের সার্কেল আড্ডায়। কিন্তু গভীর নিবিষ্টমনে ফারিয়ার দিকে আইমানের চেয়ে থাকা তার নজর এড়ায়নি। ছেলেটার চোখদুটো খুব নীল- ভেবেছে সে মনে মনে।
“আপু, আপনার জন্য ডায়মন্ড ক্রাউন অর্কিড এনেছি।” আইমান সাহস করে ফুলগুলো এগিয়ে দেয় ফারিয়ার দিকে।
“আমার জন্য। কেন?” ফারিয়া নিজের মনের ভাব যথাসম্ভব গোপন করার চেষ্টা করে।
“আপনার এই অর্কিড ফুল খুব পছন্দ যে।”
“আমার এই অর্কিড ফুল খুব পছন্দ, তুমি জানো কি করে?”
“আপনি যদি চান, আমি প্রতিদিন আপনার জন্য অর্কিড এনে দিব।”
শেষ বাক্যটির মধ্যে ভালবাসার গভীরতা ফারিয়া টের পাই। কি যেন একটা নাড়া দিয়ে যায় তাকে। আইমানের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই তার হাতে ধরা ফুলগুলো টেনে নেয় নিজের হাতে। নাকের কাছে নিয়ে ফুলের গন্ধ নেয়। তার চিরচেনা পছন্দের ফুল অর্কিড, তবু আজকের ফুলগুলো তার কাছে আরও সুন্দর মনে হচ্ছে।
“আমার সাথে রিকসায় যাবে আমাকে হলে পৌছে দিতে?” ফারিয়া মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে। আইমানের হৃদয়ে উছলে পড়ে সে হাসি। অবাক সুন্দর লাগে আজকের হলুদ ফুলের গাছটি। অবাক সুন্দর লাগে পৃথিবী। পৃথিবীর সবকিছু।
এরপর প্রতিদিন আইমান ফারিয়াকে অর্কিড এনে দিয়েছে। একদিনও সে ভুলে যায়নি ফুল আনতে।

(২)
বহু বছর পর।
মধ্যরাত। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মৃদু আলোয় স্থির মনে হাতে ধরা বইটি পড়ছে আইমান খান। খুশবন্ত সিং এর ‘দি কোম্পানী অব উইমেন’। নিঃশব্দ রাতের মৌনতা ভেঙে দিতেই বুঝি হঠাৎ করে বেডসাইড টেবিলে রাখা টেলিফোনটি বেজে ওঠে। এত রাতে সাধারণত আইমানকে কেউ টেলিফোন করে না। কিছুটা ত্রস্ত হয়েই টেলিফোন রিসিভ করে সে। নিজে ‘হ্যালো’ বলার আগেই ওপাশের কণ্ঠের আওয়াজে সে চমকে যায়। দীর্ঘ বহু বছর সে ও কণ্ঠস্বর শোনেনি তবু কত পরিচিত কত চেনা কত আপন মনে হয়।
‘চিনতে পেরেছ’, ওপাশের নারী কণ্ঠটির স্বগতোক্তি। কত যুগ পেরিয়ে গেছে তবু ঐ কণ্ঠে কোন আড়ষ্টতা নেই। স্বতস্ফূর্ত তবে মায়াবী। ঠিক সেই আগের মত।

শুস্ক চৌচির মাটির বুকে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি পড়ে যেন। প্রচন্ড গ্রীষ্মে হঠাৎ বয়ে যাওয়া দক্ষিণা বাতাসে যেমন মানুষ শান্তি পায়, বুকের মধ্যে সে রকম শীতল সুখানুভূতি সে অনুভব করে। খানিকটা হঠাৎ পাওয়ার অদ্ভুত উত্তেজনা। শুধু অভিমানটুকু তার কৃত্রিমতা।
‘শত বর্ষ পরে হলেও চিনতে পারতাম’, উত্তর দেয় আইমান।
‘এত ভালবাসা আমার জন্য, কোনদিন তো একটু খোঁজ নাওনি আমার’, ওপাশের কণ্ঠেও অভিমান ঝরে পড়ে।
অদ্ভুত নারীর মন। আইমান তার দিশা পাইনি কোনদিন। দিশা সে পাবে কি করে! হঠাৎ করে ফারিয়ার বিয়ে হয়ে গেল। পূর্বাভাস ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের মত। সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল মহূর্তের ইশরায়। যে মেয়েটি প্রতিদিন তার অর্কিডের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করত, সেই মেয়েটি কিভাবে তার অর্কিড ছাড়াই জীবনের এতটি বছর পার করে দিল, তার দিশা সে কিভাবে পাবে!
‘তোমার সুখে আমি কাঁটা হতে চাইনি। তাই সব ফেলে চলে এসেছি অন্তরালে। আচ্ছা, তুমিও তো কখনো জানতে চাওনি আমি মরে গেছি, না বেঁচে আছি!’ কিশোর বয়সে বালখিল্যতা যেন ভর করে তার কন্ঠে।
অবাক হয় সে। অন্তরের গভীরে প্রোথিত অনুভূতি গুলো কি সমস্ত জীবন তাহলে একইরকম থাকে! সুযোগের অপেক্ষায় জেগে উঠবে বলে।
টুকরো টুকরো হয়ে স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে যেন চোখের সামনে। কিছুটা আনমনা হয়ে পড়ে সে।
ওপাশ থেকে নারী কণ্ঠটি কথা বলতে থাকে। স্বচ্ছ-স্বাভাবিক পানির জলের মত। ‘আমার বিয়ে হয়ে গেল। তুমি কখন আমেরিকায় চলে গেলে জানিও না। কয়েকবার চেষ্টা করেছি যোগাযোগ করতে তুমি কোনো সোশাল মিডিয়ায় নেই যোগাযোগ হয়ে উঠেনি; হয়ত সে ভাবে চেষ্টাও আর করা হয়নি। চাকুরি-স্বামী-সংসার-সন্তান আর সময়ের চাপে জীবন কখন যে ফুরিয়ে এল টের পাইনি।’
একটু থেমে ও কণ্ঠ থেকে আবার প্রশ্ন ভেসে আসে। ‘আচ্ছা, তোমার ছেলে মেয়ে ওরা কত বড় হয়েছে কি করে?’
আইমান ও কন্ঠের মধ্যে প্রচন্ড কৌতূহল টের পায়।
‘আমিতো বিয়ে করিনি।’ নিস্পৃহ কন্ঠে উত্তর দেয় আইমান।
এই প্রথম থমকে যায় ফারিয়া। বুকে একটা অসহায় দায়বোধ অনুভব করে।
‘কেন?’ এ প্রশ্ন করতে তার আর সাহস হয় না।
প্রসঙ্গ পাল্টে নেয় ফারিয়া। ‘সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে তোমার সুখ্যাতি ছড়িয়ে গেছে একজন আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার লেখক হিসেবে। তোমার লেখা ও সাহিত্য কর্মের উপর প্রথম আলো একটা নিবন্ধ ছেপেছে তোমার ইন্টারভ্যু সহ। যে তোমার ইন্টারভ্যু নিয়েছে ওই প্রতিবেদকের কাছ থেকে তোমার ঠিকানা সংগ্রহ করে টেলিফোন করেছি।’
‘আমাকে নিয়ে এখন আপনার অনেক গর্ব হয় না, বড় আপা!’ ঠাট্টা করে আইমান, অস্ফুট মিষ্টি হাসি হেসে। এভাবে সে বড় আপা বলে ঠাট্টা করত ফারিয়ার সাথে।
‘তুমি এখনও সেই আগের মতই আছো দেখছি।’ ফারিয়া বলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো স্মৃতিগুলো স্বচ্ছ সজীব হয়ে ওঠে মনের মধ্যে। পুরোনো দিনগুলোই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে আইমানের হয়তো দুজনেরই। কে জানে!
‘তোমার স্মৃতি নিয়ে আমি কাঁটিয়ে দিয়েছি আমার সমস্ত জীবনটা। এই আমার পরম তৃপ্তি না পাওয়ার মাঝে আমার জীবনের চরম পাওয়া। আমি ভাগ্যবানদের একজন।’ আইমান এক নিঃশ্বাসে বলে দেয় কথাগুলো। হালকা লাগে তার।
ফারিয়ার অসহায় লাগে। নিজেকে কাঠগড়ার আসামী মনে হয়।

এক সপ্তাহ পর।
ঠিক একই সময়ে ফারিয়া আবার টেলিফোন করে আইমানকে। টেলিফোন লাইন ডেড। অস্থির হয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করে সে। প্রতিবেদক তাকে জানায়, দুদিন আগে আইমান স্যারকে তার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি হয়তো আরো দুদিন আগে মারা গিয়েছিলেন। একা থাকেন, কেউ টের পাইনি। একজন ফুলবিক্রেতা যে তাকে প্রতিদিন সকালে অর্কিড ফুল দিয়ে যেত, সেই প্রথম টের পায় গত দিনের ফুল দরজার সামনে ঠিক সে যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবে পড়ে থাকতে দেখে। তিনি নাকি একদিনও জীবনে ভুল করেননি তার প্রিয় ফুল অর্কিড সংগ্রহ করতে। বিছানায় শোয়া মৃত আইমানকে যারা প্রথম দেখেছে তারা জানিয়েছে তার ঠোঁটে নাকি এক চিলতে তৃপ্তির হাসি লেগেছিল তখনও। মৃত মানুষের মুখে এই হাসি সচরাচর দেখা যায় না।
ফারিয়া সবকিছু পরিষ্কার বুঝতে পারে। অর্কিড তো আইমানের নয়; ফারিয়ার প্রিয় ফুল ছিল। বর্ণময় অর্কিডের স্নিগ্ধ সৌর্ন্দয্য ফারিয়ার খুব ভাল লাগত। জীবনের নিগূড় সৌর্ন্দয্য যেন ধারন করে আছে ওরা। আইমান ঢাকা শহরের যেখান থেকেই হোক, প্রতিদিন ফারিয়াকে অর্কিড এনে দিত। শুভ্র সাদা বর্ণের ডায়মন্ড ক্রাউন অর্কিড তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল।
ফারিয়ার হৃদয়ে ঝড় ওঠে। তাহলে আইমান যে প্রতিদিন অর্কিড সংগ্রহ করত সে কিসের জন্য? তাহলে কি, আইমান অর্কিডের সুবাসে তার ভালবাসা খুজেছে সারা জীবন! ওর প্রতীক্ষা করেছে প্রতিটা মুহূর্ত! আর ভাবতে পারে না ফারিয়া। তীব্র কিন্তু অচেনা এক বেদনায় তার অন্তরটা কুঁকড়ে যায়।
জীবন সায়াহ্নে এসে ফারিয়া তাকে শেষ টেলিফোনটি করেছিল সপ্তাহ খানেক আগে। যে টেলিফোনটির জন্য হয়ত আইমান প্রতীক্ষা করেছে সারাজীবন ধরে। শেষ টেলিফোন পেয়েছে, এই তৃপ্তি নিয়ে ও চলে গেল। কিন্তু ফারিয়া এখন কি করবে? হঠাৎ করে তার খুব খালি লাগতে শুরু করে। এরকম শূন্য অনুভূতি সে তার স্বামীর মৃত্যুর সময়ও বোধ করেনি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement