মেহেরজানের বাঁ গাল ফোলা ও খানিকটা লাল। ডান-চোখের নিচে চিকন কাটা দাগ। কাটার ওপর সূক্ষ্ম কালো কালো দানা। রক্ত শুকিয়ে দানায় রূপ নিয়েছে। অনেক কেঁদেছিল বলেই হয়তো চোখ দুটিও ঈষৎ ফোলা। মিথিলা আপার সামনের চেয়ারে বসে সে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ ও নাক মুছছে। মিথিলা আপাকে ফোন করেই মেহেরজান তার অফিসে এসেছে। এ অফিস তার চেনা। নিকট অতীতে তাকে এখানে বেশ কয়েকবার আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। গুলশানের শানদার আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিস।
মিথিলা আপা খুবই ব্যস্ত মানুষ। বিদেশী সংস্থা সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন ওসব অফিসের কর্মীদের ঘড়ির কাঁটার আগেও এগিয়ে থাকতে হয়। সব্যসাচীর মতো তাদের কাজ করতে হয়। তাদের ভাষায় এটাকে বলা হয় মাল্টিটাস্কিং। যোগ্যতাসম্পন্ন লোকই এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। বেতনও বড় অংকের। দুই নম্বরির তেমন কোনো সুযোগ নেই; প্রয়োজনও পড়ে না।
তার সময় নেই তবুও মেহেরজানের কাকুতি-মিনতিতে মিথিলা আপা রাজি হয়েছেন। বলেছেন, ‘আমি আপনার জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট করতে পারবো না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আপনার কথা শুনবো।’ মেহেরজান বলেছে, ‘কুনু অসুবিদা নাই আফা। আমি অপেক্ষা করতে পারুম।’
অফিস শুরু হওয়ার আগেই মেহেরজান এসে হাজির হয়েছিল। মিথিলা আপা গাড়ি থেকে নেমে অফিসে ঢোকার পথেই মেহেরজানের সাথে দেখা। মেহেরজানের মুখ দেখেই মিথিলা আপা আঁতকে ওঠেন। কিন্তু তার এ অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করার সময় নেই। তবে এটুকু জিজ্ঞেস করলেন, ‘সকালে কিছু খেয়েছেন?’
মেহেরজান কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে।
মিথিলা আপা যা বোঝার বুঝে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘চলেন, আমার অফিসে চলেন।’
তার কক্ষে ঢুকেই মিথিলা আপা ক্যান্টিনে ফোন করে গেস্টের জন্য এক কাপ চায়ের অর্ডার দেন। সাথে একগ্লাস পানিরও। তারপর তিনি টেবিলের ড্রয়ার খুলে বিস্কুটের ছোট দুটি প্যাকেট বের করেন। অফিসের সবার মতো তিনিও ড্রয়ারের কিছু বিস্কুট-কুকিস রাখেন। তারপর তাড়াহুড়া করে তিনি তার ল্যাপটপ অন করে কীসব দেখেন।
চা এলেই মিথিলা আপা চেয়ার ছেড়ে একটা ফাইল হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ান এবং মেহেরজানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মেহেরজান, আপনি চা-বিস্কুট খান। আমার একটা জরুরি মিটিং আছে। এসে কথা বলবো।’
মেহেরজান এই অফিসের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সে নাক-চোখ মোছা বাদ দিয়ে বিস্কুট চিবাতে আরম্ভ করে। বিলক্ষণ সে ক্ষুধার্ত। ক’টি মাত্র বিস্কুট তার ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য যথেষ্ট নয়। তবুও সে বিস্কুটগুলো চায়ে ভিজিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে।
মিথিলা আপার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করে। অন্যান্য অনুন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও তাদের একটি অফিস আছে। এই অফিস নিজ খরচে দুঃস্থ বাংলাদেশীদের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। স্বপ্নভুক বাঙালি তরুণরা যখন দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগর-পাহাড় পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন উন্নত দেশের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে তখন তাদের কপালে কী ঘটে এটা দেশ-বিদেশের সবারই জানা। বরফের নিচে পড়ে বা সমুদ্রের জলে ডুবে অনেকে মারা গেলেও কিছু ভাগ্যবান প্রাণ নিয়ে কোথাও না কোথাও গিয়ে ওঠে। তখন সবার না হলেও কারও কারও জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। দালালরা তাদের আটকে রেখে বাড়তি টাকার জন্য নির্যাতন করে। নির্যাতনে এবং অনাহারে অনেকে মারাও যায়। যারা বেঁচে থাকে তারা যদি কোনোক্রমে এই সংস্থাটির সাথে যোগাযোগ করতে পারে তবে সংস্থাটি তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করে। এধরনের সমস্যা ছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় অভিবাসীরা পড়ে থাকে। যেমন, দেশে ফিরবার ভাড়া নেই বলে অনেক অভিবাসী জেলে পচে মরে; সংস্থাটি এদের সাহায্যেও এগিয়ে আসে। তবে উদ্ধার পদ্ধতিটি বেশ জটিল ও সময় সাপেক্ষ।
মেহেরজান যুবতী মেয়ে; বয়স তিরিশের নিচেই হবে। বলতে গেলে মিথিলা আপা আর মেহেরজান প্রায় সমবয়সী। মেহেরজানের বিবাহিত জীবনে দশ বছর বয়সী একটি মেয়ে থাকলেও মিথিলা আপা এখনও ঘর বাঁধেননি বলে তার ধারণা। মিথিলা আপার সাথে প্রথম সাক্ষাতে সে অনেক কান্নাকাটি করেছে, কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে অনেক কথা বলেছে। অনেক কথা বলতে গিয়ে এমনও বলেছে, ‘আফা, আপনারও তো সোয়ামী-সংসার আছে। সংসারের জ্বালা আপনি কিছু তো বোঝেন…।’ মিথিলা আপা একটু মুচকি হেসে বলেছেন, ‘না, আমার সংসার-টংসার নেই; তবে আপনাদের কষ্ট আমরা বুঝি।’
দশ মাস আগে মেহেরজানকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন তার সাথে আরও তিনটি মেয়ে ছিল: ফারজানা, মাসুমা ও পরী বিবি। সংস্থার নিয়মানুযায়ী ওদের পুনর্বাসনের জন্য কিছু আর্থিক সাহায্যও দেওয়া হয়েছিল। অন্যরা সেলাইয়ের কাজ, মুরগী পালন কিংবা রিক্সা কেনার কাজে টাকা ব্যয় করলেও মেহেরজান ছাগল পালনের কাজটাই বেছে নিয়েছিল। তার ভাদাইম্যা স্বামীও হ হ বলে তাকে সমর্থন জানিয়েছিল।
মেহেরজানদের কেইসটা ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। দারিদ্র আর সামাজিক নিপীড়নে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠলে ফারজানাই প্রথম তাকে আশার বাণী শোনায়। সে বলে, ‘বেশি পয়সা লাগবো না, পঞ্চাশ হাজার টেকা জোগাড় করতে পারলেই সৌদি আরব যাইতে পারবি। শেখগো বাসার কাম; খালি টেকা আর টেকা।’
মেহেরজান চোখ কপালে তুলে বলে, ‘কস কী?’
‘হ একটা মানুষ পাইছি। আমার বাপের দেশের লোক। আমি বাপের বাড়ি যাইয়া লোকটার সাথে কথা পাকা কইরা আসছি।’
মেহেরজান কিছুক্ষণ হা করে ফারজানার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘টেকা পাইলি কই?’
ফারজানা জানায় যে সে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে-সুজিয়ে তার বাপকে রাজি করিয়েছে। সামনে কুরবানির ঈদ। বড় ষাঁড়টা বিক্রি করলেই তার টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। মেহেরজানকেও সে তার বাপের কাছে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়।
উপায়ান্তর না দেখে মেহেরজানও শেষপর্যন্ত বাপের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু তার বাপের তো কোনো গরু-ছাগল নেই যে বিক্রি করতে পারবে। অবশেষে প্রতিবেশীর চাপে মেহেরজানের বাবা একটি এনজিও থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ তুলে মেয়ের বিদেশ যাওয়া নিশ্চিত করে।
সৌদি শেখের বাড়িতে যাওয়ার সময় কিংবা পরেও মাসুমা ও পরী বিবির সাথে ফারজানা ও মেহেরজানের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কারণ ওই দালালের মাধ্যমে শুধু ফারজানা ও মেহেরজান একসাথে রিয়াদ গিয়েছিল। আসলে খাদ্দামা নামে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী নেওয়ার প্রকল্পটি ছিল সম্পূর্ণ নিখরচা। কিন্তু এদেশে কি মাল ছাড়া কিছু হয়? তাই কর্তৃপক্ষের সুকৌশল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আগ্রহী প্রার্থীর কাছ থেকে কিছু পয়সা খসানোর ব্যবস্থা করেই তবে আগ্রহী খাদ্দামাদের মধ্যপ্রাচ্যের দেশে পাঠানো হয়েছিল। যারা দুর্ভাগা ছিল বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের জীবন জাহান্নামে পর্যবসিত হয়। ফারজানা ও মেহেরজানও সেরকম দুজন। উদ্ধার প্রক্রিয়ার শেষপর্যায়েই কেবল মাসুমা ও পরী বিবির সাথে তাদের যোগাযোগ হয়।
ঘন্টাখানেক পরে ঝড়ের বেগে মিথিলা আপা এসে তার কক্ষে ঢোকেন। মেহেরজান একটু নড়েচড়ে বসে। মিথিলা আপা মেহেরজানের দিকে না তাকিয়ে বলেন, ‘একটু বসুন।’ তারপর তিনি খটখট করে তার ল্যাপটপে কী যেন লিখতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা তুলে বলেন, ‘আরেক কাপ চা খান।’
মেহেরজান বলে বলে, ‘না আফা, আমি আর চা খামু না।’
মিথিলা আপা বলেন, ‘তাহলে আরেকটু অপেক্ষা করুন। আমি একটা জরুরি কাজ সেরে নিই।’
আরও কিছুক্ষণ ধরে মিথিলা আপা হয়তো মিটিং-এর মিনিটস লেখেন, তারপর ইমেইলে নির্দিষ্ট সহকর্মীদের কাছে তা পাঠান। মেহেরজান এসবের কিছুই বোঝে না। শরীরে ব্যথা নিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে বসে থাকে। মিথিলা আপা তাকে কী পরামর্শ দেন সেই ভাবনাতেও সে কিছুটা অসাড় হয়ে পড়ে। তখনই মিথিলা আপা তার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করেন, ‘বলেন, আপনার এই অবস্থা কেন?’
মেহেরজান কিছু না বলে শাড়ির খুট দিয়ে আলতো করে চোখ মোছে।
মিথিলা আপা বোঝেন এই প্রশ্নের উত্তর জটিল হবে, তাই তিনি অন্য প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের, মানে, ছাগলের খবর কী?’
মেহেরজান দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে, ‘ছাগল তো আর নাই আপা।’
‘নাই মানে?’ মিথিলা আপা বিস্মিত হন, ‘আরে আপনি না দশটি ছাগল কিনেছিলেন!’
মেহেরজান ধরা গলায় বলে, ‘হ, কিনছিলাম। বড়ও হইছিল। দুইটা চোরে নিয়া যায়।’
মিথিলা আপা বলেন, ‘ভেরি স্যাড! তাহলে এখন আটটাই আছে, নাকি বাচ্চাকাচ্চা দিয়েছে?’
‘চাইডডা বিয়াইছিল, তয়…’, এতটুকু পর্যন্ত বলে মেহেরজান থেমে যায়।
মিথিলা আপা কৌতূহলী হয়ে বলেন, ‘তয়! বুঝলাম না।’
‘সে অনেক কথা’ বলে মেহেরজান হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
ঘটনার আকস্মিকতায় মিথিলা আপা ভড়কে যান। তিনি একটু সুলুক সন্ধানের জন্য প্রথম প্রশ্নে ফিরে যান। বলেন, ‘আপনি তো বললেন না আপনার কী হয়েছে। মুখ-চোখ এমন কেন?’
মেহেরজান চোখ মুছতে মুছতে ভারী গলায় বলে, ‘এ আমার কপাল, আফা।’
মিথিলা আপা অধৈর্য হয়ে বলেন, ‘খুলে বলুন কী হয়েছে; স্বামীর সাথে ঝগড়াঝাঁটি করেননি তো?
মেহেরজান ফোঁপাতে ফোঁপাতে আদুরে গলায় বলে, ‘আপ্নে কি দেইখ্যা বুঝেন না, আফা?’
মিথিলা আপা অবশ্যই এরকম কোনো ঘটনার কথাই ভেবেছেন। তবে ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হতে চেয়েছেন। তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। ভাবেন, এ সমাজটা আর কোনোদিন ঠিক হবে না। নারী-বৈষম্য, নারী নির্যাতন নিয়ে জগতজোড়া হট্টগোল। এদেশেও দেশি-বিদেশী পৃষ্ঠপোষকতায় শত-শত প্রকল্প তৈরি হয়েছে, কত প্রশিক্ষণ-কর্মশালা হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি নেবার পরে তো বটেই, তার আগের প্রতিষ্ঠানে থাকার সময়ও মিথিলা আপা নিজেই এসব প্রকল্পে বহুবার গিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, প্রশিক্ষণ করিয়েছেন। বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাথে সভা করেছেন, এমন কি সেসব প্রকল্পের অধীনে কয়েকবার বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছেন। এতসবের পরেও কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা তিনি দেখতে পান না।
মিথিলা আপা কথা সংক্ষেপ করার জন্য বলেন, ‘আচ্ছা বলেন তো, বিদেশ থেকে আপনার পাঠানো টাকা পেয়ে – তারপর আমাদের দেওয়া আর্থিক সাহায্য পাওয়ার পরও আপনার স্বামী কি আপনার ওপর খুশি হননি?’
মেহেরজান একটু স্থির হয়ে বলে, ‘আফা, যার কপালে সুখ নাই টেকা-পয়সা কোনো সুখ দিতে পারে না। বেটামানুষ সবগুলান একই রকম। টেকা-পয়সা আমার ভাগ্যের লিখন খণ্ডাইতে পারবো না। আপনারা আমার লাইগা অনেক করছেন। আপনার কাছে কিছু চাইতে আসি নাই, আফা। তয়, আপন মনে কইরা একটা কথা কইতে আইছি।’
মিথিলা আপা মেহেরজানের টুকরো টুকরো কথার সমাহার থেকে পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করেন। সাথে সাথে আনমনা হয়ে অন্যকিছু ভাবছেন বলেও মনে হয়। হয়তো তার অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে থাকা এরকম আরও কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ে গিয়েছে। কিংবা এমনও হতে পারে, বাবা-মার অমতে বিয়ে-করা তার অতীত স্বামী রায়হানের কথা মনে পড়েছে। বিয়ের কিছুদিন পরেই যখন তিনি জানতে পারেন রায়হান একটা বাইসেক্সুয়াল তখনই রাগে-দুঃখে-ঘৃণায় মিথিলা আপা অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে যেমনটি হয়, তার বেলাও তেমনটি ঘটেছিল। রায়হান তার ওপর হাত তোলে এবং তিনিও তাকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হন।
মিথিলা আপা সংবিতে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘স্বামী কি খুব জ্বালায়? মামলা টামলা করবেন?’
মেহেরজান মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘না আফা, মামলা কইরা কোনো লাভ আছে?’
‘তাহলে বলেন, কী কথা বলতে এসেছেন।’ মিথিলা আপা হাতের মুষ্টিতে থুতনি ঠেস দিয়ে সোজা হয়ে বসেন।
মেহেরজান বলে, ‘আফা, আমি আবার বিদেশ চইলা যামু।’
মিথিলা আপা লাফ দিয়ে ওঠেন, ‘কী বলেন? আপনাকে আমরা শয়তানের হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলাম। তারপর একটু সম্মানের সাথে যাতে বাঁচতে পারেন সে ব্যবস্থা করলাম। আবার আপনি সেই দোজখে ফিরে যেতে চান?’
‘এছাড়া তো কোনো গতি নাই, আফা’, মেহেরজান বলে।
মিথিলা আপা বলেন, ‘স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়েছে, মিটমাট করেন; ছাগলের খামারটা বড় করেন; বিদেশে গিয়ে আবার বিপদ ডেকে আনতে যাচ্ছেন কেন?’
‘তাইলে হুনেন,আফা। মনে করছিলাম বিদেশ গিয়া টেকা কামাইলে ভাতারটার মন নরম অইব, সংসারে একটু সুখের মুখ দেখুম। হ, টেকা কামাইয়া দেশে পাঠাইছি ঠিকই, কিন্তুক আমার দশা কী হইছিল তা তো আপনারা জানেন। তারপর আপনারা আমারে দেশে আইনা টেকা-পয়সা দিয়ে ছাগলের খামার কইরা দিলেন। ছাগলগুলান থাকলে হয়তো একদিন কপাল খুলতো। জুয়া খেইলা ভাদাইম্যার পুতে হেই ছাগলগুলানও শেষ কইরা দিল।’
‘তার মানে ছাগলের প্রকল্প শেষ!’, মিথিলা আপা আকাশ থকে পড়েন।
মেহেরজানের চোখ টলটল করে। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সে বলে, ‘ছাগল তো গেছেই আফা, এহন আমার টিইক্যা থাকাই দায়। এহন সে আমারে দিয়া ব্যবসা শুরু করছে।’
মিথিলা আপার মুখ লজ্জায়, ঘৃণায় লাল হয়ে যায়, ‘কী বলছেন এসব?’
মেহেরজান লাজ-লজ্জা ভুলে বলে, ‘শরীর বেইচ্যাই যদি বাচন লাগে, তয় ওই শেখের বেটাই তো ভালা আছিল। মারতো, খারাপ কাজ করতো, হের পরেও মাঝে মাঝে একশ রিয়াল দুইশ রিয়াল দিত। দেশে আইসাও তো মাইর খাইতে অয়, বাইরের মাইনসের লগে শুইতে অয়। তাইলে দেশে থাকুম ক্যান?’
মিথিলা আপা আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আজই ওই হারামজাদাকে পুলিশে ধরিয়ে দেব।’
‘না না, ওইসব কইরেন না আফা। ছাড়া পাইলে আমারে খুন কইরা ফালাইব’, মেহেরজান হাত নাড়িয়ে মিথিলা আপাকে বাঁধা দেয়।
মিথিলা আপা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তিনি সমাজের চিত্রটা চোখের পর্দায় তুলে ধরে দেখতে থাকেন। গাছতলা থেকে উঁচুতলা পর্যন্ত বিশেষ করে নারীসমাজের চিত্র তো একই। স্তরভেদে শুধু পরিচ্ছদের ভিন্নতা। নারী একটি পণ্য মাত্র; পুরুষের হাতের পুতুল তথা অলিখিত দাস। মিথিলা আপা ভাবতে থাকেন, শুধু রায়হান কেন, তার বস গিলবার্ট যে তাকে ইন্টারভিউ বোর্ডে বেশি স্কোর দিয়ে চাকরি নিশ্চিত করেছিল তাকেও কি প্রভুশ্রেণি থেকে আলাদা করা যায়। সেও তো সুযোগ পেলেই জড়িয়ে ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে দেয়। বিদেশ ট্যুরে গিয়ে সে দুবার তাকে দখল করতে চেয়েছিল। সাথে আরও সহকর্মী থাকায় কায়দা করে মিথিলা আপা ফসকে যান। কিন্তু কতদিন আর তিনি পিছলে যাবেন? লোভনীয় চাকরিটা বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে কোনো না কোনো এক সময়ে গিলবার্ট নাহয় পিটার, নয়তো অন্য কোনো কর্তার জালে মেকী হাসি মুখে নিয়ে ধরা পড়তে হবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে গিলবার্ট শিস দিতে দিতে কক্ষে প্রবেশ করে বলে, ‘হাই মিথ!’ মিথিলা আপার সামনে একজন ভিজিটর দেখে সে কিছুটা নিরুৎসাহিত বলে, ‘ওহ, ইউ আর বিজি! ইটস্ ওকে। জাস্ট টু রিমাইন্ড, উই আর গোয়িং আউট ফর লাঞ্চ টুডে। ওকে?’
গিলবার্ট চলে গেলে মিথিলা আপার গা গুলিয়ে ওঠে। কোন উপসংহার টেনে তিনি মেহেরজানকে বিদায় করবেন সেজন্য শব্দ খুঁজতে থাকেন।