ফটিকের অন্তর্ধান

বন্ধুত্ব সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ
  • 0
  • 0
  • ৪৫
প্রায় প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যায় তারা কেডস-ট্রাউজার পরে হাঁটতে বেরোন। সুস্বাস্থ্যের জন্য হাঁটা খুবই জরুরি। পার্কটা কাছাকাছি হওয়াতে খুবই সুবিধা হয়েছে। শরীর-স্বাস্থ্য এখনও নিজের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে হাত-পা ছুঁড়ে জোড়া শালিকের মতো পার্কের ভিতরে কিংবা বাইরের ফুটপাথ ধরে গল্প করে হাঁটতে হাঁটতে এক ঘণ্টা সময় বেশ ভালই কেটে যায়। ঝুট-ঝামেলাহীন জীবনে শুধু দু’জনার একান্ত সময় এই প্রৌঢ়ত্বেও কখনও তাদের মধ্যে রোমান্টিকতার আবহ এনে দেয়। কখনও ফেরার পথে ক্যাফে ইউফোরিয়া কিংবা ফ্যাট জো’তে ঢুকে তারা একটু রসনা বিলাসও করেন।

নিতান্ত অনিচ্ছায় ইতালি থেকে ফিরে এসে উত্তরার ফ্ল্যাটেই উঠেছেন দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটানো প্রৌঢ় জুটি – মুজাফফর ও মনোয়ারা। বাইশ শ’বর্গফুটের দখিনমুখী সেমি-লাক্সারী ফ্ল্যাট। ছেলে মুসব্বির ও মুফাখখারের পছন্দ ও অর্থায়নেই মূলত ফ্ল্যাটটি কেনা – বাবার নামে। বাবার যে কেনার সঙ্গতি ছিল না এমন নয়। তবে পিতার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার নিদর্শনস্বরূপ দু’ভাই মিলে ১১ নম্বর সেক্টরে ফ্লাটটি কিনেছে।

মুজাফফর সাহেবের বয়স মাত্র সাতষট্টি। এ বয়সে পেনশনধারী হয়ে গেলেও ইউরোপীয় দেশে অনেকেই টুকটাক কাজ করে। বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশীয় শ্রমজীবীরা তো জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে বা দোকানে হালকা কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখে। মুজাফফর সাহেব জীবনের চল্লিশ বছর রোম, মিলান, ভেনিসে কাটিয়ে মোটামুটি ইতালীয় জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হলেও তার দেশে ফেরার কোনো আকণ্ঠ তৃষ্ণা ছিল না। হতাশা আর অভিমানের কারণে দেশের প্রতি তিনি নেতিবাচক ধারনাই পোষণ করতেন। ছেলেরা চাপ না দিলে হয়তো আরোও অনেকের মতো হেসে-খেলে বাকি জীবনটা ইতালিতেই কাটিয়ে দিতেন। কষ্টের প্রারম্ভিক বছরগুলো কাটিয়ে বৈধতা পাওয়ার পরপরই দেশে এসে তিনি বিয়ে করেছিলেন বটে। কিন্তু স্ত্রী মনোয়ারাকে ভেনিসে নিয়ে যেতে যেতে তিনটি বছর পেরিয়ে যায়। এ সময়ে পরিবারে নতুন দুজন সদস্য যোগ হয়। অবশ্য মেয়ে মুনতাহার জন্ম ইতালিতেই হয়েছে। দেশে ফেরার আগের বছরই ইংল্যান্ড-প্রবাসী এক আত্মীয়ের সাথে মেয়েটিকে বিয়ে দিতে পেরে স্বামী-স্ত্রী দুজনই হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। মুসব্বির তার শারীরিক অক্ষমতার কথা অকপটে জানিয়ে দেবার পর মা-বাবা বাধ্য হয়েই মুফাখখারকে তার পছন্দ করা মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। মেয়েটি অবশ্য বাঙালি, তবে জন্ম ইতালিতে। বলতে গেলে তারা তাদের জীবন নিয়ে আনন্দেই আছে।

সেদিন বিকেলে ব্যালকনির টি টেবিলে বসে গ্রিন টি খেতে খেতে মনোয়ারাই প্রসঙ্গটা তুললেন। বললেন, ‘চলেন না একবার শায়েস্তাগঞ্জ ঘুরে আসি।’

এমনিতেই মুজাফফর সাহেবের দেশপ্রেম অনেক তরল হয়ে আছে। আর গ্রামের বাড়িতে বাপের ভিটেয় যাওয়ার মতো তেমন টানও নেই। তিনি বলেন, ‘ওখানে গিয়ে কী করবে? তোমার ভাই-ভাবীরা তো দুইবার এসে দেখা করে গেছে। আর আমার তো তেমন কেউ নেই। আপন যারা ছিল, তারা সবাই পরকালবাসী।’

মনোয়ারা বলেন, ‘কেউ না থাক, মুরব্বীদের কবর জিয়ারত করে আসা যাবে অন্তত।’

সুবিদ আলী চায়ের কাপ নিতে এসে তাদের কথোপকথন শুনে সে-ও কথার মধ্যে ঢুকে যায়। বলে, ‘ইকটা কেমন লাখান্ কথা কইলেন চাচা। দেশো আমরার বাড়িঘর নাই নি? আফনারার কুনো অসুবিধা অইতো নায়। চলইন ঘুইর‍্যা আই।’

সুবিদ আলী কাবুলের ‘আব্দুর রহমান’ না হলেও এই বাসার ম্যানেজার-কাম-হোয়াট নট। একটা কাজের বুয়া দুই ঘণ্টার জন্য এসে ধোয়ামোছা এবং টুকিটাকি কাজ করে দিয়ে যায়। শপিং কুকিং সহ বাকি সব কাজ একা সুবিদ আলীই চালিয়ে নিতে পারে এবং ভালভাবেই পারে। মনোয়ারার ভাই-ই সুবিদ আলীকে খুঁজে বের করেছেন। শায়েস্তাগঞ্জের এক রেস্টুরেন্টে সে বেশ কিছুদিন কাজ করার সুবাদে রান্নাবান্নার কাজে বেশ পাকা। তবে প্রথম দিকে মনোয়ারা তাদের পছন্দের খাবার রান্না করার কায়দা-কানুন তাকে দেখিয়ে দিয়েছেন। সুবিদ আলী অল্প সময়েই এসব রপ্ত করে নিয়েছে। তবুও মাঝেমধ্যে মনোয়ারা তাকে রান্নাবান্নার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় টিপস দেন। বিশ্বস্ত বলে সুবিদ আলীর ওপর তাদের নির্ভরতাও অনেক। দু’তিন মাস পর পর সুবিদ আলী বাড়িতে যেতে চাইলে তারা তাকে দুই দিনের বেশি ছুটি দেন না। এতে সে মন খারাপ করে না। কারণ চাচা-চাচী তাকে শুধু গাড়িভাড়াই দেন না, ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু কেনাকাটার জন্য বাড়তি হাজারখানেক টাকাও হাতে ধরিয়ে দেন।

সুবিদ আলীর কথা শুনে মুজাফফর সাহেব হেসে দেন। বলেন, ‘তাহলে তো তোমার সুবিধা হয়। আর তোমার চাচিরও গঙ্গানগর ট্যুর করা হয়ে যায়।’

মনোয়ারা বলেন, ‘সত্যি বলছি, আপনি রেডি হোন। এই আট-নয়মাসে এই ঘিঞ্জি ঢাকায় শ্বাস আটকে যাচ্ছে আমার; একটু অক্সিজেনের দরকার।’

মুজাফফর সাহেব মহা ফাঁপরে পড়ে যান। নিজের এলাকায় গেলে আত্মীয়স্বজন যারা আছে তাদের সাথে না হয় দেখা হল, কিন্তু পুরনো বন্ধুবান্ধব, সহযোদ্ধা কারুর না কারুর সাথে দেখা হয়ে যাবার ঝুঁকিও তো থেকে যায়। মুজাফফর সাহেব এ ব্যাপারে অনীহ।

সুবিদ আলীই ফোন করেছিল মুজাফফর সাহেবের চাচাতো ভাই আবুলের কাছে। মুজাফফর সাহেবের প্রায় পরিত্যক্ত চৌচালা ঘরটিকে আবুল মূলত ভাঁড়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বহুদিন ধরে। অবশ্য সে সবসময় বাথরুমসহ দুটি কক্ষ ঝাড়পোঁছ করে রাখে; কদাচিৎ মেহমানের আধিক্য হলে কক্ষদুটি ব্যবহার করা হয়। সুবিদ আলী বলেছিল, গোপনীয়ভাবেই যেন কক্ষদুটি গোছগাছ করে রাখা হয়। সেই গোপন সংবাদটি পরিবারের অনেকের কাছে তো বটেই, মুজাফফর সাহেবের কিছু পুরনো বন্ধুর কান পর্যন্তও চলে যায়।

মুজাফফর সাহেব অনেকটা বাধ্য হয়েই একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে শায়েস্তাগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করেন শরতের এক ফুরফুরে সকালে। এ যাত্রায় মনোয়ারা বেগমই বেশি উত্তেজিত নিঃসন্দেহে; তবে তার চেয়ে বেশি উল্লসিত সুবিদ আলী। নোয়াপাড়ায় গাড়ি থামিয়ে যখন মুজাফফর সাহেব কফি খেতে খেতে প্রাণভরে প্রকৃতির সবুজ উপভোগ করার জন্য দু’কদম হাঁটাহাঁটি করছিলেন তখন মনোয়ারা জোরে শ্বাস টেনে ফুসফুসে অক্সিজেন ভরছিলেন। সুবিদ আলী তখন সোৎসাহে গাইডের মতো বোঝাচ্ছিল, ‘বুঝচইন চাচা, ইতা আগর লাখান সুন্দর নাই; মাইনসে গাছগাছালি কাইট্যা বাড়িঘর বানাইয়া বিনাশ কইর‍্যা ফালাইছে।’

মুজাফফর সাহেব সুবিদ আলীর কথা শুনে মুচকি হাসেন। জিজ্ঞেস করেন, ‘সুবিদ আলী তোমার বয়স কত? যুদ্ধ দেখেছ?’

‘না চাচা’, সুবিদ আলী বলে। ‘শেখ মুজিব যেদিন খুন অইছইন, হেইদিন আমার জন্ম অইছে।’

মুজাফফর সাহেব এবার জোরে হেসে ওঠেন। সুবিদ আলীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে তুমি জন্মদিবস না শোকদিবস পালন কর?’

সুবিদ আলী কিছু না বুঝে হা করে থাকে। আসলে ওসব দিবস টিবসে তার সম্পৃক্ততা এবং আগ্রহ একেবারেই কম। একটি বিশেষ দিনে সে জন্মানোয় বিভিন্ন সময়ে বড়রা উল্লেখ করত বলে সে তার জন্মতারিখটা মনে রেখেছে। যুদ্ধের কথা সে বলবে কেমন করে? যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে তারাই যুদ্ধের ঘটনা, শ্লোগান এবং উদ্দেশ্য সব ভুলে গেছে। এখন অনেকেই যা বলে তা নিজের মত করে সাজিয়ে বলে; মনের মাধুরী মিশিয়ে ইতিহাসের ক্যানভাসে রং চড়ায়।

সুবিদ আলী জানে না যে এ তল্লাটের মানচিত্র তার মালিক মুজাফফর সাহেবের মগজে আঁকা আছে। এই পাহাড়ি অঞ্চলের ফাঁকফোকর, ঝর্ণা-ছড়ায় একাত্তরের যুদ্ধের দিনগুলি তিনি কাটিয়েছেন। চা-বাগানের ভেতরে কয়েকজন সহযোদ্ধাকেও হারিয়েছেন সম্মুখসমরে। তারপরও মুজাফফর সাহেব সেসব স্মৃতি ভুলে থাকতে চান।

পরিস্থিতি কখনও মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেও পরাভূত করে। মুজাফফর সাহেব তার স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থানে আর যাবেন না বলে পণ করলেও শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে এলেনই। আবুল সুচারুরূপে ভাই-ভাবীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। মনোয়ারার বাপের বাড়িতে কিছুদিন নাইওরী করার ইচ্ছা থাকলেও মুজাফফর সাহেব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি তিন দিনের বেশি দেশের বাড়িতে থাকবেন না।
লোক সমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই দূরের কাছের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী অনেকেই এসে হাজির হয়। এদের প্রায় সবাই বয়সে প্রবীণ। সবারই এক কথা, ‘ভাইরে, আমরা কী অপরাধ করলাম, আমরা তো তোমার কাছে কিছু চাইনা, তুমি তোমার জনমভিটা ছাইড়া দিলায় কিতার লাইগ্যা?’

মুজাফফর সাহেব এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে বিরক্ত বোধ করেন। তিনি বলতে পারতেন, এ মাটি তার রক্ত ঘাম দিয়ে কেনা। বুলেটের মুখে নিজেকে সঁপে দিয়ে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন এ মাটি। এ মাটির মায়া তিনি এমনি এমনি ত্যাগ করেননি। স্বাধীনতার পর পর দেশের মানুষগুলো আস্তে আস্তে কেমন পালটে যেতে থাকে। হানাহানি, চুরিচামারি, হিংসা বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র, অরাজকতা, জিঘাংসা ইত্যাদি ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকলে মুজাফফর সাহেব মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন। বিশেষ করে পঁচাত্তরের নির্মম নিষ্ঠুর ঘটনাপ্রবাহ তাকে পরিচয় সঙ্কটে ফেলে দিলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আর নয়; এই জঘন্যতম পরিবেশে বীরের তকমা এঁটে না থেকে বিদেশে গিয়ে খেটে খেলেও মানসিক শান্তি পাওয়া যাবে। তাই তার পালিয়ে বাঁচা।

পরদিন সকালে লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাশের গ্রামের লাবু মিয়া এসে হাজির হলে মুজাফফর সাহেব প্রথমে তাকে চিনতেই পারেননি। যখন আবুল বলল, ‘ভাইসাব, তাইন মুক্তিযোদ্ধা লাবু মিয়া, আপনারা এক লগে যুদ্ধ করছিলা’ তখন মুজাফফর সাহেব লাফ দিয়ে উঠে এসে লাবু মিয়াকে জড়িয়ে ধরেন। লাবু মিয়া হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলে মুজাফফর সাহেবের দু’চোখও ভিজে যায়। এই সেই লাবু মিয়া যার হাঁটুতে গুলি লাগলে মুজাফফর সাহেব নিজের কাঁধে করে তাকে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিলেন।

দীর্ঘ আলাপচারিতায় এবং স্মৃতি রোমন্থনে মুজাফফর সাহেব বুঝলেন, না, অন্য অনেকের মতো লাবু মিয়ার কপাল খুলেনি। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আর চিকিৎসা সুবিধা ছাড়া আর কোনো দাও মারতে পারেননি লাবু মিয়া। লাবু মিয়া কিছু ভাগ্যবান মুক্তিযোদ্ধা এবং অমুক্তিযোদ্ধার অগ্রযাত্রার ফিরিস্তি দিতে চেয়েছিলেন, মুজাফফর সাহেব তখনই তাকে থামিয়ে দিয়েছেন।

মুজাফফর সাহেব যার কথা কখনও স্মরণ করতে চান না, লাবু মিয়াকে দেখে তার মুখচ্ছবিটাই বার বার স্মৃতির আয়নায় ভাসতে থাকে। তাই লাবু মিয়া বিদায় নেবার বেলায় ওর কথা জিজ্ঞেস না করে পারলেন না। বললেন, ‘ফটিক কেমন আছে? বেঁচে আছে তো?’

লাবু মিয়া থমকে দাঁড়ালেন। তিনি জানেন ফটিকের সাথে মুজাফফর সাহেবের কেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল। যুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় তারা একসাথে অপারেশনে গিয়েছেন। বৃন্দাবন কলেজে তারা একসাথে পড়াশোনা করেছেন। যুদ্ধের পরও তারা লেখাপড়ায় ফিরে গিয়েছেন একসাথে। মুজাফফর সাহেব যুদ্ধপরবর্তী সামাজিক বৈকল্যে লেখাপড়ায় মনঃসংযোগ করতে না পারলেও তারা দুজন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছিলেন। ফটিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করলেও মুজাফফর সাহেব কিছুই করেননি। লাবু মিয়া এটুকুও জানেন মুজাফফর সাহেব প্রবাসী হওয়ার পর ফটিকের সাথে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

মুজাফফর সাহেবের দিকে বিষণ্নভাবে তাকিয়ে লাবু মিয়া বলেন, ‘ফটিক মাস্টার গতবছর মারা গেছে।’

দীর্ঘদিন পর এই প্রথম মুজাফফর সাহেবের বুকটা ধক করে ওঠে। তার মনে হল মাধবপুর চা বাগানের আড়াল থেকে হানাদারের ছোঁড়া একটি বুলেট এসে তার হৃৎপিণ্ড ভেদ করে চলে গেল। তার দুচোখ আপনাআপনি আর্দ্র হয়ে যায়।

লাবু মিয়া চলে যাওয়ার পর থেকে মুজাফফর সাহেবের বুকে এক ধরনের হাহাকার ঘাঁটি গেড়ে বসে। তিনি নিজের ভুল সিদ্ধান্তের ওপর বিরক্ত হন। স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে শায়েস্তাগঞ্জে না এলে তাকে মানসিক পীড়ায় ভুগতে হত না। তাছাড়া তিনি ফটিকের কথা লাবু মিয়ার কাছে জিজ্ঞেস না করলেও পারতেন। চল্লিশটি বছর মন থেকে অনেক কিছুকেই তিনি তাড়িয়ে দূরে রেখেছেন, ফটিককেও। জীবনের উচ্ছল উদ্দাম সময়ে যে ফটিক তার ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল, গেরিলা যুদ্ধে যে সবসময় তার পাশে থাকত আর বলত ‘মরলে এক সাথেই মরব’ সে এক সময় হঠাৎ করে বন্ধু মুজাফফরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। শুধু তাই নয়, মুজাফফর সাহেবের বিয়েতে পর্যন্ত সে এল না। বিয়ের পর দুই দফায় দেশে এলেও তিনি ফটিকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি। কিন্তু তার মৃত্যুসংবাদ মুজাফফর সাহেবকে মুষড়ে দিয়েছে।

রাতে ভাল ঘুম না হলেও মনোয়ারার তাড়া খেয়ে মুজাফফর সাহেবকে সকাল সকাল বিছানা ছাড়তে হল। ঢাকায় ফিরে যাবার আগে অন্তত এক রাত শ্বশুরবাড়িতে থাকতে হবে। মনোয়ারার বড় ভাই একটি গাড়ি ভাড়া করে ইতিমধ্যেই এসে হাজির হয়েছেন। এসব ডামাডোলের মধ্যেই কেউ একজন এসে খবর দিল, একটি যুবক মুজাফফর সাহেবের খোঁজে এসেছে। নাম মানিক। মুজাফফর সাহেব মানিক নামে কাউকে চিনেন না। তবুও তিনি বাড়ির ফটকে এগিয়ে গেলেন।

যুবকটি ‘স্লামালেকুম চাচা’ বলে নিজের পরিচয় দিল। ‘আমার বাবার নাম ফটিক; লাবু চাচার কাছে শুনলাম আপনি বাড়িতে এসেছেন, তাই দেখতে এলাম।’

মুজাফফর সাহেব বেসামালের মত মানিককে বুকের সাথে চেপে ধরলেন, ‘তুমি ফটিকের ছেলে! আস আস, ভিতরে আস।’

ভেতরবাড়িতে মানিককে নিয়ে গেলে মনোয়ারার ভ্রু কুচকে যায়। অসময়ে এই অনাহূত আগন্তুক এসে পড়ায় বাপের বাড়ি যেতে তার দেরি হয়ে যাবে। তিনি মুজাফফর সাহেবকে ভিতরে ডেকে নিয়ে লোকটাকে তাড়াতাড়ি বিদায় করার জন্য বললেন।

মুজাফফর সাহেব উত্তেজিত থাকার কারণে স্ত্রীর তাড়া মাথায় না নিয়ে বললেন, ‘এ আমার বন্ধুর ছেলে, ভাল কিছু নাশতা পাঠিয়ে দাও।’

দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে মুজাফফর সাহেব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মানিকের পরিবার পরিজনের খোঁজখবর নিলেন। ফটিকের কী অসুখ হয়েছিল এবং কোথায় কবর দেয়া হয়েছে তা-ও জিজ্ঞেস করলেন। তিনি খুব আদর করে মানিককে নাশতা খাওয়ালেন এবং সে বিদায় নেয়ার সময় জোর করে তার হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দিলেন।

ফটিক চলে যাবার সময় শক্ত কাগজের আঠাবদ্ধ একটি পুরনো সরকারি খাম পকেট থেকে বের করে মুজাফফর সাহেবের হাতে দিয়ে বলল, ‘বাবা মারা যাবার বেশ আগেই এই খামটি আমাকে দিয়ে বলেছিলেন আপনি কখনও দেশের বাড়িতে এলে আমি যেন এটা আপনার কাছে পৌঁছিয়ে দিই।’

প্রায় বিভ্রান্তের মতো মুজাফফর সাহেব খামটি হাতে নিলেন বটে, তবে তৎক্ষণাৎ সেটি খুললেন না। কারণ ভেতর থেকে স্ত্রী তাড়া দিচ্ছেন।

মুজাফফর সাহেবের শ্বশুরবাড়ি খুব বেশি দূরে নয়; খোয়াই নদীর ওপারে গঙ্গানগরে। শ্বশুরবাড়ির আদর-আপ্যায়নের আতিশয্যে কীভাবে যে দুপুর বিকেল সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল তিনি টেরই পাননি। রাতের খাবার-দাবার পর্ব শেষ হলেও মনোয়ারা ভাই-ভাবীদের নিয়ে এমন মাতোয়ারা হয়ে রইলেন যে স্বামীর দিকে বাড়তি মনোযোগ দিতেই ভুলে গেলেন। এই ফাঁকে মুজাফফর সাহেব টিভি রুমে বসে মানিকের দেয়া খামটি খোলার সুযোগ পেলেন।

এক সময় গলায় গলায় বন্ধুত্ব ছিল যে লোকটির সাথে চল্লিশ বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর সে কী দলিল রেখে অন্যলোকে চলে গেল? মুজাফফর সাহেব তাই অনেক উত্তেজনা এবং ঔৎসুক্য নিয়ে খামটি খুললেন। চিঠিখানি অতি ছোটও না আবার খুব বড়ও না। স্কুল-খাতার কাগজে পাঁচ পৃষ্ঠার চিঠি। মুজাফফর সাহেব নিবিষ্ট হয়ে চিঠির প্রতিটি লাইন পড়ে যাচ্ছেন এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কারণ ফটিক হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তাদের সোনালি দিনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। অগ্নিঝরা উত্তাল সত্তরে কলেজে ভর্তি হবার কথা, যুদ্ধের ভয়াল নয় মাসের কথা, যুদ্ধের মাঠ থেকে পিছু হটতে গিয়ে ফটিকদের বাড়িতে দুজনের আত্মগোপন করার কথা, ফটিকের মা কীভাবে বাতি নিভিয়ে রান্না করে তাদের ভাত খাইয়েছিলেন সেসব কথা অল্প ভাষ্যে তিনি স্মরণ করেছেন। তাছাড়াও, যুদ্ধোত্তর দিনের হৈহুল্লোড়ের মধ্যে আবার তারা কীভাবে কলেজে ফিরে গিয়েছিলেন সেকথাও আছে চিঠিতে।

চিঠি পড়তে পড়তে মুজাফফর সাহেবের চোখের সামনে সেই টুকরো ঘটনাগুলো ছবির মতো ভেসে ওঠে। চিঠির ওপর টুপ করে দু’ফোটা অশ্রু পড়লেই তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি কাঁদছেন। তবে চিঠির শেষ অনুচ্ছেদটি পড়ার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।

শেষ অনুচ্ছেদে ফটিক লিখেছেন: ‘মনোয়ারা আমার দূরাত্মীয় ছিল। সে আমাকে কতটা পছন্দ করেছিল তা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে আমার জানার সুযোগ হয়নি। তবে আমি তাকে খুবই পছন্দ করতাম। তাই মুরুব্বিদের পাঠিয়ে বিয়ের কথাবার্তা প্রায় পাকা করে ফেলেছিলাম। তখনই তুই দেশে এলি। ইতিমধ্যে তোর অভিভাবক মনোয়ারার অভিভাবকের সাথে দেখা করে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেন। আর এটা তো সহজ ছিল। আমি অতি সাধারণ প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক; তার বিপরীতে অপার সম্ভাবনাময় ইউরোপপ্রবাসী পাত্র। যে কোনো পাত্রীপক্ষের জন্য তা লোভনীয়। তুই আসতে না আসতেই পাত্রী দেখতে গেলে এবং মনোয়ারাকে তোর খুবই পছন্দ হল। সে তো হবারই কথা। সময় স্বল্পতার জন্য এক সপ্তাহের মধ্যেই তোদের বিয়েও হয়ে গেল। তোর সাথে আমার দেখা হওয়ার আগেই যখন দ্রুতলয়ে বিয়ের বাদ্য বেজে উঠল, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি তোর সাথে দেখা করব না। আর দেখা করার কি আমার মুখ ছিল, বল। আমি জানতাম আমার কথা জানলে তুই কখখনোই এই বিয়েতে রাজি হতি না। কিন্তু, আমি এ কাজ করব কেমন করে, বল। তুই আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তোর প্রতিদ্ধন্দী আমি হব কেমন করে। তাই আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর সুখের জন্য, প্রাণোচ্ছল দাম্পত্য জীবনের জন্য আমি নিজেই নিজের হৃৎপিণ্ডটি কেটে ফেলে দিলাম। এতে আমার অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। তুই আমাকে অনেক খুঁজেছিস, কিন্তু আমি পালিয়ে বেড়িয়েছি। এসব কথা তোর অজানাই ছিল। তবে কোনোভাবে তুই যাতে আমাকে ভুল না বুঝিস সেজন্য মৃত্যুর আগে এই পত্রখানি তোর জন্য লিখে রেখে গেলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস।’

অন্য কক্ষ থেকে তখন দিলখোলা হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। টিভিতে মমতাজ বেগম হেলেদুলে ‘বুকটা ফাইট্টা যায়…’ গেয়ে চলেছে। বিদ্যুতের আলোয় ঘর-বাড়ি ফকফক করছে। কিন্তু মুজাফফর সাহেব বন্ধু ফটিকের চিঠিখানি হাতে নিয়ে অনড় মূর্তির মতো বসে আছেন। তার কানে এসব কোলাহল পৌঁছাচ্ছে না; আলোর বন্যা বয়ে গেলেও তার চোখে মিশকালো অন্ধকার, যেমনটি ছিল একাত্তরের অক্টোবরের এক ভয়াবহ রাতে নোয়াপাড়ার গভীর জঙ্গলে। এ অবস্থায় হঠাৎ অ্যামবুশে থাকা ফটিকের চাপাকণ্ঠে তিনি শুনতে পান, ‘বন্ধু, আমি মরে গেলে খবরটা বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিস।’
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী চমৎকার একটি লেখা পড়লাম। খুব ভালো লাগলো, কবির জন্য রইলো শুভকামনা।
Ahad Adnan অনেক ভালো লেগেছে। শুভকামনা প্রিয় লেখক।

১৯ নভেম্বর - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "ডিজিটাল ভালবাসা”
কবিতার বিষয় "ডিজিটাল ভালবাসা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ অক্টোবর,২০২১