তমসাবৃত কুদরত আলী

একটি কালো রাত সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ
  • 0
  • 0
  • ১৯৩
কুদরত আলী সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে বুকের ভেতর কিছুক্ষণ ধোয়া চেপে ধরে নাক দিয়ে ছাড়তে ছাড়তে বলে, ‘আলতু ফালতু কথা কইয়া মাথাটা গরম করিস না। হাজারটা সমস্যায় ডুইবা রইছি, এর মাইদ্যে…।’

‘আরে আমিতো কই না’, রইসুদ্দি নিজের গায়ের ধূলা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে, ‘এইটা আমাগো কমান্ডারের বিবেচনা।’

বদির হাটের দোকানপাট সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বন্ধ করার খবরদারির জন্য কুদরত আলী ও রইসুদ্দি কাল শার্ট এবং খাকি প্যান্টের ইউনিফর্ম পরে কাঁধে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ঝুলিয়ে ডিউটিতে এসেছিল। বরাবরের মত মত আজও হাসিমের চায়ের দোকানের চুলা নিভানোর আগেই দুজন দুই কাপ ফ্রি মেরে দিয়ে দুইটা কমেট সিগ্রেট ঠোঁটে পুরে বড় রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তাদের নাইট ডিউটি আছে টেপির খালের ব্রিজে। সেদিকে এগুতে এগুতে রইসুদ্দি একটা টোকা দিয়ে কুদরত আলীর প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিল।

অক্টোবরের শেষ দিক। ধানক্ষেতে এখনও সোনালি রং না ধরলেও তা এখন পূর্ণ মেয়াদের পোয়াতি। এরকম নিবিড় ধানের মরশুমে গাদ্দার মুক্তিওলাদের চোরাগোপ্তা হামলা বেড়ে গেছে। গত এক মাসেই আশেপাশের থানায় তিনটা ব্রিজ ভেঙ্গে দিয়েছে তারা। শুধু তাই নয়, ক্যাপ্টেন বসারতের জীপে গ্রেনেড ছুঁড়ে মেরেছ কদিন আগে; আর মধুখালের ব্রিজ থেকে এক রাজাকারকে তুলেই নিয়ে গেছে। এসব কারণে রাজাকারদের সাথে পালা করে ব্রিজ পাহারা দেয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবী পাবলিকের সংখ্যা দুই থেকে বাড়িয়ে চার জন করা হয়েছে। অস্ত্রধারী রাজাকার চারজন হলেও কুদরত-রইসুদ্দিরা ধুকপুকে বুক নিয়ে নাইট ডিউটি করে। তারা যুদ্ধের সূক্ষ্ম খেলা না বুঝতে পারলেও আর্মিদের চেহারা এবং এলাকার শান্তি কমিটির নেতাদের হাবভাব দেখে এইটুকু বুঝতে পারে, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। কিন্তু ভুলেও তারা প্রকাশ্যে এই উদ্বেগ দেখায় না।

দেশের প্রতি মহব্বতের চেয়ে পেটের দায় যাদের বেশি এরকম কিছু লোক রাজাকারের দলে যোগ দিয়েছে। আবার কিছু জওয়ান রাইফেল হাতে নিয়ে একটু ভাব দেখানোর জন্যও খাতায় নাম লিখিয়েছে। কুদরত আলী প্রথম দলের। কৃষক মানুষ, মিটিং মিছিলে খুব একটা যাওয়ার সময় পায়নি, নির্বাচনে তার পক্ষপাত গোণার মধ্যেও ছিল না। তাই হানাদার বাহিনী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে অনেকের মতো সে-ও কিছুদিন ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল, এর বেশি কিছু নয়। পরে যখন দেশকে পাক-পবিত্র রাখার জন্য ধীরে ধীরে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী, আলবদর বাহিনী, আলশামস বাহিনী গঠিত হতে লাগল তখন দোস্ত রইসুদ্দিই কুদরতকে টেনে নিয়ে আসে রাজাকার বাহিনীতে। প্রথমে কুদরত ভড়কে গেলেও দাঁড়িপাল্লার কঠোর সমর্থক রইসুদ্দি কানে কানে এমন মন্ত্রণা দিল যে তাকে বাধ্য হয়েই ঢেঁকি গিলতে হল। সুযোগ-সুবিধা, পাওয়ারের পাশাপাশি যে যুক্তিটাকে কুদরত বেশি গুরুত্ব দিল তা হল, মাদারচোদ পাঞ্জাবির বাচ্চারা নারায়ে তকবির বলতে বলতে সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে মেয়েছেলেদের সাথে যে জেনা-ব্যভিচার করে এ কথা মিথ্যা নয়। ‘কিন্তুক আমরা তাগো লোক হইয়া গেলে, আমাগো বাড়ির দিকে হেরা নজর দিব না।’

গায়ে-গতরে পুরুষ্টু অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার সিকান্দার খান তার নাম ও বংশের প্রতি সুবিচার করেই আগাগোড়া মুসলিম লীগার হিসেবে পরিচিত। আর্মিরা গ্রামের স্কুলে ক্যাম্প খুলতেই সে তোহফা হিসেবে একটি ছাগল নিয়ে গিয়ে সেখানে ভয়ে ভয়ে হাজির হয়। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর এলাকার সব দেশপ্রেমীর জটলা দেখে তার বুকে সাহস ফিরে আসে। সশব্দ একটা স্যালুট মেরে চোস্ত উর্দুতে যখন ক্যাপ্টেন বসারতকে সে বলল, ‘কুচ পরওয়া নেহি, হাম সব লোগ আপকো সাত হ্যায় স্যার’, তখনই সে আলাদা কদর পেয়ে যায়। তার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন ক্যাম্পে গিয়ে সৈন্যদের সাথে উর্দু কপচায়; মাঝে মাঝে গোস্ত-রুটিও খায়। তাই যখন রাজাকার বাহিনীর সূত্রপাত হয় তখনই তার ডাক পড়ে এবং কদমরসুল ইউনিয়নের রাজাকার কমান্ডারের দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়।

অতি সাম্প্রতিক সাপ্তাহিক রুটিন প্যারেডে কমান্ডারের অস্বাভাবিক তর্জনগর্জন দেখে উপস্থিত রাজাকার সদস্যরা একটু ভয় পেয়ে যায়। কমান্ডার দু’হাত ছুঁড়ে চিৎকার করে বলছিল, ‘এই দেশ গাদ্দারে ভইরা গেছে; সবার বাড়িতে বাড়িতে, ঘরে ঘরে গাদ্দার আছে। নাইলে কেমন কইরা হারামজাদারা দেশের ভিতরে ঢুইকা ডাইনামাইট ফুটায়, ব্রিজ ভাইঙ্গা দেয়, গুলি মাইরা পালাইয়া যায়?’

কমান্ডারের বড় বড় লাল চোখ দেখে কুদরত আলী একটু বেশি ভয় পায়। রইসুদ্দির সেদিনের সন্দেহপূর্ণ কথাটা তাকে আরোও বেশি কাবু করে ফেলে। কমান্ডার কি আসলেই তার ওপর নজর রেখেছে? এখন যদি কমান্ডার বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দেয়! হুসনার যা অবস্থা, এ মুহূর্তে তাকে অন্য কোথাও পাঠানো যাবে না।

সেদিন রাতে নাইট ডিউটিতে গেলে রইসুদ্দি ইশারায় কুদরত আলীকে ব্রিজের অন্যপাশের কদমগাছের তলায় নিয়ে যায়। তারপর চতুর্দিকে টর্চ মেরে ‘হুঁশিয়ার’ বলে একটা হাঁক দিয়ে ফিসফিস করে কুদরতকে বলে, ‘তোরে কইছিলাম না, দেখছস কমান্ডারের হালচাল? আচ্ছা, বিষয়টা তুই পরিষ্কার কইরা ফালাস না ক্যা?’

কুদরত ঢোক গেলে; কিন্তু অন্ধকারে রইসুদ্দি তা বুঝতে পারে না। তারপরও কুদরত স্বাভাবিক গলায় বলে, ‘আচ্ছা ক তো, আমরা নিজের লোক, তার মাইদ্যে এইসব কথা। খারাপ লাগে না?’

‘তাইলে জিনিসটা কিলিয়ার কইরা ফালা; কমান্ডারের কাছে আমি তোরে লইয়া যামু।’ বলে, রইসুদ্দি উত্তরের আশায় কুদরত আলী মুখের দিকে তাকায়।

সকাল বেলা পান্তা খাওয়ার পর কুদরত অন্যদিনের মত দুম করে শুয়ে পড়ে না। পিড়িতে বসে বসেই একটা সিগ্রেট বের করে স্ত্রী আকলিমুনকে জিজ্ঞেস করে, ‘হুসনা কি উডে নাই?’

আকলিমুন বলে, ‘না, হের শরিলডা ভালা না; শুইয়া রইছে।’

সিগ্রেটে আগুন ধরিয়ে নিজের মাথার চুল ধরে টান দিয়ে মুখ বিকৃত করে কুদরত বলে, ‘শুয়োরের বাচ্চা আমারে কি বিপদেই না ফালাইয়া গেছে।’

আকলিমুন কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, ‘কার কথা কও?’

‘কার কথা কই বুঝস না?’ কুদরত ধমক দিয়ে ওঠে।

আকলিমুন তখন ধারনা করে এটা হুসনার স্বামীই হবে। কিন্তু নতুন কী বিপদ হয়েছে সেকথা স্বামীর কাছে জানতে চাওয়ার সাহস পায় না।

হুসনার সময় ঘনিয়ে এসেছে। যে কোনো সময় ব্যথা উঠতে পারে; এ অবস্থায় আকলিমুন যেমন ত্রস্ত তেমনি কুদরতও বিধ্বস্ত। সময়টা খুবই খারাপ যাচ্ছে। মুক্তিওলাদের চোরাগোপ্তা হামলা কমেতো নাই-ই, বরং বেড়েছে। কমান্ডার সিকান্দার খান পাগলা কুত্তার মতো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। যখন তখন সবাইকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে এবং শাসাচ্ছে। মদনপুরে সন্ধ্যার পর পর স্টেনগানের গুলিতে দুইজন রাজাকারকে গুরুতর আহত করে দুষ্কৃতিরা হাওয়া হয়ে গেছে। সিকান্দার খানের অভিযোগ হল, গাঁওগেরামে ঘুরাঘুরি করেও বানচোদ রাজাকাররা কেন শালা মুক্তিওলাদের আনাগোনা টের পায় না। তার সন্দেহ রাজাকারের কোনো কোনো সদস্যের সাথে শত্রুদের নিশ্চয়ই যোগাযোগ আছে। সেদিন কুদরত আলীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে পষ্টাপষ্টি বলে দিয়েছে, ‘আমি যেকোনো সময় যেকোনো লোকের বাড়িতে যামু। বেইমানদের আমি ছাড়মু না।’

সেদিন সন্ধ্যায় ডিউটিতে যাবার আগে কুদরত আলী ফুঁসতে ফুঁসতে আকলিমুনকে বলেছে, ‘কুত্তার বাচ্চারে যদি সামনে পাইতাম, গুল্লি মাইরা ওরে ঝাঁঝরা কইরা ফালাইতাম।’

আকলিমুন স্বামীর মুখ চেপে ধরে বলেছে, ‘আস্তে কও, হুসনা কষ্ট পাইব।’

কুদরত আরোও উত্তেজিত হয়ে বলেছে, ‘পুরা গুষ্টিরে যখন আর্মিরা বেরাশ ফায়ার করব, তখন কি আরাম লাগব?’

আকলিমুন কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে কুদরতের মুখের দিকে তাকায়।

তবে কুদরত ঘর থেকে বেরোনোর আগে আকলিমুন এবং হুসনাকে ফিসফিস করে বলে যায় তার অবর্তমানে কেউ এসে হুসনার স্বামীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা যেন দৃঢ়ভাবে বলে যে মতি ঢাকায় দারোয়ানের চাকরি করে; মালিক ছুটি দেয় না তাই সে আসতে পারে না।

হুসনার বিয়ের দুই মাস পর হন্তদন্ত হয়ে এক সন্ধ্যায় মতি শ্বশুরবাড়িতে এসে হুসনাকে রেখেই চম্পট দিয়েছে। আকলিমুন অনেক চাপাচাপি করলেও সে বলেছে, ‘ভাবী, কিসসু কইবেন না, একটা কথাও জিগাইবেন না, আমার পানি খাওনেরও সময় নাই, আমারে ছাইড়া দেন, বাঁচলে দেখা অইব।’

আকলিমুন বলেছে, ‘গেরস্থ বাড়িতে নাই, এইরকম কি চইলা যাওন যায়?’

‘ভাইজান আইয়া পড়লে বিপদ অইয়া যাইব, আমি চললাম’ বলে মতি আর এক মূহুর্তও দাঁড়ায়নি। হাতে কাপড়ের একটা ছোট্ট পোটলা নিয়ে সে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

সেদিন কুদরত নাইট ডিউটিতে চলে যাবার পরই হুসনার ব্যথা ওঠে। কুন্তি মাসীকে আগেই বলে রেখেছিল আকলিমুন; কিন্তু এই ভয়ঙ্কর সময়ে তাকে ডেকে আনবে কে? সে থাকে গ্রামের শেষ মাথায়। এখন যা করবার আকলিমুনকে অদক্ষ হাতে একাই করতে হবে। তবে আকলিমুনের গোদের ওপর যে বিষ ফোঁড়া সেটাই তাকে বেশি কুপোকাত করে ফেলেছে। পরিবারের এই দুর্যোগের সময় যদি হঠাৎ মতি এসে হাজির হয়। গত এক মাসে সে দুইবার এসেছে তাদের বাড়িতে; কুদরত এ ব্যাপারে ঘুণাক্ষরেও জানে না। দ্বিতীয়বার যখন এসেছিল তখন সে বলেছে, ‘ভাবী হেব্বি অপারেশন চলতাছে, বাচি না মরি জানি না, ভাইজানরে কিছু কইয়েন না। বাইচা থাকলে আট-দশদিন পর আরেকটা অপারেশনে আমু।’ এর বেশি কিছু বলেনি মতি। রাত নিঝুম হলেই সে ম্যাজিকের মতো মিলিয়ে যায়।

হুসনার ব্যথা চরমে উঠেছে। আকলিমুন তার দেড় বছরের ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দরজার খিল আটকে দিয়ে পাকঘরের চাটাইয়ে শোয়া হুসনাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে এবং দোয়া-দরুদ পড়ছে। নিজের বাচ্চা প্রসবের যতটুকু অভিজ্ঞতা আছে তা প্রয়োগ করা ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। কিন্তু কোনোভাবেই সে যেন সামাল দিতে পারছে না। কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ রাতের নৈশব্দ বিদীর্ণ করা গুলির আওয়াজ শোনা যায়; প্রথমে একটা, পরে এক জোড়া, তারপর বেশ কয়েকটি। গুলির শব্দে হুসনা প্রচণ্ড কেঁপে ওঠে । তার প্রসব যাতনার মরণ চিৎকার যেন ঝটিতে থেমে যায়। আকলিমুনের সেদিকে খেয়াল নেই। সে যন্ত্রচালিতের মত ঘরের দরজা খুলে দেউড়িতে এসে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে পড়ে।

হুসনার ককানি শুনে আকলিমুন সম্বিৎ ফিরে পায়। সে পড়িমরি করে আবার হুসনার কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই চেপে ধরা আতঙ্কের জালের জটা ছিন্ন করে এক নবজাতকের তীক্ষ্ণ কান্নার স্বর চরাচরে ছড়িয়ে পড়ে। সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এক মূহুর্তের জন্য ভুলে গিয়ে আকলিমুন শিশুটিকে দুই হাতে তুলে নেয়। তারপর তার জানা সব জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নবজাতক এবং প্রসূতিকে সামলানোর চেষ্টা করে।

অজানা আশংকায় আকলিমুনের মাথার রগ দপদপ করছে। হুসনাকে যতটুকু সম্ভব ধোয়ামোছা করে চৌকির ওপর তুলে দিয়েছে; সে চোখ বন্ধ করে লাশের মতো শুয়ে রয়েছে। নাড়ি কাটার পর আকলিমুন নবজাতক শিশুকে কাঁথায় জড়িয়ে নিয়ে চৌকির এক পাশে দু’পা তুলে বসেছে। মাঝে মাঝে শাড়ির কোণা মিছরিগোলা পানিতে ভিজিয়ে শিশুটির – যে কিনা তার বাপের মতো মিষ্টি চেহারার এক ছেলেশিশু – দুই ঠোঁট ভিজিয়ে দিচ্ছে। এসবের পরও আকলিমুনের উৎকণ্ঠা শরবেঁধা পাখির মতো গ্রামের পথে, ঘনশস্যের ক্ষেতে, ডিসট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায়, টেপির খালের ব্রিজে বিরতিহীন ঝাপটে পড়ছে। স্বামী কুদরত আলীর জন্য সে যতটা আশঙ্কিত, ততটাই আতঙ্কিত নন্দাই মতির জন্য। কয়দিন ধরে কুদরতের নাইট ডিউটি পড়েছে ব্রিজে; শত্রুদের হাত থেকে ব্রিজ রক্ষা করতে হবে। ওদিকে নন্দাই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। বিয়ে হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও হুসনা সাত মাস ধরে ভাই কুদরতের ঘরে পড়ে আছে এটা অনেকেই খেয়াল করেছে। সন্দেহের মশলামাখানো বিষয়টা কমান্ডার সিকান্দার খানের কান অবধি পৌঁছেছে। তাই কমান্ডারের আস্ফালনও সন্ত্রস্ত করে রেখেছে কুদরতের পুরো পরিবারকে। রাত পোহাচ্ছে না তাই আকলিমুনও বুঝতে পারছে না কিছুক্ষণ আগে কোথায় কোন সর্বনাশ হয়ে গেল।

একটু ঢুলনি চলে আসায় আকলিমুন খেয়াল করেনি ইতিমধ্যে পূবের আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। কিন্তু কুদরত আলীর যে দেখা নেই। সে নাইট ডিউটি থেকে সাধারণত ফজরের সময়ে চলে আসে। আকলিমুন শিশুটিকে তার মায়ের কোলে তুলে দিয়ে বেচইন হয়ে বাহিরবাড়ির পথের মুখে এসে দাঁড়ায়। তারপর মাথা ঘুরিয়ে চতুর্দিকে তাকায়। ভোরের আলোয় সব পরিষ্কার হয়ে গেলেও কোথাও জনমনুষ্যির চিহ্ন দেখা যায় না। আকলিমুনের বুকের ধুকপুকানি আরোও বেড়ে যায়। গতরাতের গোলাগুলিতে কুদরত পড়ে যায়নি তো?

বাড়িমুখো হতে গিয়েই আকলিমুন দূরে একজনকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে। আকলিমুন থামে। লোকটি আরেকটু কাছাকাছি হলে কুদরতকে চিনতে পারে সে। আকলিমুন পাগলের মতো তার দিকে ছুটে যায়। কুদরতের ইউনিফর্মে ছোপ ছোপ কালচে রক্ত। আকলিমুন ‘ওরে আল্লারে…’ বলে কান্না শুরু করতেই কুদরত তার মুখ চেপে ধরে বলে, ‘আমার কিছু হয় নাই; মরছে আমাগো কমান্ডার, রইসুদ্দি আর হাসমত।’ আকলিমুন টের পায় কুদরত থরথর করে কাঁপছে। সে তাকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়।

হুসনা তার নবজাতক সন্তানের মুখে মাই দিচ্ছিল। দাওয়ায় ধপাস করে কুদরত বসে পড়লে আকলিমুন ফুঁপিয়ে ওঠে। রাতের বেলা প্রসব বেদনার আতিশয্যের কারণে গুলির শব্দে অধীর হওয়ার সুযোগ পায়নি হুসনা। ভাবীর কান্নার শব্দ শুনে সে অতি কষ্টে তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে এসে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। তখনই শিশুটি চ্যাঁ শব্দে কেঁদে ওঠে। কুদরত সে দিকে ঘুরে তাকাতেই হুসনা ‘ও ভাবীগো…’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠতেই কুদরত লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে হুসনাকে ধরে বলে, ‘কান্দিস না, আমার কিছু হয় নাই।’ তারপর সে নবজাতক শিশুটিকে প্রায় কেড়ে নিয়ে তার বুকের সাথে চেপে ধরে। আকলিমুন লক্ষ করে কুদরতের চোখ থেকে দুটি জলের ধারা নেমে এসে তার পুরু গোঁফ ভিজিয়ে দিচ্ছে।

আকলিমুন তাড়াতাড়ি করে হুসনাকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় এবং স্বামীর লুঙ্গি গামছা নিয়ে ফিরে আসে। কুদরত বোনের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে দাওয়ায় বসে তখনও চোখের জল ঝরিয়ে যাচ্ছে। আকলিমুন বলে, ‘আল্লার হাজার শুকুর, তোমার কিছু হয় নাই। আমি একলা মানুষ, কিসসু বুঝি না, হের পরও আল্লায় বাচ্চাটারে সহিসালামতে দুনিয়ায় পাঠায়া দিছে।’

কুদরত বাচ্চাটিকে আকলিমুনের কোলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তখন আকলিমুন শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কাতর স্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘কী অইছিল একটু কইবা?’

কুদরত একটু দম ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, ‘মুক্তিরা আইছিল।’

আকলিমুন উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘হেরা ধরা পড়ে নাই?’

‘পালাইয়া গেছে’ বলে কুদরত মাথা নিচু করে। ‘তয় একজন মারা পড়ছে।’

আকলিমুনের বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। সে বলে, ‘তুমি ওরে চেন? এই গেরামের কেউ?’

‘না।’ বলে কুদরত আলী লুঙ্গি গামছা নিয়ে পুকুরঘাটের দিকে পা বাড়ায়। তার চোখ থেকে যে আবার জলের ধারা নেমেছে এটা সে আকলিমুনকে দেখাতে চায় না। মৃত মুক্তিটি যে তার অতি পরিচিত আপনজন একথা সে কাউকে বলতে পারবে না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
Dipok Kumar Bhadra সুন্দর লিখেছেন্
ফয়জুল মহী চমৎকার লিখেছেন। বেশ ভালো লাগলো লেখাটি
জামাল উদ্দিন আহমদ অনেক ধন্যবাদ, একনিষ্ঠ পাঠক!
Dipok Kumar Bhadra খুব ভাল লিখেছেন। ভোট দিতে চাইলাম কিন্তু ভোটিং সিষ্টেম বন্ধ কেন?
জামাল উদ্দিন আহমদ পড়েছেন এতেই আমি খুশি। অনেক ধন্যবাদ।
মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী আপনার গল্পের ভিতরে বরাবর একটা মুন্সিয়ানা রয়েছে। যা অবয়ব শেষ পর্যন্ত গল্পের রেষ টেনে আনে। এক একটা ভাব, এক একটা চরিত্র। অনেক দারুণ হয়েছে। শুভ কামনা রইল দাদু। কিন্তু ভোট দিতে পারিনি। শুভ কামনা সবসময়।।
জামাল উদ্দিন আহমদ আপনাদের সুন্দর কথা উজ্জীবিত করে। কিন্তু করোনা সবাইকে কোণঠাসা করে রেখেছে। আগের উদ্দীপনা নেই। লিখতে ভাল লাগেনা। ভাল থাকুন। অনেক ধন্যবাদ।

১৯ নভেম্বর - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

বিজ্ঞপ্তি

“ডিসেম্বর ২০২১” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ ডিসেম্বর, ২০২১ থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।

প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী