অনেক আগেভাগেই কায়দা করে ছাড়মূল্যে ইতিহাদের টিকেট কব্জা করে ফেলেছিল রায়হান এজন্যই তার মনটা ফুরফুরে। একে তো এক মুষ্টি পয়সা বেঁচে যাওয়ার তৃপ্তি, অন্যদিকে দেশে যাওয়ার আনন্দ। হেলেনও খুশিতে বাগবাগ। সে দু’বছর ধরেই তাড়া দিচ্ছে, ‘চলোনা, বাংলাদেশে চলো – আমার প্যারেন্টস ইন ল’কে দেখব না?’

দেশে আসার জন্য রায়হানের প্রাণও ওষ্ঠাগত। পনর বছর সময় কি কম? এতদিনে বাবা-মা’র চেহারা ভুলে যাবার উপক্রম। গেল বছরে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত সে উৎকণ্ঠায় ছিল। নীল পাসপোর্ট পাওয়ার পর থেকেই দেশে যাওয়ার জন্য তার তৎপরতা বেড়েছে। এরই মধ্যে ইতিহাদের মূল্যহ্রাসের সুযোগ এসে গেলে চারটা টিকেট কিনে নিয়ে রায়হান বীরের মত গিয়ে দাঁড়ায় হেলেনের সামনে। হেলেন আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেও মীযান ও মিথিলা অনেকটা নির্বিকার। শিশু দুটি টেলিভিশনের পর্দায় বাংলাদেশের দৈন্যদশা দেখে মাঝে মাঝে হা করে তাকিয়ে থাকে। ড্যাডিকে দুয়েকটা প্রশ্নও করে। বাচ্চা মানুষ, অর্থ-সমাজ, ধনী-দরিদ্র ওসব বুঝার বয়স এখনও তাদের হয়নি। মীযানের বয়স সবে পাঁচ হল, মিথিলার তিন বছর চার মাস।

মিস্টার ও মিসেস আজমলের আনন্দ আর ধরে না। মেম বউ এবং সন্তান দুটোকে নিয়ে তাদের ছেলে এতদিন পর আমেরিকা থেকে আসবে। আজমল সাহেব ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন; যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সাংসারিক অনটনের কারণে আর স্কুলে ফিরে যেতে পারেননি। অবশ্য ছেলের চিন্তায় তার পিতা দেশ স্বাধীন হবার আগেই অক্কা না পেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তো এই নয় ক্লাস পড়া বিদ্যার জোরেই তিনি হোয়াটসঅ্যাপে বৌমা এবং নাতিনাতনির সাথে ইংরেজি ফুটিয়ে ‘হ্যালো, হাউ আর ইউ’ ইত্যাকার দু’চারটি কথা বলতে পারলেও আজমল গিন্নি ইংরেজি বলতে না পারার লজ্জায় অর্ধেক মুখ আঁচলে ঢেকে ‘ওমা, বালানি, বাংলাদেশো আও, আমরা দেখমু’এরকম গুটিকয়েক শব্দ বলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। অপর দিকে হেলেনও মুখ ভেঙ্গেচুরে বহু কষ্টে শাশুড়ির গৎবাঁধা পদবাচ্যের উত্তর দেবার পর তার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। রায়হানই অল্প অল্প করে কয়েকটি বহুল ব্যবহৃত সংলাপের সাথে হেলেনকে পরিচিত করে তুলছে যাতে করে দেশে যাবার পর পরিবারের সবার সাথে সে আন্তরিক হতে পারে।

অবৈধ অভিবাসী হিসাবে আজ এ-শহরে কাল ও-শহরে ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক’বছর পর রায়হান ফ্লোরিডায় গিয়ে যখন একটি ক্রুজিং কোম্পানিতে অন্য আরোও অনেক ভাগ্যান্বেষীর মত একটি চাকরি জুটিয়ে ফেলে তখনই বার অ্যাটেনডেন্ট হেলেনের সাথে তার পরিচয় হয়। তারপর কেমন করে যেন তাদের একটু বেশি দেখাসাক্ষাৎ হতে থাকে। একই রাস্তা দিয়ে তাদের বাসায় ফিরতে হয় বলে মাঝে মাঝে হেলেন তাকে লিফট দেয়। ডিউটি শেষ হয়ে গেলে কখনও সী-বিচে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করে। গল্পের ঝুলিতে হেলেনের তেমন কিছু নেই। বাপকে সে কখনও দেখেনি, মা ন্যুইয়র্ক বা ন্যুজার্সিতে আছে বলে শুনেছে, থার্ড বয়ফ্রেণ্ডের সাথে ব্রেকআপ হয়েছে অল্পদিন হল - এই যা। কিন্তু তৃতীয়বিশ্বের লোকদের সুখ-দুঃখের গল্পের শেষ নেই – পুরো জীবনই এক বড়গল্প। রায়হান ততদিনে আমেরিকান কেতা রপ্ত করে ফেলাতে বড়গল্পকে ছোট করেই বলতে শিখে গিয়েছিল। সে বলতে পারত কেমন করে তার কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বাবা সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে জীবনের সোনালি পঁচিশ বছর কুয়েতে কাটিয়েছেন, ফুফুদের বিয়ে দিয়েছেন, ব্যর্থ ব্যবসায়ী চাচাকেও কুয়েতে টেনে নিয়েছেন, পরিবারের সুখের জন্য সহায় সম্পত্তি করেছেন, সিলেট শহরে বাড়ি বানিয়েছেন, দোকানপাট কিনেছেন, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে দেশে ফিরে গিয়েছেন, ইত্যাদি – কিন্তু বলেনি। সে বরং তার জীবন পরিক্রমার চুম্বক অংশটিই হেলেনের সাথে শেয়ার করেছে। যেমন, তার পিতা দেশে ফিরে যাবার আগে তার অতি দয়াপরবশ এবং প্রভাবশালী কফিল অর্থাৎ মালিককে অনুরোধ করে নিজের ছেলেকে তার হাতে তুলে দিয়ে যান। তারপর অল্পদিনেই সে মালিকের সুনজরে পড়ে যায়। মালিক তাকে সাথে করে বিভিন্ন দেশেও নিয়ে গেছে বেশ কয়েকবার। একসময় আমেরিকার স্বপ্ন মস্তিষ্কে ঢুকে গেলে মালিককে পটিয়ে সে মালিকের আমেরিকা ভ্রমণের সঙ্গী হয় এবং ক’দিন পর তার সম্মতিতেই সে কেটে পড়ে। এর বেশি কিছু হেলেনকে না বললেও হেলেন তাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক টুকটাক প্রশ্ন করলেই কেবল রায়হান জবাব দিয়েছে। তবে মাঝে মাঝে সে তার অতি ভাল কুয়েতি কফিল বিন-ফাওয়াদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতেও ভুলেনি। সেই কফিলকে ফেলে আসায় তার পিতা যে রায়হানের ওপর নাখোশ হয়েছেন সেটাও সে হেলেনকে জানিয়েছে।

এইতো বছর দুয়েক আগে ন্যুইয়র্কে স্থিত তাদের এক দূরাত্মীয় দেশে গেলে আজমল দম্পতির সাথে তার দেখা হয়। তার মুখ থেকে রায়হানের মেম বউ এবং ছেলে-মেয়ের কথা জানতে পেরে তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন। ওই আত্মীয় অবশ্য ঠাণ্ডা মাথায় রায়হানের বাবা-মাকে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে রায়হানের বৈধতার জন্য এটা প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া মেয়েটিও ভাল; রায়হানের জন্য পাগল। আর হবেই না-বা কেন, পশ্চিমারা এমন বিশ্বস্ত সঙ্গী পাওয়াকে সাত পুরুষের ভাগ্য মনে করে। রায়হানের জন্যই সে হারাম-টারাম খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। একবার ঈদের নামাজেও মেয়েটি নাকি গিয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। এতসব বলার পরেও ছেলের সাথে সম্পর্ক পুনস্থাপিত হতে আজমল দম্পতির ছয় মাস সময় লেগেছিল। রায়হানের ক্ষমা প্রার্থনা, আত্মীয়-স্বজনের চাপ এবং অন্যান্য বিবেচনায় অবশেষে তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছেন।

একবার ছুটিতে রায়হান সপরিবারে ন্যুইয়র্কে বেড়াতে গেলে হঠাৎ ওই আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। যাক, দেখা হওয়াতে ব্যাপারটি জানাজানি হল বলেই ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে একটি নিষ্পত্তি হল। তাছাড়া এভাবে না হলে একসময়তো এই জটিলতার সমাধান খুঁজতেই হত। সেদিন রায়হান যতটুকু না বললেই নয় ততটুকুই ভদ্রলোককে বলেছিল। চাইলেইতো সে এই বিবরণ দিতে পারে না যে হেলেনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলে সে রায়হানকে জোর করে তার অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাদের তিন বছর লিভ-ইন টুগেদার শেষে মীযান জন্ম নেবার পর তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এ কথা সত্য, বৈধ ইমিগ্রান্ট হওয়া রায়হানের প্রাথমিক লক্ষ থাকলেও হেলেনের আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততায় শেষাবধি সে তার প্রেমে পড়ে যায়।

ছেলের আগমন উপলক্ষে আজমল সাহেবের পরিবারে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। রায়হানের মা মেয়ে রুকাইয়া ও সুমাইয়াকে সপরিবারে দাওয়াত করে নিয়ে এসেছেন। উদ্দেশ্য, রায়হান তার বিদেশি বউ-বাচ্চা নিয়ে আসার পর তাদের জন্য কী আয়োজন করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করা। আজমল সাহেব অবশ্য ইতিমধ্যে একটি কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছেন। তিনি সান্ধ্য চা-চক্রে সবার সামনে সেটি তুলে ধরেন:

•চারটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে পুরো গোষ্ঠী এয়ারপোর্ট থেকে রায়হান এন্ড গংদের রিসিভ করবে।
•বাসায় আসার পর সবার সাথে পরিচয় ও কুশল বিনিময়। তবে হেলেন এবং তার বাচ্চাদের হ্যাণ্ডেল করবেন আজমল সাহেব এবং রুকাইয়ার মেয়ে তাবাসসুম; কারণ অন্য আর কেউ ইংরেজি জানে না।
•বাসার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশি মেম দেখার জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত জটলা যাতে না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
•প্রথম দিন বিশ্রামের জন্য তাদের ছেড়ে দিতে হবে। ঐদিন বাকি সবাই ইচ্ছা করলে ফ্লোরিং করে থেকে যেতে পারবে। অবশ্য জামাইদের কষ্ট হলে তারা চলে যেতে পারে, পরদিন আবার চলে আসবে।
•খাবার-দাবার এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা রায়হানের সাথে পরামর্শ করে করতে হবে।
•পর্যায়ক্রমে জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, শ্রীমঙ্গল এসব দর্শনীয় জায়গা ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে হবে।
•গ্রামের বাড়িতে অন্তত একদিনের জন্য যেতে হবে; সে ব্যবস্থা কুয়েতফেরৎ আসগর অর্থাৎ আজমল সাহেবের ছোটভাই করবে। কিন্তু কোনো অবস্থায় গ্রামে রাত্রি যাপন করা যাবে না।
(তালিকার বাইরে তাদের অন্য কোনো পছন্দ থাকলে তা-ও আমলে নিতে হবে।)

শ্বশুরের উপস্থাপনা শেষ হলে রুকাইয়ার স্বামী আগর ব্যবসায়ী মিলিয়ন্যার লোকমান একটু ভারিক্কি চালে বলল, ‘আব্বা, বড়লেখাতো লিস্টে রাখলেন না। আমার আগরের কারখানা দেখবে না ওরা?’

আজমল সাহেব হাত উঁচিয়ে ভরসা দেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। আগেতো ওরা আসুক। তারপর তাদের ইচ্ছামত ঘুরবে।’

তখন সুমাইয়ার স্বামী লনই মিয়া, যে মূলত ধনী বাপের অকাল কূষ্মাণ্ড সন্তান, বেক্কলের মত বলে উঠল, ‘আব্বা, ইমিগ্রেশনের আলাপের কথাটাও মনে রাখবেন।’

নিজের ছেলে হলে আজমল সাহেব ‘বলদের বাচ্চা বলদ’ গালিটা ঠিকই ছুঁড়ে দিতেন, কিন্তু জামাই বলে – তা-ও আবার নিজের মেয়ের গোপন পছন্দের পাত্র – তিনি রাগ হজম করে বললেন, ‘তুমি কি এখনই আমেরিকা চলে যেতে চাও? সবুর কর। সুযোগতো আসতেই পারে।’

ভর শীতকালে বাংলাদেশে এসে নামলেও হেলেন, তাদের দুই সন্তান এমন কি রায়হানও তেমন গরম কাপড় কিছু না পরেই দিব্যি ঘোরাফেরা করতে লাগল। পরিবারের সবাই অবাক; রায়হানের মা উৎকণ্ঠিত। হেলেন বলে, ‘মা, আফনে কুনো চিন্তা করবা না, আমরার ভেরি আরাম লাগের।’ অবশ্য রায়হান মা-বাবাকে বুঝিয়ে বলেছে যে তারা মাইনাসে চলাফেরায় অভ্যস্ত বলে বাংলাদেশের ঠাণ্ডাকে ঠাণ্ডাই মনে হচ্ছে না।

তিন সপ্তাহ সময় খুবই অল্প। এই সময়টুকু তৃপ্তি পাবার জন্য যেমন যথেষ্ট নয় তেমনি দেবার জন্যও নয়। তবে এটুকু সময়ের ভেতর বাংলাদেশের সহজাত রূপ দেখে হেলেন মুগ্ধ। মীযান-মিথিলার রূপ আস্বাদনের পরিপক্বতা না এলেও দাদা-দাদী আর আত্মীয়স্বজনের আদরের আতিশয্যে তাদের অবস্থা ভর্তা – এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা তাদের জন্য। রায়হান হেলেনকে বলেছে, ‘পুরো সিলেটই দেখা হল না, নেক্সট টাইমে এলে বাংলাদেশের বাছা বাছা স্পটে তোমাকে নিয়ে ঘুরে আসব। ইন ফ্যাক্ট আমার নিজেরইতো অনেক কিছু দেখার সুযোগ হয়নি জীবনে।’ হেলেন বলেছে, ‘শিওর! চা-বাগান, আগর কারখানা, মণিপুরি হ্যান্ডলুম আমাকে পাগল করে দিয়েছে।’যেখান থেকে যতটুকু সম্ভব স্যুভেনির হিসেবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে হেলেন। রায়হানের ওপর সে ক্ষুব্ধ; কেন সে বাংলাদেশ সম্বন্ধে তাকে ভালভাবে ব্রিফ করেনি। তাই সে মনস্থ করেছে, আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ইন্টারনেট ঘেঁটে পুরো বাংলাদেশ সম্বন্ধে জেনে নিয়ে পরবর্তী ট্রিপ হেলেন নিজেই ঠিক করবে।

রায়হানদের চলে যাবার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, মায়ের চোখ ততই আর্দ্র হচ্ছে। যদিও রায়হান বলেছে, ‘মা, এখন আর কোনো অসুবিধা নেই। আমি প্রতি বছর আসতে পারব।’ মা অবশ্য আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেছেন, ‘আমরা আর কয়দিন বাঁচমু?’ হেলেনের কাছে এসব সেন্টিমেন্ট একেবারে নতুন। গরিব দেশের গরিব মানুষগুলোর এই আত্মিক বাঁধন বাংলাদেশে না এলে সে উপলব্ধি করতে পারত না। বাংলাদেশে এসে সে প্রথম বারের মত বুঝার সুযোগ পায় যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও উন্নত দেশেও মানবশিশু জন্মায় কিন্তু মানবিক বন্ধন তৈরি হয় না। সে তার নিজের পিতার পরিচয়ই জানে না, অবশ্য জানার প্রয়োজনও হয়নি। কিন্তু জন্মদাত্রী মাকে সে কখনও তার জন্য কাঁদতে দেখেনি, সে-ও মায়ের জন্য কোনোদিন কেঁদেছে বলে মনে পড়ে না। শাশুড়ি তাকে নিয়ে নামাজ পড়া শেষে জায়নামাজে বসে তারা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কী সব পড়ে ফুঁক দিতেন। তখন তার চোখ ভিজে যেত। রায়হানের মায়ের চোখের জল দেখে সে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছে, ‘মা, ডোন্ট ওয়্যরি। রায়হান না আইলে আমি আইমু এভরি ইয়ার।’আবার হাসতে হাসতে বলেছে, ‘হুকইন শুরু (শুটকি মাছের ঝোল) আর হাটখরার (সাতকরা) ট্যাস্ট আমি ভুলতাম নায়।’

বাংলাদেশ ছাড়ার আগের রাতে রায়হানদের বাসায় আবার হুলস্থূল কাণ্ড। বাচ্চা দুটোকে শুইয়ে রেখে রায়হান-হেলেনও জটলায় যোগ দিয়েছে। মেঝে, খাট, ডিভান, সোফায় ঠাসাঠাসি করে বসে পুরো পরিবারের আণ্ডা-বাচ্চা, বুড়োবুড়ি নরক গুলজার করে ফেলেছে। এত হুল্লোড়ের মধ্যেও বয়স্কদের চেহারায় কাতরতার প্রচ্ছন্ন ছাপ পরিস্ফুট। মায়া-মমতা আঠালো হবার আগেই রায়হানরা ফিরে যাবে। বাজার থেকে দশ কেজি গরুর মাংস, একটি ছাগল, লুকিয়ে পাঁচটা শীতের পাখি কিনে আনা হয়েছে। আসগর চাচার বউ নিজের পোষা দশটি মোরগ-মুরগি নিয়ে এসেছেন। সকাল থেকেই মডার্ন ডেকোরেটার্স-এর বাবুর্চি পেচন মিয়া রান্নাবান্না চালিয়ে যাচ্ছে; পরদিন সকাল পর্যন্ত তার চুক্তি।

এরকম পারিবারিক সম্মিলন সহসা হয় না। তাই দফায় দফায় চা আর পান সেবনের ফাঁকে ফাঁকে সবাই একে অন্যের কুশল বিশদভাবে জেনে নিচ্ছে। প্রায় সকাল থেকে সবাই আস্তে আস্তে জড় হলেও রুকাইয়ার স্বামী লোকমান মিয়া তার পাজেরো গাড়িতে করে সন্ধ্যার পরে এসে যোগ দিয়েছে। সে হাতে করে ছোট্ট অথচ সুশোভন একটি গিফট বক্স এনে সরাসরি হেলেন ভাবীর হাতে তুলে দিয়ে বলেছে, ‘ভাবী, মাই ইস্মল গিফট, অরজিনিয়াল উদ আতর ফর ইউ।’জামাইয়ের মুখে ইংরেজি শুনে আজমল সাহেবের চক্ষু ছানাবড়া। তাহলে এ ক’দিনে পরিবারের সবাই কমবেশি ইংরেজি শিখে ফেলেছে! তখনই তার মনে পড়ে তিনি রায়হানের মাকেও নাতি-নাতনিদের সাথে থ্যাংকু, বেরি গুট বলতে শুনেছেন। আজমল সাহেবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।

লোকমান মিয়ার আগর কারখানা থেকে সে ইতিমধ্যে আগরের টুকরোসহ বিভিন্ন মানের কিছু আতর নিয়ে এলেও গিফট বক্সটি হাতে নিয়ে হেলেন স্বভাবসুলভ সৌজন্য প্রকাশ করতে গিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল, ‘ওয়াও! থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ, ডুলাবাই!’ ইংরেজির স্টক না থাকায় লোকমান মিয়া আর কিছু না বলে, হেহ্ হে করে শ্বশুরের দিকে ফিরে সালাম দিয়ে আসরে যোগ দেয়।

লোকমান মিয়া ঘরে ঢোকার পরপরই সুমাইয়া তার স্বামী লনই মিয়াকে টান দিয়ে বারান্দার দিকে নিয়ে যায়। তারপর নিচুগলা কিন্তু তেজস্বী কণ্ঠে বলে, ‘তুমি যে একটা বলদ এটা সবাই জানে। কিন্তু এইটাও কি তোমার মাথায় ঢুকল না যে যাবার সময় ভাবীর জন্য একটা স্পেশাল কিছু দেয়া দরকার। তোমার কি টাকা-পয়সা নাই? ফকির? একটা ছাগলকে আমি পছন্দ করেছিলাম। দুলাভাইকে দেখেও শিখতে পার না?’ লনই মিয়া স্ত্রীর ধোলাই খেয়ে বোকাচণ্ডীর মত বলে, ‘তাহলে এখন আমি কী করব বল।’ সুমাইয়া চোখ কটমট করে বলে, ‘এখন আর কিছু করার দরকার নাই। গিয়ে বসে বসে চা-পান খাও।’

কথাটা হেলেন যাবার আগে আগে খাবার টেবিলে বসেই পাড়ে। কিন্তু আজমল মিয়া মাথাটা অনবরত উত্তর-দক্ষিণে ঘুরাতে থাকেন, ‘নো, নো, নারে মা। আমি যাব না। আই লাইক মাই কান্ট্রি।’এই টেবিলে রায়হানদের সাথে শুধু আজমল সাহেবকেই জোর করে বসানো হয়েছে। আহারের নির্দিষ্ট সময় হয়নি বলে অন্যরা কেউ খেতে বসেনি।

রায়হান মাথা ঝুঁকিয়ে বাপকে বুঝাতে চেষ্টা করে, ‘আব্বা, হেলেনের কথাটা একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখেন। এই বয়সে আপনাদের কে দেখাশোনা করবে? হেলেন কথাটা তার মন থেকে বলেছে; আমি শিখিয়ে দিইনি।’

‘সে আমি জানি; হেলেন হয়তো আমার মেয়েদের চেয়েও বেশি যত্নআত্তি করবে। তাই বলে এই মাটি ছেড়ে চলে যাব?’ আজমল সাহেব কথাটা বলে মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশের সবার দিকে তাকান।

টেবিল তদারকির জন্য ছোট জামাই লনই মিয়া কাছাকাছিই ছিল। শ্বশুরের কথা শেষ হতে না হতেই সে মাথামুণ্ডু কিছু না বুঝেই বলল, ‘কী বলেন আব্বা; আপনারা না গেলে ইমিগ্রেশনের কাজতো হবে না।’

সে মুহূর্তে হঠাৎ কোথা থেকে সুমাইয়া ঈগলের মত ছুটে এসে ছোঁ মেরে লনই মিয়াকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। আজমল সাহেব কিছু না বলে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মুচকি হাসতে থাকেন।

লাগেজ ঠিক করতে করতে হেলেন শ্বশুরকে আবার বলল, ‘ইউ হ্যাভ টু স্টে উইদ আস; আমি বেবস্তা করমু।’

আজমল সাহেব চেয়ারে বসেছিলেন। বৌমার কথা শুনে তিনি কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থাকলেন। একটু পর হেলেনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লুক’, তারপর নিজের কপালের বাঁ পাশের পুরনো ক্ষতের উপর তর্জনী ঠেকিয়ে বললেন, ‘দিস ইজ মাই প্রাইড। বোমার স্প্লিনটার। আমার রক্ত দিয়ে এই দেশ কিনেছি। আমার কলজের ভেতর আমার দেশ, আর আমিও আমার দেশের বুকের মধ্যে। তাছাড়া আমার দেশ এখন বটমলেস বাস্কেট নয়। এই দেশে সব আছে। গুড অর ব্যাড, মাই কান্ট্রি। আমি এই দেশেই মরব। এই মাটিতে আমি মিশে যাব।’

আজমল সাহেবের কথা শুনে সবাই চুপ মেরে যায়। কিছুক্ষণ পর রায়হান কাছে এসে বলল, ‘ঠিক আছে আব্বা, আপনার থাকার দরকার নাই। আপনি আমাদের দেখতে যাবেন, যতদিন ভাল লাগে থাকবেন, তারপর চলে আসবেন।’

‘সে দেখা যাবে’বলে আজমল সাহেব মাথা ঘুরাতেই দেখেন সুমাইয়া ও তার স্বামী লনই মিয়া দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। লনই মিয়ার মুখের হাসি বিস্তৃত হয়ে কান পর্যন্ত চলে এসেছে।

ততক্ষণে গাড়িতে লাগেজ ওঠানো আরম্ভ হয়ে গেছে।