আজকের বৃষ্টিটা থামছেই না। শ্রাবণ বলে কথা। একবার শুরু হলে আকাশের সুবিশাল গামলা যেন উপুড় করে দেয়। এমনিতেই এ রকম বর্ষণমুখর দিনে যানবাহনের সংখ্যা কমে যায়; আর এখনতো করোনা-কাল। অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুলে যাওয়ায় প্রায় সর্বত্রই লোক সমাগম বেড়েছে। গুটিকয় বাস রাস্তায় চলাচল করে। ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নেই। নিরুপায় লোকজন গাদাগাদি করে গন্তব্যে যাতায়াত করে। তবে স্বাস্থ্য-সচেতন অনেকেই সে ঝুঁকি নিতে চায় না। ভাড়া বেশি দিয়ে হলেও একান্ত পরিচিত ও বিশ্বস্ত কাউকে নিয়ে সিএনজি অটোরিক্সায় অফিস-আদালতে যায়।

গুলশান-১-এর যে বহুতল ভবনের গাড়িবারান্দায় পাঁচজন লোক বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে আশ্রয় নিয়েছে ওরা সন্ধ্যা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়ঘন্টা সময় ধরে মুখে মাস্ক পরে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের মধ্যে দুজন মহিলা, বাকি তিনজন পুরুষ। নারী দুজন প্রায় সমবয়সী হলেও পুরুষের মধ্যে বৈচিত্র্য লক্ষণীয় – ঝাঁকড়া সফেদ চুল ও গোঁফওয়ালা মোটাসোটা লোককে সবচেয়ে বয়স্ক মনে হলেও পোশাকআশাকে তরুণ তরুণ ভাব পরিস্ফুট। অধিক সচেতন হিসেবে তিনি মাস্ক ছাড়াও হ্যাণ্ডগ্লাভস পরেছেন। আর আসল তরুণ ছেলেটার পরনে আহামরি পোশাক না থাকলেও তার চটপটে স্বভাব এবং ছটফটানিতে বোঝাই যাচ্ছিল বয়স হয়তো কুড়ি পেরোয়নি। তৃতীয় জন হলেন মাঝবয়সী, সুঠাম এবং অপেক্ষাকৃত দীর্ঘদেহী ব্যক্তি যিনি একটি এলবো ক্রাচে ভর করে দাঁড়িয়েছেন।

লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকাতে তরুণ ছেলেটি ছাড়া প্রায় সবারই যে পা এবং কোমরব্যাথা বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে গেছে তা তাদের অস্থিরতা দেখেই বুঝা যায়। সফেদ চুলের তরুণ বেশধারী সিনিয়র সিটিজেন বিরক্তির আতিশয্যে ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে কিছুক্ষণ বকবক করলেন; তারপর এক কোণে সরে এসে এক্সকিউজ মি বলে অবলীলায় একটা সিগ্রেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে বসলেন। তাঁর এই কাণ্ড দেখে বাকিরা ক’মুহূর্ত নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। লোকটি যখন ফেসমাস্ক খুলে খুলে সিগ্রেটে টান দিচ্ছিলেন তখনই তাঁর তুলার মত সাদা গোঁফ দেখা যাচ্ছিল। একটু পর যখন ভদ্রলোক দুয়েকটা কাশি দিলেন তখনই মোহাম্মদপুরগামী ভদ্রমহিলা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে তীক্ষ্ণ গলায় তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করলেন, ‘দুঃখিত, না বলে পারছি না; আপনি নিতান্ত ভদ্রলোক হয়ে এটা কী করলেন?’

সপাং করে ভদ্রমহিলার কথার আঘাত ভদ্রলোকের গায়ে লাগতেই লজ্জাবনত হয়ে মাথাটা বাঁকিয়ে আস্তে করে তিনি বললেন, ‘স্যরি।’ তারপর আরেকটা টান দিয়ে আধপোড়া সিগ্রেটটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

মহিলা দুজন এই আশ্রয়স্থলে ঢোকামাত্র ভূমিকা ছাড়াই একে অপরের সাথে পরিচিতজনের মতো কথা বলতে আরম্ভ করে দিয়েছিলেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। কথা বলার জন্য তাদের বিষয়ের অভাব হয়নি। তবে দুজনই কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এজন্য যে তাঁদের দুজনের গন্তব্য দুদিকে – একজন মোহাম্মদপুর, অন্যজন মিরপুর; একই দিকে হলে নিশ্চিন্তে একটি অটোরিক্সাতেই যেতে পারতেন।

বৃষ্টির ফোঁটার আকার কৃশ হয়ে এলেও ধারা এখনও অঝোর। তাই শরণার্থীদের অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে। তবে তরুণটিকে আপাতত নীরব দেখা যাচ্ছে। সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাতের স্মার্টফোনে ভীষণ মনোযোগে টেপাটিপি করছে। মোহাম্মদপুরগামী ভদ্রমহিলা যার কপালের ওপরের একগোছা সাদা চুল আকর্ষণীয়ভাবে মাথার তালু বেয়ে পেছন দিকে গড়িয়ে পড়েছে তিনি কপাল কুঁচকে বললেন, ‘আমার একা যেতে কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু একটা গাড়ি পেতে হবেতো।’ মাথায় ফুলেল স্কার্ফপরা মিরপুরগামী মহিলা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপ করে থাকলে মোহাম্মদপুরগামী তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যা বৃষ্টি হচ্ছে, আপনার জন্য ভাবছি; একটু বৃষ্টিতেই নাকি ওদিক তলিয়ে যায় শুনেছি।’ মিরপুরগামী চোখ থেকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন, ‘হ্যাঁ তাই; দশ নম্বরের অবস্থা যা তা। কোনো অটোরিক্সা পাব কিনা ভাবছি।’

এলবো ক্রাচের ভদ্রলোককে আটকেপড়া পুরো সময়টাতে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। দুই মহিলার উদ্বেগের কথা তার কানে এলে তিনি মাথার হালকা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে স্বগতোক্তির মত বললেন, ‘আমিও বোধ হয় বিপদে পড়ে গেলাম।’ কথাটা মোহাম্মদপুরগামী মহিলার কানে যেতেই তড়াক করে বলে উঠলেন, ‘আপনি কোনদিকে যাবেন?’ ভদ্রলোক ম্লানমুখে বললেন, ‘মিরপুর। ডিওএইচএস।’

গাড়িবারান্দার যে পাশটায় এখন সাদাচুলের স্মার্ট ভদ্রলোক দেয়াল ধরে প্যারেডের মত লেফট-রাইট করছিলেন মোহাম্মদপুরগামী মহিলা অন্য মহিলাকে সেদিকেই চোখ ইশারায় নিয়ে গেলেন। সাদাচুল কী ভেবে তাঁর লেফট-রাইট থামিয়ে মহিলাদের দিকে একটু সমীহের চোখে তাকালেন। কিন্তু মহিলারা তাঁর দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে গুনগুন করে কথা বলা শুরু করে দিলে ভদ্রলোক আবার তাঁর লেফট-রাইটে ফিরে যান।

‘আপনি কীভাবে যাবেন ভাবছেন?’ গুনগুনানি থেকে ফিরে এসেই মোহাম্মদপুরগামী মহিলা হুট করে প্রশ্ন করেন এলবো ক্রাচধারী ভদ্রলোককে।

প্রশ্নের আকস্মিকতায় এলবো ক্রাচ ভড়কে যান। তিনি বলেন, ‘দেখি, একটা উবার পেয়ে গেলে ভাল হয়।’

দুই মহিলা তখন নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করেন। একটু থেমে মোহাম্মদপুরগামী মহিলা ইতস্তত না করে ভদ্রলোককে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা, আপনারা মিরপুরের দুজন চাইলেতো একটা উবার শেয়ার করতে পারেন, তাই না?’

এলবো ক্রাচ অন্য মহিলার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললেন, ‘উনি কোথায় নামবেন জানিনা, আমি সোজা ডিওএইচএস যাব।’

‘কোনো অসুবিধা নেই; আমি দশ নম্বর গোলচত্বরের পরেই মেইন রোডে নেমে যাব।’ হন্তদন্ত হয়ে মিরপুরের ভদ্রমহিলা সরাসরি জবাব দিলেন। তাঁর মাস্ক-ঢাকা চেহারা থেকেও অনুমান করা যায় যে তিনি আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন।

‘আমার কোনো অসুবিধা নেই; বৃষ্টি একটু ধরে এলেই উবার কল করব।’ ভদ্রলোক গোবেচারার মত সম্মতি দিলেন।

মহিলা দুজন প্রফুল্লচিত্তে আবার গল্পে মেতে উঠলেন।

বৃষ্টি সম্পূর্ণ দম ধরার আগেই উবার কার এসে হাজির হয়। দুর্বিপাকের কবলে পড়ে পরিচিত হওয়া দুই মহিলা ফোন নম্বর বিনিময় করে একে অপরকে আশীর্বাদ করে বিদায় নেন। উবারের ড্রাইভার ততক্ষণে গাড়ির ভেতরে জীবাণুনাশক কিছু একটা স্প্রে কোরে। ক্রাচধারী ভদ্রলোক হাত তুলে সবাইকে ‘বাই’ বলে কারের দিকে এগিয়ে যান। তখনই বোঝা যায় ভদ্রলোকের বাঁ পা’টা খানিকটা খাটো। তিনি পেছনের দরজাটি খুলে দিয়ে নিজে ড্রাইভারের উল্টোদিকের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে তাঁর সহযাত্রী মহিলাকে আহ্বান করেন, ‘ম্যাডাম, প্লিজ।’

মিরপুরগামী সহযাত্রী মহিলা মুখে হাত দিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে বলেন, ‘না না, সে কি! তা হয় না। আসুন আসুন। আমার কোনো অসুবিধা নেই।’ বলে, ভদ্রমহিলা অপর পাশে গিয়ে অন্য দরজা খুলে গাড়িতে উঠে পড়েন। অগত্যা ভদ্রলোককেও পেছনের সিটেই বসতে হয়।

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলে, ‘আপনাদেরতো মাস্ক আছে, আমার গাড়িও একদম জীবাণুমুক্ত; কোনো অসুবিধা নাই।’

একটু আগে রাস্তা একদম ফাঁকা ছিল। কিন্তু বৃষ্টি থেমে যাওয়াতে এলোপাথাড়িভাবে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রাস্তায় চলতে শুরু করেছে। ফুটপাতের পাশ ঘেঁষে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে যাওয়ায় ট্রাফিকের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জট সামলে উবারের গাড়ি ছুটতে আরম্ভ করলে ভদ্রমহিলাই পরিবেশ হালকা করার মানসে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার বাসা ডিওএইচএসে তাহলে?’

‘না, এটা আমার বোনের বাসা। আমি চিটাগাং থাকি, আমার বাড়ি ওখানে।’

‘ও। বেড়াতে এসেছিলেন বুঝি?’ মহিলা আবার জিজ্ঞেস করেন।’

ভদ্রলোকের সংকোচ কিছুটা কেটেছে। তিনি বলেন, ‘তা বলতে পারেন; তবে আমার কিছু কাজও ছিল। মাঝে মাঝে আমার ঢাকা আসা পড়ে।’

ভদ্রলোক আর কোনো কথা বলছেন না দেখে ভদ্রমহিলাই আবার মুখ খোলেন, ‘আপনাকে পাওয়াতে সুবিধাই হল। অবশ্য আমার একটা পুরনো গাড়ি আছে। কিন্তু লকডাউনে লম্বা সময় পড়ে থাকায় ইঞ্জিন বসে গেছে।’

একটু ইতস্তত করে ভদ্রলোক বললেন, ‘গুলশানে কোনো কাজে এসেছিলেন…?’

‘ও, আচ্ছা। অ্যাকচুয়ালি ওখানে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আমি পড়াই।’ মহিলা বলেন, ‘তাছাড়া ওই স্কুলে আমার বড় ভাইয়ের শেয়ারও আছে। স্কুল বন্ধ তবু মাঝে মাঝে আসতে হয়। ’

‘সে তো খুব ভাল।’ ভদ্রলোক একটু কেশে নিয়ে বলেন, ‘আমার একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে; ব্যবসা-সংক্রান্ত কাজে কিছুদিন পর পর ঢাকা আসতে হয়।’

মহাখালী পর্যন্ত ঠেলেঠুলে এসে ভীষণ যানজটে পড়তে হয়। উবার ড্রাইভার উশখুশ করতে করতে বলে, ‘রাস্তায় গাড়ি কম থাকলেও যা বেশি থাকলেও তা, জ্যাম থাকবেই।’

জড় সময় কাটাতেই ভদ্রলোক নির্লিপ্তভাবে বলেন, ‘ভাই সাহেব – আই মিন আপনার হাজব্যাণ্ডও কি জব করেন?’

ভদ্রমহিলা একটু সময় নিয়ে এবং হয়তোবা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দেন, ‘করতেন; গভর্নমেন্ট সার্ভিস। চার বছর হল তিনি নেই; কার্ডিয়াক ফেইল্যুর।’

‘স্যরি! ভেরি স্যরি!’

‘আসলে জন্ম-মৃত্যুতে কারও হাত নেই।’ ভদ্রমহিলা শান্ত গলায় বলেন, ‘ওর মৃত্যুর পর আমার বড় ভাই জোর করে বাবার বাড়িতে আমাদের নিয়ে আসেন। অবশ্য বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। দুজন কাজের লোকসহ এখন মূলত আমি আমার মেয়েকে নিয়ে থাকি। ছেলেটি তার মামার কাছে থেকে আমেরিকায় পড়াশোনা করছে।’

ভদ্রলোক বলেন, ‘তাহলে আপনার দুই সন্তান?’

‘হ্যাঁ। আপনার?’ ভদ্রমহিলা সাথে সাথে আবার বলেন, ‘কিছু মনে না করলে…আপনার হাতে ক্রাচ দেখছি। কোনো দুর্ঘটনা…?’

ভদ্রলোক একটু শুষ্ক হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, ‘শুধু জন্ম-মৃত্যু নয়, প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুতেই মানুষের হাত নেই।’ কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার বললেন, ‘একটি ভয়ঙ্কর সড়ক দুর্ঘটনায় আমার কোমর ভেঙ্গে গিয়েছিল; বেঁচে গেছি সে অনেক ভাগ্য।’

এ মুহূর্তে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘স্যরি, স্যরি!’ দুঃখী দুঃখী মুখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলে-মেয়েরা কি বড় হয়ে গেছে?’

ভদ্রলোক একটু হোঁচট খেলেন মনে হল। তিনি ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘দুর্ঘটনার পর বেশ ক’বছর আমাকে চিকিৎসা নিতে হয়। চেন্নাইয়ে যেতে হয়, ব্যাংককে যেতে হয়। শেষপর্যন্ত বিয়েথা করা হয়নি।’

ভদ্রলোকের কষ্টের কথা শোনার পর ভদ্রমহিলা আর কোনো কথা খুঁজে পাননি। গাড়ি ইতিমধ্যে জাহাঙ্গীর গেইট দিয়ে ঢুকে পড়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে। ক্যান্টনমেন্ট সে এক অন্য দেশ। সেখানকার মানুষ-পশু, গাড়ি-ঘোড়া সভ্য দেশের মত আইন মেনে চলে।

ভদ্রমহিলা গুমোট পরিবেশকে হালকা করার সুযোগ পেয়ে বললেন, ‘পুরো দেশটা যদি এ রকম হত!’

‘সে আর হবার নয়’, ভদ্রলোক হতাশা ব্যক্ত করেন।

গাড়ি কচুক্ষেত পার হয়ে গেলে ভদ্রলোক বলেন, ‘দুই যুগ আগে মিরপুর কী ছিল বলেন; কত পরিবর্তন হয়ে গেছে।’

‘হ্যাঁ, আমাদের ছোটবেলায় ফাঁকা মাঠ ছিল, ছোটাছুটি করতাম’, ভদ্রমহিলা সায় দেন।

মিরপুর দশ নম্বর এলাকার পানি এখনও নামেনি। হাঁটুজলের মধ্যে রিক্সা, গাড়ি চলছে। উবার একই সঙ্গে যানজট আর জলজট ঠেলে গোলচত্বর ঘুরে ডান দিকে মোড় নিয়েছে।

ভদ্রমহিলা তাঁর পার্স খুলতে খুলতে মাথা উঁচু করে ড্রাইভারকে বলেন, ‘দেখুনতো ভাড়া কত হল?’

ভদ্রলোক ত্বরিত গতিতে বললেন, ‘থামুন, থামুন। আপনি কি চলে এসেছেন? গাড়িতো আমাকে নিয়ে আরোও কিছুদূর যাবে। তখন ভাড়া হিসাব করা যাবে।’

‘হ্যাঁ, এইতো সামনে, ইনডোর স্টেডিয়ামের পাশে। কিন্তু ভাড়াটা আমি দিতে চাই।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘প্লিজ, ওটা নিয়ে ভাববেন না; ড্রাইভারকে বলুন কোনদিকে যেতে হবে।’

ভদ্রমহিলা বললেন, ‘অসুবিধা নেই, আমি রাস্তায় নেমে যাব। বাসা সামান্য ভেতরেই।’

‘ড্রাইভার সাহেব, সামনে বামদিকে ঢুকে যাবেন।’সৌজন্যের খাতিরে ড্রাইভারকে লেনের ভেতরে যাবার নির্দেশ দিয়ে ভদ্রলোক ইনডোর স্টেডিয়ামের দিকে তাকাতে তাকাতে বললেন, ‘কত বদলে গেছে! ষ্টুডেন্ট লাইফে অনেকবার এদিকে এসেছি। এখানে কোথায় যেন আমার এক বন্ধুর বাসা ছিল।’

গাড়ি বামের রাস্তায় ঢুকে গেলে মহিলা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘তাই নাকি!’

চার-পাঁচটি দালান পেরিয়ে একটি পুরনো ধাঁচের দ্বিতল বাড়ির সামনে গাড়ি এসে পৌঁছালে ভদ্রমহিলা ড্রাইভারের উদ্দেশে বললেন, ‘এখানে।’

গাড়ি থামলে ভদ্রমহিলা, থ্যাংক ইউ, আপনি আমার অনেক উপকার করলেন – এ ধরনের কিছু কথা বলতে বলতে গাড়ির দরজা খুললেন। কিন্তু ভদ্রলোক এসব স্তুতিবাক্য পুরোটা শুনেছেন বলে মনে হল না, কারণ তিনি তখন দ্বিতল বাড়িটির দিকে অনুসন্ধিৎসু চোখে কী যেন খুঁজছেন।

ভদ্রমহিলা গাড়ি থেকে নেমে দরজা বন্ধ করতে যাবেন অমনি ভদ্রলোক তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাড়িটা কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছে; আমার বন্ধু ফারুকের বাড়িটা এ রকম ছিল।’

ড্রাইভার গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করার প্রশ্ন ওঠে না, কারণ তাকে ডিওএইচএসে যেতে হবে। ভদ্রলোকের কথা শুনে ভদ্রমহিলা একটা প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ না করে কয়েক মুহূর্ত থ হয়ে রইলেন। পরে ড্রাইভারকে হাতের ইশারায় একটু থামতে বলে তিনি গাড়ির দিকে ঝুঁকে ভদ্রলোকের দিকে ভাল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার কথা যেন বললেন?’

‘ফারুক।’ ভদ্রলোক বললেন, ‘ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে মেডিকেলে ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় এসে চার-পাঁচ মাস ছিলাম। তখন ফারুকের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল।’

ভদ্রমহিলা খুব ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর মাথার ভেতরে গোলাবারুদের প্রচণ্ড বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ-গতিতে শত শত প্রশ্ন ছুটে এসে স্নায়ুতন্ত্রে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এমন মুহূর্তে কোন কথাটা উচ্চারণ করা যায় কিংবা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কী করা যায় এসব ভাবতে ভাবতে ভদ্রমহিলা যখন চরম অসহায়ের মত আকাশের দিকে তাকিয়েছেন তখনই একটি চঞ্চল কিশোরী ফটক পেরিয়ে ছুটে এসে ডাক দেয়, ‘হাই মাম।’

ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা যুগপৎ মেয়েটির দিকে তাকান। মেয়েটি আসাতে ভদ্রমহিলা যেন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পান। কিন্তু ভদ্রলোক কিশোরীকে দেখে হকচকিয়ে যান। মেয়েটি যেন পঁচিশ বছর আগের রুক্সি, অবিকল ফারুকের বোন রুক্সি! তিনি কলের পুতুলের মত গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন।

ভদ্রমহিলা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ঝুঁকি নিয়ে ভদ্রলোকের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার মেয়ে মিতা, এ-লেভেল দিচ্ছে। আর হ্যাঁ, আমি রুক্সি।’ আশ্চর্য নাটকীয়তায় ‘রুক্সি’ শব্দটা ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলার মুখ থেকে একসাথে উচ্চারিত হয়।

ঘটনার ভোজবাজিতে দুজনের শব্দভাণ্ডার শূন্য হয়ে গেলেও পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে ভদ্রলোক বললেন, ‘তাহলে ফারুক আমেরিকায়?’

‘হ্যাঁ, নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হসপিটালের প্রফেসর।’ ভদ্রমহিলা মেয়ের দিকে ঘুরে নিজের ফেসমাস্ক এবং হেডস্কার্ফ খুলতে খুলতে বলেন, ‘তোমার মামার বন্ধু, সোহেল আঙ্কেল।’

সোহেল বিস্ময় এবং বিষণ্নতা নিয়ে রুক্সির মুখের দিকে তাকান। তিনি নিজের মুখের মাস্কটিও খুলে ফেলেন। তারপর মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেন, ‘কী আশ্চর্য! করোনার দুঃশাসনে আমরা কেউ কাউকে চিনতে পারিনি।’

রুক্সি বলেন, ‘তা অবশ্য ঠিক, তবে পঁচিশ বছর সময়টাও কম নয়।’

উবারের ড্রাইভার তখন জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার কি তবে এখানেই নেমে যাবেন?’

‘না না, দুই মিনিট।’ ড্রাইভারকে থামিয়ে রুক্সির দিকে তাকিয়ে সোহেল বলেন, ‘রুক্সি, কেমন ঘোর লাগার মত হয়ে গেল ব্যাপারটা। আপনার মানে তোমার সাথে আবার যোগাযোগ হবে; এখন কিন্তু আমাকে যেতে হবে।’

রুক্সি কষ্ট চেপে মিষ্টি করে বললেন, ‘বেঁচে থাকলে আরোও পঁচিশ বছর পর দেখা হবে।’

সোহেল গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, ‘আরে না, আমি ফোন করব।’

গাড়ি বড় রাস্তায় ওঠার পর সোহেলের খেয়াল হল তিনি রুক্সির ফোন নম্বরই আনেননি। এখন ফিরে যাওয়াও বেমানান। দেখা যখন হয়েই গেল তখন রুক্সির কাছে সব কৈফিয়ত দেয়া উচিৎ। তাকে জানানো উচিৎ সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা তাঁর জীবনের স্বপ্ন-সাধ কীভাবে চুরমার করে দিয়ে গেছে। জ্ঞান ফেরার পর যখন জানতে পারেন তাঁর পুরুষত্ব আর ফিরেতো আসবেই না হয়তো তিনি আর কখনও দুপায়ে দাঁড়াতেও পারবেন না তখন তিনি গ্লানি থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। সেই সময় থেকে তিনি বন্ধু-বান্ধবের সাথে যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। তারপর দীর্ঘকালের শল্যচিকিৎসা, থেরাপি, কাউন্সেলিং এসব করে ক্রাচে ভর করে চলার মত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। এসব কথা ভাবনায় ফিরে আসতেই সোহেলের দুচোখ ভিজে যায়।

ডিওএইচএসের বোনের বাসায় পৌঁছে গাড়ি থেকে নামতে নামতে সোহেল ভাবেন, অদৃষ্টের পরিহাসই যে তাকে দেয়া কথা রাখতে না পারার কারণ রুক্সিকে অন্তত এটুকু জানাতে হবে।