ধ্রুব ধীরলয়ে হাঁটছে। একা । রাত এগারটা। ধানমণ্ডি লেকের পাড়। কারণ অকারণ কিছু একটা অবশ্যই আছে, তবুও বুঝতে পারছে না কেন সে নির্বোধের মত হাঁটছে। 
এপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর সিকিউরিটি গার্ড নিষেধ করেছিল, ‘ভাইয়া, পুলিশ আছে রাস্তায়। ঝামেলা হইতে পারে।’   


একটা মাস্ক মুখে পরতে পরতে ধ্রুব বলেছে, ‘হোক। একটু না বেরোলে আমি মারা যাব।’ বলেই, সে নিজেই গেট খুলে বেরিয়ে যায়।


গ্রীনরোডের দিকে লকডাউন চলছে – একটি বিল্ডিং-এ পাঁচজন কোভিড-১৯-আক্রান্ত রুগি পাওয়া গেছে।  একজনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, চারজন হোম আইসোলেশনে।  টুম্পাও এই চারজনের মধ্যে আছে।  সন্ধ্যার পর ধ্রুব’র সাথে তার শেষ কথা হয়েছে ।  কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল টুম্পার।  বলছিল তার অল্প অল্প শ্বাসকষ্ট হচ্ছে; ডাক্তারের উপদেশমত দু’টি ওষুধ খাচ্ছে।


ধ্রুব অস্থির হয়ে বলেছে, ‘ডাক্তার ওষুধ যা-ই দিক, তুমি লেবু আর আদার রস দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর গরম পানি খেতেই থাকবে - অনবরত।  নো নেগলিজেন্স!  আর শোনো, লবণমেশানো গরম পানি দিয়ে গার্গল করবে - দিনে অন্তত পাঁচবার, সাথে একটু ভিনিগার মিশিয়ে নিয়ো।’


টুম্পা ধ্রুব’র গুরুত্বপূর্ণ উপদেশের কতটুকু গুরুত্ব দিল বোঝা গেল না।  কারণ, ধ্রুব’র কথা বলার সময় সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ধ্রুব সান্ত্বনা দেবার আগেই সে ভাঙ্গা গলায় বলল, ‘আমি বোধ হয় আর বাঁচব না।’


ধ্রুব ধমক দিয়ে বলেছে, ‘বাজে কথা বল না। যা বলছি তাই কর। এ টোটকা পরীক্ষিত।  ইউরোপ-আমেরিকার লোকজনও এটাকে বেষ্ট প্র্যাকটিস হিসেবে ফেসবুকে প্রচার করছে। আর শোনো - ভুলে গিয়েছিলাম - হ্যাঁ,  ঘরে মেন্থল আছে?  মানে ওই ভিক্স জাতীয় কিছূ? তুমি অবশ্যই অবশ্যই অল্প মেন্থল দিয়ে ফোটানো পানির ভাপ মানে ষ্টীম বুকের ভেতর টেনে নেবে…’


ধ্রুব’র প্রেসক্রিপশনের জ্বালায় বিরক্ত হয়ে টুম্পা বলেছে, ‘রাখতো তোমার হেকিমি…’ 


‘ঠিক আছে, ষ্টীমের ব্যাপারে পরে বলব; বাকি যা বলেছি তা উইদাউট ফেইল তুমি করে যেতে থাকবে। বুঝলে?’


শুনসান রাস্তা ধরে নিরাপদ দূরত্বে হেঁটে এসে ট্রাউজারের জেবে রাখা মাইল্ড মারলবোরোর প্যাকেটটি বের করে একটি সিগ্রেটে আগুন ধরায় ধ্রুব।  সে পাড় ধূমপায়ী নয়। ইউনিভার্সিটির কিছু সৌখিন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কালেভদ্রে টেনেছে কয়েকবার।  টুম্পার সাথে সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর শখ করেও তার সামনে কখনও সে সিগ্রেট টানেনি।  জীবনে এই প্রথম সে এক প্যাকেট সিগ্রেট এবং একটি দেশলাই কিনেছে - তা-ও যেদিন সে জানতে পারল টুম্পা করোনা-পজিটিভ।  


আট নম্বর রাস্তা দিয়ে ধানমণ্ডি মাঠের কাছাকাছি আসতেই, সিকিউরিটি গার্ড যেমনটি বলেছিল, হঠাৎ ভোঁ করে একটি মোটরসাইকেল এসে থামল তার সামনে।  আরোহী সুদর্শন তরুন পুলিশ অফিসার মোটরসাইকেল থেকে নামতে নামতে খেঁকিয়ে উঠল, ‘অ্যাই, এখানে কী করেন? বাইরে এসেছেন কেন?  কিছু কি বোঝেন না?’


ধ্রুব পুলিশ দেখেও কেমন যেন মোহগ্রস্থের মত ভয়ডর ভুলে গিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, আমি ঘরে মরে যাচ্ছিলাম - আমার মনটা খুব খারাপ… আই অ্যাম স্যরি, এক্ষুনি চলে যাচ্ছি।’ বলে, সে উল্টোদিকে ঘুরে বাসার দিকে পা ফেলল। 


‘অ্যাই দাঁড়ান।’ পুলিশ অফিসার একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘বাসা কোথায়?’


‘ওই যে সামনে; ব্রীজের বাঁ দিকে।’


পুলিশ অফিসার একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলে, ‘প্রকাশ্যে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ, জানেন না?’


ধ্রুব একটু হেসে বলে, ‘স্যরি, এখানে কোনো লোকজন নেইতো, তাই চুরি করে খেতে এসেছি; বাসায় কেউ জানে না।’


তরুন পুলিশ অফিসারের মুখেও কপট হাসি দেখা যায়, ‘ও তাই? কী করা হয়?’ এরপর ধ্রুব’র উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে, ‘একটা ছুড়ে মারেনতো আমার দিকে।’


ধ্রুব তাড়াতাড়ি করে এক শলা সিগ্রেট বের করে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে পকেট থেকে দেশলাই বের করতে যাবে তখন পুলিশ অফিসার বলল, ‘ম্যাচ লাগবে না; কুইক বাসায় ফিরে যান, আর বেরোবেন না।’


টুম্পা ও ধ্রুব দুজনই নর্থসাউথের ষ্টুডেন্ট।  বিবিএ শেষ হতে ধ্রুব’র দুই সেমিস্টার বাকি; টুম্পার দু’বছর।  গ্রীনরোডে দশকাঠার উপর বিশাল পাঁচতলা বাড়িটি টুম্পাদের পৈত্রিক সম্পত্তি – দাদা খুব যতন করে বনেদি ডিজাইনে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন সত্তরের দশকে।  দাদা মারা যাবার পর বাবা-চাচা-ফুফুরা মিলে পাঁচজন সম্পত্তির মালিক হলেও টুম্পাদের পরিবার ছাড়া অন্য কোনো অংশীদার এ বাড়িতে থাকেন না।  বড় চাচা গুলশানে, ছোট চাচা আমেরিকা, দুই ফুফু স্বামীর ঘরে - অষ্ট্রেলিয়া।


বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে করোনার কাছে নাকাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সেখানে বাংলাদেশের সরকারি করোনা আপডেট দেখে আরোও অনেকের মত ধ্রুব’রও রাগে গা জ্বলে যায়।  সচেতন লোকেরা জানে, দেশের সবাইকে টেস্ট করলে অধিকাংশ মানুষকে কোভিড-১৯-আক্রান্ত হিসেবে পাওয়া যাবে।  আর প্রতিদিন অন্য অসুখের নামে সারা দেশে যত মানুষ মরছে হিসেব করলে দেখা যাবে তার অর্ধেক মৃতই করোনা রুগি ছিল। ভাইরাসটি মানুষকে এমনই বেসামাল করে দিয়েছে যে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না করোনার আক্রমণে বুড়োরা নাকি অল্পবয়সীরা অধিক মৃত্যুঝুঁকিতে আছে। ভাইরাসটি নাকি ভিন্ন ভিন্ন ভূপ্রকৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করছে। ধ্রুব’র কাছে এসব তত্ত্ব-উপাত্ত শুরু থেকেই গোলমেলে ঠেকছিল।  কিন্তু বিশ্বমোড়লের দেশ আমেরিকায় যখন অল্পদিনে ভয়ংকর মড়ক লেগে গেল তখন তার বুকটা একটু কেঁপে উঠল।  তখন থেকেই ফেসবুকে করোনাসংক্রান্ত সকল পোষ্টিং - চাই সে ভিডিও, অডিও, টেক্সট - গভীর মনযোগের সাথে নিরীক্ষণ করে যেতে থাকল ধ্রুব।  অফিস-আদালত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যানবাহন সবই যখন বন্ধ হয়ে গেল তখন থেকে ঘরে বসে সে বন্ধুদের সাথে ঘনঘন গ্রুপচ্যাটিং-এ সময় কাটাতে লাগল। আলোচনার মূল বিষয় ওই একটাই - করোনা।


পুলিশের তাড়া খেয়ে বাসায় ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু সে রাতে ঘুম হল না ধ্রুব’র। টুম্পা বলেছে সে নিজে তার সুবিধাজনক সময়ে ফোন করবে; তাই চরম উৎকণ্ঠা থাকলেও ধ্রুব ফোনে তার খোঁজ নিতে পারে না। তবে সে মেসেঞ্জারে এবং হোয়াটসঅ্যাপে হট-ওয়াটার থেরাপির কথা খুব জোর দিয়ে টেক্সট করেছে টুম্পাকে। স্যামসাং এস১৮ স্মার্টফোন যেটা ধ্রুব এখন ব্যবহার করছে এটা টুম্পারই দেয়া উপহার - গত জন্মদিনে। একথা সব সময় তার মনে থাকে না। এখন সেটটি হাতে নিয়ে ঘষাঘষি করতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে যায় গুলশানের এক রেস্তোরাঁয় কফি খেয়ে জন্মদিন পালন করেছিল ধ্রুব। তখনই তাকে চমকে দিয়ে চকচকে একটি প্যাকেট বের করেছিল টুম্পা। সেটটি ছোট চাচা পাঠিয়েছিলেন ফ্লোরিডা থেকে।  টুম্পার নিত্য নতুন ফোনের শখ না থাকলেও এখনও তার কাছে তিনটি ফোন আছে - দুটোর প্যাকেটই খোলা হয়নি। 


ছেলের রাতজাগা বদভ্যাসের কথা মা-বাবার জানা আছে। তাই করোনাকালে সকাল দশটার আগে কেউ ধ্রুবকে ঘুম থেকে জাগায় না। টেবিলে নাস্তা রেডি করে বুলবুলির মা-ই প্রতিদিন ধ্রুব’র বদ্ধ দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে। সেদিন সকাল বেলাতেও বুলবুলির মায়ের ডাকাডাকিতে ধ্রুব’র ঘুম ভাঙলে তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে অভ্যাসবসত ফোনের স্ক্রীনে চোখ বোলায়। টুম্পা মেসেজ পাঠিয়েছে, “গলাব্যথা কমেনি, জ্বরও বেড়েছে।  তবে আমি হসপিটালে যাব না।  মরলে ঘরেই মরব; মাফ করে দিয়ো।”  
 
ধ্রুব প্রায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হুট করে ফোন করে বসে টুম্পাকে। টুম্পা বালিশে ভর দিয়ে বিছানায় বসে তখন আদা-লবঙ্গ দিয়ে বানানো চা খাচ্ছিল।  তাই পাশে বসা বাবাকে আস্তে আস্তে বলল, ‘বাবা, আমি কথা বলতে পারব না; তুমি ধরতো ফোনটা – ওইযে ধ্রুব, ধানমণ্ডির, এনএসইউ-তে পড়ে।’ 


টুম্পার বাবা-মা ধ্রুবকে আগে দুয়েকবার দেখেছেন - সতীর্থ হিসেবে, সিনিয়র হিসেবে।  ছুটির দিনে মা-বাবাসহ টুম্পা হাঁটতে হাঁটতে কখনও মিরপুর রোডের দিকে বেড়াতে যায়; মাঝে মাঝে আইসক্রিমও খায়। এরকমই এক বিকেলে গোপন পরিকল্পনা অনুযায়ী ধ্রুব’র সাথে তাদের দেখা হয়ে যায়। টুম্পাই মা-বাবার সাথে ধ্রুবকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তবে দ্বিতীয়বার গ্রীণকর্ণারে ওদের হঠাৎ ক্রসিং হয়ে গেলে ছেলেটির ব্যাপারে টুম্পার কাছ থেকে টুকটাক তথ্য জানতে চেয়েছিলেন তার বাবা।    


ধ্রুব ফোনে নিঃসঙ্কোচে নিজের পরিচয় দিয়ে টুম্পাসহ তাদের পরিবারের সবার খোঁজ নেয়।  টুম্পার বাবা, অফিস ইকুইপমেন্ট  ইম্পোর্টার, কাজি রফিকুল বারী জানালেন তারা বাপ-বেটি দুজনই সন্দেহভাজন। দুজনেরই জ্বর আছে, তবে তিনি অতোটা কাবু হননি এখনও।  মিসেস কাজি এবং কাজের মেয়ে লাইলী সাবধানে দূরে দূরে থাকছে।  সুবিধার জন্য বাপ-বেটিকে এক রুমেই অন্তরীন করা হয়েছে।  খুব সাবধানতার সাথে তাদের গরম পানি, চা, অন্যান্য খাবার-দাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।  কাজি সাহেব আরোও জানালেন, হট ওয়াটার থেরাপি তাঁর ক্ষেত্রে খুব ভাল কাজ করছে, তবে টুম্পাকে নিয়ে বেশ উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তাই নিজের তত্ত্বাবধানে টুম্পাকে বারবার চা, লেবু ও আপেল সাইডার ভিনিগারসহ গরম পানি খাওয়াচ্ছেন এবং আদা-লবন মিশ্রিত গরমজল দিয়ে গার্গল করাচ্ছেন। তিনি আশাবাদী যে টুম্পাকে হয়ত হাসপাতালে নিতে হবে না। 


টুম্পার সাথে কথা বলার আর সুযোগ নেই বুঝতে পেরে ধ্রুব কাজি সাহেবকে বলল, ‘আংকেল খুব সাবধানে থাকবেন; ওষুধ খেলেও গরম জল ছাড়বেন না। ভয় পাবার কিছু নেই, ইনশাল্লাহ ভাল হয়ে যাবেন।’ 


‘তোমরাও সাবধানে থেকো।’ বলে, টুম্পার বাবা ফোন কেটে দেন।


ধ্রুব’র আসলে সাবধানে থাকা আর হয় না। সে পাগলের মত দুনিয়ার তাবৎ করোনা সংক্রান্ত ওয়েবসাইট চষে বেড়ায়, বিশেষ করে বেঁচে যাওয়া করোনা-যোদ্ধাদের কাহিনী। যখন দেখে সুস্থ হয়ে যাওয়া অধিকাংশ রুগি তাদের কেসস্টাডিতে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার কাহিনী অর্থাৎ উষ্ণজল চিকিৎসা কীভাবে তাদের সারিয়ে তুলেছে এসব কথা বলে, তখন সে বুকে বল পায়; অনেকে আবার জোরালো বিশ্বাসে বলে যে কালোজিরা আর মধুর ব্যবহারের ফলেই আল্লাহ্ তাদের শিফা দান করেছেন।  কিন্তু একই সময়ে সে ভয়ে কুঁকড়ে যায় যখন দেখে উন্নত বিশ্বের সুপুষ্ট তরুণরা কোভিড-১৯-এর কাছে অসহায়ের মত হেরে যাচ্ছে।  তার মানে করোনার শিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বয়স, পুষ্টি, ভৌগলিকতা এসব কোনো মাপকাঠি নয়; বরং সে শিকার ধরে দৈবচয়নের মাধ্যমে।  এসব ভাবতে গেলেই ধ্রুব’র মাথা চক্কর দেয়।  


টুম্পা করোনায় আক্রান্ত হবার পর গত দুদিন ধ্রুব দিনের বেলায়ও মাস্ক পরে কয়েকবার বাইরে বেরিয়েছে।  আত-তাকওয়া মসজিদের পুবদিকে গাছের আড়ালে বসে পাকা ধূমপায়ীর মত সিগ্রেট ফুঁকেছে। এই দুর্যোগকালীন সময়ে নতুন উপদ্রবের আমদানী মা ইতিমধ্যে টের পেয়ে গেছেন এবং চোখ লাল করে একবার বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে তুমি বেশ সাবালক হয়ে উঠেছ?’ ধ্রুব লাফ দিয়ে উঠে মায়ের হাত চেপে ধরে বলেছে, ‘বিশ্বাস কর মা, আমার এসব বদভ্যাস নেই, কিন্তু তুমি বুঝবে না… আমি একটা কঠিন ক্রাইসিসে আছি।’  মা তার মনোভাব পরিবর্তন না করেই বলেছেন, ‘ক্রাইসিস কি তোমার একার?’


ধ্রুবও বোঝে করোনা একটা গ্লোবাল ক্রাইসিস। সরকারের একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বাবা মাহবুব চৌধুরিও শারীরিকভাবে আগের মত সবল নন; ডায়াবেটিসের সাথে হাইপারটেনশন আছে। বলা হচ্ছে, এ ধরণের লোকগুলো করোনায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। আর মায়ের বয়স ষাটের নিচে হলেও বাড়তি চর্বি আর ডায়াবেটিস বহন করে বেড়াচ্ছেন। তাই তাঁদের জন্যও ধ্রুব’র খুব চিন্তা হয়। এই ক্রাইসিসে বোঝা যাচ্ছেনা কে কম ঝুঁকিপূর্ণ আর কে বেশি।  এরই মধ্যে টুম্পার নাজুক অবস্থার কারণে নিজের বাবা-মার কথাও ধ্রুব’র মাথা থেকে সরে গেছে সাময়িকভাবে।  গত দুদিনের বেয়াড়া আচরণের পর তার নিজের শরীরটাও বেশ গরম হয়ে আছে; কিন্তু তাতে সে গুরুত্ত্ব দেয়নি, কাউকে বলেওনি।  শুধু জ্বরই নয়, সাথে মাথাব্যাথাও আছে। 


রাত দশটার দিকে টুম্পা মেসেঞ্জারে জানাল, “ষ্টীম নিয়ে কিছুটা উপকার পেয়েছি। শ্বাসকষ্ট কমে এসেছে; মাথাব্যথাও সহনীয়। দোয়া করো, বঁচে গেলে আবার দেখা হবে।”


ধ্রুব আনন্দে লাফ দিয়ে উঠেছিল প্রায়।  কিন্তু পরক্ষণে খেয়াল হল তার মাথাব্যথা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, গলাটাও খুসখুস করছে।  ধ্রুব’র বুঝতে বাকি রইল না যে মিস করোনা তাকে পছন্দ করে ফেলেছে; তাকেও এখন চিকিৎসা শুরু করতে হবে।  টুম্পাকে এই খবর দেয়া  যাবে না, কারণ সে নিজেই মরণপণ যুদ্ধ করছে করোনার সাথে। আর বাসার সবাইকে জানিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে হলে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।  


কিন্তু রাতটা মোটেই ভাল কাটল না ধ্রুব’র। শেষ রাতে জ্বর বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে শরীরটা গুলাতে থাকলে নিজে নিজে পাকঘরে ঢুকে হাঁড়িপাতিল খুঁজতে আরম্ভ করে দিল। ড্রইং রুমে ঘুমানো বুলবুলির মায়ের কানে পাকঘরের নড়াচড়ার শব্দ পৌঁছাতেই সে লাফ মেরে এসে বলল, ‘ভাইয়া, কিতা করুইন, আমারে ডাকলাইন না ক্যারে?’


ধ্রুব অল্প কথায় বুলবুলির মাকে সব বুঝিয়ে বলল এবং একই সাথে ঘরের সবার নিরাপত্তার জন্য আরোও কী কী করা দরকার, কীভাবে তাকে বিভিন্ন কায়দায় পানি গরম করে দিতে হবে ইত্যাদি পরিষ্কার করে বলে দিল।  বুলবুলির মা দুটি ফ্লাস্ক ভরে আদা ও লেবুর রসযুক্ত গরম পানি ধ্রুব’র দরজার সামনে রেখে সাবান দিয়ে ভাল করে হাত মুখ ধুয়ে আবার শুয়ে পড়ল।  ধ্রুবও দ্রুততার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কুলকুচা করল এবং যতটুকু সম্ভব পানি খেল। তারপর কষ্ট করে কয়েকটি বিস্কিট খেয়ে একসাথে দুটো প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল।


প্যারাসিটামলের প্রভাবেই হয়ত ভোরের দিকে কিছুটা ঘুম হয়েছিল ধ্রুব’র। কিন্তু আজকে কেউ না ডাকলেও শারীরিক যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙ্গে যায় তার। ভেতর থেকে মায়ের নাকি কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।  এখনতো শুধু ধ্রুব নয়, পুরো বাসার লোকজনই ঝুঁকিতে। ধ্রুব খাট থেকে নেমে এগিয়ে যায় ভেজানো দরজার দিকে, তারপর দরজা ফাঁক করে ডাইনিং টেবিলে বসা চিন্তাক্লিষ্ট বাবা-মাকে দেখতে পায়; তাদের মুখে এমন কি বুলবুলির মায়ের মুখেও মাস্ক লাগানো।  সে বাবা-মাকে অভয় দেয়ার জন্য বলল, ‘চিন্তা কর না, আমি চিকিৎসা আরম্ভ করে দিয়েছি; তোমরা কেউ এখন আমার রুমে এসোনা। আমার খাবার-দাবার, প্রয়োজনীয় সবকিছু দরজার পাশে রেখে দিয়ো, আমি নিয়ে নেব। আর আপাতত ডাক্তার প্রয়োজন নেই।  কয়েকদিন জলচিকিৎসা করে দেখি।’   


বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘শুধু জলচিকিৎসাতেই হবে? ওষুধ লাগবে না?’


‘আপাতত প্যারাসিটামলই যথেষ্ট; আমার কাছে আছে।’ ধ্রুব বলে, ‘তোমরা কিন্তু খুব সাবধানে থাকবে।’


বুলবুলির মা দরজার কড়া, ফ্রিজের হাতল, বেসিনের কল ইত্যাদিতে কী যেন একটা স্প্রে করেই যাচ্ছে। ধ্রুব বেশ কিছুক্ষণ কুলকুচা করে খালি ফ্লাস্কগুলো দরজার কাছে রেখে দেয়। বুলবুলির মা জানে এগুলো আবার কীভাবে রিফিল করতে হবে।  সে এক সময় ধ্রুব’র নাস্তার ট্রে নামিয়ে রেখে ফ্লাস্কগুলো নিয়ে যায়।


আগে দুর্ভাবনা ছিল শুধু টুম্পার জন্য, এখন ধ্রুব নিজেই আক্রান্ত হয়ে দুর্ভাবনার পাল্লা ভারি করে ফেলেছে। আজকের সকালে টুম্পার সাথে কোনো কথা বা চ্যাটিং হয়নি; টুম্পার অবস্থা এখন কেমন এ কথাটা তেমন গভীরভাবে ভাবতেও পারেনি ধ্রুব। কারণ, নির্বাচিত সব টোটকা চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তার গলার ব্যথা বেড়েছে, একটু একটু শ্বাসকষ্টও হচ্ছে। এ অবস্থায় টুম্পাকে ফোন করা যাবেনা, নইলে সে আরোও ভেঙ্গে পড়বে। তাই সে মেসেঞ্জারে ছোট্ট একটা বার্তা পাঠিয়ে দেয়, “আশা করি তুমি আগের চেয়ে ভাল আছ। দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠ ।”


প্রায় সারাটি দিন ধ্রুব লবণ-ভিনিগারমেশানো গরম পানি দিয়ে গার্গল করেছে; আদা-লবঙ্গ-দারুচিনি দিয়ে তৈরি চা খেয়েছে বার বার; মেন্থলমেশানো গরম পানির ভাপ নিয়েছে বেশ কয়েকবার। এদিকে টুম্পা কোনোকিছু জানায়নি বলে টেনশন আরোও বেড়েছ। দুপুরে ভাত খাওয়ার রুচি হয়নি। তাই দুটো মাখনলেপা টোস্টেড ব্রেড আর এক গ্লাস ডাবের জল প্যারাসিটামল খাবার পূর্বশর্ত হিসেবে জোর করে গিলেছে। এসব দেখে দরজার বাইরে বাবা-মার অস্থির পায়চারি বেড়েছে। অবশ্য মাহবুব চৌধুরি ইতিমধ্যে বেশ ক’জন ডাক্তারের সাথে ফোনে কথা বলে নিয়েছেন। তারা কোনো ওষুধের কথা বলেননি, তবে ব্লাড টেস্টের কথা জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি সেভাবেই সংশ্লিষ্ট লোকদের সাথে হটলাইনে কথা বলেছেন; তারা আজকে যে কোনো সময়ে ব্লাড কালেকশনের জন্য আসবে। তাই নিজে ভীত হয়ে পড়লেও ছেলেকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘চিন্তা করিস না, ব্লাড টেস্ট হয়ে গেলেই যা করনীয় সব করা যাবে ইনশাল্লাহ।’ 


রাতের বেলা জোর করে কিছু স্যুপ গিলেছে ধ্রুব; বমি ভাব দূর করার জন্য একগ্লাস লেবুশরবতও খেয়েছে। প্যারাসিটামল খাওয়ার পর গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট না কমলেও জ্বর নেমে আসে কিছুক্ষণের জন্য।  তখনই ফোনে টুং করে টুম্পার মেসেজ ভেসে ওঠে। সে লিখেছে, “তোমার কোবরেজি বোধ হয় কাজ করেছে। শ্বাসকষ্ট কম থাকায় দিনের বেলা বেশ ভাল ঘুম হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি ইয়াল্লা হাজারটা টেক্সট! জানো? আমার ইচ্ছে করছে তোমাকে নিয়ে একটা আইসক্রীম খেয়ে আসি।”


টুম্পার অবস্থার উন্নতির কথা শুনে চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মাথা তুলে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানায় ধ্রুব। সে-ও পাগলের মত মিস করছে টুম্পাকে। কবে যে আবার দেখা হবে তাদের; আর দেখা হলে কেমন আচরণ করবে তারা; এই ভাবনা দীর্ঘ হবার আগেই বেলুনের মত চুপসে যায় ধ্রুব।  সে জানে করোনা একটা বেজন্মা ভাইরাস; তার কোনো নীতিবোধ নেই। স্বেচ্ছাচারীর মত যাকে ইচ্ছা ধরে, যাকে ইচ্ছা ছেড়ে দেয়।  ধ্রুব’র বুকটা আলতো কেঁপে ওঠে: টুম্পার সাথে পুনর্মিলনের সুযোগ করোনা কি তাকে দেবে?