জাতীয় স্বাধীনতা দিবস সুমহান ও সৌকর্যময়। এর বাইরেও মানুষের জীবনেও কখনও কখনও স্বাধীনতার ইচ্ছে জাগে, স্বাধীন হওয়ার প্রচেষ্টা থাকে; কোনো কোনো দিন স্বাধীনতা দিবস হয়ে ধরা দেয়। কখনও অন্তর্দহনের পরিসমাপ্তিও স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতীয়মান হয়। গল্পের মধ্যেও জীবন-যন্ত্রণা ও এর অবসানের মাধ্যমে স্বাধীনতার অনুভবকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - স্বাধীনতা দিবস (মার্চ ২০১৯)

অন্ধকার শেষে
স্বাধীনতা দিবস

সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ

comment ৯  favorite ০  import_contacts ৩৫৩
মিতুল পড়ার টেবিলে বসে স্মার্টফোন টিপছে। স্যামসাং। ভাল ফোন। পিতা – আব্দুল জব্বার – কিনে দিয়েছিলেন আইফোন। মিতুল নেয়নি। মায়েরটির সাথে বদল করে নিয়েছে। মা খুশিতে টগবগ করে কোনো কারণ জিজ্ঞেস না করেই ছেলের আইফোনটি নিয়ে নিয়েছেন। বেশ কিছুদিন পরে বিষয়টি আব্দুল জব্বারের নজরে এলেও স্ত্রী সুন্দর যুক্তি দিয়ে এই অদলবদল হালাল করে নিয়েছেন। ছেলের ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা সামনে, ওর হাতে নতুন ফোন থাকলে পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া তার বন্ধুরা এই দামি ফোন নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে যেয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে, ইত্যাদি।

বনশ্রীর পাঁচতলা বাড়িটি মিতুলদের নিজের। তার বাবা অনেক টাকার মালিক। উত্তরা এবং লালমাটিয়ার ফ্ল্যাট দুটির কথা মিতুলের জানা আছে। তবে এর বাইরে আরও কত কী যে তাদের আছে তা সে জানেনা। সে ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছে, তার বাবা আব্দুল জব্বার জব্বর ব্যবসায়ী। মাসের অধিকাংশ দিনই তাকে ঢাকার বাইরে থাকতে হয়; কখনও চট্টগ্রাম, কখনও কক্সবাজার, আবার কখনও দেশের বাইরে। বিদেশে গেলেতো কথাই নেই; স্যুটকেস ভর্তি বিলাসদ্রব্য নিয়ে আসেন স্ত্রীর জন্য, ছেলেমেয়েদের জন্য।

পাঁচ কাঠা প্লটের তৃতীয় তলার পুরোটা জুড়ে মিতুলরা থাকে, বাকি ফ্লোরগুলো দুই ইউনিট করে তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বিল্ডিং ডেভেলপাররা পেছনে ঘোরাঘুরি করলেও আব্দুল জব্বার অন্যদের মত ভাগাভাগিতে যাননি; নিজের টাকায় নিজের মত করে বানিয়ে নিয়েছে্ন। নিজে থাকার ফ্লোরটি দামি আসবাব-আয়োজনে অভিজাত করে সাজিয়েছেন। কক্ষগুলোও অনেক বড় বড়। তবে দাদা আব্দুল মজিদ মিতুলের কক্ষেই থাকেন। বয়োবৃদ্ধ মানুষ; একা থাকা সমীচীন নয়, তাই এই ব্যবস্থা। মা মারা যাবার পর মাস ছয়েক আগে আব্দুল জব্বারই প্রায় জোর করে বাপকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন। পছন্দ না হলেও আব্দুল মজিদকে বাধ্য হয়েই ছেলের সাথে থাকতে হচ্ছে। এখন বেশির ভাগ সময় শুয়েই কাটান তিনি। তবে নাতির সঙ্গ তার ভালই লাগে। মিতুল রাতের বেলা অনেক সময় ধরে তার সাথে গল্প করে; না, অন্য কিছু নয়; যুদ্ধের কথা, যুদ্ধের দিনের কথাই আগ্রহ নিয়ে দাদার মুখ থেকে শোনে সে।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও আব্দুল মজিদের খেয়াল আছে, নাতির পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এসময়ে যতটুকু সিরিয়াস হওয়ার কথা সে ততটুকু নয়। নইলে মোবাইল ফোন নিয়ে বসে সারাক্ষণ টিপাটিপি করে সময় নষ্ট করত না। আব্দুল মজিদ আদর করে ডাক দেন, ভাইয়া।

মিতুলের সাড়া না পেয়ে কিছুক্ষণ পর আবার ডাক দেন, দাদুভাই!

এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকায় মিতুল। কিন্তু কোনো কথা বলে না; ফোনের স্ক্রিন থেকে হাতও সরায় না।

দাদা জিজ্ঞেস করেন, শুবি না?

মিতুল কী ভেবে চেয়ার থেকে উঠে বলে, ওষুদ খেয়েছ? দাদার প্রতি ভালই খেয়াল রাখে সে।

হ্যাঁ। দাদা নির্বিকার জবাব দেন। একটু পর আবার জিজ্ঞেস করেন, তোর বাপ কবে আসবে?

জানিনা।

দাদা চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বেশ কিছুদিন হয় ছেলে কোথায় জানি গিয়েছে; কেউই তার কথা স্মরণ করছে বলে মনে হচ্ছে না। কিছুক্ষণ থেমে জিজ্ঞেস করেন, বিন্তির সাথে তোর কথাটথা হয়?

মিতুল এবার পড়ার টেবিল ছেড়ে নিজের বিছানায় এসে ধড়াম করে শোয়। দাদার কথা কানে তোলে না।

দাদা মিতুলের পড়ালেখার প্রতি অমনযোগিতা লক্ষ করে ভেবেছিলেন কিছু উপদেশ দিবেন, কিন্তু এ ব্যাপারে আর কিছু বললেন না। ওদিকে বিন্তীর জন্যও তার মনটা পোড়ায়। তার কথা কাউকে উল্লেখ করতে শোনা যায়না। তিনি বুকের ভিতর জ্বলুনি টের পান। অসহায়ের মত বাম হাতের গুলির দাগের উপর ডান হাত বুলাতে বুলাতে শুন্যে তাকান।

মিতুলের পরীক্ষার আর মাত্র কদিন বাকি আছে। দুজন হাউজ টিউটর এখন প্রতিদিন আসছে। ওদের কথা থেকে আব্দুল মজিদ আঁচ করতে পারেন, মিতুল পড়াশোনায় মন বসাচ্ছে না। যতক্ষণ গৃহশিক্ষক থাকে ততক্ষণই যন্ত্রের মত সে শুধু নিয়ম পালন করে। দাদা শেষপর্যন্ত বলেই ফেলেন, ভাইয়া, এ রকম করলেতো ভাল রিজাল্ট করতে পারবি না; একটু মন লাগা। মিতুল কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বলে, এত কষ্ট করার কী দরকার? আমার কোনোকিছুর অভাব আছে নাকি?

দাদা সবই বোঝেন। কিন্তু কিছুই করার ক্ষমতা নেই। সময়টা একাত্তর নয় যে গুলির ঝাঁকের মুখে বুক চিতিয়ে দিবেন। সেই কবে ছোট ছেলে আব্দুস সাত্তার কুয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর থেকেই একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ মুষড়ে পড়েছেন। মেয়ে মুনীরা আগে ঘনঘন খোঁজ নিলেও মা মারা যাওয়ার পর থেকে দেশের সাথে যোগাযোগ প্রায় রাখেই না। নিজের ছেলেমেয়ে নিয়েই হয়তো আমেরিকার মত জায়গায় হিমশিম খাচ্ছে। এ বয়সে একমাত্র ছেলে আব্দুল জব্বারের আশ্রয়ে না থাকা ছাড়া আব্দুল মজিদের তার আর কোনো গতিও নেই। কিন্তু এ কথা বলারও উপায় নেই যে এখানে তার ভাল লাগছে না।

দুপুরের খাবার সেরে প্রতিদিনকার মত বারান্দায় খবরের কাগজ নিয়ে বসেছিলেন আব্দুল মজিদ। গাড়ির আওয়াজ শুনে নিচে তাকিয়ে দেখেন, হনহন করে তার পুত্রবধু হালিমা গাড়িতে উঠছে। সাথে সাথে উদ্ভ্রান্তের মত একটা লোক গাড়ির পেছনের দরজা বন্ধ করে সামনের সিটে গিয়ে বোসে। তারপর দ্রুতবেগে গাড়িটি বেরিয়ে যায়। আব্দুল মজিদের খটকা লাগাতে একটু অস্থির হয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে কাজের মেয়ে কাজুলীকে ডাকবেন কিনা ভাবেন। কিন্তু মিতুলকে বিছানায় দেখে তাকেই প্রশ্ন করেন, মা কোথায় গেল রে? সে ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই বিরক্তমুখে জবাব দিল, জানিনা।

কিন্তু ‘জানিনা’তো শেষ কথা হতে পারে না। বাপ কোথায় গেল – ‘জানিনা’, মা কোথায় গেল – ‘জানিনা’, বিন্তি কোথায় আছে – ‘জানিনা’; এসবের মানেটা কী? আব্দুল মজিদের ভীষণ রাগ হয়। কিন্তু রাগ ঝাড়বার শক্তি যে তার নেই।

আব্দুল মজিদ স্বস্তি পাচ্ছেন না। তাই তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাজুলীর কাছে গেলেন; সে এখন যি সিনেমায় ডার্টি পিকচারের উলালা গানটি উপভোগ করছে। আব্দুল মজিদ অপরাধীর মত নরম হয়ে বললেন, বৌমা কই গেলরে কাজুলী? কাজুলী জানে, আব্দুল মজিদ এই পরিবারের আগাছা – ঢোঁড়া সাপ। সে কোনো উত্তর না দিলেও এই অথর্ব লোক দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করবে না। তবুও অনিচ্ছায় মাথা ঘুরিয়ে বলে, দাদাজি রুমে যান, আমি আইতাছি।
যি সিনেমার বিজ্ঞাপন বিরতিতে দৌড় মেরে কাজুলী ঠিকই এল। বলল, একটা ফোন আইছিল। হের পর আম্মা অস্থির অইয়া বাইর অইয়া গেল। বলছে ফিরতে দেরি অইতে পারে। কথা শেষ হতে না হতেই সে আরেকটা দৌড় লাগাল।

আব্দুল মজিদ বামহাতের গুলিলাগা ক্ষতটির উপর অন্যহাতের তেলো ঘষতে থাকেন। প্রেসার নির্ঘাত বেড়ে গেছে। ডায়াবেটিসের ওষুধও ইদানীং তেমন কাজ করছে না। ছেলের বাসায় না এসে উপায় ছিল না; কিন্তু এখান থেকে মুক্তি মিলবে কবে? এ সোনার খাঁচা তার কাম্য নয়। জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকালে কোন মাইলফলকই দেখা যায় না। সারাটি জীবন যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ালেও সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেননি বলে মুক্তিযোদ্ধা হতে পারলেন না। নয়তো আজকে ভাতার পয়সায় নিজের বাড়িতেই কোনোমতে টিকে থাকতে পারতেন। তাছাড়া বিনামূল্যে চিকিৎসা-সেবাও পেতেন। প্রাইমারী স্কুলের চাকুরি ছেড়ে পেট্রোডলারের দেশে না গেলে পেনশনের টাকায় একজন মানুষ ভালভাবেই চলতে পারতেন। শুধু ভাল থাকার জন্য, ছেলেমেয়েদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য জীবনের সোনালি দিনগুলি মরুর আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করেছেন। ছেলেমেয়েরা পণ্ডিত হতে না পারলেও কমবেশি পড়াশুনা করেছে অবশ্য। মেয়েটাকে একটা সম্পন্ন ঘরে পাত্রস্থ করেছেন। বড়ছেলে যখন শিপিং কোম্পানীতে চাকুরি করত তখনও মোটামুটি ভদ্রভাবে চলতে পারত; কিন্তু বড়লোক হবে বলে চাকুরিটা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা ধরেছে। হ্যাঁ, তার লক্ষ্য হাসিল হয়েছে; সম্পদ তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে – দম ফেলার ফুরসৎ নেই। ছোটছেলেটাও বেঁচে থাকলে হয়ত সম্পদশালী হত, অটোমোবাইলে ডিপ্লোমা করে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিল।


চাপা অস্বস্তি নিয়ে আসরের নামাজ পড়ে মিতুলের বিছানার উপর গিয়ে বসেন আব্দুল মজিদ। মিতুল এখন মোবাইল ফোন টিপছে না; চোখ বন্ধ করে চিত হয়ে শুয়ে আছে। আব্দুল মজিদ মিতুলের চুলে আস্তে করে বিলি কাটেন। চোখ বন্ধ রেখেই মিতুল বলে, দাদা কিছু বলবে?

আব্দুল মজিদ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, নারে ভাই, কী আর বলব।

তোমার শরীর খারাপ করে নাইতো? চোখ মেলে তাকায় মিতুল।

না, শরীরতো যা আছে তাই; মনটা ভাল না। আব্দুল মজিদের বুকটা ভারী হয়ে আছে; একটু হালকা করার উপায় খুঁজছেন।

মিতুল কিছু না বলে আবার চোখ বন্ধ করে।

আব্দুল মজিদ জানেন, মিতুল ছোট হলেও সবই বোঝে। কিন্তু তার অবস্থাও একই রকম; না সইতে পারে না কইতে পারে। আব্দুল মজিদ শুনেছেন, তিনি আসার আগে হঠাৎ করে বিন্তির বিয়ে হয়ে গেছে কি একটা ঝামেলার ভিতর দিয়ে। তিনি ধরেই নিয়েছেন, এখনকার ছেলেমেয়েদের প্রেমটেম কতকিছু থাকে, এ রকমই কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা! গত ছয়মাস ধরে তিনি এখানে আছেন, কাউকেই বিন্তির নাম উচ্চারণ করতে শুনেননি। মিতুলও কিছু বলে না। সে তার বাপের খবরও রাখে না, মা’রও না।

হঠাৎ কাজুলী হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে রুমে। সে আব্দুল মজিদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মিতুলকে কাঁপাগলায় ডাকে, ভাইয়া, ভাইয়া!

মিতুল শোয়া থেকে উঠে বসে বলে, কী হয়েছে?
আম্মা ফোন করছিলেন। চিটাগাং যাইতাছেন।

মিতুল রেগে উঠে বলে, তো আমি কী করব?

কাজুলী আবার কাঁপা গলায় বলে, আব্বার নাকি কী অসুবিধা হইছে।

মিতুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ঠিক আছে, তুই যা।

মিতুল স্থির হয়ে গেলে কী হবে? আব্দুল মজিদের কাঁপুনি বেড়ে গেল। যত যাই হোক, নিজের ছেলেতো; এমনিতেই পচে আছে, এখন যদি গলে যায়! তিনি অস্থির হয়ে মিতুলকে জড়িয়ে ধরেন, ভাইয়া, আব্বার কী হয়েছে রে?

মুখে বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে মিতুল বলে, তার আমি কী জানি? কতকিছুই তো হতে পারে।

আব্দুল মজিদও গত ছয়মাসে বুঝেছেন, অনেক কিছুই হতে পারে। অনেক লোকের সাথে তার ছেলের ওঠাবসা, লেনদেন। বিপদ এলে অনেক দিক থেকেই আসতে পারে – অসুখবিসুখ, পুলিশ, পার্টনার, শত্রু...... তিনি হতাশ হয়ে মিতুলকে বলেন, তোর দিলে কি একটুও মায়াদয়া নেই? মাকে একটা ফোন কর না। জিজ্ঞেস কর আব্বার কী হয়েছে।

দাদার কথা শুনে মিতুল এই প্রথম একটু ফুঁসে উঠল। বলল, দাদা আমি তোমার সাথে বেয়াদবি করতে চাই না। এইযে তুমি আমাকে সবসময় জিজ্ঞেস কর, বিন্তি কোথায় আছে, বাপ কবে আসবে, মা কোথায় গেল; এসব প্রশ্ন তুমি ওদের করতে পার না? তুমি কেন মিউমিউ কর? তুমি না একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা? তুমি না বেয়নেট দিয়ে পাঞ্জাবির গলা কেটে তার মেশিনগান কেড়ে নিয়েছিলে? তুমি তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে পার না এত সম্পদ কোত্থেকে এল, কী তার ব্যবসা? তুমি তোমার ছেলের বউয়ের কাছে বিন্তির খোঁজ নিতে পার না? ......

আব্দুল মজিদ বুঝতে পারেন আজকে পাগলা ক্ষেপেছে; আজ হয়ত আসল সত্য কিছু জানা যাবে তার কাছ থেকে। সেটা নাহয় হল; কিন্তু ছেলের খবর পাবেন কীভাবে সে চিন্তা কাঁটার মত বিঁধে আছে মাথায়। গলার সুর এবার নরম করে বলেন, তুই না আমার বন্ধু, দাদুভাই! দিনরাত তোকেইতো আমি কাছে পাই, রাত জেগে গল্প করি; তোকেইতো সব কথা বলি ...

মিতুল মাথা নিচু করে বিছানার উপর জানু পেতে বসে আছে। সে দাদার কথা শুনে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারল না। ধরাগলায় বলল, দাদা আমার কিচ্ছু ভাল লাগেনা। এ ঘরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। কী হবে আমার ভোগ-বিলাসে, অঢেল সম্পদে? আমার বোন কোথায় কোন লম্পটের সাথে আছে জানিনা, আমার বাপ ড্রাগ ব্যবসার গডফাদার – কখন কোথায় মরবে জানিনা ...

আব্দুল মজিদ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না; অসাড়ের মত বিছানার উপর শরীর ছেড়ে দিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদের ছেলে মাদক ব্যবসায়ী! তিনি বলার মত কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। শুধু ডবডবে চোখ দুটি দিয়ে নাতির দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকেন।

বিন্তি কোথায় জান? মিতুল আবার বলতে শুরু করে। কারুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে আরেক টাকার কুমিরের হাত ধরে ঘর ছেড়েছে সে। ওই লোকটি ছিল তোমার ছেলের পার্টনার। আমরা আঙ্কেল ডাকতাম। এই ধাড়ি শয়তানটার সাথেই তোমার নাতনি চলে গেছে আমেরিকায়। এত বড় ঘটনার পরও তোমার ছেলে পড়ে আছে অন্ধকার জগতে। দাদা, কষ্ট আরও আছে। আমার মা... কোথায় স্বামীকে ফিরিয়ে আনবে, সে তাকে আরও ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের গভীর থেকে গভীরে...

হঠাৎ মিতুলের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলে আব্দুল মজিদের জড় অনুভূতি ধাক্কা খায়। তিনি ত্রস্ত হয়ে বলেন, দেখতো ভাই, আব্বুর ফোন নাকি।

মিতুল ফোন উঠিয়ে হেলো বলেই চুপ করে রইল। মিনিটখানিক পর কোনো কথা না বলেই কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ঝিম মেরে বসে রইল।

দাদা অস্থির হয়ে বলেন, কিরে কোনো কথা বললিনা যে; কে ফোন করেছিল?মা? আব্বা কেমন আছে?নিজের বিছানা থেকে উঠে এসে মিতুলকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। মিতুল কোনো কথা বলছে না দেখে তিনি তাকে আরও শক্ত করে ধরে বলেন, তোর দাদা বীর মুক্তিযোদ্ধা! তুই ভয় করিস না। অন্ধকারকে তছনছ করে দিব; আমি আছি তোর সাথে। বল, খবর বল; কে ফোন করেছিল?

মিতুল শক্তহাতে দাদাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলে দাদার আর বুজতে বাকি রইল না সময় অবশেষে হোঁচট খেয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে মিতুল বলল, আপনার ছেলে, ইয়াবার রাজা, আব্দুল জব্বার গতরাতে ক্রসফায়ারে মারা গেছে।

আব্দুল মজিদ, হতভাগা বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি শত্রুর টুঁটি চেপে ধরে একদিন এদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন, এমুহুর্তে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। আস্তে করে মিতুলের হাত ছাড়িয়ে তিনি বাথরুমে ঢোকেন। তারপর ভাল করে অজু করেন। সময় নিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়ে জায়নামাজের উপর উঠে দাঁড়ান। তারপর আস্তে করে মিতুলকে ডেকে আনেন তার কাছে। মিতুলের কান্না এখনও থামেনি; তার সাথে যোগ দিয়েছে কাজুলীও। মিতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, আমার অবশিষ্ট ছেলেটিও চলে গেল; দেখ, দেখ আমার চোখে কোনো পানি নাই, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমি কাঁদব না। মিতুল ফুঁফিয়ে উঠলে তাকে স্বান্তনা দিয়ে বলেন, তুই আমার ভাই, আমি আছি তোর সাথে। কান্নার দিন শেষ। দেখ সব অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। আজ আলোর দিন, আজ স্বাধীনতার দিন। আর কোনো কান্না নয়।

কিন্তু পরক্ষণেই আব্দুল মজিদের অশ্রুর পাথুরে বাঁধটি হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement